নি র্বা চ নী হা ল চা ল (নরসিংদী ২)

আসন ধরে রাখতে চায় আওয়ামী লীগ, ফিরে পেতে মরিয়া বিএনপি

শেষের পাতা

মোর্শেদ শাহরিয়ার ও মো. আশাদউল্লাহ মনা, নরসিংদী থেক | ২৩ নভেম্বর ২০১৭, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:৩০
নরসিংদী-২ আসনটি গঠিত পলাশ উপজেলার ১টি পৌরসভা, ৪টি ইউনিয়ন ও সদর উপজেলার ৩টি ইউনিয়ন নিয়ে। ১৯৮৬ সালে পলাশ প্রথম সংসদীয় আসন হিসেবে সৃষ্টি করা হয়। এ আসন থেকে ১৯৮৬ সালের ৭ই মে নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আহমেদুল কবীর মনু মিয়া সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তখন তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী নূরুল ইসলাম। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সব ক’টি নির্বাচনে বিএনপির টিকিটে ড. মঈন খান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর সংসদ নির্বাচনে মঈন খানকে হারিয়ে ডাক্তার আনোয়ারুল আশরাফ খান দিলিপ নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হন।
২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুল আশরাফ খান নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মহাজোটের নৌকা প্রতীক নিয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ-ইনু) জায়েদুল কবির।
আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে যাদের নাম  শোনা যাচ্ছে তারা হলেন- আওয়ামী লীগ থেকে পলাশ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক এমপি ডাক্তার আনোয়ারুল আশরাফ খান দিলিপ, বর্তমান সংসদ সদস্য ও পলাশ উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি কামরুল আশরাফ খান পোটন। বিএনপি থেকে সাবেক মন্ত্রী ও এমপি ড. মঈন খান, বিএনপি নেতা এলদেম কবির। মহাজোট থেকে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ-ইনু) জায়েদুল কবির। তবে এ আসন থেকে কামরুল আশরাফ খান পোটন তার বড় ভাই ডাক্তার আনোয়ারুল আশরাফ খান দিলিপের জন্য আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইবেন বলে পোটন নিজেই জানিয়েছেন।
যতই দিন ঘনিয়ে আসছে পলাশে নির্বাচনী হাওয়া ততই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। গ্রামে-গঞ্জে, হাটে, ঘাটে, চা স্টলেও চলছে নির্বাচনী আলাপ-আলোচনা। সর্বত্র চলছে পাওয়া না পাওয়া আর ভালো-মন্দের হিসাব-নিকাশ। হাতছাড়া আসনটি ফিরে পেতে বিএনপি এখন মরিয়া। পলাশের মাটি বিএনপির ঘাঁটি- এক সময় এ কথা প্রচলন থাকলেও বর্তমানে সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়রের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো আওয়ামী লীগের দখলে। এখানে বর্তমানে বিএনপি অনেকটা কোণঠাসা। আর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ।
পলাশ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ডা. আনোয়ারুল আশরাফ খান দিলিপ ২০০৪ সালে উপজেলা সম্মেলনের মাধ্যমে সভাপতি নির্বাচিত হয়ে দুর্বল আওয়ামী লীগকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করেন। এরপর ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন নিয়ে চার বারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও একাধিক বারের মন্ত্রী বর্তমান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খানকে পরাজিত করেন। দীর্ঘ ৫ বছর ক্ষমতা থাকাকালীন সময় তিনি দলকে আরো মজবুত ও শক্তিশালী হিসেবে গড়ে তোলেন।  দলীয় প্রার্থী দিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়র এবং সব ক’টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের পদ নির্বাচনের মাধ্যমে নিজ দলের ঘরে আনেন। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি নির্বাচনে মহাজোট থেকে নৌকা প্রতীকে জাসদ নেতা জাহিদুল কবিরকে মনোনয়ন দিলে অনেকটা বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে উপজেলার তৃণমূল আওয়ামী লীগ। পরে আওয়ামী লীগের শক্ত অবস্থান ধরে রাখার জন্য আওয়ামী লীগ সভাপতির ছোট ভাই কামরুল আশরাফ খান পোটন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন। তৃণমূল আওয়ামী লীগের সহযোগিতায় স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুল আশরাফ খান পোটন মহাজোটের প্রার্থীকে পরাজিত করে দোয়াত কলম মার্কা নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ২০১৪ সালে ১৪ই ডিসেম্বর সর্বশেষ উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে পুনরায় ডা. আনোয়ারুল আশরাফ খান দিলিপকে সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। এছাড়া বর্তমান সংসদ সদস্য কামরুল আশরাফ খান পোটনকে সিনিয়র সহ-সভাপতি করে ৬৭ বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। এদিকে কামরুল আশরাফ খান পোটন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করেন। তার চেষ্টায় পলাশে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পাঁচদোনা-ডাঙ্গা-ঘোড়াশাল চার লেন সড়কের জন্য একনেকে ৮৬৫ কোটি টাকা অনুমোদন পেয়েছে। স্কুল কলেজ এমপিওভুক্ত, সরকারিকরণ, রাস্তাঘাট এবং শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর ব্রিজ নির্মাণসহ ব্যাপক উন্নয়ন করে মানুষের কাছাকাছি চলে যান তিনি। আওয়ামী লীগকে পৌঁছে দেন ঘরে ঘরে। আগামী নির্বাচনে এসব বিষয় বিশেষভাবে প্রভাব ফেলবে বলে অভিজ্ঞমহল ধারণা করছে। পলাশের সাবেক এমপি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ডা. আনোয়ারুল আশরাফ খান দিলিপ এবং বর্তমান এমপি কামরুল আশরাফ খান পোটন দুই ভাই মিলে গত সাড়ে ৮ বছরে এ আসনকে একটি উন্নয়নের মডেল আসনে রূপান্তর করেছেন। তাদের সমর্থকদের দাবি, পলাশ আসন এক সময় বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত থাকলেও এখন তা আওয়ামী লীগের  শক্তিশালী ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। তাই ডা. আনোয়ারুল আশরাফ খান দিলিপ এবারও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী। সে হিসেবে এলাকায় তিনি প্রায় প্রতিদিন ব্যাপক গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।   
অপরদিকে পলাশ একটি শিল্প এলাকা। এখানে প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী বিভিন্ন কলকারখানায় চাকরি করেন। এক সময় এ এলাকায় জাতীয় পার্টির এমপি ছিলেন। পলাশে জাতীয় পার্টির সমর্থিত ভোটাররা একটা ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টির জোট হওয়ার ফলে জাতীয় পার্টির সব ভোটই যায় আওয়ামী লীগের বাক্সে। পলাশ উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি জাকির হোসেন মৃধা জানান, আমাদের ৫০ দলীয় জোট করার কথা। পার্টির প্রেসিডেন্ট এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিবেন। আমরা চাই পলাশের আসনটিতে দল থেকে আমাদের চেয়ারম্যান হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ নির্বাচন করুক। তিনি না করলে এ আসন থেকে আমি মনোনয়ন নেয়ার প্রত্যাশী। তবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ভালো।
পলাশ উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবলীগের সভাপতি সৈয়দ জাবেদ হোসেন বলেন, আশা করি ঐক্যবদ্ধের মাধ্যমে আগামী নির্বাচনেও দল থেকে এমপি নির্বাচিত করে সভানেত্রীকে উপহার দিব। ঘোড়াশালের পৌর মেয়র আলহাজ শরীফুল হক জানান, বর্তমানে আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে থানা পর্যায়ে অবস্থান শক্তিশালী ও সুদৃঢ এবং আগামীদিন দলের এ অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করবো। জেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী সদস্য মাহফুজুল হক টিপু বলেন, পলাশ এখন আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিণত হয়েছে। আগামী সংসদ নির্বাচনে ডা. আনোয়ারুল আশরাফ খান দিলিপকে দলীয় মনোনয়ন দিলে তিনি বিপুল ভোটে জয়লাভ করবেন। নরসিংদী ২ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ কামরুল আশরাফ খান পোটন বলেন, আমার প্রত্যাশা আগামী নির্বাচনে আমার বড় ভাই সাবেক সংসদ সদস্য আলহাজ ডা. আনোয়ারুল আশরাফ খান দিলিপ দলীয় মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করবেন।
এদিকে জেলার অনেক নেতাকর্মী চাচ্ছেন নরসিংদী-২ আসনের সংসদ সদস্য কামরুল আশরাফ খান পোটন নরসিংদীর অন্য কোনো আসন থেকে নির্বাচন করুক। তবে তিনি এ ব্যাপারে বলেন, নেত্রীর সিদ্ধান্তই আমাদের সিদ্ধান্ত। নেত্রী চাইলে আমাদের দুই ভাইকেই পৃথক পৃথক আসন থেকে মনোনয়ন দিতে পারেন।
ওদিকে ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে বিএনপি নেতাকর্মীদের মনোবল ভেঙে পড়ে। তবে ড. আবদুল মঈন খান এলাকায় বিনয়ী ও ভদ্রলোক হিসেবে পরিচিত। তার আমলেই প্রথম পলাশের উন্নয়ন শুরু হয়। যার ধারাবাহিকতায় পলাশ এখন মডেল। ভোটাররা মঈন খানকে পছন্দ করেন। সেই হিসাবে আওয়ামী লীগ খুব সহজে নির্বাচনী বৈতরণী পার হবে- এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। এছাড়া ভোটাররা মনে করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে মঈন খান পলাশের গর্ব। তবে বর্তমান সরকারের আমলে বিএনপির অধিকাংশ নেতা দলের যথাযথ দায়িত্ব পালন না করে মামলা হামলা থেকে বাঁচতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে লিয়াজো করে যাচ্ছে। বিএনপি ও পৌর বিএনপির কয়েকজন নেতা ছাড়া বাকিদের কোনো দলীয় কার্যক্রমে দেখা যায় না। ফলে সাংগঠনিক দুর্বলতা পেয়ে বসেছে বিএনপিকে। জানা যায়, পলাশ আঞ্চলিক শ্রমিক দলের নামেমাত্র একটি কমিটি রয়েছে। যার কোনো কার্যক্রম নেই। ৯১, ৯৬, ২০০১-এর নির্বাচনে এ আসনে জয়লাভ করেন বিএনপির বিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান। এবারও বিএনপির একক প্রার্থী হিসেবে ড. মঈন খানই মাঠে রয়েছেন।
এসব বিষয়ে পলাশ উপজেলা বিএনপির সভাপতি এরফান আলী জানান, পলাশে বিএনপির নেতাকর্মীরা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। আমরা আমাদের এ আসন পুনরুদ্ধার করবো। চারবার এমপি ও তিনবারের মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খানই হবে আগামী সংসদের এমপি। আমরা শুধু একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন চাই।
সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক জানান, দল সাংগঠনিকভাবে অনেক শক্তিশালী। আমাদের অধিকাংশ কমিটিই গঠন করা হয়েছে। কিছু কমিটি রয়েছে তা অচিরেই গঠন করা হবে। পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আলম মোল্লা জানান, পলাশের মানুষের বিএনপির ওপর আস্থা আছে। পলাশ এখনও বিএনপির ঘাঁটি। শুধুমাত্র একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন দিলেই তার প্রমাণ মিলবে।
এদিকে আওয়ামী লীগের প্রতীক নিয়ে ১৪ দলীয় জোটের শরিক জাতীয় সমাজতান্তিক দলের (জাসদ-ইনু) নরসিংদী জেলার সভাপতি জায়েদুল কবিরও জোটের মনোনয়ন প্রত্যাশী। তিনি তার বাড়িতে জাসদের নেতাকর্মীদের নিয়ে প্রায় সপ্তাহেই নির্বাচনী মিটিং করে যাচ্ছেন।

আগামীকাল: নওগাঁ-২

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

ওআইসি’র ঘোষণা নেতানিয়াহু’র প্রত্যাখ্যান

প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরেছেন

ট্রাম্পের কড়া সমালোচনা

গাজীপুরে মসজিদের ভেতর নৈশ প্রহরীকে গলা কেটে হত্যা

‘প্রেম’ করে বিয়ে, চাকরি হারালেন শিক্ষক দম্পতি

চবি শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির সত্যতা মিলেছে

প্রশ্ন ফাঁস হতো প্রেস থেকে

আবাসিক এলাকায় রাতে হর্ন বাজানোয় নিষেধাজ্ঞা

‘বিএনপি প্রার্থীর নির্বাচনে বাধা নেই’

কুয়ালালামপুরে গ্রেপ্তার ২ ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা

জামিনে আপন জুয়েলার্সের তিন মালিক

নারী সহশিল্পীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কে বাধ্য করা হয় আমাকে

বিবাহ বহির্ভূত যৌন সম্পর্ক নিষিদ্ধ করার আবেদন প্রত্যাখ্যাত ইন্দোনেশিয়ায়

প্রথম ১ মাসে ৬৭০০ রোহিঙ্গাকে হত্যা

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে মিয়ানমার, বাংলাদেশ সফরের আহ্বান

৪ সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় ভূমিমন্ত্রীপুত্র কারাগারে