আকবর আলি খানের বই থেকে

বিচারক রেফারি মাত্র

প্রথম পাতা

স্টাফ রিপোর্টার | ২২ নভেম্বর ২০১৭, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:৪৯
আমাদের বিচারব্যবস্থা কালে কালে-এ পর্যায়ে এসেছে। এদেশের বর্তমান বিচারব্যবস্থা বৃটিশরা প্রবর্তন করে। তারা তাদের দেশে প্রচলিত কমন ল’ (বা নজিরের ভিত্তিতে অলিখিত আইনের আদলে)-এর ভিত্তিতে এই দেশের বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলে। এ ব্যবস্থা বৃটিশ-পূর্ব ভারতে প্রচলিত বিচারব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির ছিল। পৃথিবীতে বৃটিশ কমন ল’ ছাড়াও বিচারব্যবস্থা রয়েছে। যথা সিভিল ল’, সমাজতান্ত্রিক আইন   ও ইসলামিক আইন।
ভারতে বিচারব্যবস্থার লক্ষ্য ছিল বাদী ও বিবাদীর মধ্যে আপসের পরিবেশ সৃষ্টি করা। বৃটিশ বিচারব্যবস্থায় আপসের কোনো স্থান নেই। বিচারব্যবস্থায় চলে হার-জিতের লড়াই। ড. আকবর আলি খান তার সুলিখিত ‘অবাক বাংলাদেশ, বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি’ বইতে বিচারব্যবস্থার সংকট ও সমাধানে দিয়েছেন বেশকিছু সুপারিশমালা। বইটি প্রকাশ করেছে প্রথমা। তিনি বলেন, বিচারব্যবস্থায় হার-জিতের ফলে যে মামলায় জেতে, সেই লাভবান হয়। আর যে মামলায় হারে, সে হয় ক্ষতিগ্রস্ত। আবার দেখা গেছে, বিচারব্যবস্থায় দুঃসাহসিক ব্যক্তিদের ফটকাবাজির সুযোগ সৃষ্টি হয়। এর মাধ্যমে তারা অধিক টাকায় আইনজীবী নিয়োগ করে জাল দলিল ও ভুয়া সাক্ষী ব্যবস্থা করে অন্যের সম্পদ গ্রাস করার খেলায় মেতে ওঠে।
আকবর আলি খান লিখেছেন, ভারতের চিরাচরিত বিচারব্যবস্থায় সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণের তাগিদ ছিল না। বরং বিশ্বাস করা হতো যে, সিদ্ধান্ত না হলে দু’পক্ষ ক্লান্ত হয়ে আপস করবে। কৌটিল্য বিচারকদের নিম্নলিখিত পরামর্শ দেন: কিন্তু বৃটিশসৃষ্ট আদালতে বিচারকের সন্দেহের ক্ষেত্রে দুই পক্ষের মধ্যে সমান ভাগ করে আপস করার কোনো সুযোগ ছিল না। বৃটিশ আদালতের নিয়ম হলো, মামলায় এক পক্ষের বক্তব্য প্রতিষ্ঠিত হবে। এই নতুন বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি বৃটিশরা এ দেশে নতুন ভূমিব্যবস্থাও গড়ে তোলে। এই নতুন ভূমিব্যবস্থায় জাল দলিল দিয়ে অনেকে প্রচুর ভূ-সম্পত্তির মালিক হয়।
দ্বিতীয়ত, বৃটিশসৃষ্ট আদালতে আইনজীবীদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। বিলাতের কমন ল’ ব্যবস্থাতে আদালতে মামলা নিয়ন্ত্রণ করেন আইনজীবীরা, বিচারকেরা নন। আইনজীবীরা যেসব প্রশ্ন উত্থাপন করেন, বিচারকেরা সেসব বিষয়ের ওপর রায় দেন। মামলায় কোন কোন বিষয়ের ওপর রায় হবে, সেটা বিচারকেরা নির্ধারণ করেন না। সেটা আইনজীবীরা নির্ধারণ করেন। অথচ সিভিল ল’ ব্যবস্থায় আদালত পরিচালনা করেন বিচারকেরা। কোন মামলায় কোন কোন বিষয় সিদ্ধান্ত হবে, সেটা নির্ধারণ করেন মূলত বিচারকেরা, আইনজীবীরা নন।
এ প্রসঙ্গে ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে কমন ল’ ও সিভিল ল’ বিচারব্যবস্থার একটি তফাৎ স্মরণ করা যেতে পারে। সিভিল ল’ ব্যবস্থায় ইনকুইজিটোরিয়াল (Inquisitorial) বা অনুসন্ধানমূলক ব্যবস্থা প্রচলিত আছে। এই ব্যবস্থায় আদালতের কাজ হলো সত্য বের করা। তাই আদালত বাদী, বিবাদী ও সাক্ষীদের জেরা করতে পারেন। এখানে অভিযুক্তকে প্রমাণ করতে বলা হয় যে সে নির্দোষ। পক্ষান্তরে কমন ল’ ব্যবস্থাকে বলা হয় অ্যাডভারসারিয়াল (Adversarial) বা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় বিচারক রেফারি মাত্র। বাদী ও বিবাদীর আইনজীবীরা মামলার বিচার্য বিষয় তুলে ধরেন। বিচারকের কাজ আইন ও আদালতে পেশকৃত তথ্যের আলোকে রায় দেয়া। এখানে প্রমাণের মানদণ্ড কঠোর। আসামিকে নির্দোষ গণ্য করে বিচার শুরু হয়। এখানে বাদীকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হয় যে আসামি দোষী। কমন ল’ ব্যবস্থায় তাই আসামিকে দোষী প্রমাণ করা অত্যন্ত কঠিন।
উপরন্তু বিলাতে কমন ল’ ব্যবস্থায় সাধারণ মামলা ও গুরুত্বপূর্ণ মামলার মধ্যে তফাৎ করা হয়। সাধারণ ফৌজদারি মামলায় কোনো আইনজীবী আদালতে মামলা পরিচালনা করেন না। বাদী ও আসামি উভয়পক্ষ আদালতে যান এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিজের দোষ নিজেরা স্বীকার করে নেন অথবা এ সম্পর্কে তার নিজের বক্তব্য পেশ করেন। তেমনি দেওয়ানি ছোটখাটো মামলায় দুইপক্ষ আদালতে উপস্থিত হয়ে নিজেরাই তাদের বক্তব্য পেশ করেন। কোনো আইনজীবী এসব মামলায় উপস্থিত হন না। এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকাতে বলা হয়েছে যে, ফৌজদারি মামলায় বেশির ভাগ অপরাধী নিজের অপরাধ স্বীকার করে নেন এবং দেওয়ানি মামলার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিচারের আগেই মামলা নিষ্পত্তি হয়ে যায়। এসব মামলায় তাই আইনজীবীদের কোনো ভূমিকা নেই। আইনজীবীরা শুধু গুরুত্বপূর্ণ মামলায় অংশগ্রহণ করেন। বোটেরো ও তার সহকর্মীরা বিলাতের আদালতের দক্ষতা এবং মামলারত ব্যক্তিদের সন্তুষ্টির একটি বড় কারণ হিসেবে আইনজ্ঞদের কম হস্তক্ষেপকে চিহ্নিত করেছেন।
ভারতে সব মামলাতেই আইনজ্ঞরা অংশগ্রহণ করেন। এর কারণ হলো, বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ আদালতে বিচারকেরা ছিলেন ইংরেজ এবং আইন প্রণীত হতো ইংরেজি ভাষায়। দেশের বেশির ভাগ লোক ছিলেন অশিক্ষিত। ইংরেজি ভাষায় রচিত আইন দিয়ে ইংরেজ বিচারকদের বোঝানোর ক্ষমতা বেশির ভাগ মামলারত বাদী-বিবাদীর ছিল না। কাজেই তারা সব ক্ষেত্রেই উকিল নিয়োগ করতেন এবং আদালতও উকিলদের অংশগ্রহণ মেনে নেন। এর ফলে সব মামলাতেই আইনজ্ঞরা জড়িয়ে পড়েন।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

ভর্তি জালিয়াতি সন্দেহে রাবির দুই ছাত্রলীগ নেতা আটক

‘এটাও কিন্তু একটা চ্যালেঞ্জের বিষয়’

সৌদিই ব্যতিক্রম

তাদের কি বিবেক বলে কিছু নেই

ঢাকা উত্তরের উপনির্বাচন ফেব্রুয়ারিতে

যেভাবে উগ্রপন্থায় দীক্ষিত হয় আকায়েদ

স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় মেটাতে দারিদ্র্যসীমার নিচে ৫ শতাংশ পরিবার

তারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসটাকে হাইজ্যাক করে ফেলেছে

কুয়ালালামপুর বিমানবন্দর থেকে ৬০০ কর্মকর্তা প্রত্যাহার

আরো বেড়েছে দেশি পিয়াজের দাম

সময় চাইলেন ‘অসুস্থ’ বাচ্চু

ঢাকার আকাশে ঝড়ের ঘনঘটা

বিএনপির প্রচারণায় বাধার অভিযোগ

বিএনপির বিজয় র‌্যালি

ব্যবহারে বংশের পরিচয়

‘উন্নয়ন কথামালায়, মানুষ কষ্টে আছে’