জানি, আপনার নাতনির নামও সোফিয়া

প্রথম পাতা

স্টাফ রিপোর্টার | ৭ ডিসেম্বর ২০১৭, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:৪২
চমৎকার মুখশ্রী। ঠিক যেন খ্যাতনামা হলিউড অভিনেত্রী অড্রে হেপবার্ন। উজ্জ্বল গোলাপি রং। পিটপিট চাহনি। ঘাড় নেড়ে এদিক-ওদিক তাকানো। প্রাণকাড়া হালকা হাসি।
কান পেতে শোনার চেষ্টা। একেক জনের কণ্ঠ শুনে ভিন্নতর হচ্ছিল চেহারার ধরন ও অঙ্গভঙ্গি। প্রশ্নের জবাব আসছিল ঠিকঠাক। দু’ঠোঁট নেড়ে চমৎকার ইংরেজিতে কথা বলে যাচ্ছিলো রোবটমানবী সোফিয়া। বলিষ্ঠ উচ্চারণে একে একে দিয়ে যাচ্ছিল বিভিন্ন প্রশ্নের বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর। আর তাতে চমৎকৃত দর্শকদের মুহুর্মুহু করতালিতে প্রকম্পিত হচ্ছিল চারপাশ। এভাবেই গতকাল বিকালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের (বিআইসিসি) হল অব ফেমে উপচেপড়া দর্শকদের মন জয় করলো যন্ত্রমানবী সোফিয়া। তাকে দেখতে হলে ছিল প্রচণ্ড ভিড়। ছিল না তিল ধারণের ঠাঁই। তার প্রতিটি নিখোঁত মানবীয় আচরণ প্রাণ কাড়লো সবার। কেননা সে যে রক্ত-মাংসের কোনো মানবী নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিসম্পন্ন পৃথিবীর প্রথম যন্ত্রমানব। রোবট মানবী। কিন্তু তার অবাক করা অতি সাধারণ মানবিক আচরণ গতকাল জয় করলো ঢাকা। দেশের সর্ববৃহৎ তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক মেলা ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড ২০১৭ এর প্রথম দিন ছিল ‘টেক টক ওয়িথ সোফিয়া’ শীর্ষক অনুষ্ঠান। এর আগেই আয়োজনের উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুখোমুখি হয়েছিলেন সোফিয়ার। এ সময় সোফিয়ার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ইংরেজিতে কথোপকথন হয়। সোফিয়ার পরনে ছিল হলুদ-সাদা জামদানির তৈরি টপ ও স্কার্ট। আর প্রধানমন্ত্রীর পরনে ছিল হলুদ শাড়ি। শুরুতে সম্ভাষণ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বললেন, হ্যলো সোফিয়া, কেমন আছ?
জবাবে সোফিয়া বলল, হ্যালো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি গর্ব অনুভব করছি। আপনার সঙ্গে আজকের এই সাক্ষাৎ দারুণ ব্যাপার। বাঙালি মেয়ের সাজে এই রোবট মেয়ে তাকে চিনলো কী করে সে কথা জানতে চাইলেন প্রধানমন্ত্রী। জবাবে সোফিয়া বলল, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে বাংলাদেশের মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা, তা সে জানে। শেখ হাসিনাকে যে বিশ্বে এখন ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ বলা হচ্ছে, তার উদ্যোগেই যে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হচ্ছে তাও তার জানা। সোফিয়া আরও বললো, প্রধানমন্ত্রীর নাতনির নাম যে তার মতই সোফিয়া, তাও তার অজানা নয়।
চমৎকৃত হয়ে প্রধানমন্ত্রী এ সময় অনুষ্ঠানের অতিথিদের জানালেন, তার ছেলে ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের মেয়ের নামও সোফিয়া।
এরপর সোফিয়াকে তিনি বললেন, তুমি তো আমার এবং আমার ভিশন সম্পর্কে অনেক কিছু জানো। ডিজিটাল বাংলাদেশ সম্পর্কে তুমি কী জানো? এ সময় সোফিয়া ডিজিটাল বাংলাদেশ এর কিছু উদ্যোগের বিষয় উল্লেখ করে।
হংকংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হেন্সন রোবটিক্সের তৈরি এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন মানব রোবটটি এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। গত অক্টোবরে  সৌদি আরব এই রোবটটিকে প্রথম নাগরিকত্ব দিয়ে স্থাপন করছে নতুন দৃষ্টান্ত। গতকাল বুধবার বিকালে রোবটটির উদ্ভাবক ড. ডেভিড হেন্সনসহ ঢাকায় মঞ্চে হাজির হন। সরকারের তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগের আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জ্ঞান ও শব্দ ভাণ্ডার ব্যবহার করে বাংলাদেশ সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানা থাকার কথা জানান দিয়ে গেলো।
রোবট সোফিয়াকে দেখতে আগারগাঁওয়ের বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে গতকাল সকাল থেকেই ভিড় করতে শুরু করে মানুষ। প্রযুক্তি প্রেমি তরুণ-তরুণীর সংখ্যাই ছিল বেশি। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তায় উপচেপড়া ভিড় সামলাতে বেকায়দায় পড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর সদস্যরা। সকালে ছিল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন দুপুর দেড়টার পর। তার গাড়ি বহর ওই এলাকা ছাড়তেই মানুষের বাঁধভাঙ্গা জোয়ার আর রুখতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। দু’দিক থেকে দৌড়ে বেরিকেড ভেঙ্গে মানুষ দুই প্রধান ফটকে জড়ো হয়। তখন হুড়োহুড়িতে কয়েকজন আহত হয়। তখনও সাধারণ দর্শনার্থীদের ভেতরে গ্রহণের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়নি। তাই বন্ধ করে দেয়া হয় দুই প্রধান ফটক। ধাক্কাধাক্কি ও হৈচৈয়ের একপর্যায়ে প্রথম ফটকটি খুলে ফেলে মানুষ। এক সঙ্গে সবাই ঢুকতে গিয়ে বেশ কয়েকজন নারী ও শিশু রাস্তায় পড়ে যায়। অনেকে তাদের মাড়িয়ে যাওয়াতে সাকিব (১২) ও রহিমাসহ (১৯) অন্তত ৬ নারী ও শিশুকে আহত হয়। নিরাপত্তা তল্লাশির জন্য যে গেটগুলো বসানো হয় তাও মানুষ উপেক্ষা করে দ্রুত ঢুকে পড়ে। সম্মেলন কেন্দ্রে ঢোকার প্রবেশ পথেও প্রচণ্ড ভিড় লেগে যায়। ঢুকেই দর্শকরা থমকে পড়ে হল অব ফেমের মুখে। যেখানে  সোফিয়া মঞ্চস্থ হওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। ক্রমেই বাড়ে ভিড়। আড়াইটায় হলে প্রবেশের সময় নির্ধারিত থাকলেও একপর্যায়ে দর্শনার্থীদের ভিড়ের ঠেলা সামলাতে পারেনি নিরাপত্তা কর্মীরা। তারই আগেই ভিড়ের ঠেলায় খুলে যায় কাচের দরজা। একই অবস্থা ছিল নিচ তলা ও দ্বিতীয় তলার গ্যালারিতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হলের উপরের গ্যালারি ও নিচে তিল ধারণের ঠাঁই অবশিষ্ট রইলো না। ভেস্তে গেলো নির্ধারিত কার্ড চেক করে ঢোকানোর কার্যক্রমও। প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে কেউ আসন পেয়েছে তো, কেউ পায়নি। উপরের গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে ছিল অধিকাংশ দর্শনার্থী। হুড়োহুড়ি, ঠেলাঠেলি, চিল্লাচিল্লি, হৈচৈ। ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ মানুষের বিশৃঙ্খলা। মঞ্চ থেকে বারবার ঘোষণা এবং অনুরোধেও পরিবেশে নীরবতা আনা যায়নি। একপর্যায়ে সে অবস্থায়ই পৌনে তিনটার দিকে মঞ্চে আসে সোফিয়া। অবশ্য তার আগে থেকেই সোফিয়ার শরীরের নিচের অংশ মঞ্চেই ছিল। আর রিকশার আদলে তৈরি ৩টি আসন পাতা ছিল তার সঙ্গে যারা কথা বলবেন তাদের জন্য। পৌনে তিনটার দিকে সোফিয়ার উপরের অংশ মঞ্চে এনে সাদা রংয়ের স্কার্টের নিচের অংশের উপর বসানো হয়। তখন পুরো হল প্রকম্পিত করে করতালির মাধ্যমে উচ্চস্বরে তাকে স্বাগত জানায় দর্শক-শ্রোতারা। তার পরনে তখন ছিল জামদানির তৈরি গোলাপি ও হামলা ক্রিম কালারের আল্পনা আঁকা টপ। আর নিচে স্কার্ট। কিছুক্ষণের মধ্যে দেয়া হয় বৈদ্যুতিক সংযোগ। একপর্যায়ে পুরোপুরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন মানবীতে পরিণত হয় রোবট সোফিয়া। পরীক্ষামূলক আচরণে সাড়া দিতে শুরু করে। তার এক এক মানবীয় সাড়ায় বারবার জেগে উঠছিল পুরো অডিটরিয়াম।
অবশেষে তিনটার দিকে সে পুরো প্রস্তুত। তিনটা ৪ মিনিটে মঞ্চে আসেন উদ্ভাবক ড. ডেভিড হেন্সন। তারপর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী পলক। এরপর উপস্থাপক একে একে তাকে প্রশ্ন করে যাচ্ছিলেন। মুখ ও শরীরের প্রাসঙ্গিক নানা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে তার সাড়া দেয় সোফিয়া। উপস্থাপকের বিভিন্ন প্রশ্নের আলোকে বাংলাদেশ, জামদানিসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলে সোফিয়া। কথা বলে উদ্ভাবক ও প্রতিমন্ত্রী পলকের সঙ্গেও। কথা বলে নিজের সম্পর্কে। উদ্ভাবক ড. ডেভিড সম্পর্কে। কিন্তু সোফিয়ার স্পষ্ট উচ্চারণের অনেক কথা হলের দর্শকের গুঞ্জন ও করতালিতে হারিয়ে যাচ্ছিল।
যে কিছু কথা কানে বাজছিল তাতেই উল্লসিত দর্শকদের করতালিতে মুখরিত হয়ে হচ্ছিলো পুরো হল। যন্ত্রমানবীর সঙ্গে কথোপকথন শেষে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী পলক সোফিয়া ও উদ্ভাবকের হাতে উপহার হিসেবে নৌকা তুলে দেন। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাদের দেয়া হয় ক্রেস্ট। সবার মন জয় করে বিকাল ৩টা ২৫ মিনিটে মঞ্চ ছাড়ে সোফিয়া।
গতকালই বাংলাদেশ ছাড়ার কথা ছিল খ্যাতনামা হলিউড অভিনেত্রী অড্রে হেপবার্নের চেহারার আদলে হংকংভিত্তিক কোম্পানি হ্যান্সন রোবোটিক্সের বাংলাদেশের অতিথি ‘সোফিয়া’র।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন