চির বসন্তের দেশে, ২৬

চীনা সংগীতে পঞ্চস্বর

চলতে ফিরতে

কাজল ঘোষ, চীন থেকে ফিরে | ৩১ অক্টোবর ২০১৭, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:২৭

‘ঊ’ আর ‘উ’। একজন ঊর্মি। অন্যজন উদয়। উর্মি ঘোষ আর শাহান কামাল উদয়। দু’জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থী। ইয়ুথ ক্যাম্প-২০১৭ যখন চূড়ান্ত হয়, তখন শর্ত ছিল সবাইকে কিছু না কিছু করতে হবে।
তা গান হোক, কবিতা আবৃত্তি হোক বা ছবি আঁকা হোক। বাধ্যতামূলক। সে অনুযায়ী সবাইকে তাগাদা দেয়া হয়েছে। প্রস্তুতির দীর্ঘ তালিকা আর সবশেষে ইউনান ইউনিভার্সিটিতে পারফর্ম করা। তবে চীনে যাওয়ার পর মনে হয়েছে সময় স্বল্পতায় সবার প্রস্তুতি দেখার সুযোগ মিলবে না। হলোও তাই। একেবারে কোর মিটিং-এ অনেকের নাম বাদ পড়ে যায়। প্রথম পাঁচ/সাতজনের মঞ্চে যাওয়ার সুযোগ হয়। চীনা ভাষা না জানায় চীনের স্থানীয় সংগীতের সঙ্গে কিভাবে একাত্ম হওয়া যাবে তা নিয়ে দুর্ভাবনা প্রথম থেকেই। এই দুর্ভাবনা থেকে মুক্তি দিয়েছিল ঊর্মি-উদয়। তারা মঞ্চ মাতিয়ে রেখেছে চীনের। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাদের গাওয়া ধনধান্য-পুষ্প ভরা, ফুলে ফুলে, জাত গেল-জাত গেল আর ফাইভ হানড্রেড মাইলস গানগুলো সকলের মন জয় করেছিল। সবচেয়ে চমকে দেয়া বিষয় ছিল ফুলে ফুলে গানটির চাইনিজ ভার্সন ‘হোয়ার হোয়ার মানথেন ফেইয়ু, চেইয়ে তোয়ান শের কোয়াং; হোয়ান হোয়ান লিউধাং’ গাওয়া। মঞ্চের সামনে বসা অতিথি, ডেলিগেটস, ভলান্টিয়ার সবাই হাততালিতে পূর্ণ করে এই গানটির সময়। আর ওদের দু’জনের সেই ধারা অব্যাহত থাকে শেষ পর্যন্ত। তবে শেষদিনের বাড়তি আয়োজনে তিথি চক্রবর্তী ও জবা বিশ্বাসের নাচ-গান ছিল অন্যরকম ভালো লাগা। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া এই টুকরো টুকরো সংগীত মজমা সব সময় সঙ্গী ছিল। চলার পথে জবা, তিথি, ঊর্মি, উদয় ওদের যুথবদ্ধ গলায় গেয়ে ওঠা গানে অনেক সময় পুরো গাড়ির সবাই তাল মিলিয়েছে। আর আসার আগের দিন শেষ রাতে আমার রুমে অর্থাৎ রুম নং-৪১২তে হেরে গলায় সবাই যখন ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই বা পুরনো সেই দিনের কথা বলবো কীরে হাই- গেয়ে ওঠে তা এখনো কানে বাজে। ১৪ দিনের বিভিন্ন ইভেন্টে চীনের ঐতিহ্যবাহী সংগীতের পরিচয় পেয়েছি নানাভাবে। প্রথমদিন অরিয়েন্টেশনের সময় মিলনায়তনে প্রবেশ মুখেই ‘ড্রাগন ড্যান্স’ দেখি। একদল ছেলেমেয়ে অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শন করে ড্রাগন ড্যান্সে। এদিন হলরুমে প্রবেশের মুখেই পরিচিত হই কুচাং যন্ত্রটির সঙ্গেও। এরপর যেদিন ন্যাশনালিটি ভিলেজে নৃ-জাতিগোষ্ঠীর পরিচয় জানতে পারি সেদিন মোটাদাগে ঐতিহ্যবাহী অনেক সংগীত যন্ত্রের সঙ্গে পরিচিত হই। আর ন্যাশনালিটি ভিলেজে ই, বাই, তিব্বতিয়ান, মঙ্গোলিয়ান, ম্যায়, উই, ঝাংসহ বেশকিছু ভিলেজে যাওয়ার পথে-পথে নাচ ও গানে শামিল হওয়ার সুযোগ মিলে। বাই নৃ-গোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন দেখে বের হওয়ার পথেই অকস্মাৎ মিউজিকের তাল শুনে আমরা হুড়মুড় করে ছুটে যাই তা-উন নৃ-গোষ্ঠীর ভিলেজে। যেখানে ই-আর-সান- (এক, দুই, তিন)-এর বনির গান আর নাচ জমে ওঠেছিল। আর এই গানের তালে তালে ব্যাম্বো ড্যান্সে আমরাও শামিল হই। ন্যাশনালিটি ভিলেজের একেবারে শেষদিকে একটি খোলা প্রান্তরে বিশালাকৃতির বেশকিছু ড্রাম দেখে আমরা থামি। তখনও বুঝে উঠতে পারিনি আমাদের জন্য কী চমক অপেক্ষা করছে। পেছনে থাকা একটি ভবনের ভেতর থেকে একদল নারী-পুরুষ ড্রাম স্টিক নিয়ে ঐতিহ্যবাহী পোশাকে হাজির হয়। দশ মিনিটের পরিবেশনায় ড্রামের তালে তাদের ঐতিহ্যবাহী গান শুনে আমরা বিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম। তারা চলে যাওয়ার পর আমরা অনেকেই খুঁজেছি কোথায় হারালো দলটি। এই ধারার গান বা পরিবেশনাকে বলে Call of platou। কুনমিং-এর পর্বতমালার যে সৌন্দর্য্য তারা তাকে প্লাতাও বলে অভিহিত করে। আর তা থেকে যে সংগীতের জন্ম তা প্লাতাও। নিজের সেলফোনে রেকর্ড হওয়া ‘কল অব প্লাতাও’ সুযোগ পেলে এখনো শুনি। স্টোন ফরেস্ট বেড়াতে গিয়ে মাঝামাঝি একটি জায়গায় স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের পরিবেশনাও ছিল স্মরণীয়। এটি অনেকটা বড় দোতরার মতো যন্ত্রবিশেষ। যার সুরের সঙ্গে আমরা দল বেঁধে তাল মিলিয়েছি পায়ে পায়ে। এ যেন কথা বলছে হাজার বছর জমে থাকা পাথরে সৃষ্টি কাব্যগাঁথা। এরপর বেশকিছু ঐতিহ্যবাহী লোকনৃত্য ও লোকবাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি ত্বালিতে। আরহিউয়ান লেকে বেড়াতে গিয়ে দেখেছি ঘাটে বসে থাকা