গরুর বাজারে পাবলিক লাইব্রেরি, বস্তাবন্দি ৪৫ হাজার বই

অনলাইন

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি | ৭ ডিসেম্বর ২০১৭, বৃহস্পতিবার, ৩:১০ | সর্বশেষ আপডেট: ৬:৪৪
চট্টগ্রামের লালদিঘীর পাড়ের তিনতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় থাকা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন পাবলিক লাইব্রেরিটি এখন আর নেই। বহুতল ভবন গড়ে তুলতে ভেঙে ফেলা হয়েছে ভবনটি। আর তাতে দুর্দশায় পড়েছে পাবলিক লাইব্রেরির ৪৫ হাজার বই।
বিপুল এই বই এখন ঠাঁই পেয়েছে নগরীর বিবিরহাট গরুর বাজারে গড়ে তোলা সিটি কর্পোরেশনের আরবান হেলথ কমপ্লেক্সের তৃতীয় তলার কয়েকটি কক্ষে। সেখানে গত দেড় মাস ধরে বইগুলো বস্তাবন্দি করে ফেলে রাখা হয়েছে। ফলে বইগুলো পড়ার কোনো সুযোগ পাচ্ছেন না পাঠকরা।
অথচ কয়েকশ বছরের পুরনো ইংরেজি সাহিত্য, পেটেন্ট, কলকাতা থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন গেজেটসহ মূল্যবান পত্রিকা ও সাহিত্য সাময়িকীগুলো রয়েছে এখানে।
যা কিছুদিন বস্তাবন্দি থাকলে মূল্যবান এসব বই নষ্ট হয়ে যেতে পারে বলে চট্টগ্রামের বিশিষ্টজনদের অভিমত।
বিশিষ্টজনদের দেওয়া তথ্যে জানা গেছে, ১৯০৪ সালে চট্টগ্রাম পৌরসভার প্রথম ভবনে চিটাগাং মিউনিসিপ্যাল লাইব্রেরি নামে এ পাবলিক গড়ে উঠে। ১৯২১-২২ সালে নূর আহমদ চেয়ারম্যান থাকাকালে লাইব্রেরিটি পূর্ণতা পায়।
১৯২৩ সালে পৌরসভার লালদিঘীর পাড়ে বর্তমান ভবনে স্থানান্তরিত হয় পাবলিক লাইব্রেরিটি। স্বাধীনতার পর এর নামকরণ করা হয় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন পাবলিক লাইব্রেরি। তবে পুরনো এই ভবনটি ভেঙ্গে এখন বহুতল ভবন করার উদ্যোগ নেয় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।
ফলে লাইব্রেরিটি স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয় চসিক। গত ১৯শে অক্টোবর লাইব্রেরির সব বই, জার্নাল, পেটেন্ট, আলমিরাসহ সবকিছু স্থানান্তর করা হয় বিবিরহাট গরুর বাজারের আরবান হেলথ কমপ্লেক্সে। যেখানে লাইব্রেরির কোন অস্তিত্ব নেই।
বরং খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা যায়, বিবিরহাট গরুর বাজারে সিটি কর্পোরেশন আরবান হেলথ কমপ্লেক্স ভবনের তৃতীয় তলায় বস্তাবন্দি করে রাখা হয়েছে পাবলিক লাইব্রেরীর বইগুলো। এ ভবনের নিচতলায় সিটি কর্পোরেশনের প্রকৌশল বিভাগের পুল অফিস। দ্বিতীয় তলায় আরবান হেলথ সেন্টার করা হয়েছে।  
তৃতীয় তলায় প্রবেশ করলে প্রথমেই চোখে পড়ে, স্তুুপাকারে ফেলে রাখা পূরণো পত্রিকার বান্ডেল। সেই সাথে লাইব্রেরীর চেয়ার, টেবিল ও আলমিরাগুলো রাখা হয়েছে একটার ওপর একটা করে। আরেক কক্ষে দেখা যায় পাহাড়ের মতো বইয়ের স্তুপ।
বস্তাগুলোর কোনটির গায়ে লেখা জীবনী, কোনটির গায়ে লেখা মেডিকেল। আবার কোনটির গায়ে লেখা বিজ্ঞান সমগ্র, কোনোটির গায়ে লেখা সাহিত্য-সাময়িকী। এভাবে ৯০০ বস্তায় রাখা রয়েছে লাইব্রেরীর সমস্ত মূল্যবান বই, পত্রিকা ও সাহিত্য সাময়িকীগুলো।
এ ব্যাপারে জানেত চাইলে পাবলিক লাইব্রেরীর তত্ত্বাবধানে থাকা চসিকের কাউন্সিলর সাইয়েদ গোলাম হায়দার মিন্টু বলেন, সিটি কর্পোরেশনের পাবলিক লাইব্রেরীর ভবনের স্থলে বহুতল ভবন নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। ভবনটি গড়তে তিন বছর সময় লাগবে। তাই লাইব্রেরীর বিপুল পরিমান বই বিবিরহাট গরুর বাজারের আরবান হেলথ কমপ্লেক্সে রাখা হয়েছে।
প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আরবান হেলথ কমপ্লেক্সে লাইব্রেরী করার স্থান ও পরিবেশ কোনটিই নেই। এ নিয়ে আমরা চিন্তায় আছি। যেখানে লাইব্রেরি চালু করা যাবে সেখানে বস্তাবন্দি বইগুলো সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছি। লাইব্রেরীতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের দুরাবস্থার কথা স্বীকার করেন তিনি।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় সরকারি গণগ্রন্থাগারের প্রিন্সিপাল লাইব্রেরিয়ান ও উপ-পরিচালক মোহাম্মদ রিয়াজ উদ্দিন বলেন, এই লাইব্রেরিতে অনেক পুরনো বই ও পেটেন্ট রয়েছে যেগুলোর পাতা জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। আর পুরণো আমলের কাগজে প্রিন্ট হওয়ায় এসব বইয়ের কাগজ তেমন ভাল নয়। যতœ করা না হলে এসব বই আর দ্বিতীয়টি পাওয়ার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, ভবনের আধুনিকায়নের কারণে ভবন ভাঙ্গা হতেই পারে। তাই বলে বইগুলো বস্তাবন্দি অবস্থায় থাকবে তা হতে পারে না। এতে সবকটি বই নষ্ট হয়ে যাবে। লাইব্রেরি সায়েন্সে বস্তাবন্দি অবস্থায় বই রাখার বিধান নেই। বইগুলোকে নিয়মিত পরিচর্যা করতে হয়। স্বাভাবিক সেলফে রাখলেও বই নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সিটি কর্পোরেশনের অনেক ভবন রয়েছে, অনেক স্কুল কলেজ রয়েছে, সেগুলোর কোনো একটিতে বইগুলো রাখা হলে লাইব্রেরিও চালু থাকতো এবং বইগুলোও ভাল থাকতো।
বাংলা একাডেমি পদকপ্রাপ্ত সাহিত্য গবেষক ড. ভূঁইয়া ইকবাল বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন পাবলিক লাইব্রেরি এই অঞ্চলের সবচেয়ে প্রাচীন। এই লাইব্রেরীতে অনেক দুর্লভ বই আছে। এই লাইব্রেরির বই নিয়ে আমি গবেষণা করছি। তা থেকে ৯টি বই প্রকাশের উপকরণ সংগ্রহ করেছি।
তিনি বলেন, এই লাইব্রেরিতে একশ বছরের পুরণো বই যেমন রয়েছে, তেমনি অনেক মূল্যবান গেজেট ও সাময়িকীও রয়েছে। বস্তায় রাখার ফলে বইয়ের বাইন্ডিং নষ্ট হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পোকায়ও ধরতে পারে। তাই বইগুলোকে সরকারি পাবলিক লাইব্রেরি কিংবা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে জমা রাখা যেতে পারে। পরে ভবন নির্মাণ শেষে আবারো বইগুলো ফেরত আনা যেতে পারে।

[এমকে]

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন