ঢাকার আকাশে ঝড়ের ঘনঘটা

অনলাইন

জ্যোতি মালহোত্রা, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস | ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭, সোমবার, ৯:৩৮ | সর্বশেষ আপডেট: ১২:২৪
আগের সময় ও পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বলা যায়, ২০১৭'র নভেম্বর মাসটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক নিয়তি নির্দিষ্ট করবে। এই ৭ই নভেম্বরে নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মোবাশ্বের হাসানকে তুলে নেয়া হয়েছে। এর সঙ্গে কথিতমতে দেশটির শক্তিশালী সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত। ১১ই জানুয়ারিতে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা পদত্যাগ করেছেন। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করার পরে প্রধানমন্ত্রী নিজে এবং তার দোসরগণ প্রকাশ্যে তার কঠোর সমালোচনা করে আসছিলেন। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়।
এরপর তিনি দেশত্যাগ করেন। গত নির্বাচনে শেখ হাসিনার দল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয়লাভ করে। ওই নির্বাচন বিএনপি ও তার মিত্র জামায়াত প্রতিবাদ হিসেবে বয়কট করেছিল। আর এখন বঙ্গবন্ধু কন্যা বিচারবিভাগ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন।
এরপর ১২ই নভেম্বরে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া কেন্দ্রীয় ঢাকার সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন, এদিন রাজধানী কয়েক ঘণ্টার জন্য অচল হয়ে পড়ে। ১৮ই নভেম্বরে শেখ হাসিনা একাত্তরে দেয়া তার পিতার ৭ই মার্চের অসামান্য ভাষণটি ইউনেস্কোর স্বীকৃতি লাভ উপলক্ষে উদযাপন করেন। এটি নিশ্চিতভাবেই বেগম খালেদা জিয়ার আগের সভাটির একটি প্রত্যুত্তর এবং তা ছিল পাল্টা শক্তি প্রদর্শনেরই একটি উদ্যোগ। এখন থেকে এক বছর পরে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে খালেদা জিয়ার অংশ গ্রহণের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন।
সুতরাং কি ঘটছে বাংলাদেশে? রোহিঙ্গা সংকটে ভারতের নেতৃবৃন্দের নির্জিব প্রতিক্রিয়ার বিপরীতে শেখ হাসিনার শক্তিশালী সাড়া অবশ্যই আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তাকে একটি উজ্জ্বল ভাবমূর্তি এনে দিয়েছে। এখনো একটি দরিদ্র দেশ হয়েও মিয়ানমারের জাতিগত নির্মূল অভিযানের বিরুদ্ধে তারা সোচ্চার হতে পেরেছে। এর ফলে চীনও প্রতিক্রিয়া দেখাতে বাধ্য হয়েছে। শেখ হাসিনা সাম্প্রতিক ইতিহাসের বাম্পার ফলন প্রত্যক্ষ করছেন। এডিবি সম্প্রতি বলেছে, বাংলাদেশ অর্থনীতি ২০১৬ সালে ৭ দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা গত ৩০ বছরের মধ্যে সব থেকে বেশি দ্রুত বেড়ে ওঠা প্রবৃদ্ধি। আর জিডিপির প্রবৃদ্ধি টানা ছয় বছর ৬ শতাংশের চেয়েও বেশি হারে বেড়েছে।
কিন্তু ওই পরিচ্ছন্ন দৃশ্য ঢাকার মধ্যবিত্তের বহুসংখ্যক বাড়িতে বিদ্যমান আশাভঙ্গের অনুভূতির সঙ্গে গুরুতর সংঘাত তৈরি করছে। গত কয়েক বছর ধরে শেখ হাসিনার ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিষয়ে আলোচনা চলছে। মর্যাদাপূর্ণ ইংরেজি দৈনিক স্টারের সম্পাদকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের ৮২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এরফলে এই সম্পাদককে দেশের বিভিন্ন স্থানের মফস্বল আদালতগুলোতে ছুটে বেড়াতে হয়েছে। দৈনিক প্রথম আলো বাংলাদেশ সরকারের আরেক চক্ষুশূল (হুইপিং বয়)। বর্তমানে যেনতেন প্রকারের একটা শান্তি বজায় রয়েছে। কিন্তু একাধিক সাংবাদিকের মত হলো প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার লম্বা হাত কখনই বেশি দূরে নয়।
রাষ্ট্র ক্রমাগতভাবে নিরাপত্তা বেষ্টনীতে বন্দি হয়ে পড়ছে। জনগণকে নিরাপত্তা সুরক্ষা দেয়ার নামে বিশেষ করে গত গ্রীষ্মে হলিআর্টিজান বেকারি আক্রমণের পর থেকে নতুন ব্যাটালিয়ন বৃদ্ধি করা হচ্ছে। সামরিক বাহিনী ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে। চীন থেকে শেখ হাসিনা দুটি সাবমেরিন ক্রয় করেছেন। কিন্তু এটা স্পষ্ট নয় যে, এই সাবমেরিন কোথায় বা কেন বা কিভাবে ব্যবহৃত হবে। নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা অপহরণের ঘটনা হামেশা ঘটছে। মানবাধিকার সংগঠন অধিকার শুধু ২০১৭ সালেই ৭৪ জনকে গোপনভাবে অন্তরীণ করেছে। আওয়ামী লীগের ভেতরকার লোকেরা বলছেন তাদের দলটি দুই ভাগ হয়ে গেছে। দুর্নীতি কার্যক্রম, চাঁদাবাজি, স্বজনপ্রীতি ও ঘুষ ঢাকা এবং বড় শহরগুলোতে ‘নিয়ন্ত্রণের’ বাইরে চলে গেছে।
জনগণ আওয়ামী লীগকে নিয়ে এতটাই হতাশ ও বিরক্ত হয়ে গেছে যে, বলা হয়ে থাকে যদি আজই নির্বাচন হয়, হাসিনার দল তাহলে ৩শ’ আসনের (৫০ নারী সংরক্ষিত আসন) মধ্যে শুধুমাত্র ৭৫টি আসন জিতবে। হাসিনাকে অবশ্য এখনো পর্যন্ত সম্পূর্ণরূপে দুর্নীতিমুক্ত দেখা হচ্ছে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য স্থানের মতোই তিনিও তার ছেলে জয়কে রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী বানাতে চাইছেন। কিন্তু তূণমূলে জয়ের সামান্যই সমর্থন রয়েছে। সুতরাং তার বোন শেখ রেহানা এবং তার ছেলে ববি ইতিমধ্যে অনেকটাই প্রকৃত ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন।
কিন্তু বাংলাদেশিরা এটাও হিসেবে রাখছেন যে, যদি হাসিনা পরাস্ত হন এবং বিএনপি ক্ষমতায় আসে তাহলে রাজপথে রক্ত¯œান ঘটবে। দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত খালেদার পুত্র তারেক বহু বছর ধরে লন্ডনে রয়েছেন এবং তিনি আরো বেশ ভারতবিরোধী এবং তিনি নিশ্চিতভাবেই দেশের রাজনৈতিক গহ্বরকে আরো গভীর ও বিস্তৃত করার সুযোগ হাতছাড়া করবেন না। এবং সব দোষের জন্য তিনি অভিযুক্ত করবেন ভারতকেই। উত্তর-পূর্ব ভারতের বিদ্রোহীদের কাছে অস্ত্র তুলে দেয়া, চীন-পাকিস্তান অক্ষ শক্তি থেকে সব সুবিধা নিঙরানো এবং বাংলাদেশকে সামরিক বাহিনী সমর্থিত একটি কর্তৃত্ববাদী সরকার ব্যবস্থায় পরিণত করাই হবে বিএনপির ‘কলিং কার্ড’।
দিল্লি নিশ্চিতভাবেই, শেখ হাসিনার তরফে বাংলাদেশে চীনা নেতা শি জিনপিংয়ের (গত বছর তার সফরকালে শি বাংলাদেশের জন্য ২৬ বিলিয়ন ডলারের একটি চেক কেটেছিলেন) সফর, রোহিঙ্গা ইস্যুতে পাকিস্তানে একজন রাষ্ট্রদূত প্রেরণ, চীনের উচ্চাভিলাসী ওবিওআর প্রকল্পে যোগদানের আশাবাদ এবং দেশের প্রথম হিন্দু প্রধান বিচারপতিকে সমালোচনা করার ঘটনাবলীতে স্বস্তিবোধ করছে না। অন্যদিকে শেখ হাসিনা উত্তরপূর্ব ভারতের বিদ্রোহ দমনে ভারতের অনুরোধ রক্ষায় বিপুলভাবে সাড়া দিয়েছেন। ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গের মতো প্রতিবেশী ভারতীয় রাজ্যগুলোতে তিনি বাস ও ট্রেন সার্ভিস পুনরায় চালু করেছেন। এমনকি তিনি নৌপথে ভারতীয় পণ্য ট্রানজিট দিতেও অনুমতি দিয়েছেন। সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পাকিস্তানে যখন বেসামরিক চেহারার সামরিক শাসন অসফল হচ্ছে, তখন ভারত বাংলাদেশকে একই পথে যাওয়া থেকে প্রতিরোধ করতে সাধ্যমতো চেষ্টা করবে। সব কিছুর পরেও শেখ হাসিনাই ভারতের এবং একইসঙ্গে তিনি তার অসন্তুষ্ট জনগণের জন্য এক দীর্ঘমেয়াদি ‘বেস্ট বেট’ রয়ে গেছেন।
তবে বাংলাদেশে গল্পের শেষটা অপ্রত্যাশিত। বিএনপি এখন ভারত সরকারের কাছে আসার চেষ্টা করছে। গত অক্টোবরে সুষমা স্বরাজ যখন ঢাকা গেলেন, তখন খালেদা জিয়া তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। যদিও বিএনপি নেতারা ২০১৩ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির ঢাকা সফরকালে তাকে অপদস্ত’ করেছিলেন। (খালেদার উচিত তার রাজত্ব বিন¤্র স¦ভাবের বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা, যদি তিনি সত্যিই তার কর্তব্য পালনে আন্তরিক হন) এদিকে দিল্লি আশা করছে যে, হাসিনা ‘ন্যূনতম দৃশ্যমান অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন’ অনুষ্ঠানের পথ করে দেবেন। এর অর্থ হলো যখন এক বছর পরে নির্বাচন আসবে তখন বৈধ বিরোধী দল হিসেবে বিএনপির তাতে অংশ নেয়া উচিত হবে।
একটি জাতি যারা গণতন্ত্র অর্জনের জন্য আত্মত্যাগ করেছে, আসন্ন বছরটি আমাদের বলে দেবে ১৯৭১ সালে যেসব প্রতিশ্রুতি তারা নিজেদের কাছে করেছিল, তা রক্ষা করা হচ্ছে কিনা। বাদবাকি অঞ্চলের মানুষ তা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
জ্যোতি মালহোত্রা: পরামর্শক সম্পাদক, দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

ভিডিও দেখে অস্ত্রধারীদের খোঁজা হচ্ছে

‘অতিষ্ঠ হয়ে প্রেমিককে ছুরিকাঘাত’

ফল প্রকাশের দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, অবরোধ

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সময় লাগবে ৯ বছর!

মত প্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত, আক্রমণের শিকার নাগরিক সমাজ

মেয়র আইভী হাসপাতালে

জিয়াউর রহমানের ৮২ তম জন্মবার্ষিকী আজ

এবার আটকে গেল দক্ষিণের ১৮ ওয়ার্ডের নির্বাচনও

হাথুরুকে দেখিয়ে দেয়ার লড়াই

‘আপনার এত তাড়াহুড়া কিসের?’

সংবাদটি আমাকেও শোকে মুহ্যমান করে ফেলে

‘নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতেই ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ রাখা হয়েছিল’

৬ মাসের প্রাণ পেলো যশোর রোডের গাছগুলো

সিলেটে রাজনীতির আড়ালে সক্রিয় ‘চিহ্নিত’ অপরাধীরা

‘নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে ৮০ শতাংশ ভোট পাবে বিএনপি’

কাজাখস্তানে বাসে আগুন লেগে ৫২ জনের মৃত্যু