চির বসন্তের দেশে, ২৯

ওদের চোখে বাংলাদেশ

চলতে ফিরতে

কাজল ঘোষ, চীন থেকে ফিরে | ৪ নভেম্বর ২০১৭, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ২:০৬
কুনমিং-এ একটি বিষয় চোখে পড়েছে তা সেখানকার তরুণ সমাজ। যেখানে গিয়েছি নেতৃত্বে তারাই। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, শপিংমল, রেস্টুরেন্টে, চালকের আসনে সবখানে তারা কাজ করছেন দু’হাতে। যেন ক্লান্তি নেই। বাংলাদেশ-চীন ইয়ুথ সামার ক্যাম্প-২০১৭-তে অংশ নিয়ে বেশির ভাগ সময় কেটেছে ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে আমাদের সাহায্য করতে একঝাঁক উদীয়মান চীনা শিক্ষার্থী ছিল সব সময়।
তারা কিভাবে দেখছেন বাংলাদেশকে? আমাদের শিক্ষার্থীদেরকে? তাদের লেখায় সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি-

সোফিয়া (ইয়ুনইয়ুন তান)
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি ইউয়ানফ্যান (ণঁধহভবহ) ধারণায়। যার অর্থ হচ্ছে ঈশ্বরই আমাদের মিলিত হওয়ার এবং ভালো বন্ধু হওয়ার নিয়তি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। ইয়ুথ ক্যাম্পের প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা ছিল সুখকর। সেদিন বিমানবন্দরে আমার দিকে এগিয়ে আসা হাসিমাখা মুখগুলো এখনও মনে পড়ছে। শেষদিন প্রত্যেকেই আমরা বিদায়বেলায় আবেগকে সংবরণ করছিলাম। যদি কেউ কাঁদতে শুরু করতো তবে অন্যরাও তাদের আবেগ ধরে রাখতে পারতো না। এ বিষয়টিতে সতর্ক ছিল সবাই। কষ্ট সত্ত্বেও আমরা হাসিমুখে সবাইকে বিদায় দিয়েছি। কারণ, আমরা জানতাম সবার সঙ্গে ফের দেখা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে অনেক রকম ভলান্টিয়ারি কাজে যুক্ত থেকেছি। তবে ইয়ুথ ক্যাম্প আমার জীবনে অনেক বেশি ছাপ ফেলেছে। এরফলে আমি অনেক ভালো বন্ধু পেয়েছি। বাংলাদেশের বন্ধুরা প্রাণবন্ত, বন্ধুবৎসল, সহজ-সরল; যা আমাকে আকৃষ্ট করেছে। তাদের সঙ্গে কাটানো দুই সপ্তাহের স্মৃতি আমাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফিরছে। বাংলাদেশের বন্ধুরা হাঁটতে-চলতে এমনকি গাড়িতে চলন্ত অবস্থায় গান গেয়ে ওঠে। যা আমাকে মুগ্ধ করেছে। তাদের নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়সহ শহরের বিভিন্ন স্থানে যেখানে বেড়াতে গিয়েছি, সে জায়গাগুলো দেখলে আমার মনে পড়ে এবং তা প্রচণ্ডভাবে মিস করি। বাংলাদেশের বন্ধুদের কি সোফিয়ার বিষের (ঝড়ঢ়ংরধ্থং ঢ়ড়রংড়হ) কথা মনে আছে? এই বিষ যে বন্ধুরা নিয়েছে তারা প্রত্যেকেই সুন্দর এবং হ্যান্ডসাম হতে বাধ্য। তারা প্রত্যেকেই তাদের জীবনে সুখি হবে। উইচাট বাংলাদেশে নতুন বিষয়। কিন্তু যেহেতু এখানকার সবাই ফেইসবুক ফ্রেন্ডলি তাই আমিও তাতে যুক্ত হয়েছি। কারণ, আমি বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও আমার বন্ধুদের জীবনযাপন গভীরভাবে জানতে চাই।

থিয়ান (মা সিংথিয়ান)
ক্যাম্প শুরুর আগে আমি ইন্টারনেটে বাংলাদেশে মানুষ এবং সংস্কৃতি সম্পর্কে কিছু ধারণা লাভ করি। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশে কিছু বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করে বুঝতে পেরেছি তারা আসলে খুবই বন্ধুত্বপরায়ন, মেধাবী, উৎসাহী এবং দেশপ্রেমিক। স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে একই সময়ে সবার প্রতি খেয়াল রাখা আমাদের জন্য কিছুটা কঠিন ছিল, কিন্তু বাংলাদেশি বন্ধুরা আমাদের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পেরেছিল। তারা আমাদের সহায়তা করেছিল দায়িত্ব পালনে। বাংলাদেশি ছাত্রদের মাঝে নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, তারা বাসের মধ্যেও নাচ, গান করতে পারে, এমনকি যখন তারা হাঁটে তখনও। এই ব্যাপারটা আমাকে মুগ্ধ করেছে। তারা উদ্বোধনী ও ক্যাম্প শেষের অনুষ্ঠানে অসাধারণ কিছু পরিবেশনা উপহার দিয়েছে। চীনের সংস্কৃতি ও ভাষার প্রতি তাদের গভীর আগ্রহ দেখে অবাক হয়েছি। তারা বিশ্বাস করে একদিন তাদের দেশও অনেক এগিয়ে যাবে। এক কথায় বলতে গেলে স্বেচ্ছাসেবক হয়ে আমি অনেক কিছু শিখেছি বাংলাদেশি বন্ধুদের কাছ থেকে। এই ক্যাম্প দুই দেশের মধ্যে মাঝে গভীর বন্ধুত্বের সৃষ্টি করেছে।

অ্যাঞ্জেল (এলভি চিয়াইও)
ইয়ুথ ক্যাম্পে অংশ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের জানার সুযোগ পেয়ে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি। তাদের উদ্দীপনা এবং প্রাণশক্তি আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। তারা যখন মঞ্চে গান গেয়ে এবং নেচে সবাইকে মাতাচ্ছিল, তখন থেকেই আমার বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে জানার আগ্রহ তৈরি হয়। বাংলাদেশের ছাত্রদের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতিকে জানার আগ্রহ দেখে মুগ্ধ হয়েছি। তারা বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে যেমন: কুংফু ফ্যান, চাইনিজ গেম, মুরগী বনাম ঈগল, এক সারিতে পাঁচ ইত্যাদি। আমি তাদের জীবনযাপন, ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং উৎসবের অভিজ্ঞতা নিতে বাংলাদেশ যাওয়ার ইচ্ছা পোষন করছি। আমি আরো জানতে চাই কেমন সংস্কৃতির কারণে সে দেশের ছেলে-মেয়েরা এতো বন্ধুত্বপরায়ন, প্রাণবন্ত, অমায়িক। সর্বোপরি, আমি বিশ্বাস করি এই ক্যাম্প চীন এবং বাংলাদেশের ছাত্রদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব স্থাপনে মাইলফলক।

গুয়েন (লিয়াও চিয়া)
চীন বাংলাদেশ ইয়ুথ ক্যাম্প ২০১৭ সম্পর্কে বলতে গেলে বলতে হয়- ‘সব সুন্দর কিছু কীভাবে এত দ্রুত সমাপ্তি হয়’। সত্যিই এটা আমাদের জন্য অসাধারণ অভিজ্ঞতা। ক্যাম্প শেষ হওয়ার পরও স্মৃতিগুলো এখনো তাড়া করছে। তাদের সঙ্গে অল্প কিছুক্ষণ আলাপ করতেই বুঝতে পারি তারা খুব মিষ্টভাষী, সরল এবং বন্ধুত্বপূর্ণ। তাদেরকে খুব দেশপ্রেমী মনে হয়েছে। তারা তাদের সংস্কৃতি জানাতে কোনো রকম সংকোচবোধ করেনি। তাদেরকে তাদের দেশের তৈরি খাবারের প্রশংসা করতে শুনেছি। আশা করি, অদূর ভবিষ্যতে এই বন্ধুত্ব আরো গভীর হবে এবং আমরা আরো বড় এবং ভালো কিছুর দিকে ধাবিত হবো।

জো (চেনসি হানওয়েন)
শুরুতে একটু ভীত ছিলাম। কারণ, আমার ইংরেজি জ্ঞান খুব একটা ভালো না। কিন্তু যখন বাংলাদেশি বন্ধুদের সঙ্গে মেশা শুরু করি তখন ধীরে ধীরে ভয় কাটতে শুরু করে। তারা আমার ইংরেজি বলতে পারা ভালোভাবেই নিয়েছে। তাদের সঙ্গে মেশার পর আমার একটু পরিবর্তন হয়েছে বুঝতে পারছিলাম। আমি আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশাসী এবং সাহসী হয়েছি। স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে আমি সাংবাদিক হওয়াতে ছবি তোলাসহ, দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের প্রতিবেদন করতে হয়েছে। যা সত্যিই উপভোগ করেছি। সবশেষে বলতে চাই, এই ক্যাম্প আমাকে সুন্দর কিছু স্মৃতি দিয়েছে। প্রিয় বন্ধুদের দেখতে আগামী বছর বাংলাদেশে যেতে চাই।

