শুধু সেই মানুষটি ফিরে আসে না

দেশ বিদেশ

রফিকুজজামান রুমান | ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭, সোমবার
চোখের পানিও বোধ করি ফুরিয়ে গেছে। হাহাকারে হাহাকারে মায়েদের হৃদয়গুলো শুকিয়ে পাথর। বাবারা হারিয়ে ফেলেছে সান্ত্বনার শেষ মরীচিকাটুকুও। সহধর্মিণীরা বুকফাটা নীরব বেদনায় ক্ষত-বিক্ষত। আর অবুঝ শিশুগুলো! কী নিদারুণ মমতা আর ভালোবাসায় প্রতিটি দিন অপেক্ষা করে আছে বাবা এই এলো বুঝি! দিন ফুরোয়, মাস চলে যায়, ক্যালেন্ডারের পাতায় আসে নতুন বছর। শুধু ফিরে আসে না সেই মানুষটি! সেই মানুষটি ফিরে আসে না, যে যাওয়ার আগে জানত না কোথায় যাচ্ছে কেন যাচ্ছে।
সেই মানুষটি ফিরে আসে না, যে যাওয়ার আগে অসুস্থ মায়ের হাত ধরে বলে গিয়েছিল- মা, সন্ধ্যায় এসে তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব। সেই মানুষটি ফিরে আসে না যার ফিরে আসার কথা ছিল তিন বছরের ছোট্ট বাচ্চাটার জন্য চকলেট হাতে।
২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর এক বাবাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো। চার বছরেও জানা গেল না সে কোথায় আছে। ক্লাস ওয়ানে পড়া মেয়ে মায়ের কাছে প্রশ্ন করে- মা, বাবা কবে আসবে। বাবা কেন ফিরে আসে না। মায়ের বুক ফাঁটে। চোখ থেকে ঝরে পড়ে হাহাকারের সমুদ্র। কী উত্তর দিবে অবুঝ এই মেয়েকে। মায়ের কান্না সইতে না পেরে ছোট্ট মেয়েই বলে ওঠে, কেঁদো না মা। বাবা ফিরে আসবে! বাবাকে নিয়ে যাওয়ার সময় এই মা ছিল অন্তঃসত্ত্বা। অনাগত ছেলে আজ সাড়ে তিন বছরের শিশু। এই শিশুর পৃথিবী বাবাহীন! কী নির্মম কী নিষ্ঠুর এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছি এই শিশুটিকে! ও হয়তো ধরেই নিয়েছে পৃথিবীতে বাবা বলে কোনো ব্যাপার নেই। কিন্তু ওর বয়সী অন্যরা যখন ওদের বাবাকে বাবা বলে, তখন মাকে জিজ্ঞস করে, আমার বাবা কোথায়? মা আবারো কাঁদে। মনে মনে বলে, এর চেয়ে নিশ্চিত জেনে গেলেই ভালো হতো যে মানুষটিকে মেরে ফেলা হয়েছে। এই রাষ্ট্র সেটুকুও তাকে জানতে দেয় না! স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরেও এই রাষ্ট্র আপনজনের ডেড বডি দেখার অধিকারটুকুও তাকে দেয়নি। স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা নয়; এই রাষ্ট্রের নাগরিকরা এখন প্রিয়জনের ডেড বডিটা কোথায় আছে সেটি জানার জন্যই বুকে পোস্টার নিয়ে মানব বন্ধন করে, সমাবেশ করে!
সম্প্রতি এমনই এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হলো বিশ্ব মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে জাতীয় প্রেস ক্লাবে। ‘মায়েরডাক- সন্তানদের মায়ের কোলে ফিরিয়ে দাও’ নামের এই সমাবেশে গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনরা এসেছিলেন। ২৭টি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে মায়েরা ছিলেন, বাবা, ভাইবোন, স্ত্রী, সন্তানরা ছিলেন। গুম হওয়ার পর থেকে প্রতিবছরই এমন সমাবেশে তারা আসেন। সমাবেশগুলো পরিণত হয় হাহাকারে। কষ্টে, কান্নায়, বেদনায় আর অসহায়ত্বে সমাবেশগুলো হয়ে ওঠে মানবিকতার নির্লজ্জ পরাজয়ের এক অতলান্ত দীর্ঘশ্বাস। যেন কোথাও কেউ নেই। রাষ্ট্র নির্বিকার। ‘জনগণকেই সকল ক্ষমতার উৎস’ বানানো সেই নির্বিকার রাষ্ট্রের পাষাণ দেয়ালে জনগণেরই কান্নাগুলো কী নিদারুণ করুণ রোদনে উপহাসের বয়ান লিখে যায়! জীবন যে রাষ্ট্রে এমন উপেক্ষা উপহাসের বিষয়, রাষ্ট্র হিসেবে তার কাছে কিসের দাবী তবে? এ দাবী নয়। এ কিছু করতে না পারার মরণ-বেদনা। কিছুই করার নেই বলে দাবিটুকু করা। এছাড়া আর কী-ই বা করার আছে! মনের গহীন কোণে স্বজন ফিরে আসবে বলে সামান্য মরীচিকা উঁকি দিয়ে উঠলেও চার বছরের বাস্তবতায় তা উবে যেতে সময় লাগে সামান্যই। তবুও আশায় বেঁচে থাকে মানুষ। মা, বাবা, আত্মীয় স্বজন। প্রতিরাতেই মা হয়তো প্রার্থনা করে ঘুমাতে যায়, মাঝরাতেই ছেলে এসে বলবে, মা, দরজা খোলো!
এমন প্রত্যাশায় বুকবাঁধা মায়ের সংখ্যা বেড়ে চলেছে ক্রমাগত। গেল আগস্ট মাসে গুম হওয়া ১২ জনের মধ্যে এখনো ফিরে আসেননি আটজন। গত ১০ই অক্টোবর সাংবাদিক উৎপল দাস বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকে নিখোঁজ। ২৭ই আগস্ট থেকে কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এমএম আমিনুর রহমান নিখোঁজ। চার নভেম্বর ‘নাই’ হয়ে যান নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোবাশ্বের হাসান। চার ডিসেম্বর বাসা থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেননি সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তথ্যমতে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত গুম বা অপহরণের শিকার হয়েছেন ৫২ জন। হংকংভিত্তিক এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশনের হিসেবে ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আট বছর নয় মাসে দেশে কমপক্ষে ৩৯৫ জন মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫২ জনের লাশ পাওয়া গেছে। ফিরে এসেছেন ১৯৫ জন। এখনো নিখোঁজ ১৪৮ জন।
লাশ পাওয়া গেছে যে ৫২ জনের তাদের পরিবার নিজেদেরকে ‘ভাগ্যবান’ ভাবছে! লক্ষ্মীপুরের ফয়েজ আহমেদ ২০১৪ সালে ক্রসফায়ারে নিহত হলে তার মেয়ে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, “দেশে অনেকের স্বজনরা এখনো গুম হয়ে আছেন। অনেকেই জানেননা তাদের স্বজনরা কী অবস্থায় আছেন, কোথায় আছেন। সে হিসেবে তাদের চেয়ে আমরা ভাগ্যবান। অন্তত আমরা আমাদের বাবার মরদেহটা পেয়েছি!”
দার্শনিক ডায়োজেনিস একদিন উঠোনে বসে রোদ পোহাচ্ছিলেন। তখন তার সামনে এসে হাজির হলেন বিশ্বজয়ী বীর আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট। বললেন, দার্শনিক, আপনার জন্য আমি কী করতে পারি? ডায়োজেনিস কিছুক্ষণ চুপ থেকে উত্তর দিলেন, আপনি যেটা করতে পারেন তা হলো, আমার সামনে থেকে সরে যাওয়া। আপনি আমার সামনে দাঁড়িয়ে রোদ আটকে দিয়েছেন। রোদ যেহেতু আপনি দিতে পারেন না, এটা নেয়ার কোনো অধিকারও আপনার নেই।
আহা, জীবন কতো বড় বিষয়! যে জীবন কেউ দিতে পারে না, সেই জীবন কতো সহজেই ‘নাই’ হয়ে যায়! মায়ের বাঁধন, বাবার স্নেহ, স্ত্রীর ভালোবাসা, সন্তানদের অপরিমেয় আবেগ কেমন অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় জীবন কেড়ে নেয়া এই রাষ্ট্রের কাছে!
যেখানে জীবন তুচ্ছ, সেই মৃত্যুকূপ আমার রাষ্ট্র নয়।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

ব্যাংক কোম্পানি আইন পাস, জাপার ওয়াকআউট

২০ হাজার টাকায় ১ বছর ক্লাস, অতঃপর...

শাম্মী আখতারের মৃত্যুতে শোবিজ অঙ্গনে শোকের ছায়া

ট্রেনে কাটা পড়ে রেলওয়ে কর্মকর্তার মৃত্যু

শাম্মী আখতারের জানাজা কাল বাদ জোহর

আইভী-শামীম সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, আহত অর্ধশত

শাম্মী আখতার আর নেই

স্বামী হত্যায় স্ত্রীসহ ৩ জনের ফাঁসির রায়

‘নির্বাচন সুষ্ঠু হলে বিপুল ভোটে জিতবে তাবিথ’

‘মিথ্যা মামলায় খালেদার কোনো ক্ষতি হবে না, জনপ্রিয়তা বাড়বে’

ডিএনসিসি উপনির্বাচন স্থগিত চেয়ে রিট, আদেশ বুধবার

জেলপলাতক ৩ বাংলাদেশিকে এখনো ধরা যায়নি, সীমান্তে নজরদারি

অনশন ভাঙলেন ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষকরা

পুতিনই হবেন রাশিয়ার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট

শেকলে বাঁধা সন্তান, উদ্ধার ১৩, গ্রেপ্তার পিতামাতা

মার্কিন কূটনীতিকদের তলব করেছে আফ্রিকার ৫ দেশ