নিজেদের ‘সাধু’ দাবি করলো মিয়ানমারের সেনাবাহিনী

বিশ্বজমিন

মানবজমিন ডেস্ক | ১৪ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ৫:৫৬
রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো নৃশংসতা অভিযোগ তদন্তে নিজেদের ‘সাধু’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। কোনো রোহিঙ্গাকে হত্যা, গ্রাম পুড়িয়ে দেয়া, নারী ও যুবতীদের ধর্ষণ, তাদের সহায় সম্পদ কেড়ে নেয়ার অভিযোগ কোনোটিতেই সেনাবাহিনী জড়িত নয় বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও দেশ এমন নৃশংসতার জন্য মিয়ানমারের সেনাবাহিনী জড়িত বলে প্রামাণ্য আকারে এর আগে তথ্য উপস্থাপন করেছে। কিন্তু জাতিসংঘের নির্যাতিত একজন সিনিয়র কর্মকর্তা রোববার মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সেনাবাহিনী গণ হারে নারী, যুবতী ও বালিকাদের ধর্ষণ করেছে। মানবতার বিরুদ্ধে আরো অনেক অপরাধ করেছে।
ওদিকে বিবিসি বলছে, তাদের হাতে যে প্রমাণ আছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তার বিপরীতে কথা বলছে। তাছাড়া জাতিসংঘ মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ওপর এই নৃশংসতাকে জাতি নিধন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ফলে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ওই ‘সাধু’ সাজার রিপোর্টকে ‘হোয়াইট ওয়াস’ বা চুনকাম বলে আখ্যায়িত করেছে অ্যামনিেস্ট ইন্টারন্যাশনাল। ওদিকে, এরই মধ্যে রাখাইন রাজ্যের ওয়েস্টার্ন কমান্ড প্রধান মেজর জেনারেল মুয়াং মুয়াং সোই’কে তার পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। কেন এমনটা করা হয়েছে সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হয় নি। তাকে বর্তমানে পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে কোনো পদে রাখা হয় নি। তাকে ‘রিজার্ভ’ করে রাখা হয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মনস্তস্ত¡ ও জন সম্পর্ক বিষয়ক বিভাগের উপ পরিচালক মেজর জেনারেল আয়ে লুইন বলেছেন, কি কারণে তাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে তিনি তা জানেন না।