এসতেলা হোসে (লিউ তান)
ইয়ুথক্যাম্পে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি। ক্যাম্পের আগে বাংলাদেশ সম্পর্কে খুব কম জানতান। শুধু জানা ছিল এটা দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশ। নাম বাংলাদেশ এবং রাজধানী ঢাকা। দুই সপ্তাহের মেলামেশায় বাংলাদেশি বন্ধুদের কাছ থেকে অনেক কিছু জানতে পেরেছি। দোয়েল তাদের জাতীয় পাখি এবং শাপলা তাদের জাতীয় ফুল। বাংলাদেশি বন্ধুরা অনেক দয়ালু, বন্ধুত্বপরায়ন, দেশপ্রেমিক। ভিন্ন সংস্কৃতি হওয়া সত্ত্বেও আমরা সবাই প্রায় একই ধরনের অনুভূতি শেয়ার করেছি এবং এই স্বল্প সময়ে ভালো বন্ধু হয়েছি ।

এলিস (সান চিনইয়াও)
এই ক্যাম্প চলাকালে আমি বাংলাদেশি বন্ধুদের সঙ্গে অনেক সময় কাটিয়েছি। আমি অবশ্য ছবি তোলা, প্রতিদিনের সব কার্যক্রম এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো রেকর্ড করেছি। নিঃসন্দেহে এটা আমার জীবনে বিশেষ একটি অভিজ্ঞতা। এর আগে আমি অন্য কোনো দেশের এতগুলো মানুষের সঙ্গে মিশতে পারিনি। তাই আমি খুব খুশি বাংলাদেশি বন্ধুদের দেখা পেয়ে। আমি এখানে সবাইকে নিয়ে খাবার খাওয়া, শপিংয়ে যাওয়াও এক সঙ্গে চীনের সংস্কৃতি জানাকে মিস করছি।

ইলায়না (লি ইয়াতিং)
২০১৭ সালের চীন বাংলাদেশ ইয়ুথ ক্যাম্পের একজন স্বেচ্ছাসেবক হতে পেরে আমি সম্মানিত বোধ করছি। এই ক্যাম্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা পেয়েছি। সবচেয়ে স্মরণীয় দিন ছিল আমার জন্য, যেদিন বাংলাদেশি বন্ধুদের নিয়ে ন্যাশনালিটি ভিলেজ বেড়াতে যাই। আমি তাদের জীবনীশক্তি এবং প্রাণোচ্ছ্বলতা দেখে মুগ্ধ হয়েছি। তারা খুব মজা করতে পারে। গান গেয়ে নেচে এমনকি আলাপচারিতার মধ্যেও। তারা গ্রামে এমন একধরনের চমৎকার আবহ তৈরি করেছিল যেটা আমাদেরকে আপ্লুত করেছিল। বাংলাদেশি বন্ধুদের আরেকটা দিক হচ্ছে তারা খুব দয়ালু এবং বন্ধুত্বপরায়ণ। যেমন- ন্যাশনালিটি ভিলেজ গ্রাম থেকে
ফেরার পথে বাসের পেছনে একা একটা সিটে বসেছিলাম। কিন্তু বাংলাদেশি এক বন্ধু আমাকে একা দেখতে পেয়ে তাদের সঙ্গে যোগ দেয়ার জন্য অনুরোধ করে। ফলে আমিও তাদের সঙ্গে গল্প-গুজব করে কখন যে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পড়েছি টের পাইনি। আমার কাছে এই ব্যাপারটা খুব ভালো লেগেছে। আশা করি, তাদের কেউ কেউ সামনে চীনে পড়তে আসবে এবং তাদের একটি সুন্দর সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবে।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

শাহান কামাল

২০১৭-১১-০৩ ২০:১০:৫৯

ওদের কথাগুলো শুনে ওদের অনেক বেশী মনে পরছে :(

আপনার মতামত দিন

বিএনপিকে ভোট দিয়ে অশান্তি ফিরিয়ে আনবে না জনগণ: প্রধানমন্ত্রী

অভিযোগ মিথ্যা এতিমখানার টাকা আত্মসাৎ করিনি

আরো ব্লগার হত্যার হিটলিস্ট

আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে মামলা, অতঃপর...

ফের বেড়েছে বিদ্যুতের দাম

চাহিদা নেই, তবুও রাজউকের নতুন ফ্ল্যাট প্রকল্প

‘আনিসুল হককে নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা ভিত্তিহীন’

মৌলভীবাজারে গ্রাহকের কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা ভিডিএন চেয়ারম্যান ও এমডি

সিলেটে জামায়াতের ‘স্বতন্ত্র প্রার্থী’, জল্পনা

সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ

রোহিঙ্গা জাতি নিধনের তুমুল সমালোচনা যুক্তরাষ্ট্রের

‘আমি হতবাক’

ডাক্তাররা বেশ প্রভাবশালী ও তদবিরে পাকা: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

যশোর জেলা স্পেশাল জজের বিরুদ্ধে ঘুষ নেয়ার অভিযোগ

রোহিঙ্গা শব্দ ব্যবহার না করতে বলা হলো পোপকে

অসুস্থ রাজনীতি বাংলাদেশকে গ্রাস করছে: ড. কামাল হোসেন