একজন আরতু বাজাচ্ছিলেন। যা এক করুণ সুরে আমাদের নিয়ে যাচ্ছিল কোন সুদূরে। সাপের চামড়া দিয়ে তৈরি আরতু অনেকটা আমাদের দেশের বেহালার মতো। আরহিউয়ান লেকে বোটিং শেষে পাশের মিলনায়তনে টানা তিনটি ঐতিহ্যবাহী লোকনৃত্য দেখার সুযোগ হয় থ্রি কোর্স টি সহযোগে। স্থানীয় একদল ছেলেমেয়ে পরিবেশনায় একটি মেয়েকে পছন্দ ও বিয়ের প্রস্তাব প্রদর্শিত হয় লোকজ গানের মধ্যদিয়ে। আর ত্বালির পুরনো রাজবাড়ী যতবার গিয়েছি একটি গান ঢোলের তালে তালে বেজে চলেছে তা মুগ্ধ হয়ে শুনেছি। ইংরেজি  Little Boy  গানটির চাইনিজ নাম XU Zanglin। এই গানের সুর-তাল পরে ত্বালি নিয়ে বিভিন্ন প্রামাণ্যচিত্রের ভিডিওতে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে ব্যবহার করতে দেখেছি। সব চাপিয়ে মুগ্ধ হয়েছি ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ছোট এক কিশোরীর কণ্ঠে অপেরা শুনে। টানা বিশ মিনিট তার গাওয়া অপেরা শুনে আমরা তন্ময় হয়েছিলাম অনেকটা সময়। সমাপনী অনুষ্ঠানে শিয়াও (বাঁশি) আর মঙ্গোলিয়ান ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনা ছিল মুগ্ধ হওয়ার মতো। তবে চীনা সংগীতের নানা শাখার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছি ২৩শে সেপ্টেম্বর ফেরার দু’দিন আগে। সেখানকার ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ বিভাগের শিক্ষক ড. হুসা তথ্য-উপাত্ত দিয়ে আমাদের নিয়ে যান চাইনিজ এতিহ্যবাহী সংগীতের অন্দরে। আর সবশেষে তিনি নিজেও কুচাং বাজিয়ে শুনিয়েছেন। ড. হুসার পরিবেশনা সংগীতের অ আ ক খ শুধু বুঝাতেই সক্ষম হয়েছে তা নয়। তার কথায় যন্ত্র আবিষ্কারের নেপথ্য কথাও আমরা জানতে পারি। চীনের বর্তমান সংগীত ধারাকে শক্তিশালী অবস্থায় নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন কম্পোজার আবিং। যিনি ছিলেন জন্মান্ধ। তিনি পিপা এবং আরতুকে জনপ্রিয় ধারার সংগীত যন্ত্র করতে ভূমিকা রেখেছিলেন।
পিপা, হারতু, কুচাং ও শিয়াও
চীনের সঙ্গে আমাদের স্বরের পার্থক্য হচ্ছে দু’টি। ভারতবর্ষে মূল স্বর ৭টি। আর চীনের ৫টি। আমরা সবাই সা, রে, গা, মা, পা, ধা, নি ও সা-এর সঙ্গে পরিচিত। চীনে সা (Gong), রে (Shang), গা (Jue), পা (Zhi) ও ধা (YU)। চীনের ফনেটিক স্কেল রয়েছে দু’টি। যদিও প্রাচীন চীনে সংগীতের বাদ্যযন্ত্র রয়েছে আটটি। বলা হয়ে থাকে এই আটটিই আট রকম সুর অর্থাৎ Eight Sounds and Eight tones দিয়ে থাকে। এগুলো সিল্ক (Silk), বাঁশ (Bamboo), কাঠ (Wood), পাথর (Stone), ধাতব (Metal), কাদা (Clay), মাটি (Ground) ও লুকায়িত (Hide)। এর বাইরে চীনের সংগীতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মঙ্গোলিয়ান ধারা। আর আধুনিক চাইনিজ অর্কেস্ট্রার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাশ্চাত্যের অর্কেস্ট্রা। একইরকমভাবে অপেরাতেও।
চীনের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী এই সংগীত নানাভাবে তাড়িত প্রকৃতি দিয়ে। পাহাড়-পর্বত-ঝরনা আর প্রকৃতির উদ্ভূত নানা বিষয় ঘুরে-ফিরে থাকে চীনের সংগীতে। যেমন- আরতুর বিখ্যাত পর্বের নাম হচ্ছে Moon reflected on the Second Spring। একইভাবে বিখ্যাত লোকজ সংগীতের একটি নাম Moon Light over the mugic Lotus pond। একই রকমভাবে Snow mauntain। একটি বাদ্যযন্ত্রের নামও রয়েছে  Moon instrument।
পিপা (Pipa)
অনেকটা বাংলাদেশের দোতরার মতো দেখতে। চিং এবং থাং ডায়নেস্টি সময়ে পিপার প্রচলন। প্রায় দু’হাজার বছরের পুরনো পিপা। চাইনিজ  pi এবং pa  অর্থাৎ ডান হাতে বাজাতে হবে আর বাম হাতে ধরে থাকতে হবে পিপা।
আরতু (Erhu)
সাপের চামড়ায় তৈরি দেখতে অনেকটা আমাদের বেহালার মতো। দু’টি তার থাকে এতে। চীনা ভাষায়  Er অর্থাৎ দুই তার থেকে উদ্ভূত যে শব্দ hu  মানে হচ্ছে হু নৃ-গোষ্ঠী। পশ্চিমা ধাঁচের ভায়োলিনই চীনে আরতু বলে পরিচিত।
কুচাং (Guzheng)
কুচাং হচ্ছে চাইনিজ গিটার। প্রায় আড়াই হাজারের বেশি বছর ধরে কুচাং চীনের সংগীতের অংশ হয়ে আছে। চিং ও থাং ডায়নেস্টির সময় থেকেই এর প্রচলন। এটি সাধারণত ৬৪ ইঞ্চি লম্বা হয়। আর এতে ১৬টি তার থাকে। যদিও আধুনিক কুচাং ২১ তারেরও হয়ে থাকে।
শিয়াও (xiao)
বাংলাদেশের বাঁশিকেই চীনে শিয়াও বলে। এটি বাঁশে তৈরি। প্রাচীনকালে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনে শিয়াও-এর ব্যাপক ব্যবহার দেখা যেতো। সেই থেকে এখন পুরো চীনেই এর প্রসার ঘটেছে। সাধারণত তিন ধরনের শিয়াও-এর প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। চিন শিয়াও, নান শিয়াও ও শিবা।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

২০১৮ সালে প্রবল ভুমিকম্পের আশঙ্কা!

কেয়া চৌধুরী এমপি’র উপর হামলার ঘটনায় মামলা

বাংলাদেশের রাজনীতি, বিকাশমান মধ্যবিত্ত এবং কয়েকটি প্রশ্ন

ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতাতে আহত ডিবি পুলিশ

প্রতিবেশীদের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকা জরুরীঃ বাংলাদেশকে মিয়ানমার

তারেক রহমানের জন্মদিন পালন করবে বিএনপি

রোহিঙ্গা শিবিরে যেতে চান প্রণব মূখার্জি

তালাকপ্রাপ্ত নারীকে অপহরণের পর গণধর্ষণ

আরো ১০ দিন বন্ধ থাকবে লেকহেড স্কুল

জাতিসংঘকে দিয়ে রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধান হবে নাঃ চীন

ম্যনইউয়ের টানা ৩৮

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সংলাপে সহায়তা করতে আগ্রহী চীন

জল্পনার অবসান ঘটালেন জ্যোতি

চীনের বেইজিংয়ে অগ্নিকাণ্ড, নিহত ১৯ আহত ৮

সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত এমপি গোলাম মোস্তফা আহমেদ

বিশ্ব সুন্দরীর মুকুট মানসী চিল্লার-এর