আকবর আলি খানের বই থেকে

একজন পেশকার মুচিরাম গুড়

প্রথম পাতা

স্টাফ রিপোর্টার | ১৯ নভেম্বর ২০১৭, রবিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৩:০৯
Justice delayed is justice denied- ইংরেজি এই আপ্ত বাক্যটিই বাংলাদেশের বিচারপ্রার্থীদের ক্ষেত্রে বহুলাংশে সত্য। কারণ, বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা এখানে বিচার পেতে অনেক সময় লাগে। যেকোনো বিচার ব্যবস্থার মূল্যায়নে দুটি বিষয় বিবেচনা করতে হয়। প্রথমত, বিচার পেতে কত সময় লাগে এবং দ্বিতীয়ত, যে বিচার পাওয়া যায় সেটি স্বচ্ছ এবং মানসম্মত কিনা? সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার বর্তমান সংকট নিয়ে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান বিচার বিভাগের প্রশাসন ব্যবস্থাকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন। তিনি প্রথমা থেকে প্রকাশিত ‘অবাক বাংলাদেশ, বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি’ গ্রন্থে বিচার ব্যবস্থা অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন- বাংলাদেশে মামলাজটের সমস্যাকে জটিল করে তুলেছে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের প্রশাসন ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থা মূলত পেশকার বা ইবহপয ঈষবৎশ-এর ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশে পেশকাররা হাকিমদের নথি রক্ষণাবেক্ষণে, মামলার তারিখ নির্ধারণে, আদালতের হুকুম জারিকরণে এবং বিভিন্ন রিটার্ন প্রেরণে সহায়তা করেন। বাংলাদেশে এই পদ বৃটিশ শাসনামলে সৃষ্টি করা হয়। শুরু থেকেই তারা ঘুষখোর হিসেবে দুর্নাম কামাই করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা উপন্যাস এবং সংবাদপত্রে তাদের কীর্তিকলাপ সম্পর্কে অনেক বর্ণনা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মুচিরাম গুড়ের জীবনচরিত বইটির কথা স্মরণ করা যেতে পারে। বঙ্কিম নিজে একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন এবং তিনি মুচিরাম গুড়ের যে চরিত্র চিত্রায়ণ করেছেন, তা অত্যন্ত বাস্তব। যখন মুচিরামকে আদালতে সহায়ক কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ করা হয়, তিনি শপথ নিয়েছিলেন যে তিনি ঘুষ খাবেন না। কিন্তু চাকরিতে যোগ দিয়েই তিনি ঘুষ খাওয়া শুরু করেন। প্রথমে আপসে যা পাওয়া যেত, তাতেই তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন। কিছুদিন পর মক্কেলদের ফাঁদে ফেলে কিভাবে অতিরিক্ত ঘুষ আদায় করা যায়, সেটা তিনি শিখে যান এবং তা রপ্ত করা শুরু করেন। ঘুষ না পেলে হাকিমের হুকুম সত্ত্বেও তিনি ওয়ারেন্ট কিংবা সমন জারি করতেন না। যেহেতু বৃটিশ ম্যাজিস্ট্রেটরা বাংলা জানতেন না, সে জন্য তাকে সাক্ষীদের বক্তব্য লিপিবদ্ধ করার ব্যাপারে সহায়তা করতে হতো। ঘুষ দিলে তিনি সাক্ষীদের বক্তব্য পরিবর্তন করে দিতেন। পেশকার পদে তার উপরি পাওয়া এত বেশি ছিল যে তিনি পদোন্নতি চাইতেন না। তবু যখন তাকে ম্যাজিস্ট্রেট পদে পদোন্নতি দেয়া হয়, তখন তিনি চাকরি ছেড়ে দেবেন বলে চিন্তা করেন। কিন্তু তার শুভানুধ্যায়ীরা তাকে ভয় দেখান, চাকরি ছেড়ে দিলে তার অনুপার্জিত অর্থের দিকে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষিত হতে পারে। তাই তিনি চাকরিতে থেকে যান। বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছেন যে মুচিরাম কোনো ব্যতিক্রম ছিলেন না, তার সহকর্মীরাও একই রকম দুর্নীতিবাজ ছিলেন। এক ড. আকবর আলি খানের মতে, শত বছর আগে পেশকারদের সম্বন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র যা লিখেছেন, তা আজও প্রযোজ্য। সুপ্রিম কোর্টে পেশকারদের এ ধরনের তৎপরতা এখনো লক্ষণীয়। ২০১০ সালে বাংলাদেশ সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেল প্রধান বিচারপতিকে অভিনন্দন জানিয়ে যে বক্তব্য দেন, সেখানে তিনি সহায়ক কর্মকর্তাদের দুর্নীতি সম্পর্কে বিচারপতিদের সতর্ক করে দেন। (দৈনিক আমাদের সময়, ২০১০) তবে তারা শুধু নিজেরাই ঘুষ খান না, তারা দুর্নীতিবাজ জজ ও দুর্নীতিবাজ আইনজ্ঞদের মধ্যে যোগাযোগও ঘটিয়ে দেন। (পিপিআরসি ২০০৭) জ্যেষ্ঠ সহায়ক কর্মকর্তারা অনেক সময় অনভিজ্ঞ ও কনিষ্ঠ জজদের চেয়েও আইন-কানুন ভালো বোঝেন। এর ফলে তারা জজ এবং মক্কেলদের মধ্যে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করে দেন। তাদের কাজ সুষ্ঠুভাবে তদারক করা হয় না।
অন্যদিকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে মুচিরাম গুড়ের জীবনচরিত উল্লেখ করে আকবর আলি খান বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সুষ্ঠু বিচারব্যবস্থার জন্য অত্যাবশ্যক। প্রথমত, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা মানবাধিকার রক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি। যদি বিচারব্যবস্থা সরকারের আজ্ঞাবাহী হয়, তাহলে নির্বাহী বিভাগ মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে দ্বিধাবোধ করবে না। নির্বাহী বিভাগের স্বেচ্ছাচারের প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপরই অনেকাংশ নির্ভর করে মানুষের অধিকার। দ্বিতীয়ত, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রয়োজন এ জন্য যে যারা বিচার করবেন, তাদের সম্পূর্ণ স্বাধীন হতে হবে। কেউ যদি তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তাহলে বিচারব্যবস্থা সুষ্ঠু হবে না। তাই একদিকে বিচারকদের কার্যকলাপে কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না, অন্যদিকে এ ধরনের স্বাধীনতা দেয়ার জন্য উপযুক্ত বিচারক নিয়োগ করতে হবে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখার জন্য সংবিধানে বিচার বিভাগকে অনেক মর্যাদা দেয়া হয়েছে। কিন্তু নির্বাহী বিভাগ এ ধরনের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করে। ২০১৬ সালের ২২শে জানুয়ারি বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা দাবি করেন যে, নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগের কাছ থেকে সব ক্ষমতা নিয়ে যেতে চাইছে। প্রধান বিচারপতির এই বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বাংলাদেশের সংবিধান নির্বাহী বিভাগ আইনসভা ও বিচার বিভাগের স্বতন্ত্র ক্ষমতার ভিত্তিতে রচিত হয়েছে। এর তাৎপর্য হলো, কোনো বিভাগই অন্য বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন নয় এবং প্রতিটি বিভাগই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। বাস্তবে এই ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক প্রতিবন্ধকতা থেকে যায়। বৃটিশ শাসনামলে অধস্তন ফৌজদারি আদালতকে বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণে দেয়া হবে। কিন্তু কোনো সরকারই সংবিধানের এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করেনি। ফলে সুপ্রিম কোর্ট এই বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ২০০০ সালে সুপ্রিম কোর্ট ‘মাজদার হোসেন ও অন্যান্য বনাম সচিব অর্থ মন্ত্রণালয়’ মামলায় সরকারকে সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অধস্তন ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থাকে সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণে দেয়ার জন্য আদেশ দেন। এরপরও সরকার গড়িমসি করে এবং ২০০৭ সালে এই রায় বাস্তবায়ন করে।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

ভর্তি জালিয়াতি সন্দেহে রাবির দুই ছাত্রলীগ নেতা আটক

‘এটাও কিন্তু একটা চ্যালেঞ্জের বিষয়’

সৌদিই ব্যতিক্রম

তাদের কি বিবেক বলে কিছু নেই

ঢাকা উত্তরের উপনির্বাচন ফেব্রুয়ারিতে

যেভাবে উগ্রপন্থায় দীক্ষিত হয় আকায়েদ

স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় মেটাতে দারিদ্র্যসীমার নিচে ৫ শতাংশ পরিবার

তারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসটাকে হাইজ্যাক করে ফেলেছে

কুয়ালালামপুর বিমানবন্দর থেকে ৬০০ কর্মকর্তা প্রত্যাহার

আরো বেড়েছে দেশি পিয়াজের দাম

সময় চাইলেন ‘অসুস্থ’ বাচ্চু

ঢাকার আকাশে ঝড়ের ঘনঘটা

বিএনপির প্রচারণায় বাধার অভিযোগ

বিএনপির বিজয় র‌্যালি

ব্যবহারে বংশের পরিচয়

‘উন্নয়ন কথামালায়, মানুষ কষ্টে আছে’