জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে ট্রাম্পের স্বীকৃতি গ্রহণযোগ্য নয় : প্রধানমন্ত্রী

প্রথম পাতা

কূটনৈতিক রিপোর্টার | ৮ ডিসেম্বর ২০১৭, শুক্রবার | সর্বশেষ আপডেট: ৫:৫৫
জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে ট্রাম্পের একতরফা স্বীকৃতি কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করে বাংলাদেশ। স্বীকৃতি না দিতে জাতিসংঘ, ইইউ, ফ্রান্স, তুরস্ক, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার আহ্বান-অনুরোধ উপেক্ষা করে বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী মেনে নেয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। শুধু তা-ই নয়, তেলআবিব থেকে মার্কিন দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তরের নির্দেশনাও দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তার এ ঘোষণায় মধ্যপ্রাচ্যে অশান্তির দাবানল জ্বলে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। চলমান শান্তি আলোচনা এবং ইসরাইল ও ফিলিস্তিন পৃথক দু’টি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বৈশ্বিক উদ্যোগ (সংকট সমাধানে দ্বি-রাষ্ট্র তত্ত্ব) ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। ট্রাম্পের ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করেছে আরব বিশ্ব, ইউরোপ ও জাতিসংঘ।
বাংলাদেশের তরফে খোদ প্রধানমন্ত্রী এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। কম্বোডিয়া সফর নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট সুয়োমটো যে ঘোষণা দিয়েছেন তা ইসলামিক ওয়ার্ল্ডে কারও কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ এখানে জাতিসংঘের রেজ্যুলেশন রয়েছে। রেজ্যুলেশন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়া উচিত। সরকার প্রধান এ-ও বলেন, জাতিসংঘের রেজ্যুলেশনকে যেভাবে অগ্রাহ্য করা হয়েছে তা বোধ হয় কেউই মেনে নেবে না। ফিলিস্তিন প্রশ্নে বিশেষ করে দেশটির জনগণের অধিকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন রয়েছে উদার মুসলিম রাষ্ট্র বাংলাদেশের। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা মনে করি, ফিলিস্তিনের একটা অধিকার রয়েছে। তাদের একটা নিজস্ব রাষ্ট্রের স্বীকৃতি অবশ্যই দিতে হবে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের (আরব-ইসরাইল যুদ্ধ) পরে তাদের যে ভূখণ্ডটা এবং যে সীমানাটা তাদের ছিল, যেটা তাদের রাজধানী হওয়ার কথা, সেটাই (জেরুজালেম) থাকা উচিত। শেখ হাসিনাও বলেন, এখানে এভাবে একতরফাভাবে করা মানে, অশান্তি সৃষ্টি করা। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রক্রিয়া আমেরিকাই শুরু করেছিল জানিয়ে তিনি বলেন, এর জন্য নোবেল প্রাইজও দেয়া হয়েছিল। ট্রাম্পের এবারের ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যকে অশান্তির পথে ঠেলে দিতে পারে- এমন আশঙ্কা করে শেখ হাসিনা বলেন, এমনটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। ফিলিস্তিনের জনগণ যাতে তাদের ন্যায্য অধিকার পায়, সে ব্যাপারে সকল মুসলিম দেশকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ারও আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। এদিকে রাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ট্রাম্পের ঘোষণায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জেরুজালেম বিষয়ে জাতিসংঘের প্রস্তাবনাকে সংরক্ষণের তাগিদ দেয়া হয়। বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়া বিশেষ করে ফিলিস্তিন ও ইসরাইল দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বৈশ্বিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত সব পক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
ওআইসির বৈঠকে যোগ দিচ্ছে বাংলাদেশ: জেরুজালেমে দূতাবাস স্থানান্তরকারী দেশের সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান আগেই জানিয়েছিল ওআইসি। ৫৭ মুসলিম রাষ্ট্রের জোট তাদের বিবৃতিতে বলেছিল- যে দেশ জেরুজালেমে ইসরাইলের দখলদারিত্বের স্বীকৃতি দেবে ওআইসি’র উচিত তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা। সেই আহ্বানের মধ্যেই জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তেলআবিব থেকে মার্কিন দূতাবাস সরিয়ে জেরুজালেমে নেয়ার ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এ অবস্থায় পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে ওআইসি’র একাধিক জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে। আল-আকসা মসজিদের কাস্টডিয়ান জর্ডান আগামী ১০ই ডিসেম্বর দেশটির রাজধানী আম্মানে ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক বৈঠকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এদিকে ওআইসি শীর্ষ সম্মেলনের চেয়ার তুরস্ক আগামী ১৩ই ডিসেম্বর ইস্তাম্বুলে সদস্য দেশগুলোর শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। বাংলাদেশ দুটি বৈঠকেই যোগ দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন সেগুনবাগিচার কর্মকর্তারা। তবে কোন পর্যায়ের প্রতিনিধি পৃথক ওই দুই বৈঠকে অংশ নেবেন তা এখনো ঠিক হয়নি বলে দাবি করেন আন্তর্জাতিক সংস্থা (আইও) অনুবিভাগের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা। উল্লেখ্য, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ জেরুজালেম প্রশ্নে বৈঠক আহ্বান করেছে। শুক্রবার সেই বৈঠক হবে।
জেরুজালেম নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়া: ওআইসি জানিয়েছে, জেরুজালেমের স্বীকৃতি বা সেখানে কূটনৈতিক মিশন স্থানান্তর করার বিষয়ে সতর্ক করে ওআইসি আগেই বলেছে, এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত হবে আরব দেশগুলো ও মুসলিম জাতির ওপর নিষ্ঠুর আঘাত। পোপ ফ্রান্সিসও মনে করেন আল আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে বিরাজমান স্থিতিশীলতার প্রতি সবার সম্মান জানানো উচিত। রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকি দিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান কূটনীতিক ফেডেরিকা মোঘেরিনি বলেন, শান্তি প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করে এমন পদক্ষেপ বরাবরই প্রত্যাখ্যাত। জেরুজালেম প্রশ্নে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঘোষণাকে ‘অস্থিরতাকবলিত মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরো বাড়িয়ে দেয়ার পদক্ষেপ’ আখ্যায়িত করে এর নিন্দা জানিয়েছে আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য মুসলিম দেশগুলো। ফিলিস্তিন বলেছে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে শান্তি আলোচনার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ওয়াশিংটন তার নেতৃত্বদানকারী ভূমিকার জলাঞ্জলি দিয়েছে। জাতিসংঘ ও ইইউ ট্রাম্পের ঘোষণায় ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে সতর্ক করেছে। জেরুজালেম বিষয়ে মার্কিন নীতি পরিবর্তনের বিরোধিতা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মিত্ররা। একতরফা ওই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছে ফ্রান্স। দেশটির তরফে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি বজায় রাখার আবেদনও জানানো হয়েছে। বৃটেন এর নিন্দা করে বলেছে, মার্কিনিদের সিদ্ধান্ত শান্তি উদ্যোগে কোনো ভূমিকা রাখবে না। জেরুজালেমে ইসরাইল ও ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অংশীদারিত্ব থাকা উচিত বলেও মনে করে বৃটেন। জার্মানি বলেছে, জেরুজালেমের মর্যাদা শুধু দ্বি-রাষ্ট্রীক সমাধানের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র আরব রাষ্ট্রগুলোও ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে সৌদি আরব বলেছে, ট্রাম্পের ঘোষণা ‘অযৌক্তিক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন’। আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ইসরাইলের সঙ্গে প্রথম শান্তিচুক্তি করা মিশর ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, এতেও জেরুজালেমের আইনি মর্যাদা নিয়ে বিতর্কের অবসান ঘটবে না। জর্ডান বলেছে, পূর্ব জেরুজালেমের ওপর ইসরাইলি দখলদারিত্বকে দৃঢ় করায় ট্রাম্পের পদক্ষেপ ‘আইনি বৈধতা হারিয়েছে’। লেবাননের প্রেসিডেন্ট মিশেল আউন বলেছেন, জেরুজালেমের বিষয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত সংকট সৃষ্টি করবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রচেষ্টার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে। এই সিদ্ধান্তে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে আর তাতে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। ট্রাম্পের পদক্ষেপকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে মন্তব্য করেছে তুরস্ক। তাদের ‘ভুল’ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে দেশটির সরকার। ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় তুরস্কের ইস্তাম্বুলে যুক্তরাষ্ট্রের কন্স্যুলেটের বাইরে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করে কয়েকশ’ প্রতিবাদকারী। কন্স্যুলেট ভবনের দিকে কয়েন ও অন্যান্য বস্তু ছুড়ে মারে তারা। ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিরসনে জাতিসংঘের দেয়া প্রস্তাবের লঙ্ঘন অভিহিত করে এর ‘তীব্র নিন্দা’ করেছে ইরান। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে ইসরাইলের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য যুদ্ধ শুরু করার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক বিশ্বের মুসলিম সমপ্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, “আমরা যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধী, এটি পরিষ্কার করে দিন।” এসব প্রতিক্রিয়ার বিপরীতে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে ইসরাইল। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, “ইসরাইলের প্রথম দিন থেকে এটি আমাদের লক্ষ্য ছিল, এটি শান্তির পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

ruhul

২০১৭-১২-০৭ ২২:২২:৩৯

দাবানলের সূচনা হয় ক্ষুদ্র স্ফুলিংগ থেকে। বিধ্বংসী দাবানল ঘটানোর অসাধু উদ্দেশ্যে যারা স্ফুলিংগ সৃষ্টির সুযোগ খোঁজে, মানবতার আদালতে তারা সর্বোচ্চ ঘৃণার পাত্র। কিছু কিছু মানবরূপী শয়তানের শয়তানির কাহিনী ইতিহাসের পরতে পরতে লেখা হয়ে আসছে সেই আদিকাল থেকে। তাদের দোসররা দাবানল নিয়ে অনেক কথা বলে। কিন্তু স্ফুলিংগ সৃষ্টির খলনায়কদের নিয়ে তারা একদম চুপ। তাদের বিবেক কোথায়!!!!!!?

আপনার মতামত দিন