সত্যবাবু মারা গেছেন

মিডিয়া কর্নার

| ৩০ নভেম্বর ২০১৭, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৪:২৯
প্রয়াত প্রখ্যাত সাংবাদিক ফয়েজ আহমদের লেখা বহুল পঠিত গ্রন্থ ‘সত্যবাবু মারা গেছেন’। ওই বইয়ের ‘সত্যবাবু মারা গেছেন’ শীর্ষক অনুচ্ছেদে তিনি লিখেছেন,

রিপোর্টিং-এ কোন কোন ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত বা অনবধানতাবশত যতটুকু ভুলভ্রান্তি থাকে, তার চাইতে বহুগুণ অধিক সঠিক তথ্য স্থান পায়। অর্থাৎ রিপোর্টের যে অংশটুকু মিথ্যা বলে প্রতীয়মান হবে তার চাইতে হয়তো বহুগুণ সত্য উক্ত রিপোর্ট-এ পাওয়া যাবে। অপর দিকে এই ভুল ও মিথ্যার কোনটার জন্যেই বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রিপোর্টার দায়ী নন। হয় তো দেখা যাবে, পত্রিকার নীতি বা পত্রিকা মালিকের রাজনীতিই এই অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির জন্যে দায়ী। কিন্তু তবুও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল রিপোর্টারকে তার প্রতিটি শব্দের জন্যে পাঠকের কাছে জবাবদিহি করার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত থাকতে হয়।
(একটি ভুল বা একটি মাত্র মিথ্যা মূল্যবান একটি রিপোর্টকে ধ্বংস করে দিতে পারে।) প্রকৃতপক্ষে রিপোর্টিং সাংবাদিকতা পেশার এমন একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, যার উৎপাদিত ফসলের ওপর নির্ভর করেই প্রধানত পত্রিকার অগ্রগতি। বিদেশী বা দেশী সংবাদ যা কিছু প্রকাশিত হয়, তার, সবটাই মূলতঃ রিপোর্টিং এবং এমন কি পত্রিকায় যে সম্পাদকীয় কলাম বা উপ-সম্পাদকীয় প্রকাশ পায়, তাও কোনো না কোনো রিপোর্টের তথ্য নির্ভর করেই। ফিচার, তথ্যপ্রধান নিবন্ধ বা অনুসন্ধানমূলক রিপোর্টিং সবই তো রিপোর্ট। সে কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ পেশায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিটিও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অবলম্বন করেন। আর সেই একই কারণে তাঁর ভুল ও মিথ্যাকে পত্রিকার ক্রেতা ও পাঠক বিশেষ গুরুত্ব সহকারে সমালোচনা করে থাকেন। তবে তথ্যের অসম্পূর্ণতা ও অবহেলার দরুণ রিপোর্টার ভুল করতে পারেন। রিপোর্টের ভুল ও মিথ্যাকে যদি উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রচার ও প্রতিষ্ঠার প্রয়াস থাকে, তবে আমাদের রাষ্ট্রের মতো পশ্চাদপদ দেশের সাধারণ মানুষ শুধু যে বিভ্রান্তিতেই ভুগবে তা নয়, ক্রমানুয়ে সংবাদবিমুখ হয়ে পড়বে। তা’ হবে সমাজের জন্যে ক্ষতিকর।
কিন্তু এমনও হতে পারে যে, এই ভুল ও মিথ্যার সাথে রিপোর্ট রচয়িতা রিপোর্টারের কোন সম্পর্ক নেই। রাষ্ট্র ব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় প্রচার, অর্থনৈতিক মন্দা বা ঊর্ধ্বগতি, রাজনীতি, প্রচলিত সংবাদ লেখন পদ্ধতি বা মালিকের উদ্দেশ্যই মূলতঃ এই পরিস্থিতির জন্যে দায়ী বলে গণ্য হতে পারে।
যে কোন পত্রিকার রিপোর্টার ও রিপোর্টকে সমাজে পাঠক সম্প্রদায় সহজেই শনাক্ত করতে সক্ষমÑ কারণ জনসভা, বিমানবন্দর, সাংবাদিক সম্মেলন, সরকারী দফতর, রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে শুরু করে নৈশভোজ ও সন্ধ্যার পার্টি পর্যন্ত সর্বত্র রিপোর্টারের পদচারণ। প্রকৃতপক্ষে তারা পত্রিকা বা সংবাদ সংস্থার প্রতিনিধি রূপে চিহ্নিত। কিন্তু পত্রিকার মালিকের ব্যক্তিগত অভিরুচি, তাঁর রাজনীতি, সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও নির্দেশনামা ইত্যাদির মধ্যে যখন একজন রিপোর্টার বর্ধিত হন, তখন যে তিনি সর্বদা স্বাধীন বিচার বিবেচনা প্রসূত বিষয়গত রিপোর্ট করতে পারবেন, তার কোন নিশ্চয়তা নেই। বিশেষ করে বর্তমান আমাদের দেশে প্রধানতঃ দু’ধরনের মালিকানায় পত্রিকা প্রকাশিত হয়- সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে ব্যক্তি মালিকানায়। সুতরাং রিপোর্টারগণও একই রিপোর্টকে নিজ নিজ মালিকানার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবেন। আবার ব্যক্তি মালিকানায় কোন পত্রিকা ধনবাদী বিশ্বের সমর্থক, কোনটি সাম্যবাদী দুনিয়ার সোভিয়েট ও তার সমর্থকদের প্রচারক, কেউ বা চীন ও তার নীতিধর্মী বিশ্বের পৃষ্ঠপোষক। সরকারী পত্রিকাগুলো সরকারের ক্ষণস্থায়ী ও দোদুল্যমান বৈদেশিক, রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক নীতির মারপ্যাঁচে এক এক সময় বিভ্রান্ত হয়ে ওঠে। সরকার নিয়ন্ত্রিত পত্রিকাগুলোকে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও প্রচার অস্ত্ররূপে ব্যবহার করা হয়। কোন কোন মালিক পত্রিকার শক্তি প্রয়োগ করে নিজের বা অপরের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারেন। কেউ বা নিজ পত্রিকার অস্ত্র উঁচিয়ে ব্যবসা করেন, কোটিপতি হয়ে বিলেতে হীরের আংটি পরে পার্টিতে যান।
এই পরিস্থিতিতে একজন রিপোর্টারের অবস্থান কোথায়? তিনি তো সরকারী বা মালিকের নীতি ও বক্তব্য উপেক্ষা করতে সক্ষম নন। তাঁকে বিশেষ সমাজ ব্যবস্থা, ব্যক্তি বিশেষ বা দেশের প্রতি সমর্থনের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রাসঙ্গিক রিপোর্ট রচনা করতে হয়ে থাকে। এই অবস্থায় কোন রিপোর্টার যদি আধুনিক কবির মতো উদভ্রান্ত হয়ে প্রশ্ন করেন, সত্য কোথায়? তার উত্তর মেলা তো দুষ্কর।
তবে একথা সত্যি যে, রিপোর্টাররা সত্যেরই সন্ধান করতে গিয়ে পথে নামেন। সেই সত্যের সন্ধানেও বিপর্যয় ঘটতে পারে এবং সে বিপর্যয় ত্রুটিপূর্ণ সংবাদ লেখন পদ্ধতি বা সংশ্লিষ্ট সংবাদের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে উদাসীনতা বা প্রকৃত সত উদঘাটনের উপযুক্ত প্রচেষ্টার অভাব থেকে হতে পারে। ঊনসত্তর সালে যশোর সীমান্তে ভারতের পথে এক সম্ভ্রান্ত মহিলা শুল্ক বিভাগ কর্তৃক আটক হন। চেক পোস্টে অফিসারগণ উক্ত মহিলার কাছে ছয় হাজার পাকিস্তানী টাকার নোট ও কিছু অলঙ্কার পান। এই টাকা ও অলঙ্কার কাস্টমস-এর কাছে নিয়ম অনুযায়ী ঘোষণা না করে তিনি আইন লঙ্ঘন করেছিলেন বলে দাবি করা হয়। কর্তৃপক্ষ সেই টাকা ও অলঙ্কার জব্দ করে রাখেন।
সেই সম্ভ্রান্ত মহিলা ছিলেন বরিশালের সিনিয়র সাব জজ মিঃ সান্যালের স্ত্রী। মেয়ের বিয়ের জন্যে সঞ্চিত অর্থ ও অলঙ্কার নিয়ে তিনি কোলকাতার যাচ্ছিলেন। নিশ্চিতভাবে একাজ আইনের লঙ্ঘন ছিল।
কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একটি বিরাট চোরাচালানের কেস রূপে চিহ্নিত করে নিজেদের কৃতিত্ব প্রকাশের উদ্দেশ্যে মহিলার নামের সাথে স্বামী জজ সান্যালের নাম উল্লেখসহ রিপোর্টারদের কাছে খবরটা পৌঁছে দেন। মিঃ সান্যাল বিচার বিভাগের কাছে সারাজীবন একজন সৎ, নিষ্ঠাবান ও প্রথম শ্রেণীর বিচারক হিসেবে পরিচিত ও সম্মানিত। পরের দিন ঢাকার কয়েকটি পত্রিকার এই চোরাচালানের কাহিনী বের হলো। মিঃ সান্যালের নাম ও সম্মানকে বিশেষভাবে বিপন্ন করেও জড়িয়ে পাঠকের চোখে জজ-পত্নীর এই ঘটনার জন্যে জজ সায়েবকেই দোষী মনে হতে লাগলো কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সরবরাহকৃত তথ্য এমনই উদ্দেশ্যমূলক ছিল। সংশ্লিষ্ট রিপোর্টার আনুপূর্বিক বিবেচনা না করে এবং এর প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে সে সম্পর্কে সচেতন না থেকেই পত্রিকায় রিপোর্ট পাঠিয়ে ছিলেন।
সাব-জজ সান্যাল বাবু পত্রিকার খবর পড়ে পরের দিন কোর্টে আসলেন। দৃঢ় চরিত্রের সেই বিচারককে তাঁর সহকর্মীগণ স্বাভাবিকভাবে কর্মরত দেখেছিলেন। কোর্ট শেষ হয়ে যাওয়ার অল্প পূর্বে তিনি তরুণ জেলা জজের কক্ষে প্রবেশ করলেন। জেলা জজ সায়েব সান্যাল বাবুকে নিষ্ঠা ও সততার জন্যে শ্রদ্ধা করতেন। সান্যাল বাবু স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন: কাগজ দেখেছেন নিশ্চয়ই।
জেলা জজ আসাফদ্দৌলা বললেন: আপনি এ ব্যাপারে জড়িত বা দোষী কি করে? কাগজে আপনার নাম এভাবে জড়ানো সঠিক হয়নি। তা’ছাড়া আইনের দৃষ্টিতে আপনাকে কোন ভাবেই অভিযুক্ত করা যায় না। গৃহে ফেরার সময় সান্যাল বাবু বলে গেলেন: সমস্ত বিচার বিভাগের সততার উপর কলঙ্ক এসে পড়েছে। যে জন্যে মানুষ বাঁচে, তাই আমি হারিয়েছি। কলঙ্কময় এ জীবন নিয়ে বেঁচে থাকার অর্থ নেই।
তিনি একটু থেমে বললেন: বিশ্বাস করুন, এ ব্যাপারে আমি কিছুই জানতাম না।
পরের দিন ভোরে সমগ্র বরিশাল শহরে একটি শোকের খবর ছড়িয়ে পড়ল- জজ সান্যাল বাবু আত্মহত্যা করেছেন।
শোবার ঘরে ঝুলন্ত অবস্থায় লাশের পা’দুটো ছিল গোটানোÑ যাতে মাটিতে পা না লাগে। পাশের টেবিলে একটি চিরকুট ছিল, সেই গতকালকের গর্বিত উক্তি- এ লজ্জার পর কলঙ্কময় জীবন নিয়ে বেঁচে থাকার অর্থ নেই। মানুষ যা’ নিয়ে বেঁচে থাকে, তাই আমি হারিয়েছে।
এ জাতীয় দৃষ্টান্ত ছাড়াও সত্য যাচাই না করার দরুণ রিপোর্টারদের নানা ধরনের ভুল হতে পারে এবং সে ভুল মিথ্যা বলে পরিগণিত হলে কিছুই করার নেই। চুয়ান্ন সালের প্রদেশের সাধারণ নির্বাচনের সময় আমি দৈনিক ইত্তেফাকে এমন এক বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছিলাম। যুক্ত-ফ্রন্ট সমর্থক অতি উৎসাহী এক ব্যক্তি এসে জানালেন যে, ঢাকায় কালো পতাকা দেখাবার জন্যে কোন কালো কাপড়ই তন্নতন্ন করে খুঁজে পেলাম না। মুসলিম লীগ নেতাদের সর্বত্র এমন ব্যাপকভাবে কালো পতাকা দেখানো হচ্ছে যে তাঁরা তো পালাচ্ছেনই, বাজার থেকে কালো কাপড়ও উধাও হয়েছে। অমনি কোন দিক বিবেচনা না করে নির্বাচনের তোড়ে তোড়ে নিউজ লিখলাম- ঢাকার বাজারে কালো কাপড়ের অভাব ইত্যাদি। বক্স হয়ে এই নির্বাচনী প্রচারণা বের হল। কিন্তু পরে দেখা গেল এই সংবাদ সত্যি নয়। সঠিক অনুসন্ধানের অভাবজনিত এই ভুলকে মিথ্যা বলা যেতে পারে।
ভুল নয় মিথ্যাও নয়Ñ সাংবাদিক নীতিমালার দিক থেকে সঠিক কি না, সেটাই বিবেচ্য। সাতান্ন সালে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী জনাব আতাউর রহমান খান খুলনায় ডক ইয়ার্ড উদ্বোধন করতে যান। আমরা কিছু সংখ্যাক রিপোর্টার ছিলাম তাঁর সঙ্গে। পি-আই ডি-সি’র চেয়ারম্যান জনাব গোলাম ফারুক এই উদ্বোধনের আয়োজন করেন। যাকে সে সময় কেন্দ্রের উচ্চপদস্থ বাঙালী জয়েন্ট সেক্রেটারী জনাব মিজানুর রহমান ‘কিং ফারুক’ বলে ডাকতেন। গোলাম ফারুকের চালচলন ছিল রাজসিক এবং বাঙালীদের সঙ্গে ব্যবহার ছিল প্রজার প্রতি রাজার ব্যবহার। সে কারণেই তাঁকে ব্যঙ্গ করে বলা হতো ‘কিং ফারুক’। উদ্বোধনের পর একটি গেস্ট হাউজে রিপোর্টারদের নিয়ে কর্মকর্তাগণ উচ্ছল পরিবেশে পানাহার শুরু করলেন। ঢাকায় আমাদের রিপোর্ট যেতে শুরু করেছে ফোনে বা টেলিগ্রামে। উদ্বোধনের সময় থেকেই একটা বিশেষ খবর আমাকে আলোড়িত করে তুলছিল। নিকটবর্তী অপর একটি গেস্ট হাউসে গিয়ে টেলিফোনে ধরলাম ঢাকায় আমার অফিস Ñ সংবাদ। খবরটা ছিল: ডক ইয়ার্ড উদ্বোধনের দিন থেকেই এই প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকগণ বিভিন্ন দাবীর ভিত্তিতে ধর্মঘট শুরু করেছে। কিন্তু উদ্বোধনের মূল খবরটা আমি দেইনি এপিপি দিয়েছে বলে।
পরের দিন সকাল বেলায় সংংবাদে এই ধর্মঘট সংক্রান্ত খবরটাই প্রাধান্য পেয়েছিল বেশী উদ্বোধনের খবরের চেয়ে। অন্যান্য কাগজ এ ব্যাপারে মার খেয়ে গেল। মুখ্যমন্ত্রী অসন্তুষ্ট হলেন; আমি কৃতিত্বের জন্যে গর্ববোধ করলাম। কিন্তু পরবর্তীকালে দেখেছি মূল সংবাদ বাদ দিয়ে একই অবস্থান থেকে কেবলমাত্র পার্শ্ব সংবাদ প্রেরণ সাংবাদিক নীতিমালা সম্মত হয়নি।
আটষট্টি সালে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ (স্টেট বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য) রজু হওয়ার পর ট্রাস্টভুক্ত সরকারী কাগজগুলো সরাসরি সাংবাদিক নীতিমালা ভঙ্গ করে বসল। সরকারের অলিখিত নির্দেশেও সামরিক বাহিনীর জনসংযোগ বিভাগের তাদারকিতে এ সমস্ত পত্রিকা কয়েকটি আলোকচিত্র ছাপিয়ে পাঠকদের চোখে আঙুল দিয়ে বলে দিলÑ‘এই সেই পেট্রোল পাম্প’ (গ্রীন রোডের মোড়ে), ‘এই সেই বাড়ি’ (গ্রীন স্কোয়ারে) ইত্যাদি। অর্থাৎ এই পেট্রোল পাম্পের মালিকই অভিযুক্ত। অর্থাৎ এই বাড়িতে ষড়যন্ত্র হয়েছিল। সরকারী অভিযোগের সূত্র ধরে, পরবর্তীকালে কোর্টে মিথ্যা প্রমাণিত হতে পারে, এ ধরনের চিত্র প্রকাশ করা যায় না বলে অন্যতম কৌসুলী জনাব আবদুস সালাম খান ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ এনেছিলেন। কিন্তু প্রধান বিচারপতি এস, এ রহমান কর্ণপাত করেননি। (গণঅভ্যুত্থানের সময় বাংলা একাডেমীর পাশে অবস্থিত বিচারপতি রহমানের অস্থায়ী সরকারী বাসস্থান বিক্ষুব্ধ জনতা পুড়িয়ে দিয়েছিল এবং তিনি লম্ববান প্রত্যঙ্গ গুটিয়ে বাঙালী বাবুর্চির সহায়তায় লক্ষণ সেন প্রদর্শিত দ্বার পথে পালিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন।)
পরে সরকার পক্ষের প্রধান কৌসুলী সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী জনাব মঞ্জুর কাদেরকে এই সময় আলোকচিত্র ছাপানো ন্যায়সঙ্গত বা নিরপেক্ষ বিচারে পরিপন্থী হয়েছে কি না সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে বলেন যে, সরকার পক্ষতো এ ছবি ছাপায়নি, পত্রিকাগুলো নিজেদের উদ্যোগে করেছে। তাঁর এই অস্বীকৃতির (মিথ্যা) পর পত্রিকার উপরেই সব দোষ এসে পড়ে। অথচ, সরকারই চাপ দিয়ে অলিখিত নির্দেশে ছবিগুলো ছাপিয়েছেন।
এমন অনেক সংবাদ আছে যা রিপোর্টারগণ জনস্বার্থের প্রয়োজনে প্রকাশ করতে আগ্রহী নন; এমন কি অনেক লঘু খবরও। একবার বার্মার স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে শাহবাগ হোটেলের ব্যাঙ্কোয়েট বলে সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকাস্থ বার্মার কন্সাল ও প্রাদেশমিক গভর্নর স্ব স্ব দেশের মোনায়েম খান এলেন; তাঁর পাশে দাঁড়ালেন বার্মার কন্সাল। এককদম পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন এডিসি (সম্ভবত: সে সময়) মেজর মশরুর; পরবর্তীকালে বিগ্রেডিয়ার ও আরো পরে রাষ্ট্রদূত হয়েছিলেন।
পরস্পরের শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর কন্সাল ও গভর্নর দু’গ্লাস ‘কোমল পানীয়’ হাতে তুলে দাঁড়ালেন। এবার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘টোস্ট’ বা কল্যাণ কামনার পালা। ইংরেজীতে আমাদের গভর্নর মোনায়েম খান বার্মার কল্যাণ ও উন্নতি এবং দু’ দেশের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব কামনা করে শেষ করলেন এই বলে- পিপলস রিপাবলিক অব চায়না! টুং (গ্লাসে গ্লাসে টোকা, এটাই রেওয়াজ)। শত শত অতিথি স্তম্ভিত। মুখে কারো রা নেই। বেচারা মশরুর তড়িৎ এক কদম এগিয়ে গবর্নরের কানে কানে বললেন: বার্মা। অপ্রতিভ গভর্নর মোনায়েম পুনরায় সেই শব্দটি মন্ত্রমুগ্ধের মতো উচ্চারণ করলেন: বার্মা। তখন এই ক্ষুদ্র ও লঘু ঘটনা সম্পর্কে কেউ রিপোর্ট করেন নি। হয়তো তাঁর বয়সের কথা বিবেচনা করে, নয় তো অশোভন হবে মনে করে। নয়তো সদাক্ষুদ্ধ গভর্নরের ভয়ে। কিন্তু পৃথিবীর অন্য কোন উন্নত দেশে বন্ধু রাষ্ট্রের জাতীয় দিবসে এ জাতীয় ভুলকে কোন সমালোচনা না করে যে, ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা হতো না, তাতে কোন সন্দেহ নেই।
অপরদিকে শত শত দৃষ্টান্ত এমন আছে বা রিপোর্টাররা প্রকাশ করতে উৎকন্ঠিত; কিন্তু সরকারী মিথ্যা প্রচার ও সংবাদ হননের চাপে রিপোর্টারগণ অসহায় হয়ে পড়েন। তাদের চোখের সম্মুখে যে ঘটনা ঘটে, তারও সঠিক রিপোর্ট করা সম্ভব হয়ে উঠে না। দুর্ভিক্ষ মহামারী ও বন্যায় মৃত্যু, এমন কি ঘূর্ণিঝড়ে মৃত্যুর সংখ্যা পর্যন্ত সরকার সঠিকভাবে প্রকাশ করতে নারাজ। অর্থাৎ প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্যও সরকারের যে দায়ী হবার আশংকা আছে। সরকার প্রকৃত পক্ষে দুর্গত জনগণকে রিলিফ প্রদানের দায়িত্ব নিতে অনিচ্ছুক।
আমাদের দেশের যে কোন সরকারই অহরহ মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে থাকেন এবং তাদের ভয়ে ও আজ্ঞায় অনেক রূঢ় সত্য প্রকাশ পায় না। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় হরতালের একদিন (২৪শে জানুয়ারী) ছাত্র-জনতার একটি বিক্ষুব্ধ মিছিল সচিবালয়ের আবদুল গণি রোডস্থ প্রথম গেটে জমায়েত হয়। মোনায়েম খানের স্বরাষ্ট্র সচিব সালাউদ্দিন আহমদ সে সময় ‘নিষিদ্ধ এলাকায় মন্ত্রীদের প্রধান ভবনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে উত্তেজিত কণ্ঠে গেটরক্ষকদের সর্তকতার নির্দেশ দিতে থাকেন। আকস্মিকভাবে পুলিশ মিছিলের ক্ষুব্ধ জনতার ওপর গুলি চালায়। অতি নিকট থেকে গেট আড়াল করে গুলিবর্ষণের ফলে বহুসংখ্যক আহত হয় ও তিন-চারজন সঙ্গে সঙ্গে প্রাণ হারান বলে অনুমান করা হয়। এই গুলিতেই নবকুমার হাইস্কুলের কিশোর মতিয়ুর শহীদ হয়।
সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন রিপোর্টার সচিবালয়ের উক্ত স্থানে গিয়ে উপস্থিত হন। তাদের সম্মুখেই মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ার পর পুলিশ দু’জন গুলিবিদ্ধ বিক্ষোভকারীর দেহ টেনে গেটের মধ্যে নিয়ে আসে এবং প্রধান বিল্ডিং-এর পাশে ফেলে রাখে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এরা মারা যাননি; সম্ভবত আহত অবস্থায় টেনে আনার ফলেই তাদের মৃত্যু তরান্বিত হয়। তখন সেই গুলিতে মৃত্যুর সংক্ষিপ্ত খবর দেশবাসীকে দেয়া গেছে; কিন্তু স্বরাষ্ট্র সচিবের তৎপরতা, উত্তেজিত কণ্ঠ, ঘটনাস্থলে উপস্থিতি বা তার সম্মুখেই গুলিবর্ষণ সম্পর্কে তখন কিছু লেখা সম্ভব হয়নি। মোনায়েম খানের স্বরাষ্ট্র সচিব পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশের অনুমোদনে জাতিসংঘের একটি এজেন্সীতে গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হন।
সরকারী চাপে এভাবে সত্যকে কবর দেয়ার নজীর অনেক। অবশ্য একে মিথ্যার নামান্তর বলা চলে। রিপোর্টার বা পত্রিকা এ সমস্ত ক্ষেত্রে অসহায় দর্শকের ভূমিকা অবলম্বন করতে বাধ্য হন।
রিপোর্ট-এ কোন কোন ক্ষেত্রের রচনা পদ্ধতি বা প্রকাশ ভঙ্গির কোন অভিব্যক্তি সঠিক, তা’ দৃষ্টিভঙ্গির বিভিন্নতার দরুণ সর্বদা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ণয় করা যায় না এবং এ কারণে বিভ্রান্তির মধ্যে পতিত পাঠক সঠিক খবর থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

আটান্ন সালের গোড়ার দিকে কুমিল্লার বুড়িচং উপনির্বাচনী এলাকায় নব গঠিত ন্যাপ-এর মনোনীত প্রার্থী ছিলেন অধ্যাপক মফিজুল ইসলাম (বহুপরে পার্লামেন্ট সদস্য)। সেই নির্বাচন ছিল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে নবগঠিত ন্যাপ-এর প্রথম নির্বাচনী লড়াই। কেন্দ্রের প্রধানমন্ত্রী শহীদ সোহরাওয়াদ্দী, প্রদেশের মূখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান থেকে শুরু করে শেখ মুজিব এবং সমগ্র আওয়ামী লীগের সরকারী-বেসরকারী শক্তি ন্যাপ প্রার্থীর বিরুদ্ধে এবং আওয়ামী প্রার্থীর পক্ষে প্রচারাভিযান দীর্ঘদিন অব্যাহত রাখেন। স্বাভাবিকভাবেই প্রাদেশিক সরকারের সংশ্লিষ্ট অফিসার ও কর্মচারীগণও এই অভিযানে আওয়ামী লীগের পক্ষে কাজ করতে বাধ্য হন। নির্বাচনে সরকারী ক্ষমতা ব্যাপকভাবে ব্যবহার অবশ্য নুরুল আমীনের আমল থেকে শুরু হয়।
‘সংবাদ’ ছিল সে সময় মওলানা ভাসানী ও নয়াপার্টি ন্যাপ-এ সোচ্চার সমর্থক। রিপোর্টার হিসেবে এই নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে রিপোর্ট করার দায়িত্ব ছিল আমার উপর। বন্ধু কে. জী. মোস্তফা, বর্তমানে রাজনৈতিক অর্থে নিরুদ্দেশ-রাষট্রদূত, (পঁচাত্তর সালে ইরাকে রাষ্ট্রদূত ছিলেন) সে সময় সংবাদে সহকারী নিউজ এডিটর। নির্বাচনের রাতে তিনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন নিউজ ডেস্কের। অনেক টেলিফোন-যোগাযোগের পর আমি বুড়িচং নির্বাচনের ব্যাপক একটি রিপোর্ট লিখলাম। উক্ত নির্বাচনে ন্যাপ প্রার্থী অল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন।
কে. জী. আমার রিপোর্ট দেখে উৎফুল্ল হয়ে বলল: চমৎকার। তবে রাইট আপটা ঘুরিয়ে দিলে ভালো হয়। দু’মিনিটের মধ্যে করে দে’।
আমি বললাম: সবই ঠিক আছে। ন্যাপ সমর্থক পত্রিকা হিসেবে এই নির্বাচনে সংবাদ যে ভূমিকা নিয়েছে, সে দিক বিবেচনা করেই লেখা হয়েছে। সংশোধনের প্রয়োজন নেই।
কে. জী. সে বক্তব্য মানতে রাজী নন। তার মতে নির্বাচনে যে জয়লাভ করেছে, তার সম্পর্কেই প্রথমে লিখতে হবে-অর্থাৎ বুড়িচং নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ন্যাপ প্রার্থীকে পরাজিত করে জয়লাভ করেছেন।
আমার রিপোর্ট ছিল, (সংক্ষেপে) কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী, তার মন্ত্রীপরিষদ সরকারী ক্ষমতা ও সমস্ত আওয়ামী লীগের শক্তি প্রয়োগ করার পরও নবগঠিত ন্যাপের প্রার্থী মাত্র সামান্য ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর নিকট বুড়িচং উপনির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন।
দেখা গেল এই বিশেষ সংবাদটির প্রকাশভঙ্গির প্রতি দু’জনের অভিগমনই আলাদা।
কে. জী. চাইলো যে, তার কথা মতো আমাকে সংশোধন করে দিতে হবে। কারণ তার বক্তব্যই সঠিক। আমি বললাম: পছন্দ না হলে বাজে কাগজের ঝুঁড়িতে ফেলে দিতে পারে। (ডেস্ক-প্রধানের এডিটিং করা বা ফেলে দেবার অধিকার আছে।) কাগজের নীতি অনুযায়ী এটাই রাইট আপ হবে। প্রয়োজনে সংশোধন করে নাও।
জেদী কে. জী. বলল: তোকেই করতে হবে।
বন্ধু কে. জী.-র যোগ্যতা ও দক্ষতার প্রতি আমার শ্রদ্ধা ছিল গভীর, তবু দ্বিমত। আমি একটুকরো কাগজ কে. জী.-র হাত থেকে টেনে নিয়ে পদত্যাগ করে রাতের অন্ধকারে রাস্তায় বের হলাম। এখনো আমি নিশ্চিত নই; আমাদের মধ্যে কার বক্তব্য সঠিক ছিল। সাংবাদিক নীতিমালার বিভ্রান্তিও সত্যের বিভ্রান্তির সমতুল্য।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

ruhul

২০১৭-১১-৩০ ০২:১৮:২৬

ভুল অমার্জনীয় নয়। কিন্তু স্বেচ্ছা প্রণোদিত মিথ্যা অমার্জনীয়। এ প্রসঙ্গে সূরা বাকারার ৪২ নং আয়াত প্রণিধানযোগ্যঃ 2:42 নির্জলা মিথ্যার চেয়ে সত্য ও মিথ্যার মিশ্রণ অধীক দূষণীয় ও ফিৎনা সৃষ্টিতে বেশি কার্যকর: = وَلَا تَلْبِسُوا الْحَقَّ بِالْبَاطِلِ•• তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিয়ে দিও না•• =

আপনার মতামত দিন