রহস্যঘেরা ডাইনোসর ভ্যালি

চলতে ফিরতে

কাজল ঘোষ, চীন থেকে ফিরে | ২৪ অক্টোবর ২০১৭, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:৪০
কুনমিং-ত্বালি ৫ থেকে ৬ ঘণ্টার পথ। সবমিলিয়ে ৩২৫ কিলোমিটার। পুরোটাই পাহাড়ি পথ। অভ্যাসবশত তাকিয়ে দেখছি বাইরের দৃশ্য। আর কোন এলাকার পর কোন এলাকা। কিছু কিছু এলাকার নাম নোট নিচ্ছিলাম।
দেড় ঘণ্টার মতো পথ যাওয়ার পর রোডমার্কে লেখা দেখলাম এরপর ডাইনোসর ভ্যালি। এখানে ডাইনোসর বলে কি! ১৯৯৩ সালে দুনিয়াজুড়ে সাড়া ফেলেছিল স্টিভেন স্পিলবার্গের ছবি জুরাসিক পার্ক। সফলতায় ২০১৫ সালে তিনি বানান ‘জুরাসিক ওয়ার্ল্ড’। স্পিলবার্গের নির্মাণশৈলী অন্যরকম। কোটি কোটি বছর আগের বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এই প্রাণীদের তিনি আমাদের চেনালেন নতুন করে। ১৯৯৩ সালে জুরাসিক পার্ক মুক্তি পেলে তার ৫ বছর পর ঢাকায়ও মুক্তি পায় ছবিটি। মধুমিতায় বড় পর্দায় দেখতে গিয়েছিলাম। স্টুডিও সারাওন্ড সাউন্ড সিস্টেমে তখন মধুমিতাতেই ছবি প্রদর্শিত হতো। পুরো তিন ঘণ্টা এক দুর্দমনীয় অভিযানে শরিক হলাম। শব্দশৈলীর বহিঃপ্রকাশ এমনভাবে হচ্ছিল যে, পেছন থেকে ডাইনোসর দল আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছিল- এমনটাই মনে হচ্ছিল বারবার। স্পিলবার্গ ছবির শুরুতে বলে দেন তিনি কি দেখাতে চান। দর্শকরা সেভাবেই প্রস্তুতি নিয়ে ছবিটি দেখতে শুরু করেন এটাই হচ্ছে স্পিলবার্গের নান্দনিকতা। আমরা জানতাম এটা একটি পার্কে বন্দি ডাইনোসরদের বেরিয়ে পড়ার গল্প। একদল মানুষ সেই ডাইনোসরদের খপ্পরে পড়বে এবং তাদের সঙ্গে লড়ে সভ্যতায় টিকে থাকবে তাই প্রদর্শিত হবে। কিন্তু সব ভুলে গেলাম ছবি শুরুর পর থেকে। ১৯৯৮ থেকে ২০১৭। উনিশ বছর পর নতুন এক অভিজ্ঞতা। এখন ডাইনোসর নিয়ে কৃত্রিমভাবে নির্মিত কোনো ছবি নয়। সরাসরি ডাইনোসর ভ্যালিতে। যেখানে ডাইনোসররা বাস করতো। দলে দলে ঘুরে বেড়াতো। খেলা করতো সন্তানদের নিয়ে। আর তর্জন-গর্জনে কেঁপে উঠতো চারপাশ। কোটি কোটি বছর আগে ইউনানের এই এলাকাটা কেমন ছিল? কল্পনায় দেখতে ইচ্ছে করছিল সেই সময়কাল। গাইড আমাদের সকলের উৎসাহ দেখে ডাইনোসর ভ্যালিতে পৌঁছাবার আগেই দিতে লাগলেন নানা তথ্য। গাইডের বর্ণনা শুনছিলাম। কিন্তু আমাদের চোখ চলছে পাশ থেকে সাঁই সাঁই করে চলে যাওয়া ভ্যালিগুলোর ওপর। ডাইনোসরের বাংলা অর্থ ‘ভয়ঙ্কর গিরগিটি’। গ্রিক শব্দ উজঞগঙঝ (ভয়ঙ্কর) আর ঝঅটজঝ (গিরিগিটি) এই দুটো শব্দ মিলে হয়েছে। এই পৃথিবীতে ডাইনোসরের অস্তিত্ব যিনি প্রথম আবিষ্কার করেন তার নাম রিচার্ড ওয়েন। ধারণা করা হয় ১৬৫ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে ডাইনোসরদের রাজত্ব ছিল। ডাইনোসরদের বড় হাড় ও দাঁত নিয়ে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন এরা সবাই ছিল সরীসৃপ। এরা আকারে ছিল একেকটি একেকরকম। বিশাল শরীর নিয়ে তারা ছুটে বেড়াতো। দুনিয়াজুড়ে এই প্রাণী নিয়ে এ যাবৎ নানা গবেষণা হয়েছে। বলা যায় এখনো চলছে। ডাইনোসরের যুগকে ১৩টি যুগে ভাগ করা হয়- প্যালিত্তজোয়িক মহাযুগ, মেসোজোয়িক মহাযুগ, প্রি-ক্যামব্রিয়ান মহাযুগ, ক্যামব্রিয়ান যুগ, ওর্গেভিসিয়ান যুগ, সিলুরিয়ান যুগ, ডেভোনিয়ান যুগ, কার্বোনিফেরাস যুগ, পারমিয়ান যুগ, ট্রাসিক যুগ, জুরাসিক যুগ, ক্রিটোসিয়াস যুগ, টার্সিয়ারি ও কোয়াটানারি যুগ। এ সময়কালে নানা প্রজাতির ডাইনোসর পৃথিবীতে রাজত্ব করেছে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন ডাইনোসরের ফসিল ও ডিম উদ্ধার করে ৫০০ প্রজাতির জীবাশ্ম রেকর্ড করছেন বিজ্ঞানীরা। তারা ধারণা করছেন ১৮৫০ প্রজাতির ডাইনোসরের অস্তিত্ব ছিল। যা এখনো প্রমাণিত হওয়ার অপেক্ষায়। এই ডাইনোসরগুলো কোনটি মুরগির বাচ্চার মতো ছোট ছিল আবার কোনটি ১০০ ফুট পর্যন্ত লম্বা ছিল। এরা দল বেঁধে ছুটে বেড়াতো। পৃথিবী পরিবর্তনেই এরা বিলুপ্ত হয়ে যায়। পরিবর্তিত তাপমাত্রায় এরা তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারেনি। ২২৫ মিলিয়ন বছর আগে ট্রায়সিক যুগে পৃথিবীর সবগুলো মহাদেশ একসঙ্গে জোড়া লাগানো ছিল। তখন পৃথিবী ছিল উষ্ণ। বৃষ্টিপাত হতো প্রচুর। ঘন জঙ্গল আর পাহাড়ে পূর্ণ ছিল। যা ছিল বিশালাকৃতির ডাইনোসরদের বসবাসের জন্য উপযুক্ত। কিন্তু ১৪ মিলিয়ন বছর আগে হঠাৎ গরম আবার হঠাৎ ঠাণ্ডা। তাপমাত্রার এই টালমাটাল অবস্থায় তাল মেলাতে পারেনি ডাইনোসর দল। ফলে ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু রহস্য শুরু হয় নতুনভাবে। ডাইনোসর নিয়ে নতুনভাবে আলোচনায় আসে চীন। চীনের ইউনানের ডাইনোসর ভ্যালিটি একদল কৃষকের আবিষ্কার। কৃষিকাজ করতে গিয়ে ১৯৩৮ সালের দিকে তারা দেখতে পায় হাড়গোড়। এই বিশাল আকৃতির হাড় সবই ডাইনোসরের। আমরা ডাইনোসর ভ্যালি বলে যে জায়গাটিতে বিশ্রাম নেয়ার জন্য নেমেছিলাম এটি ঠিক তার পেছনেই। লুফেং এলাকা বলে পরিচিত। ১৯৩৮ সালে এখান থেকে ১৫০টি পূর্ণাঙ্গ ডাইনোসরের কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। ছিল বেশকিছু হাড়ও। বিস্ময়কর হচ্ছে এই ডাইনোসররা সবাই শুয়ে ছিল পূর্বমুখী হয়ে। চীনের হুনান প্রদেশকে বলা হয় ডাইনোসরের জন্মস্থান আর ইউনানকে বলা হয় বাসস্থান। কারণ, হুনানে রয়েছে একটি মিউজিয়াম। যেখানে প্রায় ১০ হাজার ডাইনোসরের ডিমের ফসিল রয়েছে। যা সেই এলাকার বিভিন্ন পাহাড় এমনকি বাড়িঘর থেকে পাওয়া। কিছুদিন আগে  দক্ষিণ চীনের গুয়াংডু এলাকার একটি বাড়ি থেকে ২৩১টি ডাইনোসরের ডিমের ফসিল উদ্ধার করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন চীনের বেশকিছু এলাকায় আদিকালে ডাইনোসরদের বাস ছিল। হুনান এলাকার মিউজিয়ামটি গিনেস বুকের রেকর্ডে নাম লিখিয়েছে।
একই রকমভাবে চীনের চচিয়াং এদোন থেকেও মাটি খুঁড়ে ৮২টি ডাইনোসরের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন জীবাশ্মগুলো সাড়ে ৬ থেকে ১৪ কোটি বছরের পুরনো। চচিয়াং প্রদেশের ১১ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে আছে ডাইনোসরের জীবাশ্ম। ধারণা করা হয় এ অঞ্চলে এক সময় জুরাসিক পার্ক ছিল। চীন সরকার প্রাচীন ঐতিহ্য, পুরাকীর্তি এমনকি ডাইনোসরের ফসিল, ডিমের এ ফসিল নিয়ে সবরকম ব্যবসা নিষিদ্ধ করেছে। ফিরছি ইউনানের ডাইনোসর ভ্যালিতে। এখানকার উদ্ধারকৃত ডাইনোসরের ১৫০টির কঙ্কালই পূর্বদিকে থাকায় ধারণা করা হয় উত্তর চায়নার হুনানে ডাইনোসর জন্মালেও ইউনানে এসে তাদের মৃত্যু হয়। ইউনানের ডাইনোসর ভ্যালি হচ্ছে তাদের কবরস্থান। তাই তো দলে দলে এরা এখানে এসে শেষ শয্যা নিয়েছে। তবে এ এলাকায় উদ্ধারকৃত ফসিল সাক্ষ্য দেয় অন্তত ৭০০ ডাইনোসরের অস্তিত্ব ছিল। এরা বেশিরভাগই ভেজিটেবল ডাইনোসর। উদ্ধারকৃত হাড় ২০-২৫ মিটার লম্বা ছিল। যা ডাইনোসরদের বড় প্রজাতিগুলোর একটি। তথ্যগুলো জানতে জানতেই আমাদের গাড়ি থামে ডাইনোসর ভ্যালিতে।
সেখানকার বিশ্রামাগারে যখন দাঁড়িয়ে চায়ের কাপে চুমুক দেয়ার কথা ভাবছি মনে হচ্ছিল সামনের এই উপত্যকা থেকে বুঝি উঁকি দিচ্ছে ডাইনোসর। দূরে কোথাও ওদের গলার আওয়াজ জানান দিচ্ছে এখনো বহাল তবিয়তে আছে ডাইনোসর দল। গা শিউরে উঠছিল ডাইনোসরের বাসভূমিতে আমরা। গাইড আমাদের কথা দিয়েছে এখানেই আছে ‘ডড়ৎষফ উরহড়ংধঁৎং ঠধষষু’। ফেরার পথে আমাদের দেখাবেন। পরে অবশ্য সময় স্বল্পতায় সেই জাদুঘরে যাওয়া হয়নি।
ডাইনোসরের বসতবাড়ি
ডাইনোসর ভ্যালি কুনমিং থেকে আশি কিলোমিটার পশ্চিমের শহর লুফেং-এ অবস্থিত। এই ভ্যালি ১৯৩৮ সালে কৃষকরা শনাক্ত করে। পরবর্তীতে স্থানীয় লোক এবং চীন ও বিদেশের বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞ দল প্রায় ১৫০টি পুরো অক্ষত কঙ্কাল এবং অনেক টুকরো হাড় উদ্ধার করে। উদ্ধারকৃত হাড়ের মধ্যে ‘দি ইপুনিমাস লুফেং গোসরাস’ প্রথম আবিষ্কৃত হয় এই অঞ্চলেই।
২০০৮ সাল থেকে ‘ওয়ার্ল্ড ডাইনোসর ভ্যালি’ সর্ব সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। স্থানীয় সরকার এই ভ্যালিকে একটি পর্যটন কেন্দ্রে রূপ দেয়। দর্শনার্থীদের পার্কের প্রবেশদ্বার থেকে বৈদ্যুতিক ট্রামে করে নিয়ে যাওয়া হয় জাদুঘরের মূল ভবনে।
জাদুঘরের সম্মুখভাগ দেখলে মনে হবে জুরাসিক পার্ক ছবি থেকে নেয়া কোনো দৃশ্য। সুদৃশ্য হাঁটার পথ, বড় বড় লেক, লেকের মধ্যে ডাইনোসরের মূর্তি সবদিকে। ভ্যালিতে একটি আবদ্ধ খনন এলাকা আছে সেখানে কিছু কঙ্কাল মাটির নিচে দেখা যায় এবং কিছু কূপ দেখা যায় যেখানে প্রচুর ডাইনোসরের হাড়। এই হাড়গুলো দর্শনার্থীরা স্পর্শ করতে পারে। মিলনায়তনের ভেতরে দেখা যায় ডজনখানেক ডাইনোসরের কঙ্কাল। কঙ্কালগুলো এমনভাবে রাখা আছে মনে হয় পাল বেঁধে ডাইনোসর দৌড়াচ্ছে। মিলনায়তনের ভেতর অন্ধকার শুধু প্রদর্শনী লাইট ছাড়া। এই লাইটগুলো অদ্ভুত সুন্দর আবহ সৃষ্টি করে। আবার একটু ভীতিরও সঞ্চার করে দৈত্যাকৃতির ডাইনোসরগুলো দেখে। পৃথিবীর বিভিন্ন জাদুঘরে একটি বা দুটি ডাইনোসরের কঙ্কাল দেখতে পাওয়া যায় কিন্তু এখানে ডজনে ডজনে বিভিন্ন ভঙ্গিমার ডাইনোসর দেখতে পাওয়া যায়। ডাইনোসরের ফসিল এলাকাটি প্রায় ১০,০০০ স্কয়ার মিটার। যেটি পৃথিবীতে সর্ববৃহৎ ডাইনোসর পার্ক। ৩০ সেট-এর অধিক একক ডাইনোসর ফসিল প্রদর্শনীতে আছে। ১২ প্রজাতির দুর্লভ ডাইনোসরের মাথার খুলি রয়েছে এই জাদুঘরে।
লুফেং ডাইনোসরের পাঁচ রহস্য
১.    সব ডাইনোসর কেন্দ্রীভূত কেন? কেন এক জায়গায় এসে সব ডাইনোসর জড়ো হলো?
২.    সময় ও স্থান: আদি, মধ্য ও বিগত জুরাসিক যুগের সব ডাইনোসর একই স্থানে কেন? আর বিবর্তনের ধারায় সবগুলো ফসিল কিভাবে এত নিখুঁত রয়ে গেল?
৩.    সব ডাইনোসর দল বেঁধে বিলুপ্তির কারণ কী, যে ডাইনোসর ১৬০ মিলিয়ন বছর পৃথিবীতে রাজত্ব করেছিল?
৪.    সব ডাইনোসর পূর্বমুখী কেন? পূর্বে কি হয়েছিল?
৫.    ডাইনোসর ফসিল: ডাইনোসরিয়ান ডিম ফসিল পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু লুফেং-এ যে ফসিল পাওয়া গেছে তা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বৈচিত্র্য বা নানান ধরনের। আর কেন এই ভিন্নতা? কেন লুফেং-এ ডাইনোসরিয়ান ডিমের ফসিল পাওয়া যায়নি? এই রহস্যের কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি এখনো বিজ্ঞানীরা।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

২০১৮ সালে প্রবল ভুমিকম্পের আশঙ্কা!

কেয়া চৌধুরী এমপি’র উপর হামলার ঘটনায় মামলা

বাংলাদেশের রাজনীতি, বিকাশমান মধ্যবিত্ত এবং কয়েকটি প্রশ্ন

ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতাতে আহত ডিবি পুলিশ

প্রতিবেশীদের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকা জরুরীঃ বাংলাদেশকে মিয়ানমার

তারেক রহমানের জন্মদিন পালন করবে বিএনপি

রোহিঙ্গা শিবিরে যেতে চান প্রণব মূখার্জি

তালাকপ্রাপ্ত নারীকে অপহরণের পর গণধর্ষণ

আরো ১০ দিন বন্ধ থাকবে লেকহেড স্কুল

জাতিসংঘকে দিয়ে রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধান হবে নাঃ চীন

ম্যনইউয়ের টানা ৩৮

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সংলাপে সহায়তা করতে আগ্রহী চীন

জল্পনার অবসান ঘটালেন জ্যোতি

চীনের বেইজিংয়ে অগ্নিকাণ্ড, নিহত ১৯ আহত ৮

সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত এমপি গোলাম মোস্তফা আহমেদ

বিশ্ব সুন্দরীর মুকুট মানসী চিল্লার-এর