নবান্ন

অনলাইন

কাফি কামাল | ১৫ নভেম্বর ২০১৭, বুধবার, ১২:০৮ | সর্বশেষ আপডেট: ৪:০৬
হিম হিম কুয়াশার আবরণে ষড়ঋতুর পরম্পরায় বাংলার প্রকৃতিতে আজ ফিরে এলো পহেলা অগ্রহায়ন। নবান্ন উৎসব। অগ্রহায়ন মানেই কৃষকের গোলায় নতুন ধান। কৃষাণির ব্যস্ততা দিনভর। নবান্ন মানেই নতুন চালের পিঠার ঘ্রাণে আমোদিত চারদিক। গ্রামজুড়ে উৎসবের আমেজ।
নবান্ন উৎসবের সঙ্গে মিশে আছে বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস, ঐহিত্য ও সংস্কৃতি। বাংলার কৃষিজীবী সমাজের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী শস্যোৎসব নবান্ন। অনাদিকাল থেকে কৃষিসভ্যতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে গ্রাম বাংলায় পালিত হয়ে আসছে এ উৎসব। একদা অত্যন্ত সাড়ম্বরে উদযাপিত হতো নবান্ন উৎসব। সকল মানুষের সবচেয়ে অসাম্প্রদায়িক উৎসব হিসেবে নবান্ন উৎসব সমাদৃত ছিলো। অগ্রহায়ণের শুরু থেকেই আমাদের গ্রামবাংলায় চলে নানা উৎসব-আয়োজন। ‘নবান্ন’ শব্দের অর্থ ‘নতুন অন্ন’। নতুন ধান কাটা আর সেই সঙ্গে প্রথম ধানের অন্ন খাওয়াকে কেন্দ্র করে পালিত হয় এই উৎসব। নবান্ন উৎসব হল নতুন আমন ধান কাটার পর সেই ধান থেকে প্রস্তুত চালের প্রথম রান্না উপলক্ষে আয়োজিত উৎসব। মোগল সম্রাট আকবর অগ্রহায়ণ মাসকেই ঘোষণা করেছিলেন বছরের প্রথম মাস বা খাজনা তোলার মাস। বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণÑ এ যেন সত্যি হৃদয়ের বন্ধনকে আরো গাঢ় করার উৎসব। হেমন্ত এলেই দিগন্তজোড়া প্রকৃতি হলুদ-সবুজ রঙে ছেয়ে যায়। পাকা ধানের পাশাপাশি প্রকৃতিকে রাঙিয়ে দেয় গন্ধরাজ, মল্লিকা, শিউলি, কামিনী, হিমঝুরি, দেব কাঞ্চন, রাজ অশোক, ছাতিম আর বকফুল। এই শোভা দেখে আনন্দে নেচে ওঠে কৃৃষকের মন। স্মরণাতীতকাল থেকে বাঙালি জীবনে অগ্রহায়ণে পাকা ধান নিয়ে আগমন ঘটে এ ঋতুর। নবান্ন হচ্ছে হেমন্তের প্রাণ। নতুন ধানের চাল দিয়ে তৈরি করা হয় পিঠা, পায়েস, ক্ষীরসহ হরেক রকম খাবার। সোনালি ধানের প্রাচুর্য আর বাঙালির বিশেষ অংশ নবান্ন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, সুফিয়া কামাল, পল্লীকবি জসীম উদ্দীন, জীবনানন্দ দাশের কবিতায় ফুটে ওঠেছে অনন্য মহিমায়। কবি জীবনানন্দ দাশ তার কবিতায় লিখেছেনÑ ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে- এই বাংলায়/ মানুষ নয়- হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে/ হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে/ কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঁঠাল ছায়ায়।’ চিরায়ত বাংলার চিরচেনা রূপ এটি। বাংলার নবান্নের ইতিহাস সন্ধানী ও হৃদয় আন্দোলিতসব চিত্র এঁকেছেন এস এম সুলতান।  
অগ্রহায়ণ এলেই কৃষকের মাঠজুড়ে ধান কাটার ধুম পড়ে যায়। অত্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটে এ দেশের কৃষাণ-কৃষাণীর। পল্লীকবি জসীম উদ্দীন লিখেছেনÑ ‘সারা মাঠে ধান, পথে ঘাটে ধান উঠানেতে ছড়াছড়ি/সারা গাঁও ভরি চলেছে কে কবি ধানের কাব্য পড়ি।’ অগ্রহায়নে ধান ভাঙার গান ভেসে বেড়ায় বাতাসে। ঢেঁকির তালে মুুখর হয় বাড়ির আঙিনা। গ্রামে মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহিনী ও বৌ-ঝিরা নিজস্ব ঢেকিতে ধান ভাঙিয়ে চাল করতো। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পালাক্রমে চলতো সে ধান ভাঙার কাজ। আবার অনেক সময় সুরে সুরে গীত। ঢেঁকি নিয়ে কত গানই না রয়েছে গ্রাম বাংলায়Ñ ‘ও ধান কোটেরে ঢেঁকিতে পাড় দিয়া, ঢেঁকি নাচে আমি নাচি হেলিয়া দুলিয়া...’। অবশ্য যান্ত্রিকতার ছোঁয়ায় এখন ঢেঁকির তালে খুব বেশি মুখরিত হয় না আমাদের গ্রামবাংলা। কিন্তু বেশিদিন আগের কথা নয়, ঢেঁকিছাঁটা চাল দিয়েই হতো ভাত খাওয়া। তারপরও নতুন চালের ভাত নানা ব্যঞ্জনে তৈরি হয় আনন্দঘন পরিবেশ। নবান্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে মেয়েদের নাইওর নেয়া হয় বাপের বাড়ি। নবান্ন আর পিঠাপুলির উৎসবে আনন্দে মাতোয়ারা হয় সবাই। রকমারি খাদ্য-সামগ্রী পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন সবাইকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানো হয়। ধর্মীয় রীতি-নীতি অনুযায়ী এসব আচার-আনুষ্ঠানিকতায় রয়েছে বৈচিত্র্য। মুসলিম কৃষক সমাজে নতুন ফসল ঘরে ওঠার আনন্দে মিলাদ আর শিরনির আয়েজন করে। হিন্দু ধর্মাবম্বী কৃষকেরাও পালন করে কাকনৈবদ্যসহ নানা পর্ব। তাই অগ্রহায়ণ এলেই সর্বত্র বেজে ওঠে নতুন ধ্বনি। নবান্ন যেহেতু একটি ঋতুকেন্দ্রিক উৎসব, তাই বছর ঘুরে ফিরে আসে নবান্ন উৎসব। হেমন্তে নতুন ফসল ঘরে তোলার সময় এই উৎসব পালন করা হয়। হাজার বছরের পুরনো এই উৎসবটি যুগ যুগ ধরে একইভাবে পালন করে আসছে সবাই। বাংলার মাটির সঙ্গে চিরবন্ধনযুক্ত সবচেয়ে ঐহিত্যবাহী ও প্রাচীনতম উৎসব নবান্ন।
নবান্ন উপলক্ষে এই বাংলায় প্রচলিত আছে অনেক আচার অনুষ্ঠান। উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে জামাইকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানো হয় পিঠা-পায়েস। খুলনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে কৃষকরা মইয়না শাইল ধানের চাল দিয়ে পালন করে এই উৎসব। নেত্রকোনার হাজংরা হাতিবান্দা ধান দিয়ে ও মান্দিরা মিদিম ধানের চাল দিয়ে নবান্ন করে। শেরপুর অঞ্চলের কোচ জনগোষ্ঠী পুরাবিনি ধান দিয়ে নবান্ন উৎসব করে। নবান্ন উৎসবে গ্রামগঞ্জে আয়োজন করা হয় গ্রামীণ মেলার। হরেক রকম দোকান দিয়ে বসানো হয় গ্রামীণ মেলা। নবান্নের গ্রাম্য মেলায় আয়োজন করা হয় নানা ধরনের দেশীয় নৃত্য, গান, বাজনাসহ আবহমান বাংলার লাঠিখেলা, নাগরদোলা, পালাগান, লোকনাট্য, কেচ্ছা-কাহিনী, বাউল গানের আসর। নাচ আর গানে মুখরিত হয় মেলা প্রাঙ্গণ। প্রকৃতি আর পরিবেশের মধ্যে আত্মহারা হয়ে ওঠে বাঙালিমানস। পিঠা, মিষ্টি, সন্দেশ, মন্ডা-মিঠাই, খেলনা-পুতুল, বাঁশি, শখের চুড়ি, খৈ, মোয়া আর মাটি-বাঁশ-বেত কাঠের তৈরি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের পসরা বসে গ্রাম্য মেলা। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব শ্রেণী-পেশার মানুষের ঢল নামে এসব মেলায়। উৎফুল্ল দেখা যায় গ্রামের সহজ সরল মানুষকে। তবে গ্রামীণ মেলা এখন আর শুধু গ্রামেই হয় না, শহরেও বসে গ্রামীণ মেলা। রাজধানীতে বেশ কয়েকটি সংগঠন আলাদাভাবে অগ্রহায়ণের প্রথম দিন নবান্ন উৎসবের আয়োজন করে। এইসব মেলায় পাওয়া যায় বিভিন্ন ধরনের পিঠা, মিষ্টি, সন্দেশ, ম-া-মিঠাই। সেইসঙ্গে মাটির বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্র এ মেলায় চোখে পড়ে। এ উৎসব প্রাণভরে উপভোগ করে শহরের মানুষজন। অনেকে বাড়িতে পিঠাপুলির আয়োজন না করতে পারলে বছরে অন্তত একবার নবান্নের মেলায় গিয়ে পিঠাপুলির স্বাদ নেন। তখন হয়তো মনে পড়ে যায় ফেলে আসা দূর অতীতের কথা। যেখানে মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন সবাই একসাথে মিলে নবান্নের দিনে নানা ধরনের পিঠাসহ আয়োজন করা হয় সুস্বাদু খাবারের। সেই খাবারের বাহারি স্বাদের কথা মনে পড়লে এখনো উদ্বেলিত হয় মনোপ্রাণ। অবশ্যই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ষড়ঋতুর মধ্যে টের পাওয়া যাচ্ছে চারটি ঋতুর উপস্থিতি।
১৯৯৮ সাল থেকে রাজধানী ঢাকা শহরে আনুষ্ঠানিকভাবে উদযাপন শুরু হয়েছে নবান্ন উৎসব। জাতীয় নবান্নোৎসব উদযাপন পর্ষদ প্রতিবছর পহেলা অগ্রহায়ণ নবান্ন উৎসব উদযাপন করে। অগ্রহায়নের প্রথম প্রহরে গ্রাম বাংলার নতুন ধান ঘরে তোলার আনন্দ নাগরিক জীবনে ছড়িয়ে দিতেই পালিত হয় এই উৎসবটি। জাতীয় নবান্ন উৎসব উদযাপন পর্ষদ এবার এ উৎসবের আয়োজন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার বকুলতলায় ও ধানমন্ডি রবীন্দ্র সরোবর মুক্তমঞ্চে। সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদের উত্থান ঠেকাতে দিবসটি নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে উদযাপন করবে জাতীয় নবান্নোৎসব উদযাপন পর্ষদ।  নবান্ন এ উৎসব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার বকুলতলা ও ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরের মুক্ত মঞ্চে সকাল ৭ টা ১ মিনিটে শুরু হয়ে চলবে রাত ৯ টা পর্যন্ত। প্রবীণ সাংবাদিক তোয়াব খানের উদ্বোধনায় শুরু হওয়া উৎসবে দর্শকদের জন্য থাকবে সঙ্গীত, নৃত্য, আবৃত্তি, মানিকগঞ্জের চানমিয়ার দলের লাঠীখেলা, নড়াইলের নিখিল চন্দ্রের দলের পটগান, নেত্রকোনার দিলু বয়াতীর দলের মহুয়ার পালা, খুলনা ধামাইল, নবান্ন শোভাযাত্রা, আদিবাসী পরিবেশনসহ বিভিন্ন পরিবেশনা। আরো থাকবে ঢাক-ঢোলের বাদন আর মুড়ি-মুড়কি-বাতাসা ও পিঠার আয়োজন। উদযাপন পর্ষদের বিবৃতিতে বলা হয়, নবান্ন উৎসব বাঙালির চিরাচরিত প্রথা। সকল হিংসা ভুলে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়াই এ দিবস উদযাপনের মূল লক্ষ্য।
[এফএম]

