কেন উত্তরাধিকার বেছে নেবেন না শি জিনপিং?

বিশ্বজমিন

মাহমুদ ফেরদৌস | ২৩ অক্টোবর ২০১৭, সোমবার
চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর উত্তরাধিকারী হিসেবে একসময় ভাবা হতো হু চুনহুয়াকে। তিনি দেশটির ক্ষমতাসীন কম্যুনিস্ট পার্টির গুয়াংডং প্রদেশ প্রধান। আগামী মার্চে তিনি হয়তো উপ-প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। কিন্তু চলমান দলীয় কংগ্রেস শেষে কম্যুনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী স্তর পলিটব্যুরো স্থায়ী কমিটিতে তাকে অন্তর্ভূক্তির সম্ভাবনা ক্রমেই কমছে। বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে এ খবর দিয়েছে হংকং-ভিত্তিক প্রখ্যাত পত্রিকা সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।
অপরদিকে চোংকিং প্রদেশের দলীয় প্রধান চেন মিনার হয়তো ২৫ সদস্য-বিশিষ্ট পলিটব্যুরোতে পদন্নোতি পেতে পারেন।
চীনা রাজনীতির এই উদীয়মান তারকাকে খোদ প্রেসিডেন্টের শিষ্য ভাবা হয়। কিন্তু তিনিও ৭ সদস্যের পলিটব্যুরো স্থায়ী কমিটিতে জায়গা পাবেন না।
হু চুনহুয়া এখনই পলিটব্যুরোর সদস্য। আর চেন মিনার বর্তমানে একধাপ নি¤œবর্তী কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। সবার ওপরে হলো পলিটব্যুরো স্থায়ী কমিটি। এই কমিটিই চীনা রাজনীতির সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। মঙ্গলবার চীনা কম্যুনিস্ট পার্টির জাতীয় কংগ্রেস সমাপ্ত হবে। তারপরই স্থায়ী কমিটিতে কাউকে অন্তর্ভূক্ত করার কথা। কিন্তু হু চুনহুয়া (৫৪) ও চেন মিনারের (৫৭) যদি পলিটব্যুরো স্থায়ী কমিটিতে জায়গা না হয়, তাহলে ২০২২ সাল নাগাদ প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর কোনো পরিগণিত উত্তরাধিকারী স্থায়ী কমিটিতে থাকবে না। ততদিনে কম্যুনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক তথা দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ৫ বছর-ব্যাপী দুই মেয়াদ পূরণ হয়ে যাবে তার।
স্থায়ী কমিটিতে জায়গা পাওয়ার দৌড়ে হু চুনচুয়া ও চেন মিনারের আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। ৫৪ বছর বয়সী সান ঝেংচাই ছিলেন দলের চোংকিং প্রাদেশিক সভাপতি। কিন্তু অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা চালানোর অভিযোগে তাকে গত মাসেই দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে এখন দুর্নীতির অভিযোগে ফৌজদারি তদন্ত চলছে।
চীনে প্রেসিডেন্ট সাধারণত ৫ বছর করে সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। কিন্তু চীনে আলোচনা চলছে যে, শি জিনপিং যেভাবে কর্তৃত্ববাদী কায়দায় দেশ চালাচ্ছেন, তিনি হয়তো নিজের জন্য নিয়ম সংস্কার করবেন। থাকবেন দুই মেয়াদেরও বেশি! যদি হু চুনহুয়া ও চেন মিনারকে পলিটব্যুরো স্থায়ী কমিটিতে না নেওয়া হয়, তাহলে এই গুজব আরও উস্কে উঠবে। কিন্তু দলীয় সূত্রগুলো বলছে, এখনই এই উপসংহারে পৌঁছানো উচিত হবে না।
তারা বলছেন, দুই উদীয়মান নেতাকে যদি সত্যিই পদোন্নতি দেওয়া না হয়, তাহলে তা হবে দলের বর্তমান ক্ষমতা স্থানান্তর পদ্ধতি নিয়ে প্রেসিডেন্টের অসন্তুষ্টির প্রতিফলন। চীনে নেতৃত্ব স্থানান্তর প্রক্রিয়া ঐতিহাসিকভাবেই কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ এক প্রক্রিয়া। মাও সেতুং নিজেই তার উত্তরাধিকারী তিন বার পরিবর্তন করেছিলেন! এর মধ্যে প্রথম দু’ জনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু মাও সেতুং-এর বেছে নেওয়া সর্বশেষ উত্তরাধিকারীও ক্ষমতার স্বাদ বেশিদিন পান নি। দলের অভ্যন্তরে আরও শক্তিশালী অংশ তাকে হটিয়ে দেয়। ক্ষমতা গ্রহণ করেন ডেং শিয়াওপিং। শিয়াওপিং চীনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করে আছেন। তিনিও নিজের দুই শিষ্যকে বাদ দিয়ে তৃতীয় আরেক শিষ্য জিয়াং জেমিনকে উত্তরাধিকারী হিসেবে বেছে নেন।
মাত্র ২০০২ সাল থেকে দলের নেতৃত্ব হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক একটি প্রক্রিয়ার অধীনে নিয়ে আসা হয়। ওই বছর জিয়াং জেমিন পদত্যাগ করেন। ক্ষমতা নেন হু জিনতাও। ততদিনে পলিটব্যুরো স্থায়ী কমিটিতে ১০ বছর হয়ে গিয়েছিল হু জিনতাওর। ১৯৯২ সালে স্থায়ী কমিটিতে হু জিনতাওকে নিয়ে গিয়েছিলেন খোদ ডেং শিয়াওপিং। তিনি চেয়েছিলেন নিজের উত্তরাধিকারী জিয়াং জেমিনের পর ওই জায়গা যাতে হু জুনতাও পান। অর্থাৎ, জিয়াং জেমিন প্রেসিডেন্ট থাকার সময় হু জিনতাও ছিলেন তার ‘নির্ধারিত উত্তরাধিকারী।’ তা-ই ঘটেছিল। কিন্তু তারপরও কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের ক্ষমতাধর চেয়ারম্যান পদটি জিয়াং জেমিন ছেড়েছিলেন প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়ারও ২ বছর পর।
২০১২ সালে নিজের সমস্ত দলীয় পদ শি জিনপিং-এর কাছে হস্তান্তর করেন হু জিনতাও। শি তার ৫ বছর আগ থেকে পলিটব্যুরো স্থায়ী কমিটির সদস্য। সদস্য হওয়ার এক বছর পর তিনি হন ভাইস প্রেসিডেন্ট, বা কার্যত ‘নির্ধারিত উত্তরাধিকারী’। শি জিনপিং-এর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক মসৃণ। এ জন্য শি জিনপিং তার পূর্বসূরির ‘উঁচু নৈতিকতা’র প্রশংসাও করেন।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, আগেভাগে উত্তরাধিকারী ঠিক করে রাখার এই চর্চা স্থিতিশীলতার বোধ তৈরি করে দলের মধ্যে। কিন্তু ‘নির্ধারিত উত্তরাধিকারী’ হওয়ার পর হু জিনতাও এবং পরে শি জিনপিং - উভয়কেই খুব সতর্ক থাকতে হয়েছিল। অনেক বছর ধরে তারা নিজেদের ব্যাপারে বেশি কিছু প্রকাশ না করার ব্যাপারে তটস্থ ছিলেন। এছাড়া কোনো অবস্থায় যাতে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘিত না হয় সেদিকেও খেয়াল ছিল তাদের। কারণ, অনেক উত্তরাধিকারীর তিক্ত পরিণতির ইতিহাস তাদের জানা ছিল।
এক সূত্রের ভাষায়, ‘উত্তরাধিকারী নির্ধারিত থাকলে তাকে টার্গেট করা সহজ হয়ে যায়। দলের বিভিন্ন অংশ তাকে খাটো করতে ফাঁদ পাতে। আর বিভিন্ন সুবিধা পেতে আগ্রহীরা তার সঙ্গে ভাব গড়ে তোলার চেষ্টা করে।’ এছাড়া এমনও ঝুঁকি থেকে যায় যে, উত্তরাধিকারী শক্ত কেউ হলে, খোদ ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের সঙ্গেই ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে। অপরদিকে উত্তরাধিকারী দুর্বল কেউ হলে, দলীয় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও লড়াই বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হয়।
এক সূত্র জানায়, ‘সান ঝেংচাইর পতন ও তাকে বরখাস্তের ঘটনা প্রকাশের সময় বেশ ভালোভাবেই ইঙ্গিত দেয় যে, শি জিনপিং উত্তরাধিকারী নির্ধারণের প্রচলিত সিস্টেম থেকে বের হতে চান। একে সংস্কার করতে চান।’ কিন্তু শি জিনপিং এক্ষেত্রে কি পরিকল্পনা আঁটছেন, সেটি স্পষ্ট নয়। সাধারণ নিয়ম হলো, একদল নেতার মধ্য থেকে সম্ভাব্য কয়েকজনকে আগে বাছাই করা। এবং সেখান থেকেই একজনকে তার পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে উত্তরাধিকারী নির্বাচন করা। কিন্তু সূত্রটি বলছে, ‘এই ইস্যু এখনই সমাধান করার তাড়া নেই প্রেসিডেন্টের। তার অগ্রাধিকার ও নজর হলো তার দ্বিতীয় মেয়াদকে ব্যবহার করে লক্ষ্য পূরণ করা যায়। আগামী ৫ বছরে অনেক কিছুই ঘটতে পারে।’
কম্যুনিস্ট পার্টির ১৯ তম জাতীয় কংগ্রেস শুরু হয়েছিল বুধবার থেকে। শেষ হবে মঙ্গলবার। দলের নতুন যেই কেন্দ্রীয় কমিটি নির্বাচিত হবে তাদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সভা হবে পরের দিনই। আনুষ্ঠানিকভাবে সেখান থেকেই পলিটব্যুরো ও পলিটব্যুরো স্থায়ী কমিটির নতুন সদস্য নির্বাচিত হবে। এভাবেই পূর্ণ হবে দলীয় নেতৃত্ব রদবদল প্রক্রিয়া।
এরপরই দলীয় নেতারা আলোচনা করবেন। আগামী বসন্তে অনুষ্ঠেয় কেন্দ্রীয় কমিটির দ্বিতীয় অধিবেশনে তারা সিদ্ধান্ত নেবেন বিভিন্ন প্রদেশের দায়িত্ব কাকে দেওয়া যায়। মার্চে অনুষ্ঠেয় চীনের আইনসভা তথা ন্যাশনাল পিপল’স কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনের আগেই এসব প্রক্রিয়া শেষ হবে। এই অধিবেশনেই প্রস্তাবিত পরিবর্তনসমূহ আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হবে।
বুধবার ২৫ সদস্যের পলিটব্যুরো কমিটির তালিকা প্রকাশিত হবার পর সেখানে হু চুনহুয়া ও চেন মিনার উভয়ের নামই থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। তবে এই পদায়ন চূড়ান্ত হতে তাদেরকে মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। হু চুনহুয়া পলিটব্যুরোতে এখনই সদস্য। এর আগে তিনি ইনার মঙ্গোলিয়া ও গুয়াংডং প্রদেশে দলীয় প্রধান ছিলেন। প্রাদেশিক পর্যায়ে তার অভিজ্ঞতার পাল্লা বেশ ভারি। ফলে তিনি উপ-প্রধানমন্ত্রী পদে এগিয়ে। অপরদিকে গুইঝো প্রদেশে দলীয় প্রধান থাকাকালে দারিদ্র্য দূরীকরণ ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তির প্রয়োগ দেখানোর জন্য প্রশংসিত হয়েছিলেন চেন মিনার। ফলে চোংকিং প্রদেশ দলীয় প্রধান পদ থেকে সান ঝেংচাইকে যখন অভ্যুত্থান ষড়যন্ত্রের অভিযোগে বরখাস্ত করা হয়, তখন তার স্থলাভিষিক্ত করা হয় চেন মিনারকে। এই বদলিকে অনেক রাজনৈতিক প-িত দেখছিলেন চেন মিনারের ওপর দলীয় নেতৃত্বের আস্থার ইঙ্গিত হিসেবে।
(সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট-এ প্রকাশিত ‘হোয়াই চায়না’স শি জিনপিং ইজ আনলাইকলি টু অ্যানয়েন্ট অ্যা সাকসেসর’ নিবন্ধের অনুবাদ।)

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক আকরাম ৮ দিনের রিমান্ডে

টসে জিতে ফিল্ডিংয়ে রংপুর

বাড়ি ফিরেছেন নিখোঁজ ব্যবসায়ী অনিরুদ্ধ রায়

শিক্ষার্থীদের মাথা ন্যাড়ার শর্তে এসএসসি’র ফরম পূরণ!

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে

একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ

শিক্ষিকা-ছাত্রের যৌন সম্পর্ক, অতঃপর...

রাবি অপহৃত ছাত্রী ঢাকায় উদ্ধার

‘সমাবেশে জোর করে লোক আনা হয়েছে’

সমাবেশ মঞ্চে শেখ হাসিনা

যুদ্ধাপরাধের ২৯তম রায়ের আপেক্ষা

ঈদে মিলাদুন্নবী নিয়ে চাঁদ দেখা কমিটির সভা কাল

সিরিয়া ইস্যুতে আবারো রাশিয়ার ভেটো

হারিরির সৌদি আরব ত্যাগ

ঢাকায় চীন-বাংলাদেশ বৈঠক শুরু

প্যারাডাইস পেপারসে শিল্পপতি মিন্টু ও তার পরিবারের নাম