ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের উদ্বোধন

সুন্দর আগামীর জন্য তরুণদের প্রস্তুত হতে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান

দেশ বিদেশ

স্টাফ রিপোর্টার | ৭ ডিসেম্বর ২০১৭, বৃহস্পতিবার
তরুণ প্রজন্মকে সুন্দর আগামী দিনের প্রস্তুতি নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘আমরা তরুণদের আধুনিক প্রযুক্তি শিক্ষায় দক্ষ করে গড়ে তুলছি। কাজেই সমগ্র বিশ্ব এখন তাদের হাতের মুঠোয় এবং আমি আশা করি এই তরুণরাই দেশকে এগিয়ে নিয়ে জাতির জনকের উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে সার্থক করবে। প্রধানমন্ত্রী গতকাল সকালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আইসিটি সেক্টরের মেগা ইভেন্ট চার দিনব্যাপী ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড-২০১৭’র আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন।  প্রধানমন্ত্রী বক্তৃতা পর্ব শেষে রোবট মানবী ‘সোফিয়ার’ সঙ্গে কথপোকথন করে ট্যাব চেপে আনুষ্ঠানিকভাবে মেলার উদ্বোধন করেন। আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ এবং আইসিটি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ইমরান আহমেদ এবং বাংলাদেশ সফটওয়্যার ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)-এর সভাপতি মোস্তফা জব্বার। আইসিটি মন্ত্রণালয়ের সচিব সুবীর কিশোর চৌধুরী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন।
মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ, সরকারের পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ, বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিকবৃন্দ, মেলায় অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিবৃন্দ, সুশীলসমাজের প্রতিনিধি এবং কম্পিউটার খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এসময় উপস্থিত ছিলেন। কয়েকটি আইটি সংগঠনের সহযোগিতায় আইসিটি বিভাগ ও বেসিস ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড-২০১৭’-এর আয়োজন করেছে। চার দিনব্যাপী এই আয়োজনের প্রতিপাদ্য হচ্ছে- ‘রেডি ফর টুমরো’। গত নয় বছরেরও বেশি সময়ে আইসিটি সেক্টরে বাংলাদেশের যে অর্জন তা নিয়ে বাংলাদেশ আগামীর জন্য প্রস্তুত বলে এই প্রতিপাদ্যে ইঙ্গিত করা হয়েছে। মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আইসিটি খাত ২০২১ সাল নাগাদ দেশের উন্নয়নের সব থেকে বড় অংশীদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে এবং আমরা আমাদের জিডিপিকে ৭ দশমিক ২৮ ভাগে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছি। রপ্তানিও আমাদের বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু আমি মনে করি, আইসিটি সেক্টরটাকে যদি আমরা আরো সুযোগ দিই তাহলে এখান থেকেই আমাদের রপ্তানি আরো ব্যাপক হারে আসবে। আমাদের আর অন্য কোনো দিকে তাকাতে হবে না এবং আমাদের ছেলে-মেয়েরা এ ব্যাপারে যথেষ্ট মেধাবী। এ খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য এই বছর থেকে রপ্তানিতে ৫ শতাংশ হারে প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, চলতি অর্থবছরে সফটওয়্যার রপ্তানি থেকে আয় ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। আশা করা হচ্ছে, ২০২১ সালের মধ্যে এ আয় ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়াবে এবং জিডিপিতে সফটওয়্যার ও আইসিটি সেবা খাতের অবদান ৫ শতাংশে উন্নীত হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি জেলায় হাইটেক বা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। সেই সঙ্গে ১০০ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হয়েছে। বেসরকারি উদ্যোক্তরা বিনিয়োগ করতে এলে এসব জায়গাতেও প্লট বরাদ্দ করা হবে।  প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশজুড়ে গড়ে তোলা হচ্ছে ২৮টি হাইটেক ও সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক। এর মধ্যে ঢাকার কারওয়ান বাজার ও যশোরে সফটওয়্যার পার্কের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ ছাড়া ১২টি বেসরকারি সফটওয়্যার পার্কও গড়ে উঠেছে। এসব পার্কে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করার জন্য ১০ বছরের আয়কর মওকুফ ও শতভাগ রিপেট্রিয়েশনসহ বিবিধ সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ছেলেমেয়েকে ঘরে বসে ট্রেনিং দেয়া এবং বিভিন্ন ভাষায় শিক্ষা দেয়ার জন্য ইতিমধ্যে ১০টি ভাষায় অ্যাপ তৈরি করে দেয়া হয়েছে এবং তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পোস্ট অফিস ডিজিটাল করে দেয়া হয়েছে। ইউনিয়নে ইউনিয়নে রয়েছে ডিজিটাল সেন্টার। গ্রামে নিজের ঘরে বসে ছেলেমেয়েরা এখন বিদেশ থেকে টাকা উপার্জন করতে পারছে। তিনি বলেন, এটাকে আরো উন্নত করে দেয়া হবে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফ্রি ল্যান্সিং সাইট আপওয়ার্ক, ইল্যান্স এবং ফ্রি ল্যান্সারের প্রথম দশটির মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে আমাদের ফ্রি ল্যান্সাররা। বিশ্বে ফ্রি ল্যান্সারের সংখ্যার দিক থেকে আমরা রয়েছি দ্বিতীয় স্থানে। আমরা প্রথম স্থানে উঠবো ইনশাল্লাহ। আমরা আশা করছি, ২০২১ সাল নাগাদ আমাদের ২০ লাখ তরুণ-তরুণী তথ্যপ্রযুক্তির পেশার সঙ্গে যুক্ত হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবলের সংযোগ ও বেসরকারি খাতে ৬টি ইন্টারন্যাশনাল টেরিস্ট্রিয়াল কেবলের সুবিধা দিয়েছি। যার ফলে দেশব্যাপী ১০ গুণেরও বেশি ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ ব্যবহার বেড়েছে। ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ রপ্তানিও হচ্ছে। যে ব্যান্ডউইথ এর দাম ২০০৭ সালে ছিল ৭৬ হাজার টাকা তা এখন ৫০০ থেকে ১০০০ টাকায় নেমে এসেছে। ফলে ই-গভর্নেন্স, ই-হেলথ, ই-কমার্স, ই-লার্নি, মোবাইল এপ্লিকেশনসহ ইন্টারনেটের বহুবিধ ব্যবহার সহজলভ্য হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যে ফোর জি প্রযুক্তি চালু কর করা হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশে উদ্ভাবন সক্ষমতা ও গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। এজন্য আইসিটি বিভাগের আওতায় গবেষণা ফেলোশিপ, বৃত্তি প্রদান এবং উদ্ভাবন কাজের জন্য অনুদান প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া ‘ইনোভেশন ডিজাইন অ্যান্ড এন্টারপ্রেনারশিপ একাডেমি’ স্থাপন এবং গড়ে তোলা হয়েছে নতুন প্ল্যাটফর্ম ‘স্টার্টআপ বাংলাদেশ’। তিনি বলেন, উদ্যোক্তাদের ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ঋণসহ বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের উদ্যোগে ‘ইই ফান্ড’র ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। আমাদের তরুণদের সক্ষমতা আজ বিশ্বজুড়ে নজরও কাড়ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাপানের মতো উন্নত দেশের ১০ হাজার এপার্টমেন্টকে স্মার্ট করার কাজটা তাঁরা আমাদের তরুণদের হাতে তুলে দিয়েছে। তারা এ বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এই খাতটিকে আরো যোগ্য করে গড়ে তোলার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমেরিকা, ইউরোপ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের প্রায় ৫০টিরও বেশি দেশে বাংলাদেশের তৈরি সফটওয়্যার ও আইটি সেবা আমরা সরবরাহ করছি। বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানকেও আমরা সহযোগিতা করছি। আমাদের কোম্পানিগুলো এখন আফ্রিকাতেও পদচারণা করতে সক্ষম হয়েছে।  ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের প্রতিপাদ্য ‘রেডি ফর টুমরো’র সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নট টুডে ফর টুমরো, আমরা বাংলাদেশকে তৈরি করতে চাই। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ কীভাবে তৈরি হবে সেটাই আমরা দেখতে চাই, সেভাবেই আমরা করতে চাই।’ তিনি বলেন, হয়তো আমরা দেখেও যেতে পারবো না কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস- একবার যখন উন্নয়নের চাকা গতিশীল হয়েছে, এটা ভবিষ্যতে আর কেউ থামিয়ে রাখতে পারবে না- এটা আমার বিশ্বাস। সেটাই আমরা আগামী প্রজন্মের হাতে তুলে দিয়ে যেতে চাই। মেলায় বক্তৃতা পর্ব শেষে বর্ণাঢ্য লেজার শো অনুষ্ঠিত হয়।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন