ধর্ম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে

মত-মতান্তর

প্রফেসর আলী রীয়াজ | ২০ নভেম্বর ২০১৭, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ১:০৭
রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনীতি নিশ্চল বা অপরিবর্তনীয় বিষয় নয়; এসবের পরিবর্তনই স্বাভাবিক। উপরন্তু এগুলো পরস্পর থেকে বিছিন্ন নয়, একটি অন্যটিকে প্রভাবিত করে। এর একটি পরিবর্তিত হবে কিন্তু অন্যগুলো স্থির থাকবে, এমন মনে করা সঠিক নয়। কোনটি কোনটিকে প্রভাবিত করে, এ নিয়ে সমাজবিজ্ঞানে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। যারা ‘অর্থনৈতিক নির্ণয়বাদ’ বা ইকোনমিক ডিটারমিনিজমে আস্থা রাখেন; যারা অর্থনীতিকে, বিশেষ করে কোনো সমাজের উৎপাদন-কাঠামো এবং উৎপাদন সম্পর্কে ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেন, তারা অর্থনীতির পরিবর্তনকেই অন্যান্য পরিবর্তনের চালক বলে দাবি করেন। মার্ক্সবাদীদের একাংশ এ ধারণার অনুসারী।
অর্থনৈতিক নির্ণয়বাদের অনুসারীদের বাইরেও সমাজবিজ্ঞানী আছেন, যারা অর্থনীতির ওপরে গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তারা দেখিয়েছেন যে এটা কেবল অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির বিষয় নয়, যে কোনো রাষ্ট্র কীভাবে বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তার কী ভূমিকা, সেটাও রাষ্ট্রের কাঠামো এবং সমাজের বিভিন্ন দিককে প্রভাবিত করে, ক্ষেত্রবিশেষে নির্ণায়কের ভূমিকা পালন করে। বিশ্ব অর্থনীতির কাঠামোর পরিবর্তনের ইতিহাস নিয়ে যারা আলোচনা করেছেন, তারা দেখান যে বৈশ্বিক ব্যবস্থা হিসেবে পুঁজিবাদের বিস্তৃতি এবং সেই কাঠামোয় কোন রাষ্ট্র কী ভূমিকা পালন করবে, তার ওপরে রাষ্ট্রের চরিত্র, প্রকৃতি, সক্ষমতা নির্ভরশীল। ইম্মানুয়েল ওয়ালেরস্টিন, আন্দ্রে গুন্ডার ফ্রাঙ্ক এবং তার অনুসারী যারা বিশ্বব্যবস্থা তত্ত্ব (ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস থিওরি) এবং নির্ভরশীলতার তত্ত্বের (ডিপেনডেন্সি থিওরি) আলোকে সমাজ-রাজনীতি বিশ্লেষণে উৎসাহী, তাদের বক্তব্যের সহজ সারাংশ এই রকম (ফ্রাঙ্ক, ১৯৬৬, ১৯৭৬, ১৯৬৯; ওয়ালেরস্টিন, ১৯৭৪, ১৯৮০, ১৯৮৯)।
অনেক সমাজবিজ্ঞানী মনে করেন যেন সমাজে বিরাজমান শক্তিগুলো কেবল অর্থনৈতিক সম্পর্কের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না। তাদের বক্তব্য হচ্ছে সমাজের প্রচলিত রীতি-নীতি, মূল্যবোধ, আচার-আচরণ অনেকাংশেই নির্ণায়কের ভূমিকা পালন করে। তাদের বিবেচনায় সংস্কৃতির মধ্যে ধর্ম, বিশ্বাস, শিক্ষাও অন্তর্ভুক্ত; কেউ কেউ এর মধ্যে বর্ণ এবং এথনিসিটি বা জাতীয়তাকেও অন্তর্ভুক্ত করেন। এদের আমরা সাংস্কৃতিক নির্ণয়বাদী বলতে পারি। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ভেবারের আলোচিত গ্রন্থ দ্য প্রোটেস্ট্যান্ট এথিক অ্যান্ড দ্য স্পিরিট অব ক্যাপিটালিজম (১৯০৪-৫) এর একটা বড় যুক্তি হচ্ছে এই যে, উত্তর ইউরোপে পুঁজিবাদের বিকাশ ও সাফল্যের কারণ হচ্ছে পিউরিটান এথিকস। ভেবার ধর্মের সঙ্গে সমাজ ও অর্থনীতির প্রসঙ্গ, অর্থাৎ ধর্মের সমাজতত্ত্ব, আরো তিনটি বইয়ে আলোচনা করেছেন। ধর্মকে আমরা যদি সংস্কৃতি বলে মানি, তাহলে ভেবারের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট-সংস্কৃতির প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। (স্যামুয়েল হান্টিংটন তার বহুল আলোচিত থার্ড ওয়েব অব ডেমোক্রেসি তত্ত্বে বলেন যে প্রোটেস্ট্যান্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিকাংশ দেশেই ১৯৭০-এর আগেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, হান্টিংটন, ১৯৯১)। একই ধরনের কথা ইউরোপের বাইরের সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি ও রাষ্ট্র বিশ্লেষণে ব্যবহার করেছেন অনেক সমাজতত্ত্ববিদ। যেমন গোটা পূর্ব এশিয়া, বিশেষত চীনা সমাজে পদসোপানের বা হায়ারার্কির গ্রহণযোগ্যতা এবং রাষ্ট্র গঠনে তার ভূমিকা বিশদভাবে আলোচিত। বলা হয়ে থাকে যে এর পেছনে আছে কনফুসিয়ানিজমের প্রভাব (শি, ২০০৮; চেন, ২০১৩)। অর্থাৎ সমাজে বিরাজমান মূল্যবোধ বিশেষ ধরনের রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা রেখেছে। ১৯৯০-এর দশকে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার কর্তৃত্ববাদী শাসনের ধারণা প্রতিষ্ঠা এবং তাদের অর্থনৈতিক সাফল্যের ব্যাখ্যা হিসেবে এশিয়ান ভ্যালুজ’ বা এশীয় মূল্যবোধের ধারণা প্রচার করা হয়েছিল (ইনুগুচি ও নিউম্যান, ১৯৯৭)। সাংস্কৃতিক নির্ণয়বাদের ওপরে এককভাবে নির্ভর করার বিপদ হচ্ছে এই যে তা ভুলভাবেও ব্যবহৃত হতে পারে। এটি আমরা এশীয় মূল্যবোধের তত্ত্বে যেমন দেখি, তেমনি দেখতে পাই মধ্যপ্রাচ্য-বিষয়ক আলোচনায়ও; হান্টিংটনের বহুল আলোচিত-সমালোচিত সভ্যতাসমূহের সংঘাত (ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশনস) তত্ত্ব এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ (হান্টিংটন, ১৯৯৬)। কোনো কোনো বিশ্লেষক মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে গণতন্ত্রের অনুপস্থিতিকে ইসলাম ধর্মের বৈশিষ্ট্য বলেই দেখানোর চেষ্টা করেছেন। ফলে এটা স্পষ্ট করে বলা আবশ্যক যে সমাজ পরিবর্তনে সংস্কৃতি গুরুত্বপূর্ণ বলার অর্থ এই নয় যে তা এককভাবে নির্ণায়কের ভূমিকা পালন করে।
অর্থনৈতিক নির্ণয়বাদ এবং সাংস্কৃতিক নির্ণয়বাদের সমর্থকেরা একার্থে এক জায়গায় একমত বলেই প্রতীয়মান: তারা মনে করেন যে রাষ্ট্র নির্ণায়ক নয়, বরং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ফসল।
পরিবর্তনের নির্ণায়ক হিসেবে রাষ্ট্রকে একেবারে খারিজ করে দেয়ার ধারণাকে তত্ত্বগতভাবে চ্যালেঞ্জ করেন মার্ক্সবাদীদেরই একাংশ; তারা দেখান যে সাধারণভাবে রাষ্ট্র শ্রেণিস্বার্থের প্রতিভূ হলেও, অর্থাৎ অর্থনীতি নির্ণায়কের ভূমিকা পালন করলেও, ব্যতিক্রম হিসেবে এমন পরিস্থিতি সম্ভব যেখানে রাষ্ট্র নিজেই আপেক্ষিকভাবে স্বাধীন (বা স্বায়ত্তশাসিত) ভূমিকা পালন করতে পারে। রাষ্ট্রের অপেক্ষিক স্বাধীনতার এই ধারণার উৎস কার্ল মার্ক্স হলেও ইতালীয় মাক্স্যবাদী সমাজবিজ্ঞানী আন্তোনিও গ্রামসি তার বিশদ ব্যাখ্যা দেন (গ্রামসি, ১৯৭১)। অন্যান্য নিও-মার্ক্সবাদীরাও (যেমন পুলানসাস ও মিলিবান্ড, ১৯৭২) এই বিতর্কে অংশ নেন। এই আলোচনার পাশাপাশি ১৯৮০-এর দশকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মধ্যে নতুন করে রাষ্ট্র বিষয়ে উৎসাহ পরিলক্ষিত হয় (উভান্স, রুয়েশমায়ার ও স্কচপল, ১৯৮৫), যার একটি কারণ হচ্ছে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। তাদের যুক্তি হচ্ছে যে এসব দেশে রাষ্ট্রের ভূমিকা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে অন্যান্য তত্ত্ব এসব দেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা দিতে পারে না। পূর্ব ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার (যেমন চিলির) অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে রাষ্ট্র কেবল শাসনের উপকরণ নয়, রাষ্ট্র সমাজের শ্রেণি-কাঠামো বদলে দিতে পারে, এমনকি নতুন শ্রেণি তৈরি করতে পারে। এটা উল্লেখ্য যে রাষ্ট্র শ্রেণি তৈরি করতে পারে এই ধারণা আগে শুধু ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে আলোচিত হয়েছে। কোনো কোনো গবেষক (যেমন হামজা আলাভি, ১৯৭২) বলেছিলেন যে ঔপনিবেশিক শাসনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা রাষ্ট্র নতুন শ্রেণি তৈরি করতে পারে এবং করে। এসব আলোচনায় একটা বিষয় অনুপস্থিত থেকেছে তা হলো রাষ্ট্রের আদর্শিক ভূমিকা, অর্থাৎ রাষ্ট্র নিজেই ভাবাদর্শ বা আইডিওলজি তৈরির হাতিয়ার হতে পারে। রাষ্ট্র নতুন আদর্শের জন্ম দিতে এবং তার মাধ্যমে রাষ্ট্রের গৃহীত পদক্ষেপের বৈধতা দিতে সক্ষম (রীয়াজ, ২০০৫)। পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে জাতীয় উন্নয়নের আদর্শের নামে এবং লাতিন আমেরিকায় জাতীয় নিরাপত্তার আদর্শের নামে রাষ্ট্রগুলো অপ্রতিনিধিত্বশীল ও অগণতান্ত্রিক, এমনকি কর্তৃত্ববাদী শাসনকে বৈধতা প্রদান করেছে।
এককভাবে রাষ্ট্র, সমাজ বা অর্থনীতিকে পরিবর্তনের নির্ণায়কের ভূমিকায় স্থাপন করলে রাজনীতির ঘটনাপ্রবাহকে একটিমাত্র দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখার সুযোগ হয় এবং তাতে করে একধরনের সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। দুটি উদাহরণ আমার বক্তব্যে বুঝতে সাহায্য করবে। আমি এই দুটো উদাহরণ ব্যবহার করছি এসবের তাত্ত্বিক গুরুত্বের জন্য যেমন তেমনি বাংলাদেশের জন্য এগুলোর প্রাসঙ্গিকতার জন্যও।
প্রথমটি হচ্ছে সমাজ-রাষ্ট্র-ধর্মের মধ্যকার সম্পর্কের বিষয়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে সেক্যুলারিজমের একটি ধারণা বিস্তার লাভ করে যে সেক্যুলারিজম হচ্ছে সমাজ ও ধর্মের সম্পর্কের বিষয়। এই বিবেচনার আলোকে ঊনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীতে বলা হয় যে সমাজের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সমাজে ধর্মের প্রভাব হ্রাস পাবে। সমাজের অগ্রগতির লক্ষণ হিসেবে আধুনিকায়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কথা বলা হয়েছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর সমাজবিজ্ঞানীরা যেমন আগস্ট কোঁৎ, হার্বার্ট স্পেন্সার, এমিল ডুর্খেইম, ম্যাক্স ভেবার, কার্ল মার্ক্স- সবাই ধর্মের ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনায় এই উপসংহার টেনেছেন যে সময়ের পরিক্রমায় সমাজে ধর্মের গুরুত্ব ও প্রভাব হারিয়ে যাবে। আধুনিকায়ন ধীরে ধীরে ধর্মকে জনপরিসর থেকে বিদায় করবে, এটাই ছিল মূল যুক্তি। আধুনিকায়ন অবশ্যই কেবল অর্থনীতির বিষয় নয়, আধুনিকায়নের সঙ্গে জড়িত আছে মডার্নিটির বিষয়, যা আবার যুক্ত সমাজের মূল্যবোধের সঙ্গে (রীয়াজ, ২০১৬)। কিন্তু ‘আধুনিকায়নের’ যে সীমাবদ্ধ ধারণা সেক্যুলারিজমের বিস্তারের কারণ হিসেবে সবচেয়ে বেশি এবং ক্ষেত্রবিশেষে একচ্ছত্র বলে প্রচারিত হয়েছিল তা হচ্ছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। অর্থাৎ অর্থনৈতিক নির্ণয়বাদই শেষ বিচারে সেক্যুলারিজমের ধারণাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। এটি বিশেষভাবে ঘটে বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা আধুনিকায়ন তত্ত্বের প্রবক্তাদের কারণে।
বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে আমরা দেখতে পেলাম যে সমাজ থেকে ধর্মের অবসান তো ঘটেইনি, বরং সমাজ ও রাজনীতিতে ধর্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে, তার প্রভাব বেড়েছে, রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে তার আবির্ভাব ঘটেছে। অর্থাৎ অর্থনৈতিক নির্ণয়বাদের আলোকে আমরা যদি ধরে নেই যে অর্থনৈতিকভাবে পরিবর্তন ঘটলে সামাজিক পরিবর্তন একটি বিশেষ পথরেখা অনুসরণ করবে, সেটা সঠিক না-ও হতে পারে। ধর্মের নতুন ভূমিকা আমাদের সে ইঙ্গিতই দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সমাজের সাংস্কৃতিক পরিবর্তন কেবল আমাদের অনুমিত পথে এগোবে, এমন মনে করা বাঞ্ছনীয় নয়। অর্থনীতি ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক ভিন্ন ভিন্ন পথ অনুসরণের পেছনে রাষ্ট্রেরও ভূমিকা থাকে। সমাজ ও রাজনীতিতে ধর্মের উত্থান, বিশেষত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এ উত্থানের পেছনে রাষ্ট্রের ভূমিকাকে অস্বীকার করা যায় না। এটি কেবল সেসব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয় যেখানে রাষ্ট্র নিজেই ধর্মকে সামনে নিয়ে এসেছে, সেখানেও প্রযোজ্য যেখানে রাষ্ট্র ধর্মকে ব্যক্তিগত পরিসরে (প্রাইভেট স্ফেয়ার) ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করেছে (রীয়াজ, ২০১৬)।
(চলবে...)

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন