চীনের সেই প্রাচীর

চলতে ফিরতে

কাজল ঘোষ, চীন থেকে ফিরে | ২৬ অক্টোবর ২০১৭, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১:৩৪
কুনমিং যাচ্ছি- এটা বলা মাত্রই সকলের একটাই জিজ্ঞাসা গ্রেটওয়াল যাচ্ছো তো? কুনমিং থেকে ঢাকায় নেমে এক বন্ধুকে ফোন করতেই জানতে চাইলো, প্রাচীর কেমন দেখলাম? মহা মুশকিল! বন্ধু-সহকর্মীদের কি বলবো? গ্রেটওয়াল দেখিছি আবার দেখিনি। এটা কেমন প্যাঁচের কথা হলো। গুগল খুলে বসলাম। আর গ্রেটওয়াল সার্চ করতে লাগলাম। কি আছে তাই দেখতে? অনেক তথ্যের ভিড়ে দেখলাম ঘণ্টায় ছোট ছোট বিমান ভাড়া করে পর্যটকরা বার্ডস আই ভিউ থেকে গ্রেটওয়াল দেখতে পারে। বেসরকারি কিছু বিমান কোম্পানিও আছে।
যারা নির্ধারিত অর্থের বিনিময়ে আয়েশি মানুষদের বিমানে করে গ্রেটওয়াল দেখায়। আমার হঠাৎ মনে হলো- তাহলে তো পেইচিং না গিয়েও আমি গ্রেটওয়াল দেখেছি। কুনমিংয়ে ১৪ দিন অবস্থান শেষে ২৫শে সেপ্টেম্বর ঢাকায় ফিরি। যেদিন চেংশুই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছাড়ি তখন চীন সময় দুপুর ২টা। তখন বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টা। কুনমিংয়ের আকাশ রৌদ্রকরোজ্জ্বল। বিমান ওঠছে তো ওঠছেই। প্রথমদিকে কুনমিং শহরের পথঘাট দেখা যাচ্ছিল। ধীরে ধীরে পুরো নগরী। একসময় উঁচু উঁচু ভবনগুলো সবই পিপিলিকার মতো মনে হচ্ছিল। তারপর কেবল পাহাড় আর পাহাড়। মাঝেমধ্যে মেঘেদের ধাক্কা। কাকতালীয়ভাবে আমার আসন জানালার পাশে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই চোখ পড়ছিল নিচের অস্পষ্ট জনপদে। হঠাৎ খেয়াল করি, সাপের মতো লম্বা পথ চলে গেছে বহুদূর। এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে। তারপর আবার নিচ দিয়ে আবার অন্যকোনো পাহাড় চূড়ায়। আর নেমেছে সমান্তরাল। এই চলার যেন শেষ নেই। কখনও কখনও মনে হচ্ছিল মেঠোপথ বুঝি। যে পথে পার্বত্য এলাকায় বাসরত মানুষেরা পাহাড়ছড়া বেয়ে পথ চলে। লাল মাটি গুলিয়ে রঙ করলে যেমনটি দাঁড়াবে এপথ আসলে তেমনি। কখনও কখনও নদী বলে ভ্রম হয়েছিল। কিন্তু এটি নদী নয়। কারণ, নদী হলে নিচু বা ঢালু থেকে আবার পাহাড় ছড়ায় কিভাবে যাবে? তবু মানতাম যদি এক পাহাড়ের উঁচু থেকে নেমে নিচের দিকে যাচ্ছে। তাতো নয়। এটা পাহাড়ের পর পাহাড় একইভাবে চলছে। মাঝেমধ্যে এই ঢালু পথের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে নদী। যার আয়তন এবং দৈর্ঘ্য দেখেই ঠাহর করা যায় এটা বিশেষ কিছু। শুনেছি চাঁদ থেকে এই পৃথিবীর যদি একটি বস্তুও দেখা যায় তা নাকি চীনের গ্রেটওয়াল। যদিও এটা নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে আকাশ বা মহাকাশ থেকে চীনের প্রাচীর দেখা যায় এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ, আমি নিজেই দীর্ঘ সময় চীনের আকাশসীমায় বসে প্রাচীর দেখেছি। আর ভেতরে মহাপ্রাচীরে পদচিহ্ন না ফেলতে পারার আফসোস। রবি ঠাকুরের কবিতার লাইন দিয়ে বলতে হয়- পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে, খেয়াতরী ভিড়বে না মোর এই ঘাটে। নিজেকে কিছুটা স্বস্তি দিয়ে বলি, ফের আসা হবে প্রাচীর দেখতেই। এটা পৃথিবীর সপ্তমাশ্চর্যের একটি। চীনা ভাষায় একে বলে ‘ছাংছং’ অর্থাৎ দীর্ঘ দেয়াল। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক স্থাপনা। যা মঙ্গোলিয়ান দস্যুদের হাত থেকে চীনাদের বাঁচাতে সেনারা বানিয়েছিলেন। সে এক দীর্ঘ কথন। গ্রেটওয়াল নির্মাণের পেছনে রয়েছে হাজার বছরের ঘটনাক্রম।
প্রথম খ্রিস্টপূর্ব ২২০ থেকে ২০৬ এর সময়ে চিন সাম্রাজ্যের সম্রাট চিন শি হুয়াং চীনের উত্তরদিকের কিছু অংশে প্রাচীর নির্মাণ করেন। পাথর আর কাদায় তৈরি প্রাচীর। এটি একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। যার নির্মাণ নেপথ্যে রয়েছে অনেক নির্মমতাও।
খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ শতাব্দীতে গ্রেটওয়ালের প্রথম অংশের নির্মাণকাজের শুরু। একীভূত চীন সাম্রাজ্যের রাজা চিন হুয়াং চীনের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে মঙ্গোলিয়ানদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে প্রাচীর নির্মাণের নির্দেশ দেন। কিন্তু দীর্ঘ এই প্রাচীর নির্মাণ ছিল খুবই চ্যালেঞ্জের। প্রথম সমস্যা ছিল অবকাঠামোজনিত। কোনো রাস্তাঘাট ছিল না। তিন লাখ সেনা যারা প্রাচীর নির্মাণে যুক্ত ছিল তাদের জন্য পর্যাপ্ত খাবার আর সুপেয় পানি সরবরাহ করা কঠিন ছিল। প্রাচীরের প্রথম অংশ নির্মিত হয়েছিল কাদা দিয়ে। পরে এর স্থলে পাথরের খুঁটি স্থাপন করা হয়। প্রাচীর নির্মাণ করতে গিয়ে তারা বেশকিছু উদ্ভাবনী কৌশল প্রয়োগ করে। প্রাচীরের খাঁজে খাঁজে আগাছা জন্মানোর জন্য পরিজ রাইচ এবং চুনের সমন্বয়ে এক ধরনের আঠালো পদার্থ তৈরি করে। যা ব্যবহারে দ্রুত আগাছা জন্মাতো এবং এর ফলে দেয়ালের পিলার অনেক মজবুত হতো। যদিও এ পদ্ধতি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে দক্ষিণ চীনের মানুষের মধ্যে। কারণ পরিজ রাইচ উৎপাদন হতো চীনের এ অঞ্চলেই। প্রাচীরের দীর্ঘ ইতিহাসে এর আকৃতিগত অনেক পরিবর্তন হয়েছে। কিছু কিছু অংশ স্থানীয়দের অসাবধানতার ফলে ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রাচীরের কিছু অংশ পুনরায় নির্মাণ করেছিল বিভিন্ন সময়ে শাসকরা।
মহাপ্রাচীরের মূলভিত্তি রচিত হয় ১৫৬৯-১৫৭৫ এই সময়ে। চীনের ভৌগোলিক সীমানার উত্তর দিক ছিল সবচেয়ে নিরাপত্তাহীন। কারণ, তৎকালীন মঙ্গোলিয়ানরা ছিল যাযাবর। খাদ্যাভাব ও কাজের অভাবে তারা দস্যুবৃত্তিতে লিপ্ত ছিল হাজার হাজার বছর। মঙ্গোলিয়ানদের দক্ষিণ দিকে চীনের কয়েক হাজার মাইল এলাকায় দুই হাজার বছর মঙ্গোলিয়ানরা লুটতরাজ চালিয়েছে। এই মঙ্গোলিয়ানদের হাত থেকে স্থিতিশীলতা আনাই ছিল চীনের রাজাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগে মিং শাসনামলে। এ সময় পেইচিং ছিল মিং রাজ্যের রাজধানী। ১৫৫০ সালের সেপ্টেম্বরে মঙ্গোলিয়ানরা ভয়াবহ আক্রমণ চালায়। এ সময় মঙ্গোলিয়ানদের নেতা ছিলেন চেঙ্গিস খান-এর উত্তরসূরি দারাই সুং গুদেন খান। তিনি তার এক অন্ধ বন্দির মাধ্যমে মিং রাজার কাছে প্রস্তাব পাঠান মঙ্গোলিয়ানদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের। তাহলে তারা তাদের রাজ্যের উন্নতি করতে পারবে। মিং স্ট্রাট কিছুটা সময় চান। ভেতরে ভেতরে কাজ চলে নতুন কৌশল নির্ধারণের। অন্যদিকে এক মাস ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে মঙ্গোলিয়ানরা ফিরে গেলে পেইচিং-এর যুদ্ধ মন্ত্রীকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালানোর জন্য শিরশ্ছেদ করার পরিকল্পনা আসতে থাকে। কিন্তু কোনোটিই গ্রহণযোগ্য হয় না। অন্যদিকে এ সময় জাপানিদের সঙ্গে পরপর বেশক’টি যুদ্ধে জয়লাভ করে আলোচনার তুঙ্গে থাকে গুয়াং। জাপানিদের সঙ্গে বীরত্বের জন্য ছি চি গুয়াংকে সেনাপ্রধান করা হয়। মঙ্গোলিয়ানরা নতুন করে আক্রমণে উদ্যত হলে চিন সম্রাটকে রাজি করান প্রাচীর নির্মাণে। সেনারা শুরু করে পৃথিবীর দীর্ঘতম এই প্রাচীর নির্মাণ। চিন শি হুয়ানের পরে মিং রাজার আমল। দীর্ঘ ব্যবধান। তাতে কি মঙ্গোলদের থাবা থেকে স্বস্তি নেই শান্ত চীনকে অস্থির করতে। ১৫৬৯-এর দিকে ২০০০০ সৈন্য দিয়ে কাজ শুরু হয়। টার্গেট ছিল ৫ বছর। ইট, পাথর আর পোড়া মাটি দিয়ে নির্মাণকাজ। একেকটি ইটের ওজন ছিল ২০ কেজি। আর সেই ইট গেঁথে গেঁথে নির্মাণ হয় প্রাচীর। কয়েক শ’ গজ পরপর নির্মাণ করা হয় ওয়াচ টাওয়ার। সৈনিকরা কঠোর পরিশ্রমের ফলে নানা রোগে ভুগে হতাশ হয়ে পড়ে। অনেকের মৃত্যুও হয়। আর মৃত সৈনিকদের এই প্রাচীরের পাশেই সমাহিত করা হতো। পরে সৈনিকদের পরিবারকেও তাদের সঙ্গে কাজে যুক্ত করা হলো। এভাবে নির্ধারিত সময়েরও কিছু সময় বেশি ১৫৭৫ সালের প্রথমদিকে কাজ শেষ হয়। আর সে সময় মঙ্গোলিয়ানদের আক্রমণ সফলভাবে ঠেকানো যায়। পরে ধীরে ধীরে নানাপ্রান্তে মঙ্গোলিয়ানদের আক্রমণ ঠেকাতে প্রাচীর নির্মাণ শুরু হয়।
পরিস্থিতি বদলায়। ছি-এর শত্রুরা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠলে কুমন্ত্রনা যায় রাজার কাছে। থেমে যায় প্রাচীর নির্মাণ। তবে নানান সময়ে নির্মিত এই প্রাচীর প্রায় ৩ হাজার মাইল লম্বা। আকৃতির দিক দিয়ে পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম দেশ চীন। যার আয়তন ৯৫,৯৬,৯১৬ বর্গ কিলোমিটার। আর এই প্রাচীরের দীর্ঘ অংশ নির্মাণ করেন চিন শি হুয়াং। এরপর ছিন, হান ও মিং ডায়নেস্টি মিলে প্রায় দশ হাজার কিলোমিটারের অধিক প্রাচীর নির্মিত হয়। চীনের সাংহাই পাশ থেকে শুরু হয়ে লোপনুর নামক স্থানে শেষ হয়েছে। বাদালিং, মুথিয়ানাইয়ু, সিশাথাই, চিন শানলিং, হুয়াং হুয়া ঢং, কুপেইখৌও, চিয়ানখৌও এলাকায় প্রাচীর দর্শনার্থীদের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। এছাড়াও প্রাচীরের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে শানসি, হোপেই, পেইচিং, থিয়েনচিন, চিলিন, হুনান, হুপেই অঞ্চলে। পেইচিং থেকে সত্তর কিলোমিটার উত্তরে ইয়ানছিং কাউন্টিতে অবস্থিত ‘মুথিয়ানাইয়্যু’ পর্যটকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। সবকিছু মিলে বর্তমানে টিকে থাকা প্রাচীরের দৈর্ঘ্য ধরা হয় ৮,৮৫০ কিলোমিটার। প্রকৃত অংশ হচ্ছে ৬,২৫৯ কিলোমিটার। ৩৫৯ কিলোমিটার হচ্ছে পরিখা, ২৩২ কিলোমিটার হচ্ছে পাহাড় ও নদী। প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপে দেখা গেছে, প্রাচীরটি ২১,১৯৬ কিলোমিটারের চেয়েও লম্বা। গড় উচ্চতা ৬.৬ মিটার। কিছু অংশ ছোট আবার কিছু অংশ লম্বা। প্রাচীর লম্বায় ১০ মিটার উঁচু। প্রাচীরের মধ্যেই রয়েছে দুর্গ এবং নিরাপত্তা রক্ষীদের থাকার কক্ষ। ১৯৮৭ সালে ইউনেস্কো প্রথম একে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করে। ২০০৭ সালে এটা পৃথিবীর মধ্যে বিস্ময় কর স্থাপনা হিসেবে জায়গা করে নেয়। প্রাচীরের দৈর্ঘ্যে সূর্যও উদয়-অস্থে সময় নেয়। পশ্চিমপ্রান্তে সূর্য উঠে পূর্বপ্রান্তের ১৯ মিনিট পর।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

২০১৮ সালে প্রবল ভুমিকম্পের আশঙ্কা!

কেয়া চৌধুরী এমপি’র উপর হামলার ঘটনায় মামলা

বাংলাদেশের রাজনীতি, বিকাশমান মধ্যবিত্ত এবং কয়েকটি প্রশ্ন

ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতাতে আহত ডিবি পুলিশ

প্রতিবেশীদের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকা জরুরীঃ বাংলাদেশকে মিয়ানমার

তারেক রহমানের জন্মদিন পালন করবে বিএনপি

রোহিঙ্গা শিবিরে যেতে চান প্রণব মূখার্জি

তালাকপ্রাপ্ত নারীকে অপহরণের পর গণধর্ষণ

আরো ১০ দিন বন্ধ থাকবে লেকহেড স্কুল

জাতিসংঘকে দিয়ে রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধান হবে নাঃ চীন

ম্যনইউয়ের টানা ৩৮

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সংলাপে সহায়তা করতে আগ্রহী চীন

জল্পনার অবসান ঘটালেন জ্যোতি

চীনের বেইজিংয়ে অগ্নিকাণ্ড, নিহত ১৯ আহত ৮

সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত এমপি গোলাম মোস্তফা আহমেদ

বিশ্ব সুন্দরীর মুকুট মানসী চিল্লার-এর