চির বসন্তের দেশে ২০

মিরাকল মেডিসিনের আবিষ্কারক যিনি

চলতে ফিরতে

কাজল ঘোষ, চীন থেকে ফিরে | ২৫ অক্টোবর ২০১৭, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ২:৪৫
১৯০২ সাল। ভিয়েতনাম যুদ্ধ চলছে। দশকের পর দশক যুক্তরাষ্ট্র বোমা চালিয়েছে। সম্মুখ যুদ্ধে, গেরিলা আক্রমণে ভিয়েতনামি সেনারা আহত হয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন চীনের ইউনান সীমান্তবর্তী এলাকায়। সৈনিকরা গুলিবিদ্ধ, আহত অবস্থায় কাতরাচ্ছেন। তাদের চিৎকারে আকাশ-বাতাস বিদীর্ণ।
ঠিক সে সময় চাইনিজ ট্রাডিশনাল মেডিসিন অর্থাৎ আয়ুর্বেদিক বা ভেষজ উদ্ভিদে তৈরি ওষুধ নিয়ে গবেষণা করছেন একজন। পাশের দেশে অস্তিত্ব বাঁচাতে যারা লড়াই করছেন তাদের ব্যথা উপশমে কি করা যায় তা ভাবতে লাগলেন সেই চিকিৎসক। শুধু ভাবনাতে থেমে থাকেন নি। চষে বেড়ালেন ইউনানের বন-জঙ্গলে। ত্রিশ হাজার প্রজাতির হাইয়ার প্ল্যান্ট থেকে বাছাই করা সতের হাজার উদ্ভিদের শিকড় ও মূল নিয়ে গবেষণা করে একটি চূর্ণ আবিষ্কার করেন। যা গুলিবিদ্ধ পায়ে অথবা শরীরের যেকোনো ক্ষতে লাগালে সঙ্গে সঙ্গেই বন্ধ হয়ে যায় রক্ত। থেমে যায় ব্যথা। ক্ষত-বিক্ষত শরীরের সেই অংশ ফুলবেও না, পচনও ধরবে না। ভিয়েতনামি আহত সেই সৈনিকদের পাশে ইউনানের সেই আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক দেবদূত হয়ে হাজির হলেন। তার তৈরি সেই চূর্ণ যা চীনা ভাষায় বাই-ইয়াও (বাই মানে সাদা আর ইয়াও মানে পাউডার)- Bai“ao বিনামূল্যে দিতে লাগলেন সৈনিকদের। জাদুকরি সেই সাদা পাউডার সৈনিকদের ব্যথা উপশম করে দিলো। ভালো হয়ে আবারো তারা যুদ্ধের ময়দানে শত্রু পক্ষের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে লাগলো।
এখানেই শেষ নয়। ট্রাডিশনাল মেডিসিন নিয়ে কাজ করতে লাগলেন তিনি। নানান গাছ-গাছড়া নিয়ে চলতে লাগলো গবেষণা। ফের যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। এবার চীন-জাপান যুদ্ধ। নিজ দেশের সৈনিকরা আহত হচ্ছে তাইয়েরজাং যুদ্ধক্ষেত্রে। তাদের শুশ্রূষায় ১৯০২ সালে আবিষ্কৃত সেই পাউডার আরো বেশি করে তৈরি করতে লাগলেন। আর এবারই এ ওষুধের কার্যকারিতার কথা চীনের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লো। প্রায় ত্রিশ হাজারের বেশি বোতল সাদা পাউডার ‘ইউনান বাইইয়াও’ সৈনিকদের মধ্যে বিতরণ করা হলো। একের পর সৈনিকরা আহত অবস্থায় মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেলো। যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকরা তখন এই ওষুধটি তাদের জীবন রক্ষাকারী হিসেবে সঙ্গে রাখতো।
সবচেয়ে বিস্ময়কর হচ্ছে ১৯৪০ সালের একটি ঘটনা। কুনমিং-এ ফরাসি চিকিৎসক পরিচালিত হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে চীনা সেনা কমান্ডার ‘য়ু সুয়েসিয়ান’। সম্মুখ যুদ্ধে ডান পায়ে তিনি গুরুতর আঘাত পান। কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তার পা কেটে ফেলার পরামর্শ দেন। একথা শুনে এগিয়ে আসেন একজন। তিনি এর বিরোধিতা করেন। য়ু সুয়েসিয়ানকে দুশ্চিন্তা না করার পরামর্শ দেন। এই ক্ষতের জন্য একজন সেনা কমান্ডারের পা কেটে ফেলার দরকার নেই। এর জন্য ইউনান বাইইয়াও যথেষ্ট। সত্যিই তাই। মন্ত্রের মতো কাজ হলো। ক্ষত স্থানে সাদা পাউডার লাগানোর পর সেরে ওঠেন য়ু সুয়েসিয়ান। ধীরে ধীরে এই ইউনান বাইইয়াও দৈব ওষুধ হিসেবে তীব্র জনপ্রিয় হয়ে ওঠে চীনে। তখন থেকে চীনা সেনা সদস্যরা এই ওষুধ সব সময় সঙ্গে রাখা শুরু করে। এটা একরকম বাধ্যতামূলক। আর জাদুকরি সেই সাদা পাউডারের আবিষ্কারক চু হুয়ানজাং। যিনি চমকে দিয়েছিলেন দুনিয়াকে। ইউনানের চিনচুয়ান কাউন্টিতে জন্ম প্রতিভাবান এই চিকিৎসকের। আমেরিকায় যেমন পেনিসিলিন ছিল এক বিপ্লবী বা যুগান্তকারী ওষুধের আবিষ্কার। ঠিক চীনেও তেমনি। ব্যথা আর রক্তপাতের ইতিহাস ভিন্নভাবে লেখা শুরু হলো সেই থেকে চীনে। চু হুয়ানজাং এই সাদা পাউডারের আবিষ্কার করেছিলেন বলে এর নাম দেয়া হয় ZyQu Huaûhong panacca বা ‘চু হুয়ানজাং সর্বরোগের ওষুধ’। ধীরে ধীরে এটিই ZyYunnan Bai“ao& বা white medicine from yunnan  হিসেবে দুনিয়াজুড়ে স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯০২ সালের ভিয়েতনাম-আমেরিকা যুদ্ধ, ১৯৩৮ সালে চীন-জাপানের যুদ্ধ আর সবশেষ চীনা সেনা কমান্ডারের জীবন বাঁচিয়ে দেয়া এই ওষুধ নিয়ে সমগ্র চীন জুড়েই ভাবনা শুরু হয়। দেশজুড়ে এই আবিষ্কার মীরাকল রেমিডি (Miracle Remedy) বা আশ্চর্যজনক প্রতিকার অভিধা লাভ করে।
ফার্স্ট এইড বিবেচনায় ইউনান বাইইয়াও কোম্পানির ওষুধ চীনের দক্ষিণ বা পশ্চিম যেকোনো প্রান্তেই জনপ্রিয়। ইউনান বাইইয়াও ওষুধ দ্রুত রক্তপড়া বন্ধ করে ইনফেকশন মুক্ত করে। এর ব্যবহারে আঘাতপ্রাপ্ত স্থান ফুলে যাওয়া বা পচন ধরে না। এজন্য চীনের প্রতিটি সৈনিকের ফার্স্ট এইড হচ্ছে ইউনান বাইইয়াও। চীনের ঐতিহ্যবাহী ওষুধ শিল্পের তালিকায় ইউনান বাইইয়াও গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। দীর্ঘ পথচলায় প্রতিনিয়ত এই কোম্পানি তাদের পণ্যের মান উন্নয়নে গবেষণা করে থাকে। ইউনান বাইইয়াও গ্রুপ কর্তৃক তৈরি ঐতিহ্যবাহী আয়ুর্বেদিক ওষুধ বর্তমান চীনের আধুনিক জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বদ্ধপরিকর।
চারধাপে এই কোম্পানির ওষুধ প্রস্তুত করা হয়। প্রথম হচ্ছে ছোট ছোট বোতলে লাল রঙের পিল আকারে। যা তুলা সহকারে ব্যবহার করা হয়। এরপর ছোট বোতলে ৩০ সি সি করে পাওয়া যায় ইউনান বাইইয়াও। যা পাউডারের নির্যাস থেকে তৈরি করা হয়। এটি রোগ উপশমে মানুষ খেতেও পারে আবার ব্যবহারও করতে পারে। তৃতীয় ধাপে আছে ইউনান বাইইয়াও প্লাস্টার। যা চামড়ার ক্ষতে ব্যবহার করা হয়। চতুর্থ ধাপে এটি ক্যাপসুল আকারেও পাওয়া যায়। এটি খেতে হয়। ইউনান বাইইয়াও কোম্পানির ওষুধ পাওয়া যায় হারবাল শপ, ফুড স্টোর ও ফার্মেসিতে। বর্তমানে অনলাইনেও এই পণ্য অর্ডার দেয়া যায়। কুনমিং মেডিকেল কলেজের গবেষণায় দেখা গেছে রোগ বিবেচনায় এই ওষুধের কার্যকারিতা ৯৯.২ ভাগ। গাছের শিকড় ও মূল থেকে ইউনান বাইইয়াওর ওষুধ তৈরি হয়ে থাকে। ইউনান বাইইয়াও মূলত একটি পণ্যই তৈরি করে। তা হচ্ছে সাদা পাউডার। পরে তা দিয়ে পরবর্তীতে বিভিন্ন ক্যাটাগরির ওষুধ তৈরি হয়। এর কার্যকারিতা ও সাফল্যে ম্লান হয়ে গেছে বড় বড় অনেক কোম্পানির সফলতা। বাজারে বিক্রীত অন্যান্য ওষুধ কোম্পানির তুলনায় ইউনান বাইইয়াও কোম্পানির পণ্য দামেও সস্তা। যেমন আন্তর্জাতিক মানের তৈরি বাইইয়াও কোম্পানির একটি টুথপেস্ট ২৮ আরএমবিতে পাওয়া যায়। যা অন্য যেকোনো কোম্পানির টুথপেস্টের তুলনায় অনেক কম। স্থানীয় পণ্য হিসেবে তরুণ ভোক্তাদের কাছে এর জনপ্রিয়তা অনেক। ইউনান বাইইয়াও তাদের বাৎসরিক আয় আগামী তিন বছরের মধ্যে ১০ বিলিয়ন আরএমবিতে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। ২০০১ সাল থেকে জার্মানির একটি কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে পণ্য উৎপাদনে কাজ শুরু করেছে ইউনান বাইইয়াও। শুধুমাত্র তাদের নিজস্ব পণ্য বিক্রয়ের মাধ্যমে ২০০৮ সালে ২০০ মিলিয়ন আরএমবি আয় করেছে। যা পরবর্তীতে বেড়েই চলেছে। এই কোম্পানির উৎপাদিত টুথপেস্ট পুরো চীনে উৎপাদিত টুথপেস্টের মধ্যে রয়েছে ৫ম স্থানে।
১৯০২ সালে চু প্রতিষ্ঠিত ইউনান বাইইয়াও ধাপে ধাপে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছেছে। বর্তমানে চীনের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও সুনাম অর্জনকারী ওষুধ কোম্পানি এটি। ইউনান বাইইয়াও আমেরিকার ঘোষিত ১০টি শীর্ষ ওষুধ কোম্পানিরও একটি। চীনের স্থানীয় বাজারে ব্র্যান্ড বিবেচনায় এর অবস্থান শীর্ষে। ১৯৭১ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট চৌ এন লাইয়ের তত্ত্বাবধানে কুনমিং-এ বিশাল ক্যাম্পাসে যাত্রা শুরু করে বাইইয়াও। ১৯৯৩ সালে চীনের পুঁজিবাজারে কুনমিং-এ তালিকাভুক্ত হয় এই কোম্পানি। বর্তমানে দুই যুগ অতিক্রম করেছে পুঁজিবাজারে এই কোম্পানি। শুরু থেকে এ পর্যন্ত বাহইয়াও কখনও দরপতনের মুখোমুখি হয়নি। এর মূল্যমান বেড়েছে ধাপে ধাপে। ২০০৬ সালের অর্থনৈতিক সূচকে চীনের কোম্পানিগুলোর মধ্যে এটি শীর্ষস্থান দখল করে। ২০১১ সালে বাইইয়াও কোম্পানি আরো বৃহৎ পরিসরে তার নবতর যাত্রা ঘোষণা করে। ২০১২ সালে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে অবদানের জন্য পুরস্কার লাভ করে। ২০১৪ সালে চীনা ইন্ডাস্ট্রি অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়। কালে কালে এটি শুধু ওষুধ নয় এর বাইরে নিত্য ব্যবহার্য নানান প্রসাধনী তৈরিতেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। সবশেষে তার নানামুখী কর্মকাণ্ডের জন্য সরকার এই প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
চু হুয়ানজাং-এর মৃত্যুর পর তার পত্নী লিয়াও লানয়িং সরকারকে এই বাইইয়াও বা সাদা পাউডার তৈরির গোপন ফর্মুলা হস্তান্তর করে। তবে অন্য এক ভাষ্যে বলা হয়, চীনের কমিউনিস্ট সরকার এর গুরুত্ব বুঝতে পেরে পরিবারকে গোপন ফর্মুলা সরকারের কাছে দেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করে। পরে সরকারি চাপেই তার পরিবার গোপন ফর্মুলা হস্তান্তর করে। মজার বিষয় হচ্ছে, এই পাউডার তৈরির ফর্মুলা আজও গোপন রেখেছে চীন সরকার। সরকারিভাবে ওষুধ কোম্পানি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইউনান বাইইয়াও থেকে এই সাদা পাউডার সারা দেশে বাজারজাত করা হয়। এই বাইইয়াও ওষুধ কোম্পানির সদর দপ্তর ও কারখানা অবস্থিত কুনমিং শহরেই। এক দুপুরে আমাদের সুযোগ হয়েছে সেই কারখানা পরিদর্শনের। সুবিশাল এই কারখানার মূল উৎপাদনস্থলে সাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ নিরাপত্তার স্বার্থেই। এমনকি ভেতরের ছবিও তোলা যায় না। মূল উৎপাদনস্থল আমরা দেখতে পেরেছি কাঁচের দেয়ালের বাইরে থেকে। সম্পূর্ণ যন্ত্রনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা। মাঝে-মধ্যেই একেকজন করে কর্মী দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের কাজ শুধু মেশিন বন্ধ হয়ে গেলে তা পরীক্ষা করা। সবশেষে আমরা বাইইয়াও কোম্পানির বিক্রয় কেন্দ্রে গিয়ে কিছু ওষুধ কেনার সুযোগ পেলাম। আর শতবর্ষ পুরনো ওষুধ কোম্পানির রয়েছে নিজস্ব জাদুঘর। যেখানে রয়েছে এই ওষুধ কোম্পানি স্থাপনের সচিত্র ইতিহাস আর নেপথ্যের গল্প। কিছু পুরনো মেশিন ও যন্ত্রপাতির নমুনাও স্থান পেয়েছে প্রদর্শনী কক্ষে। রয়েছে চু হুয়ানজাং ও তার পরিবারের সদস্যদের ছবিও।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

mohsin ahmed

২০১৭-১০-২৪ ১৬:৩১:১৪

please write the name of the medicine in english

আপনার মতামত দিন

২০১৮ সালে প্রবল ভুমিকম্পের আশঙ্কা!

কেয়া চৌধুরী এমপি’র উপর হামলার ঘটনায় মামলা

বাংলাদেশের রাজনীতি, বিকাশমান মধ্যবিত্ত এবং কয়েকটি প্রশ্ন

ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতাতে আহত ডিবি পুলিশ

প্রতিবেশীদের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকা জরুরীঃ বাংলাদেশকে মিয়ানমার

তারেক রহমানের জন্মদিন পালন করবে বিএনপি

রোহিঙ্গা শিবিরে যেতে চান প্রণব মূখার্জি

তালাকপ্রাপ্ত নারীকে অপহরণের পর গণধর্ষণ

আরো ১০ দিন বন্ধ থাকবে লেকহেড স্কুল

জাতিসংঘকে দিয়ে রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধান হবে নাঃ চীন

ম্যনইউয়ের টানা ৩৮

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সংলাপে সহায়তা করতে আগ্রহী চীন

জল্পনার অবসান ঘটালেন জ্যোতি

চীনের বেইজিংয়ে অগ্নিকাণ্ড, নিহত ১৯ আহত ৮

সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত এমপি গোলাম মোস্তফা আহমেদ

বিশ্ব সুন্দরীর মুকুট মানসী চিল্লার-এর