‘পরিকল্পনা ছিল ঢাকায় হামলার’

বগুড়ায় জেএমবি’র সামরিক কমান্ডার গ্রেপ্তার

শেষের পাতা

বগুড়া প্রতিনিধি | ৮ ডিসেম্বর ২০১৭, শুক্রবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:৫০
ঢাকা অ্যাটাকের পরিকল্পনা করছিল উত্তরাঞ্চলের নব্য জেএমবির সামরিক  প্রধান বাবুল মাস্টার ও মিজান। তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ঢাকা যাওয়ার
 প্রস্তুতিকালে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে তারা। সেই সঙ্গে ভেস্তে যায় তাদের পরিকল্পনা। বুধবার রাত ১টায় তাদের বগুড়ার মোকামতলা বাজারের পাশ থেকে আটক করে পুলিশ। এ অভিযানে অংশ নেয় পুলিশ সদর দপ্তরের এলআইসি শাখার সদস্যরাও।
পুলিশের হাতে গ্রেপ্তাররা হলো, উত্তরাঞ্চলের সামরিক প্রধান ও শুরা সদস্য বাবুল আক্তার ওরফে বাবুল মাস্টার (৪৫), শুরা সদস্য দেলোয়ার হোসেন ওরফে দেলোয়ার মিস্ত্রি ওরফে মিজানুর রহমান (৩৯), সক্রিয় সদস্য আলমগীর ওরফে আরিফ (২৮) ও সক্রিয় সদস্য আফজাল ওরফে লিমন (৩২)।
গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছে থাকা ১টি নাইন এমএম পিস্তল, ৫টি নাইন এমএম পিস্তলের গুলি, ১টি ম্যাগাজিন, ১০টি ৭.৬২ পিস্তলের গুলি, ১টি চাপাতি এবং ৪টি বার্মিজ চাকু উদ্ধার করা হয়েছে।
বাবুল মাস্টার দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার বাসিন্দা বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বাবুল মাস্টারের জঙ্গি জীবন: উত্তরাঞ্চলের সামরিক প্রধান ও শুরা সদস্য বাবুল আক্তার ওরফে বাবুল মাস্টার। দিনাজপুর বিরামপুর উপজেলার কসবা সাগরপুর জালেপাড়ার বাসিন্দা। তার পিতা মৃত শফিকুল ইসলাম ওরফে শফু দর্জি। বাবুল ২০০৩ সালে জেএমবিতে যোগ দেয়। ২০১৩ সাল পর্যন্ত গোটা উত্তরাঞ্চলে ওই সংগঠনের দাওয়াতি কার্যক্রম চালিয়ে আসে। ২০১৪ সালে সে নব্য জেএমবিতে যোগ দেয়। রাজীব গান্ধী ওরফে জাহাঙ্গীর আলম গ্রেপ্তারের পর নব্য জেএমবির উত্তরাঞ্চলের নেতৃত্বে আসে বাবুল। সাংগঠনিক কাজে দক্ষতা এবং বিশ্বস্ততার পরিচয় দেয়ায় ২০১৭ সালের মে মাসে শুরা সদস্য মনোনীত হয়। সে সাংগঠনের জন্য অর্থ সংগ্রহ, সদস্য সংগ্রহ, হামলার টার্গেট, ব্যক্তি ও স্থান নির্ধারণ করত। তার নির্দেশেই ঘটত বিভিন্ন স্থানে হত্যাকাণ্ড। ২০১৬ সালের ২৫শে মে গাইবান্ধা জেলার মহিমাগঞ্জের আলোচিত জুতা ব্যবসায়ী দেবেশ চন্দ্র প্রামাণিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ছিল।
দেলোয়ার হোসেন ওরফে দেলোয়ার মিস্ত্রি ওরফে মিজানুর রহমানের জঙ্গিপনা: মিজান বগুড়ার শেরপুরের আলোচিত জঙ্গি আস্তানার প্রধান আসামি। তার গ্রামের বাড়ি নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার পরইল আছির হাজিপাড়া। তার পিতা মৃত লোকমান আলী। মিজান পারিবারিকভাবেই জেএমবির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। তার পরিবারে নারী পুরুষ সবাই এর সঙ্গে জড়িত। মিজানের চার ভাই, এক ভাতিজা খায়রুল ২০১৬ সালে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়। মিজানের ছোট ভাই গত মাসের ১৬ তারিখে নওগাঁর আত্রাই থানা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে। মিজান মূলত ২০০৫ সালে তার বড় ভাই ইউসুফ হাজির মাধ্যমেই এই সংগঠনে প্রবেশ করে। ২০১২ সাল পর্যন্ত সে ওই সংগঠনের হয়ে নওগাঁ, নাটোর, রাজশাহী ও চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলায় সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করে। ২০১৩ সালে নতুন জঙ্গি সংগঠন জুনুদ আত তাওহীদ আল খিলাফা সংগঠনে যোগ দেয়। ২০১৪ সালে নব্য জেএমবিতে যোগ দিয়ে নওগাঁ, জয়পুরহাট, নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া জেলায় সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করে। মিজান ২০১৫ সালের ২৫শে ডিসেম্বর রাজশাহীর বাঘমারা থানার আহম্মদীয়া মসজিদে আত্মঘাতী হামলার প্রধান পরিকল্পনাকারী। ওই হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল তার আপন আরেক ছোট ভাই আনোয়ার হোসেন নাঈম। পরে সে ২০১৬ সালে পুলিশের সঙ্গে বন্দুক যুদ্ধে মারা যায়। ২০১৫ সালে মিজান বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলার জোয়ানপুর কুঠিরভিটা গ্রামে উত্তরাঞ্চলের বৃহত জঙ্গি আস্তানা গড়ে তোলে। এ সময় মিজান এলাকায় সিএনজি চালক হিসেবে আসে। তাকে স্থানীয়রা সিএনজি চালক হিসেবেই চিনত। ওই গ্রামের পলি আক্তার নামে এক মহিলার বাড়ি ভাড়া নিয়ে সেখানে গোলাবারুদে ভরে ফেলে। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ৩রা এপ্রিল ওই আস্তানায় গ্রেনেড তৈরির সময় ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। ওই দিনের বিস্ফোরণে জুয়েল এবং ফারদিন ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। ওই বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে ফাঁস হয়ে যায় ওই আস্তানার কার্যক্রম।
উত্তরাঞ্চলের বৃহত ওই আস্তানায় সে সময় যাতায়াত ছিল জেএমবির প্রথম সারির নেতাদের। তামিম চৌধুরী, মারজান, সাগর, রাজীব গান্ধি, বাবুল মাস্টার, রিপন, কাওসার, ওসমান, মমিন ও রজবসহ অনেক নেতাই এখানে নিয়মিত আসত। এখানে বসেই উত্তরাঞ্চল নিয়ে বিভিন্‌্ন পরিকল্পনা করত তারা। উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে বগুড়ার শিবগঞ্জে শিয়া মসজিদে হামলায় ব্যবহৃত ২টি আগ্নেয়াস্ত্র ওই আস্তানা থেকে পুলিশ উদ্ধার করেছে।
বগুড়ার পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান বৃহস্পতিবার দুপুরে সাংবাদিক সম্মেলনে এসব তথ্য জানান। এ সময় তিনি বলেন, বাবুল মাস্টার ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী রাজীব গান্ধী ওরফে জাহাঙ্গীর আলমের পর নব্য জেএমবির উত্তরবঙ্গের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। এই বাবুল মাস্টার এবং মিজান ঢাকা অ্যাটাকের পরিকল্পনা করেছিল। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্যই তারা ওই রাতে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। পুলিশ গোপন সূত্রে জানতে পেরে তাদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন