দুশ্চিন্তায় হাওরপাড়ের বাসিন্দারা ‘আফাল’ আর ‘বলনের’ ক্ষতি দৃশ্যমান

দেশ বিদেশ

ইমাদ উদ দীন, মৌলভীবাজার থেকে | ৭ ডিসেম্বর ২০১৭, বৃহস্পতিবার
কিছুটা হলেও স্বস্তিতে হাওর তীরের বাসিন্দারা। কারণ বড় ধরনের ক্ষতি এখন দৃশ্যমান হলেও। বিদায় নিচ্ছে বিধ্বংসী ‘আফাল’ আর ‘বলন’। এ অল্প ক’দিন হলো, এমন ভয়ঙ্কর দৃশ্য পরিবর্তনের। আফাল (বড় ঢেউ) আর বলনের (ঘূর্ণায়মান ঢেউ) তাণ্ডব এখন আর চোখে পড়ছে না হাওর এলাকায়। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে বানের পানিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা এখন ততই কমছে।
আর ধীরে ধীরে জেগে উঠছে ডুবন্ত ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও কৃষিজমি। আর এতে দৃশ্যমান হচ্ছে আফাল ও বলনের আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়া ক্ষতিগ্রস্ত বসতবাড়ি আর রাস্তাঘাট। এখন দৃশ্যমান এমন ক্ষতচিহ্নে দিশাহারা হাওর তীরের সর্বহারা কৃষিজীবী লোকজন। কিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি আর রাস্তাঘাট মেরামত করবেন এখন এমন দুশ্চিন্তা তাদের। এবছর মার্চ থেকে শুরু হওয়া কয়েক দফা বন্যায় হাওর ও হাওরের তীরবর্তী এলাকাও ছিল বানের পানিতে টইটম্বুর। হঠাৎ এমন আকস্মিক বন্যায় বোরো ধান আর সবজির ক্ষেত দখলে নেয় পানি। রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দির আর হাট বাজারেও ছিল বানের পানির রাজত্ব। বন্যা দীর্ঘ হয়ে রূপ নেয় স্থায়ী জলাবদ্ধতায়। আর এতে প্রলয়ের শক্তিতে বলিয়ান হয়ে হাওর তীরের বসতভিটা আর রাস্তাঘাটে আঘাত হানে আফাল ও বলন। বন্যা, জলাবদ্ধতা আর আফাল ও বলনে নিঃস্ব হাওর তীরের মানুষ। এবছর ফসল আর বসতভিটা সবকিছুই কেড়ে নিয়েছে একের পর এক এমন সব প্রাকৃতিক দুর্যোগ। গতকাল সরজমিনে দেখা গেল, হাকালুকি হাওর তীরবর্তী এলাকায় বসত বাড়িতে এখন স্পষ্ট হয়েছে আফাল আর বলনের আঘাতের ক্ষতচিহ্ন। দৃশ্যমান এমন ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে অনেকেই চেষ্টা করছেন। দেখা গেল অনেকেই নৌকাযোগে দূর থেকে মাটি এনে বসতভিটা ভরাট করছেন। আবার কেউ কেউ বসত ঘরের বাঁশের বেড়া ও চালা মেরামত করছেন। তবে অধিকাংশ লোকজন আর্থিক অনটনের কারণে ভাঙা ঘরে পরিবার পরিজনকে নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস করছেন। তারা রাত পোহালে নিজ গ্রাম ছেড়ে অন্য এলাকায় গিয়ে দিনমজুরের কাজ করছেন কিংবা মাছ ধরছেন। এই কায়িক শ্রমে যা পাচ্ছেন তাই দিয়ে কোনোরকম টানাপোড়নের সংসার চালাচ্ছেন। ওই আয় থেকে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, টিবওয়েল আর স্যানেটারি ল্যাটট্রিন মেরামতের সাধ্য কোথায়। হাওর তীরের অসহায় কর্মহীন এই কৃষিজীবী মানুষগুলো এখন আফাল আর বলনের ক্ষতি পোষাতে চরম অসহায়। বোরো ধানের সময় ঘনিয়ে আসছে তারপরও এখনো কমছে না জলাবদ্ধতা। সবজি আর বোরো চাষের অধিকাংশ জমিতে এখনো বুক সমান কিংবা কোমর সমান পানি। তাই ব্যস্ত এই চাষিরা বলতে গেলে অনেকটা অলস সময় পার করছেন। হাতে টাকা না থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর মেরামতে এই সময়টাও কাজে লাগাতে পারছেন না তারা। একদিকে আফাল আর বলনের ক্ষতচিহ্ন অপরদিকে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় এবছরের মতো আগামী বছরও বোরো ধান হারানোর দুশ্চিন্তা। সবমিলিয়ে চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন হাওর পাড়ের লোকজন। রাস্তাঘাট আর ঘরবাড়ি জেগে উঠায় আশ্রয় কেন্দ্র ছাড়তে হয়েছে অনেক আগেই। কিন্তু মাথাগোঁজার ঠাঁই এখনো নিরাপদ নয়। কারণ, দীর্ঘ জলাবদ্ধতায় আর আফাল ও বলনে ব্যাপক ক্ষতিতে পড়েছে তাদের বসতভিটা আর রাস্তাঘাট। যেগুলোর মেরামতের সাধ্য নেই তাদের। কিন্তু তারপরও উপায়ন্তর না থাকায় বাধ্য হয়ে নিজেদের ঘর বাড়িতে অনেকটা ঝুঁকি নিয়েই বসবাস করছেন। গতকাল সরজমিনে হাকালুকি হাওর তীরের চকাপন, গৌরি শংকর, জালালপুর, মদনগৌরি, মীরশংকর, সাদিপুর, ভূকশিমইল, বাদে ভূকশিমইল, উত্তর সাদিপুর, কাইয়ারচর, শশারকান্দি, বেড়কুড়ি, শাহপুর ও  বেলাগাঁও এলাকায় গেলে চোখে পড়ে মানুষের এমন দুর্দশার চিত্র। ক্ষতিগ্রস্তরা জানালেন পুরো হাওর তীরবর্তী এলাকা জুড়ে একই অবস্থা। তারা জানালেন, আগের মতো এখনো দুশ্চিন্তায় দিশাহারা তারা। আফাল আর বলনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত বসতঘর মেরামত না করায় ভেঙে পড়ার ভয়ে কাটছে নির্ঘুমরাত। উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় এখন তাদের রাত দিন একাকার। এ বছর রাক্ষুসে হাওরের উত্তাল এই উপদ্রবের কবল থেকে নিজেদের বসতভিটা রক্ষায় মার্চ থেকে এখনো চলছে তাদের জীবনযুদ্ধ। নিজস্ব নানা কৌশলে আফাল ও বলনের আঘাত সামলাতে গিয়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন তারা। তারা জানালেন আফাল ও বলনের তোড়ে চোখের সামনে অনেক ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট বিলীন হয়েছে। যুদ্ধ করে যারা কোনোরকম তাদের বসতঘর টিকিয়ে রেখেছেন তাদের শেষ ভরসাস্থলও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নানাভাবে বলন ও আফালের কবল থেকে রক্ষা পেতে ওই সময় তারা প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সব চেষ্টাই পুরোপুরি কাজে আসেনি। আফাল আর বলন গিলে খেয়েছে হাওর পাড়ের অনেকেরই ঘরবাড়ি। হাওর পাড়ের বাসিন্দারা জানালেন এবছর এই দুর্যোগ আর বির্পযয়ের পর থেকে এখনো তাদের কাজ নেই, টাকা নেই, ঘরে চালও নেই। তাই পেট ভরে তাদের খাবারও নেই। এ বছর চৈত্রের অকাল বন্যায় বোরো ধান বানের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় তাদের সব স্বপ্নই যেন শেষ। এরপর একের পর এক বন্যা আর বন্যায় সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় চরম ক্ষতিগ্রস্ত তারা। হাকালুকি হাওর তীরবর্তী কুলাউড়ার ভূকশিমইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান মনির ও জুড়ীর জায়ফরনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাছুম রেজা জানান, এতদিন হাওর হাকালুকি তার উত্তাল রূপ দেখিয়েছে। ওই সময়কার ভয়াবহ ঢেউ তীরবর্তী এই এলাকাগুলোর রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতি করছে। মানুষের বাড়িঘরও ভেঙেছে। এবছর একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ হাওর পাড়ের কৃষি ও মৎস্যজীবী মানুষ এখনো চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। তাদের অসহায়ত্ব দূর করতে এগুলো মেরামতের জন্য দ্রুত সহযোগিতার প্রয়োজন।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন