গর্ভকালীন ডায়াবেটিস শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার তাগিদ

শরীর ও মন

ডা. শাহজাদা সেলিম | ১৪ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার
প্রতি বছর ১৪ই নভেম্বর পৃথিবীব্যাপী বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস পালিত হয়। ওহঃবৎহধঃরড়হধষ উরধনবঃবং ঋবফধৎধঃরড়হ (ওউঋ) এর উদ্যোগে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এ বছর  দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় হলো “নারী ও ডায়াবেটিস : স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যৎ আমাদের অধিকার”। ওউঋ-অতি বিচক্ষণতার সঙ্গে প্রতিপাদ্যা বিষয়টি ঠিক করেছে, কেননা ডায়াবেটিস পৃথিবীব্যাপী একটি ব্যাপক জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। বর্তমানে পৃথিবীতে মোট ডায়াবেটিস রোগীর কমপক্ষে ১৬ দশমিক ২ শতাংশ শুধুমাত্র গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে এ হার মোট ডায়াবেটিস রোগীর ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
বাংলাদেশে এর চেয়ে বেশিও হতে পারে। প্রায় ১৯৯ মিলিয়ন নারী ২০১৬ সালে ডায়াবেটিস আক্রান্ত ছিলেন। যা ২০৪০ সালে ৩১৩ মিলিয়নে উন্নীত হবে। অন্য দিকে প্রতি ৫ জনে ২ জন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মহিলা প্রজনন সময়কালের মধ্যে আছেন। যা প্রায় ৬০০ মিলিয়ন। প্রতি বছর ২ দশমিক ১ মিলিয়ন (২১ লাখ) মহিলা শুধুমাত্র ডায়াবেটিসের কারণে মৃত্যুবরণ করেন। যেসব মহিলার ডায়াবেটিস আছে তাদের হার্ট অ্যাটাক ও এ ধরনের হৃদরোগ হওয়ার ঝুঁকি, যাদের ডায়াবেটিস নেই তাদের তুলনায় ১০ গুণ বেশি। আর যাদের টাইপ-১ ডায়াবেটিস আছে তাদের গর্ভস্থ সন্তান নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। প্রতি ৭টি প্রসবের মধ্যে ১টি মায়ের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস দ্বারা আক্রান্ত। এর অর্ধেকেরই বেশি ৩০ বছরের কম বয়সী  প্রসূতিদের ক্ষেত্রে ঘটে। যাদের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস আছে পরবর্তী ৫ বছরের মধ্যে এদের অর্ধেকেরও বেশি টাইপ-২ ডায়াবেটিস আক্রান্ত হবেন, অধিকাংশ গর্ভকালীন ডায়াবেটিস আক্রান্ত মহিলার বসবাস অনুন্নত দেশগুলতে। অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে তো বটেই উন্নত দেশেও গর্ভবতীর ডায়াবেটিস তার নিজের ও গর্ভস্থ শিশুর জন্য ব্যাপক ঝুঁকির কারণ। আর বাংলাদেশ-এর মত দেশগুলোতে উন্নয়ন লক্ষমাত্রা অর্জনের অন্যতম বাধা হল জনস্বাস্থ্য ক্ষেত্রে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস ও এর কারণে বর্ধিত মাতৃ মৃত্যু। তাই ওউঋ যতটুকু উদ্যোগ নিয়েছে তার চেয়ে বহুগুণ উদ্যোগ বাংলাদেশে অতি জরুরি ভিত্তিতে নেয়া উচিত। এ বছর ওউঋ কিছু নির্দেশনা দিয়েছে। এগুলো হলো- রাষ্টীয় চিকিৎসা সেবা ব্যবস্থাপনার সর্বস্তরে নারীদের বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। ডায়াবেটিস আক্রান্ত মহিলাদেরও পর্যাপ্ত অত্যাবশ্যকীয় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা সুনিশ্চিত করতে হবে। এর মধ্যে চিকিৎসা উপাদান (ওষুধপত্র, যন্ত্রপাতি) ডায়াবেটিস চিকিৎসা বিষয়ক শিক্ষা এবং প্রয়োজনীয় ফলো-আপ ব্যবস্থাপনা। যারা ডায়াবেটিস নিয়ে সন্তান ধারণ করতে চাচ্ছেন, তাদের জন্য সকল পক্ষীয় (সন্তান প্রসব আকাঙ্ক্ষী নারী, সেবাদানকারী সংস্থা সমূহ এবং রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা কাঠামো) উদ্যোগ নিতে হবে যাতে গর্ভধারণের আগে থেকেই গর্ভধারণ ও গর্ভকালীন সময়ের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক ও যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সকল বালিকা ও নারীর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণের নিমিত্তে প্রয়োজনীয় শারীরিক শ্রম সমপাদনের উৎসাহ দিতে হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। ডায়াবেটিস প্রতিরোধ নীতিমালা ও পরিকল্পনায় নারীদের সুস্বাস্থ্য ও পুষ্টি এবং প্রাক-গর্ভকালীন ও গর্ভকালীন এবং নবজাতকের ও শৈশবকালীন পুষ্টিকে প্রাধান্য দিতে হবে। গর্ভকালীন সেবা আদর্শ মাত্রায় উন্নীত করার জরুরি পদক্ষেপ নেয়া উচিত। বিশেষ করে এতে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া তাগিদ থাকতে হবে। গর্ভকালীন ডায়াবেটিস শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় মহিলা ও প্রসূতি সেবাদানকারী সকল প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলা জরুরি। নিয়মিত স্বাস্থ্য সেবা দানকারীদের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস শনাক্তকরণ ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রে প্রেরণের শিক্ষা দিতে হবে। সকল নারীর গর্ভকালীন দ্রুত ডায়াবেটিস স্কিনিং, ডায়াবেটিস সংক্রান্ত শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা বিশেষ গুরুত্ব সহকারে নিশ্চিত করতে হবে। মহিলা ও বালিকারাই আগামী দিনের সুস্বাস্থ্যময় জনগোষ্ঠী তৈরির প্রধানতম ক্রীড়নক। যেহেতু প্রায় ৭০ শতাংশ টাইপ-২ ডায়াবেটিস যথোপযুক্ত পদক্ষেপ নিয়ে প্রতিরোধ সম্ভব। প্রাপ্ত বয়স্কদের ৭০ শতাংশ মৃত্যু বয়ঃসন্ধি কালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া জীবনযাপন সংক্রান্ত জটিলতা দ্বারা সৃষ্ট এবং নারী, মা হিসেবে এসব রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে তার ব্যাপক প্রভাব থাকবে। গবেষণালব্ধ ফলাফলের ভিত্তিতে এটি জানা গেছে যে, মা সমপদের উপরে, খাদ্যের উপরে, শিশু বিকাশে পুষ্টির উপরে এবং তাদেরর শিক্ষার উপরে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি। অন্যভাবে বলা যায়, পরিবারের সদস্যদের পুষ্টি ও জীবনযাপন নিয়ন্ত্রণের প্রধান সঞ্চালক হলেন মা। সেজন্য তার (বালিকার, নারীর) সঠিক শিক্ষা ও সমপদের সকল ক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় অধিকারে মা এর কর্তৃত্ব স্থাপনের যথাযথ সুযোগ থাকতে হবে। বালিকা ও নারীর সুস্বাস্থ্য, স্বাভাবিক নীরোগ শারীরিক কাঠামো তৈরিতে উদ্যোগী হতে হবে। “নারী ও ডায়াবেটিস, স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যৎ আমাদের অধিকার” এটি শুধু ডায়াবেটিস বিষয়ক কোনো চিন্তাা-ভাবনা নয়, বরং সামগ্রিক সু-স্বাস্থ্যর অধিকারী জনগোষ্ঠী তৈরীতে প্রাথমিক, ব্যাপক বিস্তারিত এবং অনায়াসে পদক্ষেপ গ্রহণ সম্ভব এমন একটি দিক নির্দেশনা। ওহঃবৎহধঃরড়হধষ উরধনবঃবং ঋবফধৎধঃরড়হ (ওউঋ) গর্ভকালীন ডায়াবেটিসকে অন্য অসংক্রামক রোগগুলোর কাতারে ফেলতে নারাজ। কেননা গর্ভকালীন ডায়াবেটিস গর্ভবতীকে আক্রান্ত করছে কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে গর্ভস্থ শিশুর, অর্থাৎ সরাসরি রোগটি সংক্রামক না হলেও এর সদূরপ্রসারিত ক্ষতিকর প্রভাব আক্রান্ত করছে পরবর্তী প্রজন্মকে, শুধু তাই নয় এই শিশুটির ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস (টাইপ-২) হওয়ার সম্ভাবনা তার সমসাময়িকদের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি। এটাকে মনে রেখেই স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারী, বিশেষ করে ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ প্রসূতিবিদ্যা বিশেষজ্ঞ, নবজাতক ও শিশু-রোগ বিশেষজ্ঞ এবং সর্বোপরি রাষ্টীয় ব্যাপক উদ্যোগ আসু  কাম্য। এবারের বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসকে সামনে রেখে হলেও প্রচারে মাধ্যমগুলো (টিভি চ্যানেল, পত্রিকা) ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টির পদক্ষেপ নিতে পারে। সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে ডায়াবেটিস গর্ভধারণ প্রক্রিয়া, গর্ভকালীন পরিচর্যা, ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ইত্যাদি বিষয় বোধগম্যভাবে উপস্থাপনা করতে পারলে দীর্ঘস্থয়ী ফল পাওয়া যাবে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

বিএনপিকে ভোট দিয়ে অশান্তি ফিরিয়ে আনবে না জনগণ: প্রধানমন্ত্রী

অভিযোগ মিথ্যা এতিমখানার টাকা আত্মসাৎ করিনি

আরো ব্লগার হত্যার হিটলিস্ট

আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে মামলা, অতঃপর...

ফের বেড়েছে বিদ্যুতের দাম

চাহিদা নেই, তবুও রাজউকের নতুন ফ্ল্যাট প্রকল্প

‘আনিসুল হককে নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা ভিত্তিহীন’

মৌলভীবাজারে গ্রাহকের কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা ভিডিএন চেয়ারম্যান ও এমডি

সিলেটে জামায়াতের ‘স্বতন্ত্র প্রার্থী’, জল্পনা

সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ

রোহিঙ্গা জাতি নিধনের তুমুল সমালোচনা যুক্তরাষ্ট্রের

‘আমি হতবাক’

ডাক্তাররা বেশ প্রভাবশালী ও তদবিরে পাকা: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

যশোর জেলা স্পেশাল জজের বিরুদ্ধে ঘুষ নেয়ার অভিযোগ

রোহিঙ্গা শব্দ ব্যবহার না করতে বলা হলো পোপকে

অসুস্থ রাজনীতি বাংলাদেশকে গ্রাস করছে: ড. কামাল হোসেন