রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন সুদূরপরাহত

প্রথম পাতা

মানবজমিন ডেস্ক | ৮ ডিসেম্বর ২০১৭, শুক্রবার | সর্বশেষ আপডেট: ২:৫৭
বাংলাদেশে আশ্রয় শিবিরগুলোতে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘদিন অবস্থান করার ফলে ‘মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকি’ বলে সতর্ক করেছে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি)। সব কিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের  মধ্যে সম্পর্কে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে পারে। তাতে আঞ্চলিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। তারা আরো বলেছে, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো এখনও সুদূরপরাহত এক আশা। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা সংকট ভয়াবহ এক দশায় প্রবেশ করেছে। বৃহস্পতিবার তারা এই সতর্কতা উচ্চারণ করেছে।
বলেছে, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মধ্য থেকে উগ্রবাদে ঝুঁকে পড়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং তা থেকে মিয়ানমারে আন্তঃসীমান্তে হামলা বাড়তে পারে। স্রোতের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ছুটে আসায় এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান কমিশনের সুপারিশ জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের জন্য মিয়ানমার সরকারকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ দেয়া উচিত বলে মন্তব্য করা হয়। এতে বলা হয়, মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের উৎখাত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এতে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভূমিকা রাখবে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কে এর প্রভাব পড়বে। এক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে আইসিজি বলেছে, টার্গেটেড অবরোধ আরোপ করার মধ্য দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়া যেতে পারে। এতে সংখ্যালঘুদের ওপর একই রকম ঘটনা ঘটে এমন অনেকে বিরত থাকবে। ‘মিয়ানমারস রোহিঙ্গা ক্রাইসিস এন্টারস এ ডেঞ্জারাস নিউ ফেজ’ শীর্ষক দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আইসিজি। এর চতুর্থ অংশের উপশিরোনাম হলো ‘ডেঞ্জার এহেড’। অর্থাৎ সামনেই বিপদ। এই সেকশনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো এক সুদূরপরাহত আশা। গত তিন মাসে কমপক্ষে ৬ লাখ ২৪ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। এক্ষেত্রে তাদের ফিরে যাওয়ার অধিকারের পক্ষে থাকা উচিত মিয়ানমারের প্রতিবেশী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অন্য সদস্যদের। পাশাপাশি মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে যাতে তারা রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় ও নিরাপদে দেশে ফিরে যাওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে মিয়ানমারে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোহিঙ্গার ফিরে যাওয়ার আশা কঠোরভাবে ম্লান হয়ে উঠেছে। ওই রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, ন্যাপিডতে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়া সংক্রান্ত একটি চুক্তি ২৩শে নভেম্বর স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার। উভয় পক্ষের কাছে এটা একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের বিষয় ছিল। বাংলাদেশ ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তারা অনির্দিষ্টকাল ধরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেবে না। এ নিয়ে দু’পক্ষ যে বিবৃতি দিয়েছে তাকে অবিলম্বে রোহিঙ্গা ফেরত যাওয়ার চেয়ে অভীষ্ট লক্ষ্য হিসেবে দেখা উচিত। ডকুমেন্ট অনুযায়ী যেসব রোহিঙ্গাকে ফেরত নেবে মিয়ানমার তাদের মানদণ্ড বা ক্রাইটেরিয়া সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তা খুব কষ্টদায়ক কিছু নয় বলে মনে হবে। এতে বলা হয়েছে, যাদের ফেরত নেবে মিয়ানমার তারা হলো ২০১৬ সালের ৯ই অক্টোবরের পরে দেশ ছেড়ে আসা রোহিঙ্গা। মিয়ানমারে তারা বসবাস করতেন এ বিষয়টি তাদের প্রমাণ করতে হবে। এক্ষেত্রে বিশেষ কোনো প্রমাণপত্র দেখানোর দরকার নেই। তাদের ঠিকানাই যথেষ্ট। কিন্তু প্রত্যাবর্তনে সবচেয়ে বড় বাধা অন্যখানে। খুব কম সংখ্যক রোহিঙ্গাই চুক্তি মেনে স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে রাজি হতে পারেন। রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি এখনও সহায়ক অবস্থা থেকে অনেক দূরে। সেখান থেকে এখনও গভীরভাবে আঘাত পাওয়া শরণার্থীর ঢল অব্যাহত আছে। উপরন্তু মিয়ানমার থেকে পরিষ্কার করে বলা হয়নি, দেশে ফিরে গেলে রোহিঙ্গাদের তাদের আদি গ্রামে, মূল বসতভিটায় থাকতে দেয়া হবে কিনা। তারা তাদের চাষের জমি ফেরত পাবে কিনা। চুক্তি অনুযায়ী, দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে রোহিঙ্গাদের দেয়া হবে ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড। কিন্তু বেশির ভাগ রোহিঙ্গা এটা নিতে আপত্তি করেন। কারণ, তাদের আশঙ্কা এর মাধ্যমে তাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের মর্যাদা দেয়া হবে। ওদিকে আশ্রয় গ্রহণকারী রোহিঙ্গাদের মধ্যে ‘সন্ত্রাসীদের’ (আরসা) উপস্থিতি ও তাদের সমর্থন দেয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সরকার ও নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা। সতর্ক করা হয়েছে, এমন কোনো ব্যক্তি ফিরে গেলেই তাকে গ্রেপ্তার করা হবে। রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে আর একটি বড় বাধা হলো রাখাইনের বৌদ্ধ নেতারা ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়। তারা যেকোনো রোহিঙ্গার ফিরে যাওয়া কঠোরভাবে বিরোধিতা করে। এসব বাধা যদি কাটিয়ে উঠা যায় তাহলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া হবে ধীরগতির। মিয়ানমারের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেছেন, প্রতিদিন তারা মাত্র ৩০০ রোহিঙ্গার বিষয় তদারক করতে পারবেন। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক এজেন্সির কোনো ভূমিকা থাক এতে এর আগাগোড়া বিরোধিতা করে আসছে মিয়ানমার। দ্বিপক্ষীয় চুক্তির অধীনে তাদের উপস্থিতির বাধ্যবাধকতা রাখা হয় নি। আইসিজি বলেছে, মৌলিকভাবে স্বেচ্ছায় ফেরত যাওয়ার মতো পরিবেশ সৃষ্টিতে যেমন সরকার কোনো রাজনৈতিক সদিচ্ছা পোষণ করে, তেমনটা নিরাপত্তা রক্ষাকারীরাও। ফলে রোহিঙ্গা সংকটের বিশ্বাসযোগ্য সমাধান ও কার্যকর প্রক্রিয়া কোনো ইতি টানতে পারবে না। এর ফলে বাংলাদেশের গিজগিজে আশ্রয় শিবিরগুলোতে কয়েক লাখ রোহিঙ্গাকে দীর্ঘ সময় আটকে থাকার আশঙ্কা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটা ভবিষ্যতের চাওয়া হতে পারে না। যদি এমনটা হয় তাহলে তা একটি মানবিক ট্র্যাজেডি হবে। শুধু তা-ই নয়, তা হবে একটি ভয়াবহ নিরাপত্তা ঝুঁকি। ওই রিপোর্টে আইসিজি আরো বলেছে, ২৮শে আগস্টের পর আরসা নেতা আতাউল্লাহর কোনো ভিডিও প্রকাশ করা হয় নি। এতে মনে হতে পারে তারা নীরব হয়ে গেছে। কিন্তু তারা নীরব হয় নি। তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের রয়েছে একটি টুইটার অ্যাকাউন্ট। তা কিন্তু এখনও সক্রিয় রয়েছে। ৭ই অক্টোবর এতে একটি বিবৃতি প্রকাশ হয়েছে। তাতে একতরফা অস্ত্রবিরতির ঘোষণা দেয়। তারপর থেকে তারা আর কোনো হামলা চালায় নি। তারা সংগঠিত। কয়েক শত গ্রামে তাদের রয়েছে সুসংগঠিত সেল। তাদের নেই কোনো নির্ধারিত পোশাক। তাদের সঙ্গে রয়েছেন স্থানীয় পর্যায়ের সম্মানিত কিছু নেতা ও ধর্মীয় নেতা। এদের অনেকেই এখন বাংলাদেশে আশ্রয় শিবিরে রয়েছেন। তারা সীমান্ত পেরিয়ে হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুতি নিতে পারে। এ জন্য তাদের বিভিন্ন রকম প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। দরকার হাতের নাগালে অস্ত্র। তারা এখন বাংলাদেশে বসে তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে থাকতে পারে। এজন্য বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ হওয়ার কারণ রয়েছে। এবং এ জন্যই মিয়ানমারের প্রতি হতাশা প্রকাশ করতে পারে বাংলাদেশ। আইসিজি বলেছে, আরসা সীমান্ত অতিক্রম করে যদি হামলা চালাতে সক্ষম হয় তাহলে তাদের টার্গেট হতে পারে নিরাপত্তা স্থাপনা বা নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী। অথবা তারা হামলা চালাতে পারে রোহিঙ্গাদের জমির দখল নেয়া অমুসলিমদের ওপরে। এটা হতে পারে তাদের সহজ টার্গেট। এমন হামলা হলে অপরিহার্যভাবে তার নেতিবাচক পরিণতি হবে। এতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাবে। এমন কি তা থেকে দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘাত দেখা দেয়ার বড় রকমের আশঙ্কা রয়েছে। আরসা যদি নতুন করে হামলা চালায় তাহলে মিয়ানমারের ভিতরে রোহিঙ্গা বিরোধী সেন্টিমেন্ট নতুন করে জেগে উঠবে এবং তাতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি কঠোর হবে, যাতে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার সুযোগ আরো হ্রাস করবে। তা ছাড়া রাখাইনের বৌদ্ধ গ্রামগুলোতে যদি হামলা হয় তাতেও মুসলিম বিরোধী ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়বে। তা ছড়িয়ে পড়তে পারে রাখাইন রাজ্যের মধ্যাঞ্চলেও। এই স্থানটি সাম্প্রতিক সহিংসতা স্পর্শ করে নি। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে এখন যে সম্পর্ক বিদ্যমান তা যেন ক্ষুরধার একটি ছুরির ওপর রাখা। এই অবস্থায় আরসা যদি হামলা চালায় তাতে আরো সহিংসতা দেখা দেবে। আন্তর্জাতিক জিহাদি গ্রুপগুলো মিয়ানমারের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দেখা দেবে। এতে বলা হয়েছে, বিশ্ব যেহেতু এই ইস্যুতে লড়াই করছে, এমন সময়ে এই সংকট নতুন, আশঙ্কাময় ও উচ্চমাত্রায় অনিশ্চিত অবস্থায় প্রবেশ করেছে তাই গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রদায়কে কিছু কথা মনে রাখতে হবে।
এক. রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে ফেরত যাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। একই সময়ে বাংলাদেশে অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদের বেশির ভাগই সহসা তাদের দেশে ফিরতে পারবেন না। এতে বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ শরণার্থী শিবিরে বেঁচে থাকা ও মর্যাদা ধরে রাখার ক্ষেত্রে বিপুল এক মানবিক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে। এতে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভয়াবহ এক ঝুঁকি সৃষ্টি হবে। এ বিষয়টিতে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন।
দুই. মিয়ানমারে রাজনৈতিক গতিবিধির পরিবর্তনকে স্বীকার করা গুরুত্বপূর্ণ। রোহিঙ্গা ইস্যুতে সরকার, সেনাবাহিনী এমনকি পুরো দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ। সেখানে জাতীয় ঐক্য খুবই শক্তিশালী। আধুনিক ইতিহাসে এমনটা দেখা যায় না। এক্ষেত্রে কোনো নীতি গ্রহণ করা হলে তার বাস্তবায়ন কঠিন কবে। তাই কোনো অবরোধ দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। ওদিকে দু’এক মাসের মধ্যে বৈধ রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার কার্যক্রম শুরু করার বিষয়ে একমত হয়েছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার। তবে এ নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। বলা হয়ছে, কত সংখ্যক রোহিঙ্গা নিজেদেরকে বৈধ প্রমাণ করতে পারবেন এবং ফিরে যেতে পারবেন রাখাইনে সে বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা যে এলাকাকে গ্রাস করেছে সেখানে তারা ফিরে যেতে চান কি না? এমন সব প্রশ্ন সামনে চলে আসছে। এক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় এসে দাঁড়িয়েছে মিয়ানমারের মিত্র চীন। তবে মিয়ানমারের ওপর টার্গেটেড অবরোধ দেয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে ওয়াশিংটনে। বুধবারও সেখানকার কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব পাস করেছে।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন