‘যুদ্ধ আমাকে পরিবারের কথা ভুলিয়ে দিয়েছিল’

বাংলারজমিন

রিপন আনসারী, মানিকগঞ্জ থেকে | ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭, রোববার
১৯৭১ সাল। পরিবারের মায়া ত্যাগ করে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম মুক্তিযুদ্ধে। যুদ্ধ আমাকে পরিবারের সকলের কথা ভুলিয়ে দিয়েছিল। কারো প্রতি মায়া ছিল না। মাথায় শুধু একটাই চিন্তা ছিল কিভাবে দেশ স্বাধীন করবো। সব সময় রক্ত টগবগ করতো পাক হানাদার বাহিনী কিভাবে খতম করবো।
জীবন বাজি রেখে অসংখ্য হানাদার মারলাম। দেশ স্বাধীন হলো। ১৬ই ডিসেম্বর বাড়িতে এসেই প্রথম নবাগত সন্তানের মুখ দর্শন করি। এ কথাগুলো বলেছেন ৮১ বছর বয়সের সেই টগবগে যোদ্ধা মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বানিয়াজুরী গ্রামের অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধা আবদুল আজিজ। জানালেন, ২৬ মার্চ একমাত্র সন্তান জন্ম নিলেও তার মুখ পর্যন্ত দেখিনি। পরিবারের সকলেই জানতো মারা গেছি। কেউ কোনো যোগাযোগ করতে পারেনি। আমিও কোনো ধরনের যোগাযোগের চেষ্টা পর্যন্ত করিনি। যুদ্ধ আমাকে পরিবারের সকলের কথা ভুলিয়ে দিয়েছিল। কারো প্রতি মায়া ছিল না। মাথায় শুধু একটাই চিন্তা ছিল কিভাবে দেশ স্বাধীন করবো। সব সময় রক্ত টগবগ করতো পাক হানাদার বাহিনী কিভাবে খতম করবো। জীবন বাজি রেখে অসংখ্য হানাদার মারলাম। দেশ স্বাধীন হলো। কিন্তু আজো মুক্তিযোদ্ধারা না পাচ্ছে প্রকৃত সম্মান, না পাচ্ছে সমাজে মাথা উঁচু করে কথা বলতে। অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধারা এখনো মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। অথচ অনেকে যুদ্ধে অংশ না নিয়েও এখন হয়েছে বড় বড় মুক্তিযোদ্ধা। তাদের দাপটই এখন বেশি। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা রয়েছে অবহেলায়। মুক্তিযোদ্ধা আবদুল আজিজ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ ময়মনসিংহ পুলিশ লাইনে প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রস্তুতি শেষে ২৭শে মার্চ মেজর সফিউল্লার নেতৃত্বে খাগডোর ইপিআর ঘাঁটিতে অবাঙালি ইপিআর সদস্যদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে শতাধিক শত্রু খতম করি। শত্রু খতমের পর রক্ত আরো টগবগিয়ে উঠে। এর পর ১৪ই এপ্রিল টাঙ্গাইলের মধুপুর ব্রিজের নিকট পাকসেনাদের সঙ্গে ভোর ৪টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত চার ঘণ্টা সম্মুখ যুদ্ধে অশ নিয়ে বেশ কয়েকজন হানাদার আমাদের হাতে মারা যায়। তার কয়েকদিন পর ধানুয়া কালামপুর এলাকার কালিহাতি ব্রিজের নিকট এক প্লাটুন ইপিআর এবং এক প্লাটুন পুলিশ ফোর্স, আনসার ও কিছু ছাত্র মিলে পাকসেনাদের ওপর আক্রমণ চালাই। কিন্তু আমাদের চাইতে শত্রুদের সৈন্য বেশি থাকায় আমরা পিছু হটি। বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকী ও লতিফ সিদ্দিকী আমাকে সাহয্যে করার নেই যাত্রায় প্রাণে বেঁচে যাই। শক্রুদের বুলেট আমার কান ছুঁয়ে গেলে অল্পের জন্য রক্ষা পাই। পরে ময়মনসিংহ পুলিশ লাইনে চলে আসি। এর পর জুন মাসে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের অধীনে ১নং সেক্টরে যোগদান করে রংপুর ও ভুরুঙ্গামারীসহ বিভিন্ন রণাঙ্গনে পাকসেনাদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিই। আগস্ট মাসে চলে আসি নিজ জেলা মানিকগঞ্জে। সাটুরিয়া ও ঘিওর থানা কমান্ডার নিযুক্ত হয়ে প্রথমে সাটুরিয়া থানার দহগ্রামের এলাহি মাস্টার ও ঢাকার পশ্চিমাঞ্চলের অধিনায়ক ক্যাপ্টিন হালিম চৌধুরীরর নেতৃত্বে একটি পূর্ণাঙ্গ দল গঠন করি। সর্ব প্রথম সাটুিরয়া থানা আক্রমণ করে সফল হই। এর কিছুদিন পর বারোবাইরা ব্রিজ এবং বগাধর ব্রিজে রাজাকারদের ক্যাম্প আক্রমণ করে সমস্ত গোলাবারুদ দখলে আনি।
সর্বশেষ ১৪ই ডিসেম্বর সকালে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের মানিকগঞ্জ মানরা ব্রিজের সামনে পাবনা, সিরাজগঞ্জ থেকে আরিচা হয়ে পাকবাহিনীর আনুমানিক ২৩৫ সৈন্য পায়ে হেটে ঢাকা যাওয়ার সময় বাগে পেয়ে যাই। তখন সিংগাইর থানার তোবারক হোসেন লুডুর দল আমাদের সহায়তা করলে শত্রুদের ওপর হামলা চালাই। সর্বশেষ সম্মুখ এই যুদ্ধে আমাদের এক যোদ্ধা চান মিয়া শাহাদৎ বরণ করেন।
যুদ্ধ শেষে গ্রামের বাড়ি সাটুরিয়া উপজেলার তিল্লিতে ফিরে এলে বাড়ির কেউ বিশ্বাস করতে পারেনি আমি বেঁচে আছি। স্ত্রী, মা, বাবা ও স্বজনদের সে কি কান্না। ১৬ই ডিসেম্বর বাড়িতে এসেই প্রথম নবাগত সন্তানের মুখ দর্শন করি।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

শাম্মী আখতার আর নেই

স্বামী হত্যায় স্ত্রীসহ ৩ জনের ফাঁসির রায়

‘নির্বাচন সুষ্ঠু হলে বিপুল ভোটে জিতবে তাবিথ’

‘মিথ্যা মামলায় খালেদার কোনো ক্ষতি হবে না, জনপ্রিয়তা বাড়বে’

ডিএনসিসি উপনির্বাচন স্থগিত চেয়ে রিট, আদেশ বুধবার

জেলপলাতক ৩ বাংলাদেশিকে এখনো ধরা যায়নি, সীমান্তে নজরদারি

অনশন ভাঙলেন ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষকরা

পুতিনই হবেন রাশিয়ার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট

শেকলে বাঁধা সন্তান, উদ্ধার ১৩, গ্রেপ্তার পিতামাতা

আট ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল ঘোষণা

ট্রাম্পের মন্তব্যের প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের তলব করেছে আফ্রিকার ৫ দেশ

আপিলের অনুমতি পেয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ

যৌন হেনস্থা নিয়ে ভয়ে মুখ খুলছেন না বলিউড অভিনেত্রীরা!

রোহিঙ্গাদের সহায়তায় এক কোটি ওন দান করলেন অভিনেত্রী লি হানি

খালেদার শেষ, সালিমুল-শরফুদ্দিনের পক্ষে যুক্তিতর্ক মুলতবি

দক্ষিণ আফ্রিকায় মুক্তিপণ দেয়ার পরও খুন এক বাংলাদেশী