বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেলো সিলেটের শীতল পাটি

প্রথম পাতা

স্টাফ রিপোর্টার | ৭ ডিসেম্বর ২০১৭, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:০২
সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শীতল পাটিকে বিশ্বের নির্বস্তুক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য-২০১৭ (দ্য ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি) হিসেবে স্বীকৃতি  দিয়েছে ইউনেস্কো। গতকাল দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপে ইউনেস্কোর ‘ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ (আইসিএইচ) কমিটির ১২তম অধিবেশনে এ স্বীকৃতির ঘোষণা দেয়া হয়। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর ২০১৬ সালে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শীতল পাটিকে ইউনেস্কোর ‘ইন্টারগভর্নমেন্টাল কমিটি ফর দ্য সেফগার্ডিং অব দ্য ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ’-এর ১২তম অধিবেশনে বিশ্বের নির্বস্তুক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য প্রস্তাবনা উত্থাপন করে।
সিলেট অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী শীতল পাটি নিয়ে জাতীয় জাদুঘরে দুই সপ্তাহব্যাপী প্রদর্শনী চলাকালে বিশ্বস্বীকৃতির ঘোষণা এলো। মঙ্গলবার থেকে জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনী গ্যালারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে এ প্রদর্শনী শুরু হয়েছে। ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাওয়ার পর গতকাল মানবজমিনকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী বলেন, দক্ষিণ কোরিয়াতে আয়োজিত ইউনেস্কো বিশ্ব স্বীকৃতি অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পক্ষে দুজন প্রতিনিধি পাঠানো হয়েছে।
তাদের থেকে শীতল পাটির বিশ্ব স্বীকৃতির বিষয়টি আগেই জানতে পেরে প্রদর্শনীর আয়োজন সহ একটি ব্রোশিয়ার প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি বলেন, শীতল পাটির স্বীকৃতির খবর আনন্দের। এর মাধ্যমে আমাদের গ্রামবাংলার একটি ঐতিহ্য বৈশ্বিক স্বীকৃতি পেলো। তিনি জানান, ২০১৭ সালের ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজের মধ্যে ১৯টি দেশের আরো ১৫টি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তালিকায় অনুমোদন পেয়েছে। এর আগে বাংলাদেশের পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা, বাংলার বাউল সংগীত, ঐতিহ্যবাহী জামদানি বুনন পদ্ধতি এ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।  
শীতল পাটি হলো মেঝেতে পাতা এক ধরনের আসন। এটি বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্প। মুর্তা বা পাটি, বেত বা মোস্তাক নামের গুল্মজাতীয় উদ্ভিদের ছাল থেকে এ পাটি তৈরি হয়। হস্তশিল্প হিসেবেও এ পাটির যথেষ্ট কদর রয়েছে। শহরে শো-পিস এবং গ্রামে এটি মাদুর বা চাদরের পরিবর্তে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। সাজসজ্জা দ্বারা সজ্জিত মাদুরকে আবার নকশি পাটিও বলা হয়। সিলেট ছাড়া বৃহত্তর নোয়াখালী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও চট্টগ্রামের কিছু অঞ্চলে শীতল পাটি তৈরি হয়। বিশেষ করে শুকনা মওসুমে মুর্তা থেকে বেত তৈরি হয়। বর্ষা মওসুমে দীর্ঘ সময় নিয়ে যত্নসহকারে বুনা হয় শীতল পাটি। শীতল পাটিতে কারিগররা দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেন গান, কবিতা, জীবজন্তুসহ প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী। নকশা করা শীতল পাটি সৌখিন অনেকে গৃহসজ্জার কাজেও ব্যবহার করেন।
শীতল পাটির স্বীকৃতি আদায়ের এ প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১৩ সাল থেকে। ওই বছরের ১৭ই ডিসেম্বর ইউনেস্কোর ‘আইসিএইচ’-এ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক উপাদান অন্তর্ভুক্তি শীর্ষক কমিটির (পিএমসি) নবম সভায় শীতল পাটিকে অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালের ৪ঠা জানুয়ারি শীতল পাটি বুনন শিল্পকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক উপাদান হিসেবে অন্তর্ভুক্তিকরণের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। একই বছরের ৭ই জানুয়ারি জাতীয় জাদুঘর থেকে শীতল পাটির ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরির লক্ষ্যে ‘জাতিতত্ত্ব বিভাগ’ একটি সভা করে। পরে ওই বছরেরই ১৬ই জানুয়ারি ‘আইসিএইচ’-এ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক উপাদান অন্তর্ভুক্তি শীর্ষক কর্মসূচি মনিটরিং কমিটির (পিএমসি) দশম সভায় জাতীয় জাদুঘর থেকে শীতল পাটিকে অন্তর্ভুক্তিকরণ প্রস্তাব করা হয় এবং এ প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে ২৯শে জানুয়ারি সিলেটের শীতল পাটির প্রামাণ্যচিত্র তৈরির জন্য ইউনেস্কোর চেক পাওয়া যায়।
শীতল পাটির উপর প্রামাণ্যচিত্রের স্ক্রিপ্ট তৈরির জন্য গবেষক মনোনয়ন ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের জন্য ওই বছরেরই ৫ই মার্চ থেকে সিলেটের মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জ ভ্রমণ করে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ এবং তা ৩০শে মার্চ ‘আইসিএইচ’-এর জন্য (শীতল পাটির প্রথম ফাইল) পাঠানো হয়। পরে ওই বছরেরই ২৪শে নভেম্বর ফাইল সংশোধনের জন্য তুলে নেয়া হয় এবং ২০১৬ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালকের নেতৃত্বে সংশোধনপূর্বক ঐতিহ্যবাহী শীতল পাটি বুনন শিল্প ফাইল আবার পাঠানো হয়।
সিলেটে উচ্ছ্বাস-আনন্দ
ওয়েছ খছরু, সিলেট থেকে জানান, শীত নামলেই সকালের নরম রোদে শীতল পাটি তৈরির ধুম পড়ে সিলেটের ঘরে ঘরে। গ্রাম এলাকার গৃহিণীদের কাছে শীতল পাটি তৈরি করা শখের কাজ। মা, চাচি, খালা, বোনেরা দল বেঁধে বসে এই শীতল পাটি তৈরি করেন। পাটি বিছিয়ে শীতের সকালে রোদ পোহানোর দৃশ্যও চোখে পড়ে গ্রামের পথে হাঁটলেই। বনের মুর্তা দিয়ে তৈরি এই শীতল পাটি এখন বিশ্ব দরবারে পরিচিত নাম। এ নিয়ে গর্বের অন্ত নেই সিলেটবাসীর। সিলেটের মানুষের কাছে শীতল পাটির কদর বেশি। এটি শুধু সিলেটেই নয়, বৃটেনে বসবাসরত সিলেটীদের কাছেও এই পাটি সমানভাবে আদ্রিত। অনেক প্রবাসী দেশে এসে শীতল পাটি বানিয়ে নিয়ে যান। খুব বেশি দিন আগে নয়, দুই যুগ আগেও শীতল পাটি বাজারে বিক্রি হতো না। সিলেটীরা নিজেদের প্রয়োজনে নিজেদের বাড়িতে এই পাটি তৈরি করতেন। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই মুর্তা বন থাকতো। মুর্তা জঙ্গল এখনো আছে। এই মুর্তা জঙ্গল থেকে মুর্তা সংগ্রহ করে বিশেষভাবে ‘বেত’ তৈরি করা হয়। এই বেতে হরেক রকমের রঙ মিশিয়ে রোদে শুনানো হয়। এর পরও মুর্তার বেত দিয়ে বিশেষ ভাবে বোনা হয় শীতল পাটি। সিলেটে গ্রামীণ জনপদের প্রায় প্রতিটি বাড়ির মা-খালারা শীতল পাটি বুনতে জানেন। গতকাল এই শীতল পাটি ঐতিহ্যের তালিকায় ইউনেস্কোর স্বীকৃতি লাভ করেছে। এই শীতল পাটি নিয়ে এখন সিলেটের মানুষের গর্বের অন্ত নেই। প্রযুক্তির ছোয়ায় এখনো আগের মতো শীতলপাটি ঘরে ঘরে তৈরি হয় না। তবে শীতল পাটিকে ঘিরে সিলেটে আলাদা শিল্প তৈরি হয়েছে। শীতল পাটি বাণিজ্যিকভাবে তৈরি হচ্ছে। সিলেটের বালাগঞ্জ, ওসমানীনগর, বিশ্বনাথ, ছাতকসহ কয়েকটি এলাকায় এসব পাটি তৈরি করে বাজারে বিক্রির জন্য তোলা হয়। আর শহরে যারা বসবাস করেন তারাও শীতল পাটি ক্রয় করে দামি ডিপার্টমেন্টাল শপ থেকে। এছাড়া সিলেটে তৈরি করা শীতল পাটির কদর লন্ডনেও রয়েছে। ব্যক্তি উদ্যোগে সিলেট থেকে লন্ডনে নিয়ে যাওয়া হয় শীতল পাটি। বালাগঞ্জ কলেজের অধ্যক্ষ ও সিনিয়র সাংবাদিক লিয়াকত শাহ ফরিদী জানিয়েছেন, এই স্বীকৃতি সিলেটের মানুষের জন্য অনেক গর্বের। শীতল পাটির মাতৃ এলাকা হচ্ছে সিলেটের বালাগঞ্জ ও রাজনগর। এখনো গ্রামের হাটেগঞ্জে শীতল পাটি বিক্রি হয়। বালাগঞ্জের একটি গ্রামে প্রতি সোমবার শীতল পাটির হাট বসে। ফরিদী জানান, এই স্বীকৃতির আগে ইতালিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শীতল পাটির প্রদর্শনী হয় এবং ওই সব প্রদর্শনীতে শীতল পাটি সমাদৃত হয়েছে। বালাগঞ্জের পাশাপাশি মৌলভীবাজারের রাজনগর এলাকায় গ্রামের মহিলা শিল্পীরা শীতল পাটি বুনেন। সিলেট উইমেন্স চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি স্বর্ণলতা রায় জানিয়েছেন- শীতল পাটি সিলেটের মহিলাদের অবদান। আগের বিয়েতে কনে শীতল পাটি তৈরি করতে পারে কি না সেটিও বরপক্ষ জানতো। আর বর কনেকে শীতল পাটিতে বসিয়ে আপ্যায়নের রীতিও পুরনো। আমাদের এই ঐহিত্য বিশ্ব দরবারে পৌছেছে; সেটি খুবই আনন্দের বলে দাবি করেন তিনি। তিনি জানান, সিলেটের উদ্যোক্তা মহিলা নিজেদের উদ্যোগে শীতল পাটিকে শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছেন। গত কয়েক বছর ধরে সেটিকে শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে আমরা কাজ করছি। কিন্তু কারিগরের অভাব না থাকলেও বেতের কারণে কিছুটা বাধার মুখে পড়েছি। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে সিলেটের শীতল পাটি আরো বিকশিত হবে।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন