জাপানের পুলিশ যেমন..

মত-মতান্তর

মাহবুব মাসুম, টোকিও(জাপান) থেকে | ৩ নভেম্বর ২০১৭, শুক্রবার
জাপানের পুলিশ জনগণকে কিভাবে নিরাপত্তাসেবা দেয় সে সম্পর্কে আমার ছোট্ট কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করবো। তার আগে বলে নেই জাপানি পুলিশ তাদের সরকারের কোন লাঠিয়াল বাহিনী নয়। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগও নেই তাদের বিরুদ্ধে। নিরাপরাধ মানুষকে জিম্মি করে বা জোর করে পকেটে ইয়াবা ঢুকিয়ে অর্থ আদায় করে না। কারণ তারা সাধারণ জনগণের টাকায় মাস শেষে বেতন পায়। এ জন্য প্রচণ্ডভাবে জনগণকে শ্রদ্ধা করে জাপানি পুলিশ।
এক কথায় বাবা-মা’র কোলে শিশু যেমন নিরাপদ জাপানে পুলিশের কাছে মানুষ তেমনি নিরাপদ। জাপানের আইন অনুযায়ী, আপনি যে জাগায় বিপদে পরেন না কেনো হেল্প লাইনে সহায়তা চাইলে ১০ মিনিটের মধ্যে পুলিশ আসতে বাধ্য। আপনি জাপানে বেড়াতে এসেছেন। কোন কারণে রাস্তা হারিয়ে ফেলেছেন। নো টেনশন। সরাসরি পুলিশ বুথে যান। আপনার বাসায় বা হোটেলে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব পুলিশের। কোনরকমে ঠিকানাটা বলতে পারলেই হলো। বাকি দায়িত্ব পুলিশের। কোন বিষয়ে জানা বা সহযোগিতার দরকার হলে সরাসরি পুলিশের কাছে যান। দেখবেন সর্বাত্মক সহযোগিতা করার চেষ্টা করবে। পুলিশের সামনে কোন অন্যায় করে ফেলেছেন বা কোন অপরাধে আপনি ধরা খেয়েছেন। পুলিশকে মোটা অংকের ঘোষ অফার করলেন তো মরলেন। অপরাধ ক্ষমারযোগ্য হলে তারা এমনিতেই সতর্ক করে ছেড়ে দেবে। তবে ঘুষ অফার করলে আপনি আর ছাড়া পাবেন না। সাথে সাথেই মামলা হয়ে যাবে। সরাসরি জেলে। আসলে জাপানের পুলিশ যেমন সহযোগিতা করবে তেমনি আইনের প্রতি কঠোর।
পুলিশ মানুষের বন্ধু। কথায় নয় কাজে। আপনি কিছু হারিয়ে ফেলেছেন। কোন কিছু না ভেবে নিকটস্থ পুলিশ বাক্স এ গিয়ে হারানো জিনিসটির বিবরণ দিয়ে আসুন। তারা খোঁজ-খবর নিয়ে আপনাকে কল করে আপডেট জানাবে। জিনিসটি না পাওয়া পর্যন্ত আপনার পাশাপাশি পুলিশও শান্তিতে থাকবে না। অন্যদিকে কোন জাপানিজ রাস্তায় কিছু পেলে সঙ্গে সঙ্গে নিকটস্থ পুলিশের কাছে জমা দিয়ে আসে। অথবা জিনিসটি যত মুল্যবান হোক তা তারা স্পর্শ করবে না।
আপনি কোথাও যাচ্ছেন। পুলিশ কোন কারণে আপনাকে সন্দেহ করেছে। ব্যাস আপনার পিছু পিছু পুলিশ যাবে যে পর্যন্ত না আপনার সামনে এসে পৌঁছাবে। পেছন থেকে কখনো আপনাকে ডাকবে না। সামনে এসে ভদ্রভাবে হাসিমুখে বলবে আপনার রেসিডেন্ট কার্ডটা একটু দিন। দেখা শেষে আরেকটা হাসি দিয়ে ধন্যবাদ জানাতে কখনোই ভুলবে না তারা। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজনে তল্লাশি করবেই।
জাপানিরা প্রতিবেশির জন্য বিরক্তির কিছু কখনই করে না। বাসাবাড়িতে থাকেন। পাশের বাসায় জোরে শব্দ করে সাউন্ড সিস্টেম বাজাচ্ছেন। পাশের বাসার লোকজন বিরক্তি বোধ করলে আপনাকে বলবে না। সরাসরি পুলিশকে ফোন করবে। কয়েক মিনিটের মধ্যে পুলিশ এসে হাজির। জোরে শব্দ করে কথা বললেও প্রতিবেশি অভিযোগ জানানোমাত্র পুলিশ এসে হাজির হবে। আপনি অনন্দ-ফুর্তি যা ইচ্ছা করেন। একান্তই আপনার। তবে অন্যের বিরক্তির কারণ কখনই হওয়া যাবে না।  
এ দেশের প্রতিটি মানুষ আইন মেনে চলে। রাস্তায় সিগন্যাল পড়েছে অথচ কোন গাড়ি নেই। তারপরও কেউ ভুলেও রাস্তা পার হবে না। সিগন্যাল ভঙ্গ করে গাড়ি চালানো তো এদেশে কল্পনার বাইরে। চুরি-বাটপারি, মারামারি-অন্যায়-অবিচার না থাকায় আদালত পাড়ায় আজ কোন মানুষ নেই। রুটিন মাফিক আদালত চলে মাত্র। আইনজীবীরা বেকার। দেশি-বিদেশী কোম্পানির আইনী বিষয় দেখা ছাড়া আইনজীবীদের কোন কাজ জাপানে নেই।সত্যি শান্তিময় দেশ।  
জাপানে আসার সপ্তাহখানেক পর টোকিও থেকে পৌনে তিন’শ কিলোমিটার দূরে প্রথমবার একাই নাগানো সিটিতে ঘুরতে গেলাম। তখনও জাপানিজ ভাষায় বাম-ডানও বুঝিনা। ঘুরা শেষে ফেরার সময় নাগানো ট্রেন স্টেশন থেকে বাস স্টেশনে কেমনে যাবো কিচ্ছু জানিনা। স্টেশন থেকে বেড় হয়েই পুলিশকে বললাম বাস স্টেশনে যাবো। সে নানাভাবে বুঝানোর চেষ্টা করলো। সর্বশেষ সে নিজে আমার সঙ্গে বাস স্টেশনে গিয়ে টিকিট কাউন্টারে রেখে তারপর চলে গেল। যাওয়ার আগে সে আমাকে উল্টো ধন্যবাদ দিয়ে মাথানত করে চলে গেল। কতটা দায়িত্বশীল হলে অন্যকাজ ফেলে সে আমাকে স্টেশনে রেখে যায়। এই হল জাপানি পুলিশ।
দু:খের বিষয় আমাদের দেশের পুলিশ কোন দিনই জনগণের সেবক বা বন্ধু ছিল না, আজও সারা বাংলাদেশে একটি বহুল প্রচলিত কৌতুক হল এরা পুলিশ, মানুষ না । সত্যিই যে নিরাপত্তা বিধানকারী সংস্থার কোন কর্মকর্তা, কর্মচারী তার আয়ের দশগুণ বেশী খরচ করে থাকে। উর্দির ভয় দেখিয়ে নিরীহ মানুষের টাকা লুন্ঠন করে। পুলিশের কাছে নিরাপত্তার চেয়ে মানুষ আরো অপনিরাপদ হয়। আজকাল থানার আশপাশ দিয়েও যাওয়া যায় না। কি ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে বাংলাদেশে।
হায়রে আমার দেশের পুলিশ। যে জনগণের অর্থে তুমি মাস গেলে বেতন পাও সেই মানুষকে জিম্মি করতে কুণ্ঠবোধ করছো না। এটা অত্যন্ত দুঃখের, হতাশার। সম্প্রতি ডিবি পুলিশের কিছু সদস্য এক ব্যাবসায়ীর জিম্মি করে ১৭ লাখ টাকাসহ সেনাবাহিনীর কাছে ধরা খেয়েছে। ফরিদপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) সুভাষ চন্দ্র সাহা দুর্নীতির ৮ কোটি নিয়ে ধরা পড়েছে। নারায়ণগঞ্জে সাত জনকে টাকার বিনিময়ে হত্যা করেছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। সারাদেশে খোঁজ নিলে এরকম শত শত তথ্য পাওয়া যাবে কোন সন্দেহ নেই। মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে এরা হেন কোন কাজ নেই যে করছে না। বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের কাছে আতঙ্কের নাম পুলিশ। তাহলে কেন এ বাহিনীর জন্য প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা জনগণ দেবে? জনগণের অর্থে যেহেতু এ বাহিনী চলে সেহেতু জনগনের সেবক হিসেবে কাজ করতে হবে। তা না হলে এখনই এ বাহিনীর ইতি ঘটাতে হবে। টাকা দিয়ে নিজের জীবনকে অনিশ্চয়তায় ফেলতে চায় না জনগণ।
লেখক: প্রবাসী সাংবাদিক  
masum86cu@yahoo.com
+8107041063143

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Saiful Islam Sunny

২০১৭-১১-১৭ ০৯:১৬:৫১

ভাইজান, যে দেশের মানুষ যেমন; সে দেশের পুলিশ তেমন ৷

আপনার মতামত দিন

রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে চীনের তিন দফা প্রস্তাব

সিএনজি অটোরিকশার ৪৮ঘন্টার ধর্মঘট

শাহজালালে ৩ কোটি টাকা মূল্যের স্বর্ণসহ আটক ১

দীপিকার মাথা কাটলে পুরস্কার ১০ কোটি রুপি!

নিউ ক্যালেডোনিয়ায় ৭ মাত্রার ভূমিকম্প

কেন সৌদি আরব ও ইরান পরস্পরের প্রতিপক্ষ?

বন্দুকের নলের মুখেও ক্ষমতা ছাড়তে রাজি নন মুগাবে

তারেক রহমানসহ তিনজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

গেদে সীমান্তে পিতা-পুত্রের মিলন, আবেগঘন এক দৃশ্য

বিএনপির নেতার বাসার সামনে থেকে বোমা উদ্ধার

‘পুরুষের চেয়ে নারীরা বেশি যৌন নিপীড়ক’

দুদকের মামলায় গ্রেপ্তার পঙ্কজ রায়

কেক কেটে তারেক রহমানের জন্মদিন পালন

ডাকাতি, নিরাপত্তাহীনতায় ঢাকায় ভারতীয় কোম্পানি সম্প্রসারণ পরিকল্পনা স্থগিত

মা ও ছেলেকে কুপিয়ে হত্যা করলো যুবক

কানাডার উন্নয়নমন্ত্রী আসছেন মঙ্গলবার