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

রবি-সোমবার সব সরকারি কলেজে কর্মবিরতি

‘বিএনপি নির্বাচনে না আসলে অস্তিত্ব সংকটে পড়বে’

আনন্দ শোভাযাত্রার রুট ম্যাপ দেখে চলাচলের অনুরোধ ডিএমপির

‘হাইকোর্টে রুল নিষ্পত্তি না হওয়ায় আমারদেশ প্রকাশে বিলম্ব হচ্ছে’

সমঝোতা স্বাক্ষরের পরও রোহিঙ্গারা প্রবেশ করছে

কাউন্টারে টিকেট নেই, দ্বিগুণ দামে মিলছে ফেসবুকে!

৭ই মার্চের ভাষণের ইউনেস্কো স্বীকৃতি সরকারিভাবে উদযাপন আগামীকাল

‘প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য প্রমাণ করে তারা গুমের সঙ্গে জড়িত’

শপথ নিলেন মানাঙ্গাগওয়া

বাণিজ্য, জ্বালানী ও যোগাযোগ খাতে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা

‘বিএনপির ভোট পাওয়ার মতো এমন কোনো কাজের নিদর্শন নেই’

তাজরীন ট্র্যাজেডির ৫ বছর, শেষ হয়নি বিচার

দুই দফা জানাজা শেষে নেত্রকোনার পথে বারী সিদ্দিকীর মরদেহ

রোহিঙ্গা ফেরতের চুক্তি ‘স্টান্ট’: এইচআরডব্লিউ

‘আমি হতবাক’

ডাক্তাররা বেশ প্রভাবশালী ও তদবিরে পাকা: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী