হিজবুল্লাহই টার্গেট

এক্সক্লুসিভ

মোহাম্মদ বাজি | ১৩ নভেম্বর ২০১৭, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ৬:২৮
৪ঠা নভেম্বর লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি যখন সৌদি আরব সফরে গিয়ে পদত্যাগের ঘোষণা দেন, পুরো দেশ যেন চমকে ওঠে। হারিরি বলেন, গুপ্তহত্যার শিকার হতে পারেন আশঙ্কায় তিনি দেশ ছেড়েছেন। নিজের পদত্যাগের দায় তিনি চাপান ইরান ও লেবাননে দেশটির প্রধান মিত্র হিজবুল্লাহর  ওপর। এর পরদিন থেকেই সৌদি আরব অভিযোগের আঙুল উঠাতে শুরু করে হিজবুল্লাহর প্রতি। দেশটি লেবানন থেকে নিজ নাগরিকদের অবিলম্বে দেশে ফেরত যাওয়ারও নির্দেশ দেয়। শীর্ষস্থানীয় সৌদি কর্মকর্তাদের ক্রমাগত হুমকির কারণে ছোট দেশ লেবাননে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে।

আকারে ছোট হলেও, লেবাননের সমস্যা বেশ জটিল। জাতিগত বৈরিতা এখানে প্রকট। ক্ষমতা ভাগাভাগির চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে অনেকবার। দেশটিতে বিদেশিদের হস্তক্ষেপের ইতিহাসও বেশ পুরনো।
২০১১ সালের আরব বসন্তের পর মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে উত্তাল অবস্থা সৃষ্টি হলেও, কোনো এক অদ্ভুত কারণে লেবাননে তার আঁচ পড়েনি। এমন কি লেবাননের বৃহৎ প্রতিবেশী সিরিয়ায় যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লেও লেবানন অক্ষতই ছিল। এই শান্ত নিরুদ্বেগ পরিবেশ এখন হুমকির মুখে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন, সৌদি আরব ও দেশটির সুন্নি মিত্ররা টার্গেট নির্ধারণ করে ফেলেছে। হিজবুল্লাহ ও সংগঠনটির পৃষ্ঠপোষক ইরান।
কিন্তু নতুন করে কেন সংঘাতের ঝুঁকি নিতে গেলেন সৌদি নেতারা? তারা মনে করছেন, ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদের অন্যতম হিজবুল্লাহকে টার্গেট করলে ওয়াশিংটনকেও পাশে পাওয়া যাবে। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার হিজবুল্লাহর প্রতি ইরানের সমর্থনের বিষয়টি সামনে এনে সমালোচনা করেছেন। ওয়াশিংটন হিজবুল্লাহকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করে।
কিন্তু সৌদি আরবও ক্লান্ত। ইয়েমেনে শিয়া হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে দেশটির যুদ্ধ শেষই হচ্ছে না। কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক বিরোধ এখনো স্থবির অবস্থায় পড়ে আছে। এমন পরিস্থিতিতে সৌদি নেতারা যদি ভেবে থাকেন, হিজবুল্লাহকে টার্গেট করে সহজ জয় পাওয়া যাবে, তবে তা হবে আরেকটি ভুল সিদ্ধান্ত। মধ্যপ্রাচ্যের বিপজ্জনক অগ্নিদাহ্য পরিবেশকে তা আরো উস্কে দেবে।
২০১৬ সালের শেষে লেবাননে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠিত হলে তার অংশ হয় হিজবুল্লাহও। এই সরকারের প্রধানমন্ত্রী হন সাদ হারিরি। ইরান ও সৌদি আরব- উভয়েই ওই সরকার মেনে নেয়।
হিজবুল্লাহও চুক্তিতে সম্মত হয়। কারণ, তখন তারা লেবাননে নতুন করে সংঘাত না বাধিয়ে, নিজেদের শক্তি সিরিয়ায় ব্যয় করতে আগ্রহী ছিল। সিরিয়ায় হিজবুল্লাহ প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ সরকারের পক্ষে লড়ে। সাদ হারিরির সঙ্গে পশ্চিম ও সুন্নি আরব দেশগুলোর সম্পর্ক ছিল বেশ ভালো। ফলে হারিরি প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় হিজবুল্লাহ এক ধরনের রাজনৈতিক আচ্ছাদনে লেবাননে নিজেদের আধিপত্য বহাল রাখে। সিরিয়ার যুদ্ধে হিজবুল্লাহর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এই যুদ্ধে আসাদের জয় সবাই প্রকারান্তরে মেনেই নিয়েছে। তাই হিজবুল্লাহ এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি শক্তিশালী।
কিন্তু হারিরি পদত্যাগ করায় ছক উল্টে গেছে। লেবাননের বর্তমান হারিরিবিহীন সরকার যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের মুখে পড়তে পারে। এমনকি যুদ্ধ বেধে যেতে পারে প্রতিবেশী ইসরাইলের সঙ্গে। সৌদি আরব ও সুন্নি আরব দেশগুলোও অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করতে পারে লেবাননের ওপর। নিশ্চিতভাবেই এতে লেবাননে অস্থিতিশীলতা তৈরি হবে, যা সামলানোর দায় পড়বে হিজবুল্লাহর ওপর।
আশির দশকে প্রতিষ্ঠিত হয় হিজবুল্লাহ। তখন লেবাননে গৃহযুদ্ধ আর ইসরাইলের দখলদারিত্ব চলছিল। আর এখন হিজবুল্লাহ দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি। সৌদি নেতৃত্ব ও ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এটি ভাবা বাস্তবিক হবে না যে, সামান্য কাঁপুনি দিয়ে, বা প্রলয়ঙ্করী ক্ষতিসাধন না করেই, বিদেশি সামরিক বাহিনী দিয়ে হিজবুল্লাহকে নিঃশেষ করে দেয়া যাবে।
সৌদি আরবের নতুন শাসক বাদশাহ সালমান ও তার ছেলে উত্তরাধিকারী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান আগের যেকোনো সৌদি শাসকের চেয়ে আক্রমণাত্মক বৈদেশিক নীতি অনুসরণ করছেন। ইরানের সঙ্গে সংঘাতে ট্রাম্পের সমর্থন পেয়ে তারা আরো সাহস পেয়েছেন। সিরিয়ায় যেহেতু ইরানের মিত্র আসাদ কার্যত জিতেই গেছেন, সৌদি আরব তাই অন্যত্র ইরানের প্রভাব রুখতে চায়। লেবানন হলো এক্ষেত্রে লক্ষ্যবস্তু।
ইরাকি শিয়াদের একটি অংশের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করতে পেরেছে সৌদি আরব। এ কারণেও সৌদির আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। ইরাকের জাতীয়তাবাদী ঘরানার শিয়া নেতা মোক্তাদা আল সদর জুলাইয়ে সৌদি আরব সফর করেছেন। এই সফরে তিনি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সৌদি আরব প্রত্যাশা করছে সদর সহ অন্যান্য ইরাকি শিয়া নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি করে দেশটিতে ইরানের প্রভাবকে টেক্কা দেয়া যাবে। বিশেষ করে, আগামী বছর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনেই এই পরীক্ষার ফল পাওয়া যাবে।
কিন্তু লেবাননে মোক্তাদা আল সদরের মতো কোনো শিয়া নেতা পাবে না সৌদি আরব, যিনি কিনা স্থানীয় শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে হিজবুল্লাহ ও ইরানের প্রভাবের বিপক্ষে দাঁড়াতে পারবেন। ১৯৯০ সালে লেবাননের গৃহযুদ্ধ অবসানের পর, হিজবুল্লাহ শিয়া অধ্যুষিত দক্ষিণ বৈরুত ও দক্ষিণ লেবাননে নিজেদের অবস্থান আরো পাকাপোক্ত করেছে। ইরানের সমর্থনে সংগঠনটি সেসব স্থানে বিদ্যালয় ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছে। ব্যবসায়িক ঋণ দিয়েছে। পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী দাঁড় করিয়েছে। নিজেদের সামরিক সামর্থ্যও বৃদ্ধি করেছে হিজবুল্লাহ। তাদের হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন রয়েছে ইসরাইল সংলগ্ন সীমান্তে।
২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে, লেবাননের বিলিয়নিয়ার ব্যবসায়ী ও প্রধানমন্ত্রী বৈরুতে এক বোমা হামলায় নিহত হন। তার মৃত্যুর ফলে লেবানন হারায় তাদের সবচেয়ে প্রখ্যাত সুন্নি নেতাকে। সৌদি আরব হারায় তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেবানিজ মিত্রকে। হারিরির মৃত্যুর পরই তার ছেলে সাদ হারিরি সৌদিভিত্তিক পারিবারিক ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরে তিনি লেবাননে সুন্নি রাজনৈতিক অক্ষের নেতৃত্ব নেন।
২০০৬ সালের গ্রীষ্মে হিজবুল্লাহ ইসরাইলের সঙ্গে মাসব্যাপী যুদ্ধে লিপ্ত হয়। ওই যুদ্ধে কেউই সুস্পষ্টভাবে জয় পায়নি। কিন্তু যুদ্ধের পর মুসলিম বিশ্বে হিজবুল্লাহর জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। ২০১১ সালের শুরুর দিকে, হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক অবস্থান কিছুটা নড়বড়ে হয়ে উঠে, কারণ জাতিসংঘের একটি ট্রাইব্যুনাল রফিক হারিরি হত্যাকাণ্ডে সংগঠনটির কয়েকজন সদস্যকে দোষী সাব্যস্ত করে।
লেবাননে ইরান ও সৌদি আরবের প্রক্সি যুদ্ধে হারিরির হত্যাকাণ্ড যদি হয় প্রথম আঘাত, তাহলে বলতে হবে, পরবর্তী লড়াইও রিয়াদের অনুকূলে যায়নি।
লেবানিজ গৃহযুদ্ধ শেষে হিজবুল্লাহ অঙ্গীকার করে যে, লেবাননের কোনো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবে না তারা। কিন্তু ২০০৮ সালের মে আসে ওই প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে সংগঠনটি। তখন লেবাননে রাজনৈতিক অচলাবস্থা চলছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি সমর্থিত সরকার এবং হিজবুল্লাহর মধ্যে বিরোধ ছিল তুঙ্গে। সরকারে অন্তর্ভুক্ত ছিল সুন্নি, খ্রিস্টান ও ড্রুজ দলগুলো। আর হিজবুল্লাহ ও এর মিত্ররা শিয়াদের প্রতিনিধিত্ব করতো।
সেবার লেবানিজ সরকার হিজবুল্লাহর ভূগর্ভস্থ ফাইবার-অপটিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক অবৈধ ঘোষণা করে। ইসরাইলের সঙ্গে লড়াইয়ে হিজবুল্লাহর সফলতার পেছনে এই নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তাই স্বভাবতই সরকারের ওই সিদ্ধান্তে ভীষণ ক্ষুব্ধ হয় সংগঠনটি। পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে পশ্চিম বৈরুতের সুন্নি অধ্যুষিত এলাকায় শ’ শ’ যোদ্ধা পাঠায় হিজবুল্লাহ। সেখানকার সুন্নি মিলিশিয়া সদস্যদের সংখ্যা ওই তুলনায় অনেক কম ছিল। হিজবুল্লাহ তখন সুন্নি মিলিশিয়াদের কার্যালয় অবরুদ্ধ করে এবং সাদ হারিরি সহ সুন্নি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের মিডিয়া স্টেশনও দখলে নিয়ে নেয়।
এই ঘটনা সুন্নি আরব রাষ্ট্রগুলোকে এতটা নাড়িয়ে দেয় যে, লেবাননে আরব সামরিক বাহিনী পাঠিয়ে হস্তক্ষেপ করার কথাও চিন্তা করে সৌদি আরব।
তখনকার সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স সৌদ আল-ফয়সাল সফররত এক আমেরিকান কূটনীতিককে জিজ্ঞেস করেন, সম্ভাব্য আরব বাহিনীর অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো যুদ্ধ সরঞ্জাম সরবরাহ এবং নৌ ও আকাশ পথে সমর্থন দিতে পারবে কিনা। উইকিলিকসের প্রকাশ করা আমেরিকার গোপন কূটনৈতিক তারবার্তায় এই তথ্য উঠে আসে। প্রিন্স ফয়সাল তখন ওয়াশিংটনকে সতর্ক করে বলেছিলেন যে, হিজবুল্লাহর সাফল্যের ফলে পুরো লেবানন ইরানের দখলে চলে যাবে।
ওই ঘটনার কয়েক বছর পর, ঠিক একই মডেলে ইয়েমেনে যুদ্ধ সংঘটিত করেন সৌদি নেতারা। এবারও তাদের প্রতিপক্ষ ছিল ইরানসমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা।
হারিরির পদত্যাগের পর, সৌদি মালিকানাধীন একটি আরব পত্রিকার শিরোনাম ছিল: হিজবুল্লাহ রিপাবলিক ত্যাগ করলেন হারিরি। এই শিরোনামের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য স্পষ্ট। দেশের সবচেয়ে প্রখ্যাত সুন্নি নেতা না থাকায়, লেবানন আর লেবানন নেই। এটি এখন হিজবুল্লাহর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। ফলে ইরানের সঙ্গে সৌদি আরবের এই নতুন লড়াই হবে শেয়ানে শেয়ানে।
 (মোহাম্মদ বাজি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতার অধ্যাপক। তিনি নিউজ ডে’র সাবেক মধ্যপ্রাচ্য ব্যুরো প্রধান। ইরান ও সৌদি আরবের প্রক্সি যুদ্ধ নিয়ে তিনি বর্তমানে একটি বই লিখছেন। এই লেখাটি নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত তার নিবন্ধের অনুবাদ।)

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

রবি-সোমবার সব সরকারি কলেজে কর্মবিরতি

‘বিএনপি নির্বাচনে না আসলে অস্তিত্ব সংকটে পড়বে’

আনন্দ শোভাযাত্রার রুট ম্যাপ দেখে চলাচলের অনুরোধ ডিএমপির

‘হাইকোর্টে রুল নিষ্পত্তি না হওয়ায় আমারদেশ প্রকাশে বিলম্ব হচ্ছে’

সমঝোতা স্বাক্ষরের পরও রোহিঙ্গারা প্রবেশ করছে

কাউন্টারে টিকেট নেই, দ্বিগুণ দামে মিলছে ফেসবুকে!

৭ই মার্চের ভাষণের ইউনেস্কো স্বীকৃতি সরকারিভাবে উদযাপন আগামীকাল

‘প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য প্রমাণ করে তারা গুমের সঙ্গে জড়িত’

শপথ নিলেন মানাঙ্গাগওয়া

বাণিজ্য, জ্বালানী ও যোগাযোগ খাতে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা

‘বিএনপির ভোট পাওয়ার মতো এমন কোনো কাজের নিদর্শন নেই’

তাজরীন ট্র্যাজেডির ৫ বছর, শেষ হয়নি বিচার

দুই দফা জানাজা শেষে নেত্রকোনার পথে বারী সিদ্দিকীর মরদেহ

রোহিঙ্গা ফেরতের চুক্তি ‘স্টান্ট’: এইচআরডব্লিউ

‘আমি হতবাক’

ডাক্তাররা বেশ প্রভাবশালী ও তদবিরে পাকা: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী