রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যাচ্ছেন না চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

শেষের পাতা

কূটনৈতিক রিপোর্টার | ১৯ নভেম্বর ২০১৭, রবিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:৩৮
ব্যতিক্রমই থাকলো চীন। ঢাকা সফরে আসা দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যাচ্ছেন না। যদিও জাপান, জার্মানি, সুইডেন ও ইইউ’র পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ঢাকায় আসা সব উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিত্বরা ক্যাম্পে যাচ্ছেন আজ। মার্কিন সিনেটর ও কংগ্রেসম্যানরা এরইমধ্যে মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি ঘুরে এসেছেন। দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পাশাপাশি বহুপক্ষীয় উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে একটি স্থায়ী সমাধানে ঢাকার অবস্থানের প্রতি পূর্ণ সমর্থন রয়েছে বিশ্ব সম্প্রদায়ের। কিন্তু সেখানেও ব্যতিক্রম বেইজিং! পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে বৈঠকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনাতেই উৎসাহ দিয়েছেন।
বৈঠক সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ঢাকার প্রতিনিধিরা দৃঢ়তার সঙ্গেই বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। চীনের মন্ত্রীর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনের বৈঠকে বলা হয়েছেÑ ২৫শে আগস্টের পর রাখাইন থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ঢলে এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে, আন্তর্জাতিক চাপ সরে গেলে কিছুই করবে না মিয়ানমার। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নিয়েই দীর্ঘদিনের এ সমস্যা সমাধানে জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ। ফলে চীনের কথামতো দ্বিপক্ষীয় উপায়ে নয়, বহুপক্ষীয় উদ্যোগে বাংলাদেশ গুরুত্ব দিচ্ছে। পাশাপাশি মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার দরজাও খোলা রাখছে। সরকারের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-কে স্পষ্ট করেই জানিয়েছে ঢাকা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়ে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে যে সব পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ, তা থেকে সরে আসার সুযোগ নেই। বৈঠক সূত্র বলছে, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের পদ্ধতি এবং প্রক্রিয়া নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও এটি যে সমাধান হওয়া উচিত তা মানছে চীন। বেইজিংয়ের প্রতিনিধিরা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের পাশে থাকার কথাও বলেছেন। তবে তারা কোথায়, কিভাবে পাশে থাকবেন, সহায়তা দেবেন সেটি এখনো স্পষ্ট নয়। দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর গতকালের বৈঠকে চীনের তরফে রোহিঙ্গা সংকটের চেয়ে ঢাকা-বেইজিং কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং পরস্পরিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে আলোচনাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তাই বৈঠকের বেশিরভাগ অংশ জুড়ে ছিল, চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের ঢাকা সফর পরবর্তী পরবর্তী চুক্তি-সমঝোতা ও প্রকল্পকে এগিয়ে নেয়ার বিষয়ে। প্রেসিডেন্টের সফরে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জোর দিয়েছে ঢাকা ও বেইজিং। সেখানে চীনের তরফে ‘রোড অ্যান্ড বেল্ট ইনিশিয়েটিভ’কে ফোকাস করা হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। আজ ঢাকা থেকে তিনি মিয়ানমার যাচ্ছেন।   
ক্যাম্প থেকে ফিরে প্রধানমন্ত্রীর দেখা পাচ্ছেন ৪ পররাষ্ট্রমন্ত্রী: এদিকে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আলোচনার জন্য জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারো কোনো এখন বাংলাদেশে। গত রাতে ঢাকায় এসেছেন তিনি। আজ দিনের শুরুতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে প্রাতঃরাশ বৈঠকে মিলিত হবেন তিনি। ওদিকে আজই (রোববার ভোরে) জার্মানি ও সুইডেন ও ইইউ’র পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বাংলাদেশে পৌঁছাচ্ছেন। তারা সকাল ৯টায় জাপান, জার্মানি, সুইডেন ও ইইউ’র পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেলিকপ্টারে চড়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে যাবেন। জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিগমার গ্যাব্রিয়েল, সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারগট ওয়ালস্টর্ম, জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারো কোনো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ভাইস প্রেসিডেন্ট ফেদরিকা মুঘেরিনিকে ক্যাম্প পরিদর্শনকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীসহ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা সঙ্গ দেবেন। সূত্র মতে, হেলিকপ্টারে বসেই রোহিঙ্গা আশ্রিত মিয়ানমার সীমান্ত এলাকার এরিয়াল ভিউ দেখবেন তারা। পরে ক্যাম্পে গিয়ে মাঠ পর্যায়ের চিত্র দেখবেন এবং নির্যাতিতদের মুখে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর চলা বর্বর নির্যাতনের বর্ণনা শুনবেন। ক্যাম্প থেকে ফিরে তারা বিকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি পৃথকভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। রাতেই তারা ফিরে যাবেন। বিশেষ বিমানে আসা পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার যাবেন। সেখানে কাল এশিয়া ইউরোপ মিটিং আসেম পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের  বৈঠকে অংশ নেবেন। নেপি’ড’র দুদিনের ওই বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়েই মুখ্য আলোচ্য হতে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, পরে ঢাকায় ফিরে তারা আলাদাভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে  সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। তবে জার্মানি, জাপান ও সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ইইউর প্রতিনিধিদের রোহিঙ্গাদের দুর্দশা দেখতে কক্সবাজারে যাওয়ার কথা থাকলেও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেখানে যাচ্ছেন না। সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিশ্বের পাঁচটি দেশ ও জোটের দুইদিনের মধ্যে এক সঙ্গে বাংলাদেশ সফর এটাই প্রথম।
দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় সংকট সমাধান চায় চীন, কারও পক্ষ না নেয়ার ঘোষণা: ওদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলীর সঙ্গে বৈঠকের পর সন্ধ্যায় দূতাবাসে এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের মধ্যকার চলমান দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও সংলাপকে উৎসাহিত করেছেন চীনা প্রতিনিধিরা। রাখাইন ইস্যুতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনায় বেইজিং সমাধান দেখতে চায় জানিয়ে তারা বলেন, এ নিয়ে চীন তার ঘনিষ্ট দুই প্রতিবেশীকে (বাংলাদেশ ও মিয়ানমার) প্রতিনিয়ত উৎসাহ দিয়ে যাবো। দ্বিপক্ষীয় আলোচনার অংশ হিসেবে মন্ত্রী মাহমুদ আলীর আসন্ন মিয়ানমার সফর এবং রোহিঙ্গাদের ফেরানো সংক্রান্ত চুক্তি সইয়ের প্রস্তুতির প্রশংসা করেন বেইজিংয়ের প্রতিনিধিরা। অবশ্য রাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফেও ‘দ্বিপক্ষীয় আলোচনা’য় চীনের তাগিদের বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও থার্ড কমিটির বৈঠকে মিয়ানমারের পক্ষে চীনের স্পষ্ট অবস্থান নেয়ার প্রেক্ষাপটে শনিবারের বৈঠকে বেইজিং ‘এখন থেকে আর কারও পক্ষ নেবে না’ এমন ঘোষণা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকার কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, ওই বৈঠকে ঢাকা-বেইজিং দ্বিপক্ষীয় ইস্যুগুলোর পাশাপাশি আঞ্চলিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়েও কথা হয়েছে। সেখানে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের মাইলস্টোন ঢাকা ভিজিটের সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদানে তার দেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এ অঞ্চলের শান্তি এবং সমৃদ্ধির জন্য চীনের মন্ত্রী যোগাযোগ-কানেকটিভিটিতে গুরুত্ব দিয়েছেন। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ঘাটতি কমানোর উদ্যোগ নেয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, রাখাইনে নির্যাতনের কারণে বাস্তুচ্যুত লাখ লাখ মিয়ানমার নাগরিকের বাংলাদেশে অস্থায়ী আশ্রয় গ্রহণ বিষয়ে উত্থাপিত আলোচনায় চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেছেন, বন্ধু হিসেবে চীন এর একটি সমাধান দেখতে চায়। এ ক্ষেত্রে চীন কারও (বাংলাদেশ কিংবা মিয়ানমার) পক্ষ নেবে না। একই সঙ্গে মন্ত্রী মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা এবং সংলাপের ওপর জোর দেন। সীমান্তে রোহিঙ্গা-স্রোত অব্যাহত থাকায় বাংলাদেশ যে ধকল সাইছে তা স্বীকার করে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তারা তাদের উভয় বন্ধুর মধ্যকার সমস্যাটির শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়। তিনি বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেন। রোহিঙ্গাদের তাদের মাতৃভূমিতে (রাখাইনে)  দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে ফেরত পাঠাতে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বাংলাদেশ যুক্ত রয়েছে জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রী মাহমুদ আলী এ ইস্যুতে চীনের সমর্থন আশা করেন।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

ভর্তি জালিয়াতি সন্দেহে রাবির দুই ছাত্রলীগ নেতা আটক

‘এটাও কিন্তু একটা চ্যালেঞ্জের বিষয়’

সৌদিই ব্যতিক্রম

তাদের কি বিবেক বলে কিছু নেই

ঢাকা উত্তরের উপনির্বাচন ফেব্রুয়ারিতে

যেভাবে উগ্রপন্থায় দীক্ষিত হয় আকায়েদ

স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় মেটাতে দারিদ্র্যসীমার নিচে ৫ শতাংশ পরিবার

তারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসটাকে হাইজ্যাক করে ফেলেছে

কুয়ালালামপুর বিমানবন্দর থেকে ৬০০ কর্মকর্তা প্রত্যাহার

আরো বেড়েছে দেশি পিয়াজের দাম

সময় চাইলেন ‘অসুস্থ’ বাচ্চু

ঢাকার আকাশে ঝড়ের ঘনঘটা

বিএনপির প্রচারণায় বাধার অভিযোগ

বিএনপির বিজয় র‌্যালি

ব্যবহারে বংশের পরিচয়

‘উন্নয়ন কথামালায়, মানুষ কষ্টে আছে’