মানবাধিকার বিষয়ক বিভিন্ন সংগঠন থেকে রাখাইনে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডারর্সদের প্রবেশের অনুমতি দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এখনও ওই এলাকায় মিডিয়া তথা সাংবাদিকদের প্রবেশ ভীষণ কড়াকড়ি রয়েছে। তবে দক্ষিণ-পূর্ব এুিশয়া বিষয়ক বিবিসির সাংবাদিক জনাথন হেড দেখেছেন, স্থানীয় বৌদ্ধরা সশস্ত্র পুলিশের সামনে রোহিঙ্গাদের গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে। ২৫ শে আগস্ট নৃশংসতা শুরুর পর বিশ্ব দেখেছে কিভাবে নিরীহ রোহিঙ্গাদের ওপর বৌদ্ধরা, সেনাবাহিনী সহ স্থানীয় নিরাপত্তা রক্ষীরা বর্ণনার অতীত বর্বরতা চালিয়েছে। তখন মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা বুক ফুলিয়ে বলেছেন, তারা সন্ত্রীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছেন। এ নিয়ে সারা বিশ্ব যখন ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে তখন ১৯ শে সেপ্টেম্বর প্রায় এক মাস পরে ঘুম ভাঙে অং সান সুচির। তিনি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। কিন্তু তার মুখ থেকে মানুষ যা শুনতে চেয়েছিল, তিনি তা বলেন নি। তিনি যেন সেনাবাহিনীর মুখপাত্র হয়েই সেদিন কথা বলেছেন। বিশ্বের ক্রমাগত চাপ ও নিন্দার ফলে সেনাবাহিনী তাদের মতো করে একটি তদন্ত করে। সেই তদন্ত রিপোর্টে তারা নিজেদেরকে ‘তুলসি ধোয়া’ নিরপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তারা বলেছে, নিরাপত্তা বাহিনী তথা সেনাবাহিনী কোনো ‘নিরপরাধ গ্রামবাসীর’ ওপর গুলি চালায় নি। নারীদের বিরুদ্ধে কোনো যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণ করে নি। গ্রামবাসীকে গ্রেপ্তার বা প্রহার বা তাদেরকে হত্যা করে নি। তারা কোনো স্বর্ণালংকার, যানবাহন, গ্রামবাসী পশু সম্পদ কিছুই চুরি করে নি। তারা মসজিদে আগুন দেয় নি। তারা রোহিঙ্গা গ্রামবাসীকে হুমকি দেয় নি। তাদের প্রতি কোনো আঘাত করে নি। গ্রাম থেকে বের করে দেয় নি। বাড়িঘরে আগুন দেয় নি। অবাক করা তদন্ত রিপোর্ট। তাহলে রাখাইনে ওইসব নৃশংসতা করলো কারা! সেনাবাহিনীর পোশাক পরা, হেলমেট পরা, হাতে অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে গুলি করলো কারা! যুবতীদের ধর্ষণ করে রাস্তার ওপর নগ্ন করে ফেলে তাদের হাত, পা, স্পর্শকাতর অঙ্গগুলো কাটলো কারা! তারপর ওই যুবতীর গলায় ছুরি বসিয়ে তার মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করলো কারা! কাদের হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছোড়া হলো! কারা বললো- রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের জাতি নয়। তারা বাঙালি। বাংলাদেশ থেকে সেখানে গিয়েছে! এতগুলো প্রশ্নের উত্তর নেই সেনাবাহিনীর ওই রিপোর্টে। এসব নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে সংবাদ মাধ্যমে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স, বিবিসি সহ বিভিন্ন মিডিয়ায় এ নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, রাখাইনে সব নৃশংসতার জন্য দায়ী করা হয়েছে মমিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে। এ বিষয়ে সেনাবাহিনী আভ্যন্তরীণভাবে নিজেদের মতো একটি অনুসন্ধান করেছে। এরপর মিয়ানমারের সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের ফেসবুক পেজে তা পোস্ট করা হয়েছে। বুধবার মিয়ানমার সফরে যাওয়ার কথা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসনের। মিয়ানমারে শীর্ষ সেনা কর্মকর্তা, যাদের ওপর জাতীয় নেত্রী অং সান সুচির নিয়ন্ত্রণ নেই বললেই চলে, তাদের প্রতি তিনি কড়া বার্তা দেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঠিক এর আগেই নিজেদের ‘নির্দোষ’ হিসেবে তুলে ধরেছে সেনাবাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র কাতিনা এডামস বলেন, রাখাইনে ক্লিয়ারেন্স অপারেশনস-এর প্রধান মেজর জেনারেল মুয়াং মুয়াং সোইকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেয়ার বিষয়ে অবহিত যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু মিয়ানমারের নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী ও তাদের দোসররা অব্যাহতভাবে নৃশংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করে চলেছে। এতে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এসব অপরাধের জন্য দায়ীদের অবশ্যই বিচার করতে হবে। ওদিকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও ভ্রমণ বিষয়েক অবরোধ আরোপের দাবিতে একটি প্রস্তাব পাশের জন্য ওয়াশিংটনকে চাপ দিচ্ছেন সেখানকার আইন প্রণেতারা। সোমবার গার্ডিয়ান পত্রিকায় মতামত কলামে নিবন্ধ লিখেছেন রিপাবলিকান প্রতিনিধি স্টিভ চ্যাবোট ও ডেমোক্রেট দলের প্রতিনিধি জোসেফ ক্রাউলি। তাতে তারা বলেছেন, অবরোধ আরোপের এখনই প্রত্যাশিত সময়। এক্ষেত্রে তাদেরকে পরিষ্কার বার্তা দিতে হবে। জানিয়ে দিতে হবে সাধারণ মানুষকে দমনপীড়নে নিষ্ঠুরতা, অত্যধিক ও ভয়াবহ বৈষম্যমুলক অবস্থান নেয়ার কোনো অজুহাত থাকতে পারে না। উল্লেখ্য, মিয়ানমার একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ দেশ। এ দেশটি বার্মা নামেও পরিচিত। তারা রোহিঙ্গাদেরকে দেখে থাকে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অবৈধ অভিবাসী হিসেবে। ওদিকে ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় এশিয়া অঞ্চলের নেতারা যোগ দিয়েছেন এক সম্মেলনে। সেখানে যোগ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পও।অ কিন্তু ওই সম্মেলন থেকে রোহিঙ্গা ইস্যুটি বাদ রাখা হয়েছে। এতে মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপগুলো হতাশ। কারণ, তারা আশা করছিলেন এই সম্মেলন থেকে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হবে। কিন্তু তা হয় নি। ওদিকে বার্তা সংস্থা রয়টার্স লিখেছে, মেজর জেনারেল মুয়াং মুয়াং সোইয়ের বদলি আদেশ দেয়া হয় শুক্রবার। তার পরিবর্তে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সোই টিন্ট নাইংকে ওয়েস্টার্ন কমান্ডের নতুন প্রধান নিয়োগ দেয়া হয়। তিনটি বিভাগের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে ওয়েস্টারন কর্মান্ড। এই কমান্ডের ওপর নজারদারি করে ব্যুরো অব স্পেশাল অপারেশনস। তারা রিপোর্ট করে মিন অং হ্লাইং। মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের হাই কমিশনার জায়েদ রাদ আল হোসেন রাখাইনে সেনাবাহিনীর অভিযানকে জাতি নিধন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে সেনাবাহিনী দাবি করে, আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মির (আরসা) চালানো সনত্রাসী হামলার পর জাতীয় নিরাপত্তার জন্যই তাদের ক্লিয়ারেন্স অপারেশনস চালানো প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। এ বিষয়ে সেনাবাহিনীর নিজস্ব তদন্তে দেখানো হয়েছে বিভিন্ন হামলায় ১০ হাজারের বেশি ‘সন্ত্রাসী’ জড়িত। ওদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে যৌন সহিংসতা বিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ প্রতিনিধি প্রামিলা প্যানে ঢাকায় বলেছেন, তিনি মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে অভিযোগ করবেন। কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে তিন দিনের সফর শেষে তিনি বলেছেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যৌন সহিংসতা ঘটিয়েছে। এ ঘটতে সহায়তা করেছে। তারা ধর্ষণ করেছে। গণহত্যার একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে।  ওদিকে বিবিসির সাংবাদিক জনাথন হেড বলছেন, এর আগেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্ত হয়েছে। সেই তদন্ত করেছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। তাতে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসার আশা খুবই ক্ষীণ। এবারও তদন্তে বড় কোনো পরিবর্তন নেই। সেনাবাহিনী যে তদন্ত করেছে তা একেবারেই সংকীর্ণ। তদন্তকারীরা কি প্রশ্ন করবেন তাও বলে দেয়া হয়েছিল। তাদেরকে বলে দেয়া হয়েছিল, সেনাবাহিনী কি আচরণ বিধি লঙ্ঘন করেছিল কিনা, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দেয়া কমান্ড তারা অনুসরণ করেছিল কিনা এসব জানতে বলা হয়।


এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

২০১৮ সালে প্রবল ভুমিকম্পের আশঙ্কা!

কেয়া চৌধুরী এমপি’র উপর হামলার ঘটনায় মামলা

বাংলাদেশের রাজনীতি, বিকাশমান মধ্যবিত্ত এবং কয়েকটি প্রশ্ন

ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতাতে আহত ডিবি পুলিশ

প্রতিবেশীদের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকা জরুরীঃ বাংলাদেশকে মিয়ানমার

তারেক রহমানের জন্মদিন পালন করবে বিএনপি

রোহিঙ্গা শিবিরে যেতে চান প্রণব মূখার্জি

তালাকপ্রাপ্ত নারীকে অপহরণের পর গণধর্ষণ

আরো ১০ দিন বন্ধ থাকবে লেকহেড স্কুল

জাতিসংঘকে দিয়ে রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধান হবে নাঃ চীন

ম্যনইউয়ের টানা ৩৮

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সংলাপে সহায়তা করতে আগ্রহী চীন

জল্পনার অবসান ঘটালেন জ্যোতি

চীনের বেইজিংয়ে অগ্নিকাণ্ড, নিহত ১৯ আহত ৮

সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত এমপি গোলাম মোস্তফা আহমেদ

বিশ্ব সুন্দরীর মুকুট মানসী চিল্লার-এর