নি র্বা চ নী হা ল চা ল (বগুড়া ৪)

শক্ত অবস্থানে বিএনপি, হাল ছাড়ছে না আওয়ামী লীগ

প্রথম পাতা

প্রতীক ওমর, বগুড়া থেকে | ৮ ডিসেম্বর ২০১৭, শুক্রবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:৪০
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে চলছে বগুড়ার সর্বত্র আলোচনা। সম্ভাব্য প্রার্থীর পাশাপাশি নড়েচড়ে বসেছেন নেতাকর্মীরাও। জাতীয় রাজনীতিতে বগুড়া বরাবরই আলোচিত। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জন্মভূমি  এর মূল কারণ। আর এই এলাকার রাজনীতিতে বরাবরই বিএনপি এগিয়ে। কিন্তু বিগত নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করায় বগুড়ার ৭টি সংসদীয় আসনেই আওয়ামী লীগ জোট থেকে এমপি নির্বাচিত হন।
এরপর থেকে রাজনৈতিক মামলা এবং পুলিশের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকার ফলে বিএনপি এবং জোটের শরিক দলগুলো অনেকটাই কোণঠাসা হয়ে পড়ে। বিএনপির কিছু নেতাকর্মী মাঠে থাকলেও বিগত বছরগুলোতে বড় কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারেনি। অপর দিকে জামায়াতের নেতাকর্মীরা প্রথম দিকে রাজনৈতিক মাঠ দখল করে থাকলেও শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারেনি। কয়েক হাজার নেতাকর্মীর নামে মামলা এবং নেতারা জেলে থাকায় এক সময় জামায়াতও মাঠের বাইরে চলে যায়। এতো কিছুর পরেও গেল ইউপি নির্বাচন এবং উপজেলা নির্বাচনে জামায়াতের একাধিক প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। প্রকাশ্যে তাদের কার্যক্রম না থাকলেও গোপনে সাংগঠনিক ভিত মজবুত করছে।
কাহালু ও নন্দীগ্রাম উপজেলা নিয়ে গঠিত বগুড়া-৪ আসন। কাহালু উপজেলার ৯ ইউনিয়ন একটি পৌরসভা ও নন্দীগ্রামের ৫ ইউনিয়ন একটি পৌরসভা এ আসনের আওতাভুক্ত। এই আসনে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে জাসদের প্রার্থী রেজাউল করিম তানসেন এমপি নির্বাচিত হন। জাতীয় পার্টির প্রার্থী নুরুল আমীন বাচ্চু তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন।
দুই উপজেলার সাধারণ জনগণ এমপি তানসেনের উপর অনেকটাই নাখোশ। খোদ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও তার প্রতি ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সড়ে যাওয়ায় মূলত তিনি নির্বাচিত হয়েছেন। এবার আওয়ামী লীগ কোনো ভাবেই তাকে ছাড় দেবে না বলে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে।
অন্যদিকে দীর্ঘদিন বিএনপির দখলে থাকা বগুড়া ৪ আসনটি আওয়ামী লীগ দখলে নিতে বরাবরই ব্যর্থ ছিল। বিএনপির দখলে থাকা সেই আসনটি গতবারের নির্বাচনে জাসদের (ইনু) তানসেন এর দখলে চলে যায়। হঠাৎ নির্বাচনী এলাকা ছেড়ে জনবিচ্ছিন্ন ও দলীয় নেতাকর্মী বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন বিএনপির সাবেক এমপি মোস্তফা আলী মুকুল। নেতৃত্ব সংকটে পড়ে বিএনপি। বিপর্যয়ে থাকা দল ও নেতাকর্মীর দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ান জেলা বিএনপির সদস্য ও জিয়া শিশু কিশোর সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতা আলহাজ মোশারফ হোসেন। তিনি নিয়মিত এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের পাশে থেকে দলীয় কর্মসূচি, জাতীয় কর্মসূচি ও নিয়মিত গণসংযোগ করে যাচ্ছেন। স্থানীয় বিএনপি কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে দাবড়ে বেড়াচ্ছেন মাঠ। গেল দুই ঈদ এবং সম্প্রতি পরপর দুই দফা বন্যায় নন্দিগ্রাম এবং কাহালু উপজেলায় আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল কৃষক সমাজ। মোশারফ হোসেন এই সময়গুলোতে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ান।
অপরদিকে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন আরেক নেতা  অ্যাডভোকেট রাফী পান্না। তিনি বগুড়া জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও নন্দীগ্রাম উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি। তিনিও সমান তালে কাজ করে যাচ্ছেন। দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নের পাশাপাশি জনসংযোগ করছেন। নিয়মিত সাধারণ মানুষের খোঁজ খবর রাখছেন।
নির্বাচনী এলাকায় নিজের উপস্থিতি জানান দিতে নিয়মিত গণসংযোগে অংশ নিচ্ছেন বিএনপির আরেক নেতা অ্যাডভোকেট গোলাম আকতার জাকির। তিনি জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সদস্য, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং সাবেক ছাত্র নেতা। কাহালু-নন্দিগ্রামের সর্বস্তরের মানুষের খোঁজ-খবর নেয়ার পাশাপাশি সাংগঠনিক কর্মসূচিগুলোতেও তার উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।   
এ ছাড়াও বিএনপি থেকে মনোনয়ন পাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন সাবেক সংসদ সদস্য জেড আই এম মোস্তফা আলী মুকুল, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানী, জেলা বিএনপির ধর্মীয় সম্পাদক মাওলানা ফজলে রাব্বী তোহা, সাবেক সংসদ সদস্য ডা. জিয়াউল হক মোল্লা। নন্দীগ্রাম উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট রাফী পান্না বলেন, সারা জীবন বিএনপির জন্য কাজ করেছি। আসছে নির্বাচনে বেগম জিয়ার আশীর্বাদ পেলে অংশগ্রহণ করবো। তিনি আশাবাদী ধানের শীষে বিজয়ী হয়ে জনগণের জন্য আরো বেশি কাজ করবেন।
জেলা বিএনপির সদস্য ও জিয়া শিশু কিশোর সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতা আলহাজ মোশারফ হোসেন বলেন, দলীয় সব ধরনের কর্মসূচি নিয়মিত পালন করে যাচ্ছি। দলকে গোছানোর জন্য সর্বাত্মক কাজ করে যাচ্ছি। তিনিও আশাবাদী, আসছে নির্বাচনে কেন্দ্রের নজর তার দিকেই থাকবে। ধানের শীষের টিকিট পেলে জয়ী হওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সদস্য অ্যাডভোকেট গোলাম আকতার জাকির বলেন, বাংলাদেশে হারানো গণতন্ত্র উদ্ধারের সংগ্রামে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার হাতকে শক্তিশালী করতে তিনি সব সময় প্রস্তুত। তিনিও আশাবাদী আগামী নির্বাচনে এই আসনে দল থেকে মনোনয়ন পাবেন।   
কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি ভিপি সাইফুল ইসলাম বলেন, বিএনপি অনেক বড় দল। সে কারণে নেতাও বেশি। আসছে নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে কাহালু-নন্দিগ্রাম আসন থেকে একাধিক প্রার্থী মাঠে কাজ করছে। কেন্দ্র যাকেই মনোনয়ন দেবে স্থানীয় বিএনপি তার পক্ষেই কাজ করবে।     
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ মমতাজ উদ্দিন এই আসনে মনোনয়নের দৌড়ে এখন পর্যন্ত এগিয়ে আছেন। তিনি এর আগের নির্বাচনে ওই আসন থেকে নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে ছিলেন। পরে মহাজোটের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে তিনি নির্বাচন থেকে সড়ে যান। এবার তিনি অনেকটাই কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন নৌকার টিকিট নিতে। জনসংযোগের পাশাপাশি দলীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে কাহালু-নন্দিগ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ ওই নেতার প্রতি সম্মান জানিয়ে  শেষ পর্যন্ত হয়তো অন্য নেতারা সড়ে আসবেন। কেন্দ্র থেকেও অনেকটা গ্রিন সিগনাল আছে প্রবীণ এই নেতার প্রতি।
এছাড়াও আওয়ামী লীগ থেকে এখন পর্যন্ত মনোনয়নের প্রত্যাশায় মাঠে কাজ করছেন কাহালু উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র আলহাজ হেলাল উদ্দিন কবিরাজ। তিনিও মমতাজ উদ্দিনের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় সভা সমাবেশ করছেন।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ মমতাজ উদ্দিন বলেন, বিগত দুই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বগুড়ায় ব্যাপক উন্নয় হয়েছে। সেই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে জনগণ আবারো আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় আনবে। তিনি বলেন, কাহালু-নন্দিগ্রাম আসনে এবার দলীয় মনোনয়নের জন্য জনগণ তাকেই চাচ্ছে। তিনিও আশা করেন, এবার এই আসনে নৌকার টিকিট তার হাতেই দেয়া হবে।   
কাহালু উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র আলহাজ হেলাল উদ্দিন কবিরাজ বলেন, দলের বিবেচনায় আমি মনোনয়ন পেলে এই এলাকার মানুষের ভালোবাসায় আমি জয়ী হবো। তিনি বলেন, জনগণ উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখতেই নৌকায় আবারো ভোট দেবে।
গতবারের জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী-নন্দীগ্রাম উপজেলা জাপার সভাপতি হাজী নুরুল আমীন বাচ্চু এবারো নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। সেই সঙ্গে তিনি দলীয় কর্মীদের সঙ্গে  যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন। পাশাপাশি জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও বগুড়া শহর কমিটির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুস সালাম বাবু এবার জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন পেতে মাঠে কাজ শুরু করেছেন। সাংগঠনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন।
নির্বচানের বিষয়ে তিনি বলেন, কাহালু নন্দিগ্রাম থেকে তিনি নির্বাচন করবেন। সে জন্য ইতিমধ্যেই তিনি নির্বাচনী প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেছেন। তিনি আশাবাদী এবার কেন্দ্র তাকেই মনোনয়ন দেবে।   
এ ছাড়াও জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচনের মনোনয়ন পেতে মাঠে আছেন জাপার কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও জেলা যুব সংহতির আহ্বায়ক শাহীন মোস্তফা কামাল ফারুক, জাতীয় তরুণ পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা আলহাজ আছির উদ্দিন কবিরাজ। জামায়াতের প্রকাশ্যে কোনো কার্যক্রম না থাকলেও কাহালু উপজেলা চেয়ারম্যান মাওলানা তায়েব আলীর নাম শোনা যাচ্ছে প্রার্থী হিসাবে। তবে জোট থেকে না স্বতন্ত্র নির্বাচন করবেন তা নির্ভর করছে কেন্দ্রীয় নেতাদের ওপর।

আগামীকাল: সুনামগঞ্জ-৫

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

kazi

২০১৭-১২-০৭ ১৩:৩৯:৪৩

২০১৪ সালের আগে বিএনপি যে সব আসনে শক্তিশালী ছিল নির্বাচনে অংশ নিলে ঐ সব আসনে তারাই বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা ।

আপনার মতামত দিন