অভিযোগ মিথ্যা এতিমখানার টাকা আত্মসাৎ করিনি

প্রথম পাতা

স্টাফ রিপোর্টার | ২৪ নভেম্বর ২০১৭, শুক্রবার | সর্বশেষ আপডেট: ৩:৩০
মামলার তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যকে ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন বিএনপি 
চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তিনি বলেছেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ এই সাক্ষী আমার নামটি জড়িয়ে এজাহারে মিথ্যা অভিযোগ ও মিথ্যা জবানবন্দি দিয়েছেন। স্বার্থান্বেষী মহলের নির্দেশেই বিরাগের বশবর্তী হয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আমার বিরুদ্ধে আদালতে অসত্য সাক্ষ্য দিয়েছেন। এ মামলায় একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিলের পর সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে হারুন-অর-রশীদকে একই বিষয়ে পুনরায় অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি আমার বিরুদ্ধে কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই ২০০৮ সালের ২৫শে জুন একটি মনগড়া অনুসন্ধান রিপোর্ট দেন।
দু’জন ভিন্ন ব্যক্তির দাখিল করা দুটি রিপোর্টের ভাষা, বাক্য ও শব্দচয়ন এক ও অভিন্ন। দু’টি রিপোর্টের এক জায়গায় ‘আজিজুল’ নামটি কেটে একই হাতে আজিজুলের উপরে ‘মফিজুল’ নামটি বসানো হয়েছে। দু’জন অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা দুটি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে, দুটি ভিন্ন ভিন্ন রিপোর্ট দিলেও একই হাতের লেখায় একই নাম অনুরূপভাবে কাটাকাটি কী করে সম্ভব- তা আপনি বিবেচনা করে দেখবেন। আসলে প্রথম রিপোর্টটিই হুবহু প্রিন্ট করে রিপোর্টের শেষাংশে শুধু আমার নামটি সংযোজন করেছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তা সাক্ষী হারুন-অর-রশীদ নিরপেক্ষ অনুসন্ধান না করে নিজেই দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি সম্পূর্ণভাবে একজন ইন্টারেস্টেড সাক্ষী। তিনি অতি উৎসাহী। আওয়ামী লীগ সরকারের আজ্ঞাবহ। এই মামলায় একই সঙ্গে তিনি অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা, মামলার বাদী এবং তদন্তকারী কর্মকর্তা। বকশীবাজারের আলীয়া মাদরাসা মাঠে স্থাপিত বিশেষ আদালতে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ফৌজদারী কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আত্মপক্ষ সমর্থন করে দেয়া ষষ্ঠদিনের জবানবন্দিতে তিনি এসব কথা বলেন। বিএনপি সরকারের আমলে সাক্ষী হারুন-অর-রশীদের অব্যাহতির প্রসঙ্গ টেনে তার নিয়োগ, পদোন্নতি ও পুনঃনিয়োগের বিষয়গুলো উপস্থাপন করে তার সাক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন খালেদা জিয়া। বলেন, ব্যক্তিগত ও চাকরি জীবনে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার আশায় আমি ও আমার দলকে সামাজিক, রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে এ ধরনের মিথ্যা উক্তি তিনি এজাহারে উল্লেখ ও জবানবন্দি দিয়েছেন।
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, মাননীয় আদালত- রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্যে আমি প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এতিম তহবিল সংক্রান্তে কোনোরূপ অনুদান গ্রহণের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম- এমন কোনো বক্তব্য কোনো পর্যায়ে কোনো সাক্ষী দেয়নি। আমি প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল সংক্রান্ত কোনো অনুদান গ্রহণ বা বিতরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম- এমন সাক্ষ্য রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের কেউই বলেননি। রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্যে এটা দৃশ্যমান যে, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল ও স্বেচ্ছাধীন তহবিল সংক্রান্ত নথি চলমান ছিল এবং আছে। ওই দু’টি তহবিল পরিচালনা সংক্রান্ত যাবতীয় রেকর্ডপত্র বিজ্ঞ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি বলেন, এ দুটি তহবিল সংক্রান্ত যাবতীয় আবেদন সংশ্লিষ্ট সাচিবিক দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে যথার্থ বিবেচিত হয়েছে বলে তাদের মতামত নোটশিটের মাধ্যমে উপস্থাপনের পরেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব ও কর্তব্য হিসেবে আমি তাতে স্বাক্ষর দিয়েছি। এ রকম মূল নথি ও যাবতীয় রেকর্ডপত্র উপস্থাপন করা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীরাই তা প্রমাণ করেছেন। এ বিষয়ে আমার দায়িত্ব পালনে কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। ১৯৯১ সালের ৯ই জুন থেকে ২০০৭ সালের ২৮শে মার্চ পর্যন্ত এই মামলার ঘটনার বিবরণ রয়েছে এবং ২০০৯ সালের ৫ই আগস্ট এই মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল হয়েছে। এই ১৮ বছরের দীর্ঘ সময়কালের যাবতীয় কার্যক্রম সম্পর্কে ন্যায়বিচারের স্বার্থে আপনার কাছে প্রকৃত তথ্য ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা প্রয়োজন।
খালেদা জিয়া বলেন, মামলার এজাহারকারী মো. হারুন-অর-রশীদ পিডব্লিউ-১ হিসাবে এ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন। তার জবানবন্দির কিছু অংশ আমাকে শোনানো হয়েছে। তিনি মামলা দায়েরের আগে অনুসন্ধান কার্য করেছেন বলে দাবি করেছেন। হারুন-অর-রশীদ ২০০৮ সালের ২৫শে জুন একটি অনুসন্ধান প্রতিবেদন দেন। তার আগে ২০০৮ সালের ১১ই জুন দুদকের সহকারী পরিচালক মো. নুর আহাম্মদও একটি পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান প্রতিবেদন দেন। সে প্রতিবেদনে নুর আহাম্মদ এই মামলায় আমার কোনরূপ সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় আমার বিরুদ্ধে তিনি কোনো মতামত দেননি। অথচ একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিলের পর সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে হারুন-অর-রশীদকে একই বিষয়ে পুনরায় অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি আমার বিরুদ্ধে কোনো তথ্য প্রমাণ ছাড়াই ২০০৮ সালের ২৫শে জুন একটি মনগড়া অনুসন্ধান রিপোর্ট দেন।
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, অনুসন্ধান রিপোর্ট দুটি পাশাপাশি পর্যালোচনা করলে আপনি দেখতে পাবেন দু’জন ভিন্ন ব্যক্তির দাখিল করা হলেও দুটি রিপোর্টের ভাষা, বাক্য ও শব্দচয়ন এক ও অভিন্ন। ২০০৮ সালের ১১ই জুনের রিপোর্টে ‘সোনালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপক মো. আজিজুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়’ মর্মে একটি বাক্য আছে। ২৫শে জুন দাখিলকৃত রিপোর্টেও ‘সোনালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপক মো. আজিজুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়’ মর্মে অনুরূপ একটি বাক্য আছে। দুটি রিপোর্টের দুটি বাক্যেই ‘আজিজুল’ নামটি কেটে একই হাতে আজিজুলের উপরে ‘মফিজুল’ নামটি বসানো হয়েছে। দুইজন অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা দুটি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে, দুটি ভিন্ন ভিন্ন রিপোর্ট দিলেও একই হাতের লেখায় একই নাম অনুরূপভাবে কাটাকাটি কী করে সম্ভব- তা আপনি বিবেচনা করে দেখবেন। এতে স্পষ্ট বোঝা যায়, সাক্ষী হারুন-অর-রশীদ কোনো নিরপেক্ষ অনুসন্ধান না করে একটি মহল কর্তৃক নির্দেশিত হয়ে আগের রিপোর্টটিই হুবহু প্রিন্ট করে রিপোর্টের শেষাংশে শুধু আমার নামটি সংযোজন করেছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তা সাক্ষী হারুন-অর-রশীদ নিরপেক্ষ অনুসন্ধান না করে নিজেই দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছেন। একটি অসত্য রিপোর্ট দাখিলের মাধ্যমে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। ফলে এই সাক্ষীর সাক্ষ্য আইনের দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য।
খালেদা জিয়া বলেন, আমার বক্তব্য হচ্ছে- ২০০৮ সালের ১১ই জুন দাখিলকৃত রিপোর্টে আমার বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে কোনো প্রাথমিক অভিযোগ না পাওয়ায় পিডব্লিউ-১ হারুন-অর-রশীদকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বেআইনিভাবে পুনরায় অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪ ও দুর্নীতি দমন কমিশন বিধিমালা-২০০৭ অনুযায়ী একই ব্যক্তি কর্তৃক বারবার কিংবা একই বিষয়ে বারবার অনুসন্ধান কিংবা প্রতিবেদন দাখিলের কোনো আইনগত বিধান নেই। পিডব্লিউ-১ হারুন-অর-রশীদ সম্পূর্ণরূপে একজন ইন্টারেস্টেড সাক্ষী। তিনি অতি উৎসাহী। আওয়ামী লীগ সরকারের আজ্ঞাবহ। এই মামলায় একই সঙ্গে তিনি অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা, মামলার বাদী এবং তদন্তকারী কর্মকর্তা। ফলে তিনি নিরপেক্ষ কোনো অনুসন্ধান করেননি বা নিরপেক্ষ কোনো তদন্তও করেননি।
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, মাননীয় আদালত- দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক হিসাবে এই সাক্ষী ২০০৮ সালের ২৫শে জুন অনুসন্ধান প্রতিবেদন দেন। এই হারুন-অর-রশীদ ১৯৭৯ সালে ‘এ্যাসিস্টেন্ট’ পদে তৎকালীন ব্যুরো অব এন্টিকরাপশনে যোগদান করেন বলে দাবি করেছেন। অথচ ১৯৭৯ সালের ব্যুরো অব এন্টিকরাপশনের অর্গানোগ্রামে ‘এ্যাসিস্টেন্ট’ নামের কোনো পদ বা পদবি ছিল না। এই এ্যাসিস্টেন্ট পদটি ব্যুরো অব এন্টিকরাপশনে স্থান পায় ১৯৮৫ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর। তাহলে ১৯৭৯ সালে এ্যাসিস্টেন্ট হিসেবে তার নিয়োগ প্রশ্নবিদ্ধ ও অবৈধ। তার নিয়োগ অবৈধ হওয়ায় তিনি নিরপেক্ষ অনুসন্ধান বা তদন্ত করার মতো কোনো নৈতিক মনোবল রাখেন না। ফলে সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে তাদের নির্দেশনা মতে অনুসন্ধান ও তদন্ত করে মিথ্যা প্রতিবেদন দাখিল করেছেন।
খালেদা জিয়া বলেন, এই সাক্ষী ১৯৭৯ সালে এ্যাসিস্টেন্ট পদে প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগের পর বিভিন্ন কৌশলে ১৯৮৫ সালে এ্যাসিস্টেন্ট ইন্সপেক্টর ও ১৯৯২ সালে ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি নেন। ২০০৫ সালে বিএনপি ও চারদলীয় জোট সরকারের শাসনামলে তাকে অযোগ্য হিসাবে দুদকে আত্তীকরণ না করে অব্যাহতি দেয়া হয়। সেই অব্যাহতি আদেশের বিরুদ্ধে এই সাক্ষী হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে হেরে যান। সেই আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে লিভ টু আপিল ফাইল করে তিনি অদৃশ্য ইশারায় সেই লিভ টু আপিল প্রত্যাহার করে নেন। তার পরপরই ২০০৮ সালে তাকে সরাসরি উপ-সহকারী পরিচালক পদে দুদকে নিয়োগ দেয়া হয়। নিয়োগের মাত্র দুইদিন পর তাকে এই মামলার অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়া হয়। শুধু তাই নয়, আমার বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিলের সময়ের মধ্যেই তাকে পদোন্নতি দিয়ে সহকারী পরিচালক করা হয়। আর চার্জশিট দাখিলের পর ২০১২ সালে পুরস্কার হিসেবে উপ-পরিচালক পদে পদোন্নতি দেয়া হয়।
খালেদা জিয়া বলেন, পিডব্লিউ-১ হারুন-অর-রশীদ ২০০৫ সালে চাকরিচ্যুত হওয়ার কারণে তিনি আমাদের উপরে ক্ষিপ্ত ছিলেন। তারই ফলশ্রুতিতে আমাদের বিরুদ্ধে কাজে লাগানোর জন্য তাকে বেছে নেয়া হয়। ফলে এই সাক্ষী বিরাগের বশবর্তী হয়ে স্বার্থান্বেষী মহলের ইচ্ছা ও নির্দেশ অনুযায়ী আমার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান ও তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছেন। তারই ধারাবাহিকতায় আমার বিরুদ্ধে আদালতে অসত্য সাক্ষ্য দিয়েছেন। তিনি আমার বিরুদ্ধে আদালতে যে জবানবন্দি দিয়েছেন তা ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি বলেন, পিডব্লিউ-১ আদালতে দেয়া তার জবানবন্দিতে বলেছেন, ১৯৯১-১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে আমি নাকি প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল নামে চলতি হিসাব ওপেন করি। সাক্ষীর এই বক্তব্য মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। সোনালী ব্যাংক লিমিটেড রমনা কর্পোরেট শাখার হিসাব নং-৫৪১৬ খোলার ফরমে আমার কোনো স্বাক্ষর নেই। বাগেরহাটে জিয়া মেমোরিয়াল ট্রাস্ট বা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টে টাকা বিলি-বণ্টনের ক্ষেত্রে কোনো ফাইলেও আমার স্বাক্ষর নেই। এই নামে কোনো তহবিলও নেই। অথচ আমার নিজের ও দলীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্য এই সাক্ষী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা জবানবন্দি দিয়েছেন।
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, এই সাক্ষী সোনালী ব্যাংক রমনা কর্পোরেট শাখা থেকে উপরোক্ত হিসাবের সমস্ত তথ্যবিবরণী বা সংশ্লিষ্ট রেজিস্টার আপনার সামনে উপস্থাপন করেননি। ১৯৯১ সালের ২রা জুনের আগে সোনালী ব্যাংক, রমনা কর্পোরেট শাখায় কে ম্যানেজার ছিলেন, সেই তথ্যও আপনার সামনে আনেননি। ফরেন কারেন্সিতে রেমিটেন্স এলে কী কী তথ্য থাকা প্রয়োজন বা এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল কিনা বা এই সংক্রান্ত লেনদেনের ক্ষেত্রে আমার কোনো সম্পৃক্ততা আছে কিনা- সেই সব বিষয়ে কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই আমার বিরুদ্ধে তিনি এজাহার দায়ের করেছেন। এই টাকার উৎস সম্পর্কে তিনি কোনো তথ্য প্রাপ্তি ছাড়াই এজাহার রুজু করেছেন।
তিনি বলেন, সাক্ষী হারুন-অর-রশীদ আমার কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ার পরও ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সময়কালে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন সোনালী ব্যাংক, রমনা শাখায় প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল নামীয় একটি চলতি হিসাব খুলেন যার হিসাব নং-৫৪১৬’- মর্মে এজাহারে সম্পূর্ণ মিথ্যা উক্তি করেছেন। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট সম্পূর্ণভাবে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ার পরও ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীত্বের পদকে অহেতুক সম্পৃক্ত করে কতিপয় গোঁজামিল ও মিথ্যা বক্তব্য এজাহারে উল্লেখ করেন। এই সাক্ষী ‘চেক নং- ৮৪৩১১০৩, তারিখ ১৩/১১/১৯৯৩ মূলে অনুদানের অর্থ হইতে ২,৩৩,৩৩,৫০০/- টাকা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বগুড়ায় একটি এতিমখানা স্থাপনের নামে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের অনুকূলে প্রদান করেন’- মর্মে প্রধানমন্ত্রীর পদ জড়িয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা উদ্দেশ্যমূলক ও মিথ্যা। আমি প্রধানমন্ত্রী হিসাবে বা আমি নিজে স্বাক্ষর করে এই ধরনের কোনো চেক দিইনি।
খালেদা জিয়া বলেন, মাননীয় আদালত- এই সাক্ষী আমাকে জড়িয়ে এজাহারে ও জবানবন্দিতে বলেছেন, আমি নাকি বিভিন্ন চেকের মাধ্যমে প্রাইম ব্যাংক, গুলশান শাখায় এফডিআর হিসাব খোলার নামে অর্থ স্থানান্তর করেছি। সাক্ষীর এ ধরনের অভিযোগ মনগড়া ও ভিত্তিহীন। ব্যক্তিগত ও চাকরি জীবনে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার আশায় এবং ক্ষমতাসীনদের অসৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য আমি ও আমার দলকে সামাজিক, রাজনৈকিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে এ ধরনের মিথ্যা উক্তি তিনি এজাহারে উল্লেখ করেছেন। জবানবন্দি দিয়েছেন। তার এই মিথ্যা বক্তব্যের সূত্র ধরেই আমার প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল জনসম্মুখে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে আমার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে চলেছে।
খালেদা জিয়া বলেন, মাননীয় আদালত- জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ এই সাক্ষী আমার নামটি জড়িয়ে এজাহারে মিথ্যা অভিযোগ ও মিথ্যা জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলার বিচার্য বিষয় প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল সংক্রান্ত কোনো মূল নথি দুদক কর্তৃক মৌখিক ও লিখিতভাবে চাওয়ার পরেও এইরূপ নথি উপস্থাপন করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলে বিদেশি অনুদান সোনালী ব্যাংক রমনা কর্পোরেট শাখায় এসেছে, এমন দাবির সমর্থনে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখা থেকে মূল ডিডি সোনালী ব্যাংক দিতে পারেনি। এ সংক্রান্ত বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখা থেকে একটি অ্যাকাউন্ট খোলার আবেদন আদালতে দাখিল করা হয়েছে। তা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের তদানীন্তন সচিব ড. কামাল সিদ্দিকী কর্তৃক খোলা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। ওই অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তা কোনো লেজার বা অন্য কোনো ডকুমেন্টের মাধ্যমে কোনো সাক্ষ্য দেননি। অ্যাকাউন্ট ওপেনিং ফরমের কোথাও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের কোনো দাপ্তরিক আদেশ বা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার অনুমোদন নেয়া হয়েছে- এমন কোনো দালিলিক সাক্ষ্য কেউ উপস্থাপন করেননি। এই অ্যাকাউন্ট ওপেনিং আবেদনে কোথাও আমার কোনো সই-স্বাক্ষর নেই। তিনি বলেন, সাক্ষীদের সাক্ষ্যের স্বীকৃত মতে তদানীন্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএসএম মোস্তাফিজুর রহমান নিজ উদ্যোগে এই অনুদানের অর্থ আনার ব্যবস্থা করেন। পিডব্লিউ-৩১ ও পিডব্লিউ-৩২ উভয়ে তাদের সাক্ষ্যে তদানীন্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমানের নামে মূল অনুদান আনার বিষয় বিভিন্ন তথ্যাবলী সংগ্রহের মাধ্যমে স্বীকার করেন। সোনালী ব্যাংক সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তা অ্যাকাউন্ট খোলা সম্পর্কিত অভিযাচনপত্রের পরেও কোনরূপ তথ্য সরবরাহ করতে পারেননি।
খালেদা জিয়ার বক্তব্য শেষে তার আইনজীবী জয়নুল আবেদীন তার স্থায়ী জামিনের আবেদন করেন। অন্যদিকে জামিনের বিরোধিতা করেন দুদকের কৌঁসুলি মোশাররফ হোসেন কাজল। এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রথম সাক্ষী হারুনুর রশিদ প্রসঙ্গে খালেদা জিয়ার বক্তব্য এবং দীর্ঘ সময় নিয়ে খালেদা জিয়ার আত্মপক্ষ সমর্থনের বক্তব্যের বিষয়েও আপত্তি তোলেন মোশাররফ হোসেন কাজল। তিনি বলেন, এখানে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা হয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় যা বলা হচ্ছে তা রাজনৈতিক বক্তব্য। সময়ের ব্যাপারেও আমাদের আপত্তি রয়েছে। মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, তিনি (খালেদা জিয়া) যে বক্তব্য দেবেন তা লিখিত আকারেও জমা দিতে পারেন। এমন বিধান আইনে রয়েছে। আমরা সময়ের ব্যাপারে আপত্তি জানাচ্ছি। এ সময় জয়নুল আবেদীন বলেন, এই মামলাটি রাজনৈতিক। এ বিষয়গুলো না আসলে এটি পরিষ্কার হবে না। এগুলো আসতে হবে। এদিকে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়া আত্মপক্ষ সমর্থনের আগে আংশিক বক্তব্য দিয়েছিলেন। পরে এই মামলায় রিকল করে কয়েকজন সাক্ষীকে জেরা করা হয়। আদালতের বিচারক জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় রিকল করা সাক্ষীদের বক্তব্য পড়ে শোনান। এ সময় খালেদা জিয়ার উদ্দেশ্যে আদালত বলেন, আপনি দোষী না নির্দোষ। জবাবে খালেদা জিয়া বলেন, আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ। আদালত বলেন, আপনার আত্মপক্ষ সমর্থনের ধারাবাহিকতায় আরো কিছু বলবেন কি? জবাবে খালেদা জিয়া বলেন, আমি বক্তব্য দেব। আদালতের বিচারক বলেন, আপনি কোনো কাগজপত্র দাখিল করবেন কি? জবাবে খালেদা জিয়া বলেন, প্রয়োজন হলে দেবো। পরে দুই মামলায় গতকাল খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা আবারো তার স্থায়ী জামিনের আবেদন করেন। বিএনপি চেয়ারপারসনের আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেন, খালেদা জিয়া পালিয়ে যাবার মানুষ নন। আমরা তার স্থায়ী জামিনের আবেদন করছি। জবাবে আদালত জানান, তিনি (খালেদা জিয়া) আগে যেভাবে জামিনে ছিলেন এখনো সেভাবেই জামিনে থাকবেন। দুই মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য ৩০শে নভেম্বর দিন ধার্য করেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত- ৫ এর বিচারক মো. আখতারুজ্জামান। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার বিচারকাজ রাজধানীর বকশীবাজারে কারা অধিদপ্তরের প্যারেড গ্রাউন্ডে স্থাপিত অস্থায়ী আদালতে চলছে। গতকাল আদালতে হাজিরা দিতে কড়া নিরাপত্তায় সকাল ১১টা ২০ মিনিটে আদালতে হাজির হন খালেদা জিয়া। আত্মপক্ষ সমর্থনের অসমাপ্ত বক্তব্য শেষে ১টা ২০ মিনিটের দিকে তিনি আদালত প্রাঙ্গণ ছেড়ে যান।
মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে আসা দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে খালেদা জিয়া, তার ছেলে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩রা জুলাই রমনা থানায় মামলা দায়ের করে দুদক। এ মামলার অন্য আসামিরা হলেন, মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ। এ দু’জন বর্তমানে কারাগারে রয়েছে। অন্য দুই আসামি সাবেক মুখ্য সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান এখনো পলাতক। অন্যদিকে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে তিন কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা অবৈধভাবে লেনদেনের অভিযোগে ২০১০ সালের ৮ই আগস্ট রাজধানীর তেজগাঁও থানায় খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। খালেদা জিয়া ছাড়া এ মামলার অন্য আসামিরা হলেন- তার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, হারিছের তখনকার সহকারী একান্ত সচিব ও বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান। ২০১৪ সালের ১৯শে মার্চ অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে মামলার বিচারকাজ শুরু হয়।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

‘নির্বাচনে না আসলে বিএনপির অস্তিত্ব বিপন্ন হবে’

নিখোঁজ প্রকৌশলীর মরদেহ উদ্ধার

মালিবাগে গুদামে আগুন

ওয়ালটনে প্রতিষ্ঠাতা নজরুল ইসলাম মারা গেছেন

সাবেক প্রক্টর কারাগারে, প্রতিবাদে অবরুদ্ধ চবি

আপন জুয়েলার্সের তিন মালিকের জামিন স্থগিত

এবারে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁস

‘বিএনপি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেনা’

লেবাননে বৃটিশ কূটনীতিককে শ্বাসরোধ করে হত্যা

বিমানে দেখা এরশাদ-ফখরুলের

হলফনামার তথ্য গ্রহণযোগ্য নয়: সুজন

ছিনতাইকারীর টানাটানিতে মায়ের কোল থেকে পড়ে শিশুর মৃত্যু

গুজরাট ও হিমাচলে বিজেপিই জিততে চলেছে

আরো ৪০ রোহিঙ্গা গ্রাম ভস্মীভূত:  এইচআরডব্লিউ

ভর্তি জালিয়াতি সন্দেহে রাবির দুই ছাত্রলীগ নেতা আটক

‘এটাও কিন্তু একটা চ্যালেঞ্জের বিষয়’