ড্রাগনে আস্থা চীনাদের

চলতে ফিরতে

কাজল ঘোষ, চীন থেকে ফিরে | ৩১ অক্টোবর ২০১৭, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:৪০
চীনা সংস্কৃতিতে ড্রাগনকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেই বুঝতে পেরেছি। কুনমিং পৌঁছাবার পরদিন ১৩ই সেপ্টেম্বর ছিল অরিয়েনটেশন ক্লাস। বলা যায় উদ্বোধনী মহড়া। সকালে বাসে করে ম্যাপল হোটেল থেকে ইউনান ইউনিভার্সিটি পৌঁছতেই দেখি- শুরু হয়ে গেছে ড্রাগন নাচ। একদল ছেলেমেয়ে ড্রাগন নিয়ে নানা অঙ্গভঙ্গি করছে।
ড্রাগন ছুটছে অশুভ নাশে। সবশেষে শুভ কিছুর পক্ষে অবস্থান শান্ত এই ড্রাগনের। এক সময় সংগীতের তালে আমাদের স্বাগত জানানো হলো। শক্তি ও বিনম্রতার প্রতীক হিসেবেই চীনাদের সবকিছুতে ড্রাগনের উপস্থিতি। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে চীনারা শরণাপন্ন হয় ড্রাগনের কাছে। অতি খরায় তারা বিশ্বাস করে ড্রাগন দৈবভাবে বৃষ্টি নিয়ে আসে। কালজয়ী সাহিত্য, জাতীয় উৎসবাদিতে, গ্রহ-নক্ষত্র বিশ্লেষণে, শিল্পের নানা অঙ্গনে ড্রাগনের উপস্থিতি অনিবার্য। ড্রাগনকে তারা শুভ এবং সৌভাগ্য মনে করেই নানাক্ষেত্রে একে প্রতীকী অর্থে স্থাপন করে। পশ্চিমারা যেখানে ড্রাগনকে ভয়ানক ও ভয়ঙ্কর প্রাণী হিসেবে চিত্রিত করেছে, সেখানে চীনের ক্ষেত্রে এটি ব্যতিক্রম। চীনে ড্রাগনের মুখ দিয়ে কখনো আগুন বের হয় না। কিন্তু পশ্চিমা দুনিয়ায় ড্রাগন মানেই আগুনে পুড়িয়ে ছারখার। পশ্চিমাদের ড্রাগন সমস্ত ধ্বংস আর অনিষ্টের মূল। কিন্তু চীনে সমস্ত শান্তি আর সমৃদ্ধিতে ড্রাগনের চমৎকার উপস্থিতি। এখানে ড্রাগনের মুখ দিয়ে আসে শান্তির জলধারা।
চীনাদের নানা পৌরাণিক গল্প ও কাহিনীতেও রয়েছে ড্রাগনের উপস্থিতি। চীনারা বিশ্বাস করে ড্রাগনের শ্বাস-প্রশ্বাস থেকে মেঘের উৎপত্তি। ইয়ালিং হচ্ছে চীনা পুরাণে উল্লিখিত সবচেয়ে বিখ্যাত ড্রাগন। ইয়ালিংকে বৃষ্টির দেবতাও বলে থাকে চাইনিজরা। মিনজু জাতি তাদের পরিচয়ে বলতো- ‘ড্রাগনের বংশধর’। কোথাও কোথাও বুদ্ধ ধর্মের নেতাও বলা হয়ে থাকে ড্রাগনকে। আবার ক্ষেত্রবিশেষে ড্রাগনের রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন নামও। দশ বিখ্যাত ড্রাগনের পরিচয় নিচে উল্লেখ করা হলো-
ড্রাগন রাজা (ড্রাগনদের রাজা), চাই (শিংহীন ড্রাগন ও প্রবর্তনের দানব), ডিলং (পৃথিবীর ড্রাগন), ফুকাংলং (ধন-সম্পদের ড্রাগন), জিয়াওলিং (সমুদ্রের ড্রাগন), শেনলং (বৃষ্টির ড্রাগন), তাওলং (স্বর্গীয় ড্রাগন), হোয়াইট সারপেন্ট (সাদা সাপ সদৃশ ড্রাগন), ইয়ংলং (হুয়াং সম্রাটের ভৃত্য) ও ঝুলং (উজ্জ্বল লাল স্বর্গীয় ড্রাগন)। ড্রাগনের নামে নানা শুভ কাজের ফর্দ রয়েছে। সৌভাগ্যের রঙ (খঁপশু পড়ষড়ৎং), সৌভাগ্যযুক্ত সংখ্যা (খঁপশু হঁসনবৎং), সৌভাগ্যের বছর (খঁপশু ুবধৎ)। রয়েছে ড্রাগন বর্ষও। সে বছর যারাই জন্মাবে তারা হবেন ড্রাগন উপাধিপ্রাপ্ত সন্তান। ধারণা করা হয়, প্রতি ১২ বছর পরে চীনে একবার ড্রাগন বছর। চীনা লুনার ক্যালেন্ডারে হিসাব করে ড্রাগন ইয়ার নির্ধারিত হয়। যেমন ১৯৪০ সাল যদি ড্রাগন ইয়ার ধরা হয়; তবে এর পর ১৯৫২, এভাবে ১৯৬৪, ১৯৭৬, ১৯৮৮, ২০০০, ২০১২ এবং ২০২৪ পর্যায়ক্রমে ড্রাগন বর্ষ। ড্রাগন ফেস্টিভ্যাল চীনের অন্যতম বড় উৎসব। যেখানে তামাম দুনিয়ার পর্যটকরা হাজির হন উৎসবে শরিক হতে।
ড্রাগন মিথের মতোই ট্যাটুও চীনের সংস্কৃতির একটি বড় অংশ জুড়ে আছে। বিশেষত পেইচিং ও শাংহাই অঞ্চলে ট্যাটু সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। কুনমিং ও ত্বালি বেড়াবার সময় অনেক তরুণ-তরুণীদের ট্যাটু বা উল্কি আঁকা দেখেছি। চীনে এই ট্যাটু ব্যবহারের রয়েছে লম্বা ইতিহাস। ড্রাগনকে যেভাবে চীনারা তাদের রক্ষাকর্তার আসনে বসিয়েছে ঠিক একই রকম ড্রাগনের ট্যাটু গায়ে এঁকে তারা একধরনের ভয়-ভীতি কাটানো বা শক্তি সমর্থতার প্রতীক হিসেবে নিজেদের জাহির করতে পছন্দ করে। যদিও পশ্চিমা দুনিয়ার মানুষের সঙ্গে চীনাদের ট্যাটু ব্যবহারের দর্শন নিয়ে ফারাক রয়েছে। পশ্চিমারা যেভাবে ড্রাগনকে ধ্বংসের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করে; একইভাবে ট্যাটুকেও তারা গ্যাংলিডার, ডন বা দুষ্ট চরিত্রগুলোর জন্য প্রযোজ্য বলে উপস্থাপন করে। কিন্তু চীন এক্ষেত্রে উল্টো। চীনে শান্ত, সৌন্দর্য ও শক্তির প্রতীক হিসেবে ড্রাগনকে ট্যাটু করে স্থানীয়রা। তবে অনেকে ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে বিশ্বখ্যাত ফুটবল তারকা ডেভিড ব্যাকহ্যাম পেইচিং বেড়াতে এসে ট্যাটু এঁকেছিলেন। যা চীনাদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয় ট্যাটুকে। তিনি ট্যাটু এঁকে সেই ছবি পোস্টও করেছিলেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। হানজিতে নিজেদের নামও ট্যাটু হিসেবে ব্যবহার করে লিখে থাকে। আর বেশির ভাগ লোকজন নানা লোকজ মোটিভ ট্যাটুতে অঙ্কন করে।

