প্রয়াত এম আর খানের সম্পত্তিতে দখলদারদের থাবা

শেষের পাতা

নূর মোহাম্মদ | ১৫ নভেম্বর ২০১৭, বুধবার
প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এম আর খানের সম্পত্তিতে দখলদারদের থাবা পড়েছে। তার প্রতিষ্ঠিত তিনটি প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রাল হাসপাতাল, নিবেদিকা নার্সিং হোম এবং মিরপুরে সম্প্রতি অনুমোদন পাওয়া সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (সিইউআইটি) দখল হয়ে গেছে। ধানমন্ডির তার ৬ তলা বাড়ি, সাতক্ষীরার বেশকিছু জমিও আছে দখলের তালিকায়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পুরো বিষয়টি তদন্ত করছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয় দখলের প্রমাণ মিলেছে। আর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন এখনো জমা হয়নি।
অভিযোগ উঠেছে, এম আর খানের সময় সেন্ট্রাল হাসপাতাল ও নিবেদিকা নার্সিং হোমের ব্যবস্থাপনায় থাকা ব্যক্তিরাই এসব সম্পত্তি দখল করেছে। বাবার সম্পত্তিতে প্রাপ্যতা না পেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন এম আর খানের মেয়ে ডা. ম্যান্ডি করিম। লিখিত অভিযোগে জানান, তার বাবার সম্পত্তিতে অধিকার না দিয়ে উল্টো নানা ধরনের হুমকি-ধমকি দেয়া হচ্ছে। এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে আলাদাভাবে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন। এ বিষয়ে ডা. ম্যান্ডি করিম মানবজমিনকে বলেন, আমি খুব ঝামেলায় আছি। এ বিষয়ে বলার মতো কোনো অগ্রগতি নেই। এ ব্যাপারে সেন্ট্রাল হাসপাতালের পরিচালক ডা. আবুল কাশেম মানবজমিনকে বলেন, ম্যান্ডি করিম এম আর খানের পালিত কন্যা। তিনি এখন স্যারের সম্পত্তির মালিকানা দাবি করছেন। স্যারের উত্তরাধিকার হিসেবে তার নাম কোনোদিন শুনিনি, দেখিনি বা জানিও না। আবুল কাশেম বলেন, আমরা তাকে সমাধানের জন্য বারবার ডেকেছি। কিন্তু তিনি আসেননি। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে গেছেন। তাই এ বিষয়ে আর কিছু বলতে চাই না।
গত বছর নভেম্বরে এম আর খান মারা যাওয়ার পর তার সম্পত্তি দখলের পাঁয়তারা শুরু হয়। এরমধ্যে তার মেয়ে কানাডা থেকে দেশে আসেন। প্রায় ৬ মাসের সুযোগে তার পুরো সম্পত্তি বেদখল হয়ে যায়। তার মেয়ে এসে সম্পত্তির খোঁজখবর নেয়া শুরু করলেই তাকে দত্তক মেয়ে বলে প্রচার শুরু করে এবং তাকে কোনো হিসাব দেখায়নি তারা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে বিশ্ববিদ্যালয় দখলের বিষয়টি তদন্ত করে ইউজিসি। ইউজিসির সদস্য প্রফেসর ইউসুফ আলী মোল্লা, প্রফেসর আখতার হোসেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব বেলায়েত হোসেন তালুকদারসহ ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি উভয়পক্ষের বক্তব্য নিয়ে একটি প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে, এম আর খানের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে এই বিশ্ববিদ্যালয় নতুন ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করে এবং তা জবরদখল করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
তদন্ত প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের মার্চে অনুমতি পায় এই বিশ্ববিদ্যালয়টি। প্রতিষ্ঠাকালীন ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয় ডা. এম আর খানকে। ১৬ সদস্যের বিওটিতে ছিলেন মোয়াজ্জেম হোসেন, প্রফেসর ড. আমিনুল ইসলাম, বুয়েটের শিক্ষক প্রফেসর এম কায়কোবাদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর ফরিদ উদ্দিন আহমেদ, ড. মফিজুর রহমান, প্রফেসর এবিএম মফিজুর রহমান, প্রফেসর গাজী মাহবুবুল আলম, হাদিস উদ্দিন, নিজাম উদ্দিন, এনায়েত হোসেন গাজী, ইলোরা পারভীন, শেখ আশরাফুল কবির, ড. আলাউদ্দিন আহমেদ, ইঞ্জিনিয়ার আবুল কালাম আজাদ, ইঞ্জিনিয়ার হোসনে আরা সেলিম এবং সদস্য সচিব ছিলেন গাজী এমএ সালাম। গত বছর ৫ই নভেম্বর ডা. এম আর খান মারা যাওয়ার পর ১২ই ডিসেম্বর পূর্বের বিওটি সদস্য গাজী মাহবুবুল আলমকে চেয়ারম্যান এবং গাজী এমএ সালামকে সদস্য সচিব করে ৯ সদস্যের নতুন ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়। বাকি ৬ জনকে পদত্যাগ দেখানো হয়। প্রতিবেদনে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, বিওটি থেকে পদত্যাগ করা ছয়জন ইঞ্জিনিয়ার হোসনে আরা বেগম, নিজাম উদ্দিন, শেখ আশরাফুল কবির, ইলোরা পারভীন, ডা. এবি মফিজুল ইসলাম, ডা. আলাউদ্দিন আহমেদের পদত্যাগের তারিখ একাধিক দিন হলেও পদত্যাগের কারণ ও ভাষা প্রায় একই। এছাড়া তাদের ঠিকানা না থাকায় তাদের সঙ্গে কথা বলা বা তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। আর বর্তমানের বিওটি গঠনের আগে পূর্বের বিওটির সদস্যদের আনুষ্ঠানিক জানানো হয়নি, কোনো সভা করার কথা থাকলেও করা হয়নি। তাই নতুন বিওটি গ্রহণযোগ্য নয়। এ প্রসঙ্গে ম্যান্ডি করিম কমিটির কাছে জানান, গাজী এমএ সালাম এবং গাজী মাহবুবুল আলম দুই ভাই আমার বাবার অসুস্থতা ও সরলতার সুযোগ নিয়ে তার কাছ থেকে প্রায় ৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। বাবা মারা যাওয়ার পর এই দুই ভাই মিলে নতুন বিওটি গঠন করেছে। নতুন বিওটিতে আমার পরিবারের কাউকে রাখা হয়নি। অসুস্থতার সময় এম আর খান বিওটির চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং বুয়েটের শিক্ষক প্রফেসর কায়কোবাদকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন। কিন্তু মঞ্জুরি কমিশন তদন্ত করে উল্টো তথ্য পেয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পদত্যাগপত্রে এম আর খানের যে স্বাক্ষর রয়েছে তা অসুস্থাবস্থায় করা এবং তার স্বাক্ষরটি আদৌ তার কিনা তা বিশেষজ্ঞ দিয়ে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কমিটিতে প্রফেসর কায়কোবাদ জানান, সম্পত্তি সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না। ২০১৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের সময় তার নাম অন্তর্ভুক্তি, পরবর্তীতে তার পদত্যাগ এবং তিনি বোর্ড অব ট্রাস্টিজের জটিলতা সম্পর্কে অবগত নন। একই ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ডিন এবং বর্তমানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ফরিদ উদ্দিন আহমেদের ক্ষেত্রেও। তাকে প্রতিষ্ঠাকালীন বিওটি রাখা হয়েছে অনুমতি না নিয়েই। দ্বিতীয় বিওটিতে তাদের বাদও দেয়া হয়েছে না জানিয়ে। এ ব্যাপারে ফরিদ উদ্দিন আহমেদ তদন্ত কমিটিকে জানান, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
এ ব্যাপারে প্রফেসর ফরিদ উদ্দিন আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টরা নেই। এম এ সালাম ও মাহবুবুল আলম তাদের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে আমার নাম ব্যবহার করতো। আমি জানার পর নিষেধ করেছি। এখন শুনছি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাকে বিওটি সদস্য করা হয়েছে এবং আমি পদত্যাগও করেছি। এটাকে প্রতারণার শামিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সব অভিযোগের ব্যাপারে গাজী মাহবুবুল আলম ও গাজী এমএ সালাম তদন্ত কমিটিকে জানান, এম আর খান এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো বিনিয়োগ করেননি। এডভান্স ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান এ ইউনিভার্সিটির মূল উদ্যোক্তা। এই ফাউন্ডেশন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ১৬ সদস্যবিশিষ্ট বিওটি গঠনের ক্ষমতা দেয়। তারা এম আর খানের কাছ থেকে কোনো টাকা নেননি। প্রচলিত আইন অনুযায়ী ট্রাস্টি ডিড সম্পাদন হয়েছে বলে জানান তারা। নতুন বিওটি গঠনের ব্যাপারে তারা বলেন, নতুন বিওটি গঠনের একাধিক সভা হয়েছে এর কার্যবিবরণী রেজুলেশন করা হয়েছে। প্রতিটি মিটিংয়ে কোরাম পূরণ করা হয়েছে। কায়কোবাদ ও ফরিদ উদ্দিনের ব্যাপারে তারা জবাব দেন, বেশিরভাগ মিটিংয়ে তারা উপস্থিত ছিলেন।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

বিএনপিকে ভোট দিয়ে অশান্তি ফিরিয়ে আনবে না জনগণ: প্রধানমন্ত্রী

অভিযোগ মিথ্যা এতিমখানার টাকা আত্মসাৎ করিনি

আরো ব্লগার হত্যার হিটলিস্ট

আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে মামলা, অতঃপর...

ফের বেড়েছে বিদ্যুতের দাম

চাহিদা নেই, তবুও রাজউকের নতুন ফ্ল্যাট প্রকল্প

‘আনিসুল হককে নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা ভিত্তিহীন’

মৌলভীবাজারে গ্রাহকের কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা ভিডিএন চেয়ারম্যান ও এমডি

সিলেটে জামায়াতের ‘স্বতন্ত্র প্রার্থী’, জল্পনা

সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ

রোহিঙ্গা জাতি নিধনের তুমুল সমালোচনা যুক্তরাষ্ট্রের

‘আমি হতবাক’

ডাক্তাররা বেশ প্রভাবশালী ও তদবিরে পাকা: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

যশোর জেলা স্পেশাল জজের বিরুদ্ধে ঘুষ নেয়ার অভিযোগ

রোহিঙ্গা শব্দ ব্যবহার না করতে বলা হলো পোপকে

অসুস্থ রাজনীতি বাংলাদেশকে গ্রাস করছে: ড. কামাল হোসেন