মৌলভীবাজারে গ্রাহকের কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা ভিডিএন চেয়ারম্যান ও এমডি

শেষের পাতা

মো. রুয়েল কামাল, বড়লেখা (মৌলভীবাজার) থেকে | ২৪ নভেম্বর ২০১৭, শুক্রবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:৪২
ভিলেজ ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক (ভিডিএন) নামক একটি বেসরকারি সংস্থা বিভিন্ন প্যাকেজের নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে আমানত হিসেবে ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে 
। আমানতের মেয়াদপূর্তিতে লভ্যাংশসহ গ্রাহকদের ৪০-৫০ কোটি টাকা পরিশোধের কথা। কিন্তু গ্রাহকদের মূলধনসহ উধাও হয়েছে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান আব্দুল হাকিম, এমডি আয়াজ আলী, প্রতিষ্ঠাতা এমডি আব্দুস সহিদসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা।
হঠাৎ করে ভিডিএনের সিলেটের প্রধান কার্যালয়সহ মাঠ পর্যায়ের ৬ উপজেলা অফিসে তালা ঝুলতে দেখা গেছে। সরিয়ে ফেলা হয়েছে অফিসের সাইনবোর্ডসহ সব ধরনের আলামত। এতে ভিডিএনের ১০ সহস্রাধিক গ্রাহক তাদের আমানতের টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে রয়েছেন অনিশ্চয়তায়। আর গ্রাহকদের তোপের মুখে রয়েছেন অফিসে স্থানীয় কোটায় নিয়োগ পাওয়া ৬ শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী।
অনেকে গ্রাহকদের হামলা- মামলার ভয়ে আত্মগোপনেও রয়েছেন। কেউ কেউ ব্যক্তিগত গরু-মহিষ এমনকি জমিজমা বিক্রি করেও কিছু গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছেন।
মৌলভীবাজারের বড়লেখার দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ইউনিয়নের পশ্চিম হাতলিয়া গ্রামের আব্দুল হাকিম ও জুড়ী উপজেলার পূর্বজুড়ী ইউনিয়নের বড়ধামাই গ্রামের আয়াজ আলী এবং হরিপুরের আব্দুস সহিদ মিলে ২০০৩ সালে পশ্চিম হাতলিয়া গ্রামে ভিলেজ ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক (ভিডিএন) নামক বেসরকারি সংস্থার সাইনবোর্ড টানিয়ে গ্রাহকের বিনিয়োগ ও সঞ্চয় সংগ্রহের ব্যবসা শুরু করেন। আবদুল হাকিম সংস্থার চেয়ারম্যান ও আয়াজ আলী ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন। ৮০ ভাগ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে অতি অল্পসময়ে সংস্থার প্রসার ঘটে মৌলভীবাজারের বড়লেখা, জুড়ী, কুলাউড়া, রাজনগর, কমলগঞ্জ এবং সিলেট জেলার সদর, গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার উপজেলায়। ২০১০ সালে চট্টগ্রামেও অফিস খোলে ভিডিএন। এসব উপজেলায় বড় বড় অফিস ভাড়া নেয়া হয়। মোটা অঙ্কের বেতনে অফিসে ও মাঠ পর্যায়ে কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়। ব্যবসা বিস্তৃতি লাভের পর জুড়ী থেকে সিলেট মহানগরের সুরমা টাওয়ারে স্থানান্তর করা হয় ভিডিএনের প্রধান কার্যালয়। ২০১০ সালে চট্টগ্রামেও অফিস খোলে ভিডিএন নামক সংস্থাটি। অভাবী মানুষকে স্বাবলম্বী করার মন্ত্রে মুগ্ধ হয়ে সাধারণ মানুষ ভিডিএনের প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ভিলেজ ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক (ভিডিএন) সংস্থাটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জয়েনস্টক কোম্পানি থেকে নিবন্ধন নিয়ে কার্যক্রম শুরু করে। মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও প্রবাসীদের টার্গেট করে প্রথমে ৮০ ভাগ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে মাসিক, ত্রৈমাসিক, ষান্মাসিক, বার্ষিক ও এককালীন ভিত্তিতে বিনিয়োগ ও সঞ্চয় আমানত সংগ্রহ শুরু করে। পরে ভিডিএন সোস্যাল বিজনেস লিমিটেড নামে মেয়াদান্তে আড়াই গুণ মুনাফা প্রদানের শর্তে আয়বর্ধক প্রকল্প হিসেবে বনায়ন প্রকল্প, আবাসন প্রকল্প, পর্যটন প্রকল্প, শিল্পজাত প্রকল্প, সেচ প্রকল্প, ন্যায্যমূল্যে মার্কেট, কৃষি, মৎস্য, ছাগল ও গরুর খামার, পেশাভিত্তিক উপকরণ সরবরাহ, কারিগরি শিল্প বিষয়ক প্রশিক্ষণ ও উপকরণ সরবরাহ ছাড়াও নানা সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্প চালু করে।
ইতিমধ্যে ১০ ও ১২ বছর মেয়াদি প্রকল্পের ২০১৩ ও ২০১৫ সালে মেয়াদ পূর্ণ হয়। এতে আমানতকারীরা লাভসহ তাদের আমানত প্রাপ্তির জন্য স্থানীয় অফিসের মাধ্যমে আবেদন করেন। ভিডিএনের প্রণীত নীতিমালা অনুযায়ী ৩ মাসের মধ্যে গ্রাহকের দাবি পূরণে কোম্পানি অঙ্গীকারাবদ্ধ। কিন্তু গ্রাহকদের আমানত ফেরতের আবেদনের পর শুরু হয় নানা টালবাহানা। ভিডিএনের ১০ সহস্রাধিক গ্রাহকের মধ্যে কোনো গ্রাহক তাদের আমানতের মেয়াদপূর্তিতে লাভের মুখ দেখেছেন বলে কোনো তথ্য দিতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।
ভিডিএনের গ্রাহক বড়লেখা উপজেলার কাঠালতলী উত্তরভাগ গ্রামের প্রবাসীর স্ত্রী মনোয়ারা বেগম ১৮ হাজার টাকা আমানত জমা রাখেন। মেয়াদ পূর্ণের ২ বছর আগেই কর্তারা লাপাত্তা হওয়ায় তিনি হতাশায় ভুগছেন। সুজানগর ইউপির বারহালি গ্রামের ভূমিহীন হতদরিদ্র আঙ্গুর বেগম। পার্শ্ববর্তী বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে জীবিকা চালান। ২০০৫ সালে ভিডিএনের চেয়ারম্যান ও এমডি উদ্বুদ্ধকরণ সভায় মুনাফার প্রলোভন দেখালে ভাগ্যবদলের আশায় মাসিক ১০০ টাকা হারে সঞ্চয় জমা করা শুরু করেন। ১০ বছর মেয়াদি সঞ্চয় আমানতের ৩১ কিস্তি প্রদানের পর তিনি প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হন। ফলে তার পক্ষে আর কিস্তি চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে জমানো আমানতের মেয়াদ পূর্ণ হয়। সঞ্চয়কৃত মূলধনের লভ্যাংশসহ টাকা ফেরতের জন্য পঙ্গু আঙ্গুর বেগম ভিডিএনের হাকালুকি, বড়লেখা এমনকি সিলেট প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে লাভ তো দূরের কথা নিজের সঞ্চয়কৃত টাকাও ফেরত পাননি।
ভিডিএন গ্রাহক কাতার প্রবাসী আনোয়ার হোসেন সাজু জানান, ৫০ হাজার টাকায় ১০ বছর পর ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা প্রদানের শর্তে বনায়ন প্রকল্পে ২০১১ সালে তিনি এককালিন আমানত জমা দেন। কিন্তু এখন ভিডিএনের অফিস খুঁজেই পাচ্ছেন না। বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না, তিনি যে প্রতারিত হয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে ৫ বছর, ১০ বছর ও ১২ বছর মেয়াদি ৪ সহস্রাধিক গ্রাহকের মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে। স্থানীয় ভিডিএন অফিসে অনেকে রসিদ ও পাস বই জমা দেন। এর বিপরীতে অফিস ইনচার্জ ও ব্রাঞ্চ ম্যানেজার গ্রাহকদের রিসিভিং কপি বা চেয়ারম্যান ও এমডি স্বাক্ষরিত প্রাপ্ত অঙ্কের চেক প্রদান করেন। টাকা উত্তোলনের নির্দিষ্ট তারিখ অতিবাহিত হলেও ব্যাংকে গিয়ে অপর্যাপ্ত তহবিলের কারণে গ্রাহকরা কোনো টাকা পাননি। এতে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ওপর গ্রাহকরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। অফিস ইনচার্জ ও মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা পড়েছেন মহাবিপাকে।
বিয়ানীবাজার অফিস ইনচার্জ মো. আক্তারুজ্জামান জানান, তার অফিসের গ্রাহক সংখ্যা আনুমানিক ৫ শ’। মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে ৩শ’ জনের। মোট দেনা ৬১ লাখ টাকা। ভিডিএনের চেয়ারম্যান, এমডি উধাও ও প্রধান কার্যালয় গুটিয়ে ফেলায় গ্রাহকদের চাপ সামলাতে তিনি হিমশিম খাচ্ছেন।
বড়লেখা অফিস ইনচার্জ মো. শামসুজ্জামান জানান, তার অফিসের সহস্রাধিক গ্রাহকের প্রাপ্ত মূলধন কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। লভ্যাংশসহ এর পরিমাণ ৩ কোটি টাকারও বেশি।
বড়লেখা ব্রাঞ্চ ম্যানেজার (গ্রামতলা, মোহাম্মদনগর, বোবারথল) আব্দুল জব্বার জানান, ইতিমধ্যে শতাধিক গ্রাহকের মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে। তাদের পাওনা (শুধু মূলধন) প্রায় ২২ লাখ টাকা। এসব গ্রাহক প্রতিদিন বাড়িঘরে, রাস্তাঘাটে চাপ দিচ্ছে। অনেকে নানা হুমকি-ধমকিও দিচ্ছে। যেকোনো সময় হামলা-মামলার আশঙ্কা রয়েছে।
সিলেটের প্রধান কার্যালয়ের কো-অর্ডিনেটর আব্দুল ওয়াহিদ জানান, প্রায় ৬ মাস আগে হঠাৎ কোম্পানির চেয়ারম্যান ও এমডি সিলেট অফিসে গিয়ে বলেন, এ অফিস বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। তারা আমাকে জুড়ী অফিসে যোগদানের নির্দেশ দেন। এরমধ্যেই তারা আত্মগোপন করেন। গ্রাহক ও মাঠকর্মীরা তাদের পাওনা পরিশোধের জন্য চাপ দিচ্ছেন। আমার নিজেরও প্রায় ৪ লাখ টাকা বেতন আটকা। বর্তমানে কোম্পানির ৫-৬ কোটি টাকার মতো ঋণ রয়েছে। তবে ভিডিএনের যে ভূ-সম্পত্তি রয়েছে তা বিক্রি করলে কিছু গ্রাহকের পাওনা পরিশোধ করা যাবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে বাস্তবে ভিডিএনের দেনার হিসাব ৫০ কোটি টাকার কম নয়।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

kazi

২০১৭-১১-২৪ ০২:১৬:৪৮

এই বেসরকারী সংস্থা কি সরকার অনুমোদিত ? এটা কি রেজিষ্টার্ড ? এই সব যাচাই না করে লেনদেন করলে হায় হায় ছাড়া অন্য পথ নেই।

আপনার মতামত দিন

ওআইসি’র ঘোষণা নেতানিয়াহু’র প্রত্যাখ্যান

প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরেছেন

ট্রাম্পের কড়া সমালোচনা

গাজীপুরে মসজিদের ভেতর নৈশ প্রহরীকে গলা কেটে হত্যা

‘প্রেম’ করে বিয়ে, চাকরি হারালেন শিক্ষক দম্পতি

চবি শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির সত্যতা মিলেছে

প্রশ্ন ফাঁস হতো প্রেস থেকে

আবাসিক এলাকায় রাতে হর্ন বাজানোয় নিষেধাজ্ঞা

‘বিএনপি প্রার্থীর নির্বাচনে বাধা নেই’

কুয়ালালামপুরে গ্রেপ্তার ২ ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা

জামিনে আপন জুয়েলার্সের তিন মালিক

নারী সহশিল্পীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কে বাধ্য করা হয় আমাকে

বিবাহ বহির্ভূত যৌন সম্পর্ক নিষিদ্ধ করার আবেদন প্রত্যাখ্যাত ইন্দোনেশিয়ায়

প্রথম ১ মাসে ৬৭০০ রোহিঙ্গাকে হত্যা

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে মিয়ানমার, বাংলাদেশ সফরের আহ্বান

৪ সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় ভূমিমন্ত্রীপুত্র কারাগারে