ড্রাগন নিয়ে চমকপ্রদ ১০
১. চীনের সমাজ জীবনে ড্রাগন জ্যান্ত এমন কোনো প্রমাণ নেই বা এর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চীনাবাসী বিশ্বাস করে ড্রাগন তাদের সব শুভ কাজে আছে।

২. সৌর কক্ষপথ (তড়ফরড়প) ১২টির মধ্যে একটি হচ্ছে ড্রাগনের নামে।

৩. চীনে প্রাচীন আমলে বিশ্বাস করা হতো সম্রাটরা সবাই ড্রাগনের সন্তান। এ কারণে তখন সাধারণ মানুষ ড্রাগন অঙ্কিত বা ড্রাগনের ছবি সংবলিত কোনোকিছুই বহন করতে পারত না। শ্রদ্ধায় সাধারণ মানুষ মাথা অবনত করত।

৪. চাইনিজরা ড্রাগনকে দৈত্যের পরিবর্তে দেবতার আসনে বসিয়েছে। চীনের সংস্কৃতিতে ড্রাগনের অসংখ্য প্রতীক রয়েছে।

৫. সব শক্তির উৎস বলে চীনের ছেলে-বুড়ো, তরুণ-তরুণী বুকে, বাহুতে, পিঠে, হাতে, পায়ে ড্রাগনের ট্যাটু ব্যবহার করে।

৬. বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চাইনিজ ড্রাগনের যে ছবিটি আমরা দেখে থাকি তা দেখতে অনেকটা সাপের মতো লম্বা এবং তীক্ষ্ণ কিছু থাবা থাকে। কিন্তু ওয়েস্টার্ন ড্রাগনের আকৃতি একটু ভিন্নরকম।

৭. চীনের ড্রাগনের কোনো পাখা নেই। তবুও তারা উড়তে পারে।

৮. চীনে ড্রাগনের মুখ দিয়ে আগুন বের হয় না, কিন্তু অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামাতে পারে।

৯. চাইনিজ ড্রাগন সবসময় বাস করে পানিতে। কখনো সমুদ্রের অতলে, কখনো লেকের পানিতে, কখনো নদীর গভীর জলে।

১০. ড্রাগনের চাইনিজ উচ্চারণ হচ্ছে খড়হম (লং)। চীনাদের মধ্যে লং খুব জনপ্রিয় শব্দ। এ ছাড়া চীনের সর্বাধিক জনপ্রিয় তারকা ব্রুসলি, জ্যাকি চেন তাদের ছবিতে ও তাদের গায়ে ড্রাগনের ট্যাটু সবসময় শোভা পায়।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

২০১৮ সালে প্রবল ভুমিকম্পের আশঙ্কা!

কেয়া চৌধুরী এমপি’র উপর হামলার ঘটনায় মামলা

বাংলাদেশের রাজনীতি, বিকাশমান মধ্যবিত্ত এবং কয়েকটি প্রশ্ন

ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতাতে আহত ডিবি পুলিশ

প্রতিবেশীদের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকা জরুরীঃ বাংলাদেশকে মিয়ানমার

তারেক রহমানের জন্মদিন পালন করবে বিএনপি

রোহিঙ্গা শিবিরে যেতে চান প্রণব মূখার্জি

তালাকপ্রাপ্ত নারীকে অপহরণের পর গণধর্ষণ

আরো ১০ দিন বন্ধ থাকবে লেকহেড স্কুল

জাতিসংঘকে দিয়ে রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধান হবে নাঃ চীন

ম্যনইউয়ের টানা ৩৮

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সংলাপে সহায়তা করতে আগ্রহী চীন

জল্পনার অবসান ঘটালেন জ্যোতি

চীনের বেইজিংয়ে অগ্নিকাণ্ড, নিহত ১৯ আহত ৮

সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত এমপি গোলাম মোস্তফা আহমেদ

বিশ্ব সুন্দরীর মুকুট মানসী চিল্লার-এর