শাসন যেখানে বাছবিচারহীন

প্রথম পাতা

ম্যাক্স ফিশার | ২৩ অক্টোবর ২০১৭, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ১:২৭
প্রায় এক দশক আগে সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের যাত্রা শুরু করে মিয়ানমার। শুরুতে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হলেও, এই যাত্রা এখন এমন দিকে মোড়  নিয়েছে যেটা গণতন্ত্রপন্থি অ্যাক্টিভিস্ট ও বিশ্বনেতারা একদমই আশা করেননি। দেশটিতে এখন নাগরিকের ভোটে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হন বটে। কিন্তু গণতন্ত্র কার্যকর হতে যেই শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি এবং বহুত্ববাদ, সর্বজনীন অধিকার কিংবা সহিষ্ণুতার মতো বৈশিষ্ট্য দরকার, সেটি বার্মিজ সমাজে একেবারেই অনুপস্থিত।
জনগণের মধ্যে একনায়ক ধাঁচের নেতা ও সংখ্যাগুরুর শাসন প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা বিরাজ করছে। জনমত জরিপ কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম- সর্বত্রই এই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। অনেকের মত হলো, গণতন্ত্র চলবে ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ ও জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে।
সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সামরিক বাহিনীর চালানো জাতিগত নির্মূলাভিযান দেশজুড়ে বেশ জনপ্রিয় হয়েছে।
সাংবাদিক ও সংখ্যালঘুদের ওপর এক ধরনের সামাজিক নিয়ন্ত্রণ বেশ জোরালো। অং সান সুচির নেতৃত্বাধীন বেসামরিক সরকার বেশ দ্রুতগতিতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করছে। ভারসাম্যের ব্যবস্থা ক্রমেই ক্ষীয়মাণ। সরকার কিছু অঞ্চলে বেশ প্রবল, আর কিছু ক্ষেত্রে দুর্বল। চরমপন্থি ধর্মীয় নেতারা বেশ প্রভাবশালী। অপরদিকে সামরিক বাহিনী এখনো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি বিভাগের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পার্লামেন্টে তাদের আছে স্থায়ী কোটা।
দৃশ্যত, গণতন্ত্র ও কর্তৃত্ববাদের মিশ্রণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশটি। একে আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয় অনুদার গণতন্ত্র। সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠীর শাসনের একটি সংস্করণ এটি, যেখানে সংখ্যালঘুর কোনো স্থান নেই। স্বাধীনতা যেখানে সীমিত। শাসন যেখানে বাছবিচারহীন। ইতিহাসবিদ ও সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা থান্ট মিন্ট-ইউ বলেন, ‘একনায়কতন্ত্রে ফেরত যাওয়া নয়, বরং এই অনুদার গণতন্ত্রই এখন মিয়ানমারের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।’
মাত্র কয়েক বছর হলো গণতন্ত্রে পদার্পণ করেছে মিয়ানমার। কিন্তু এখনই দেশটি দ্বিতীয় এক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা হতে পারে প্রথমটির মতোই সুদূরপ্রসারী।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞানী জ্যাক স্নাইডার নব্বইয়ের দশকে একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেন যে, কেন বেশ কয়েকটি নব্য-গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র খুব দ্রুতই যুদ্ধে লিপ্ত হয় কিংবা একনায়কতন্ত্রে পরিণত হয়। মিয়ানমার দৃশ্যত স্নাইডারের ওই প্যাটার্নই অনুসরণ করছে।
সাধারণত বলা হয়ে থাকে, ওই রাষ্ট্র বা সমাজ আসলে গণতন্ত্রের জন্য প্রস্তুত ছিল না। এ কারণেই তারা একনায়কতন্ত্রে ফিরে যায়। কিন্তু স্নাইডার প্রমাণ করেন বিষয়টি আরো জটিল। তিনি বলেন, বেশ দ্রুতগতিতে গণতন্ত্রে পদার্পণ অনেক সময় একটি দেশের জনগণ ও নেতাদের মধ্যকার বন্ধন ভেঙে দেয়। সফলভাবে গণতন্ত্রে রূপান্তর ঘটলে নেতা ও নাগরিকদের মধ্যে নতুন এক সম্পর্ক গড়ে উঠে, যেখানে সকলের অংশগ্রহণ থাকে। কিন্তু এখানে কিছু অনুঘটক আছে, যারা এই নতুন সম্পর্ক গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় বাগড়া দিতে পারে।
যখন রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দুর্বল থাকে, তখন নতুন নেতারা পুরনো অভিজাতদের হুমকি হিসেবে দেখেন। ফলে এই নতুন নেতারা অভ্যুত্থানের আশঙ্কায় নিজের সরকারের ভেতরই খাদ গড়তে থাকেন। এভাবে তারা রাষ্ট্রকে বিস্ফোরিত অবস্থার মুখে ঠেলে দেন।
আবার দ্রুতবেগে সামাজিক পরিবর্তন ও গভীর জাতিগত দ্বন্দ্ব একসঙ্গে বিদ্যমান থাকলে সমাজ ও রাজনীতিতে বিভাজন ঘটতে পারে। এক্ষেত্রে, বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠী অধিকতর নিয়ন্ত্রণের জন্য একে অপরের বিপক্ষে লড়াই করে। রুয়ান্ডা ও বসনিয়ায় এটিই ঘটেছে। আবার যখন জনগণ চায় উন্নতি, কিন্তু সরকার থাকে দুর্বল, তখন নাগরিক ও নেতারা উভয়েই এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন, যাকে নামেমাত্র কর্তৃত্ববাদ বলা যায়। নব্বইয়ের দশকের রাশিয়ায় এটিই ঘটেছে।
দৃশ্যত, এসব ধরনের লক্ষণই মিয়ানমারের রয়েছে। গণতন্ত্রে ধ্বংসাত্মক কিছুর আগাম সতর্কবার্তা পাওয়া যায় যাদের মাধ্যমে, সেই সংখ্যালঘু, সাংবাদিক ও অ্যাক্টিভিস্টরা মিয়ানমারে ক্রমেই মিইয়ে যাচ্ছেন।
জাপানে পড়ালেখা করে আইনজীবী হয়েছেন নিও নিও থিন। সাবেক এই আইনপ্রণেতা ছিলেন মিয়ানমারের নব্য-গণতন্ত্রের প্রতীক। বেপরোয়া ও বাস্তববাদী এই নারী আইনজীবী তৃণমূল পর্যায়ে ভালো সমর্থন গড়ে তোলেন। তিনি যখন সুচির দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসিতে যোগ দেন, তখন মনে হচ্ছিল গণতন্ত্র শেকড় গজাচ্ছে। কিন্তু ২০১৫ সালে মিয়ানমারের প্রথম পূর্ণমাত্রার গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কিছুকাল পরই দল থেকে নিও নিও থিনের মনোনয়ন বাতিল করা হয়। পরে স্বতন্ত্রভাবে লড়েও হেরে যান তিনি। অং সান সুচির ক্ষুদ্র দুনিয়ায় রাজনীতিটা এমনই হয়ে গিয়েছিল। মিস থিনের মতো যাদের কিছুটা দলনিরপেক্ষ সমর্থন রয়েছে বা মুখ ফুটে কথা বলার সুনাম রয়েছে, তাদেরই তিনি পিষ্ট করেছেন। থিন বলেন, ‘পূর্বের সরকার আমার মতো লোকদের গুরুত্ব দিতো। যেমন, ছাত্রনেতা, বিরোধীদলীয় নেতা বা রাজনীতিবিদ। কারণ, তাদেরকে সরকারের দরকার ছিল। কিন্তু এই সরকার পাত্তাই দেয় না।’
অং সান সুচি বিভিন্ন পদে বসিয়েছেন নিজের অনুগতদের। এদের অনেকেরই নেই যোগ্যতা বা প্রশিক্ষণ। তিনি নিজের কাছে এত বেশি ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছেন যে, বিশ্লেষকরা মনে করেন, তিনি যখন বিদেশে ভ্রমণ করেন তখন সরকার কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। তিনি দৃশ্যত নিজের রাজনৈতিক সুবিধাজনক অবস্থান ও ভীতি থেকে এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
নিজের তুমুল জনপ্রিয়তার ফলে সুচি জোট গঠনের মতো গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার এড়িয়ে চলছেন। আর ভীতি তো আছেই। নিও নিও থিন বলেন, ‘তাদের (সুচি) আশঙ্কা সরকার বেশি সমালোচনার মুখে পড়লে সামরিক বাহিনী অভ্যুত্থান ঘটানোর সুযোগ পেয়ে যাবে। তাই যেকোনো ধরনের সমালোচনা, যেকোনো ভিন্নমতই নিস্তব্ধ করতে হবে, এই হলো তাদের নীতি।’
গণতন্ত্রায়ন প্রায়শই শুরু হয় বিদায়ী ও নতুন নেতাদের মধ্যে সমঝোতা বা চুক্তির মাধ্যমে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যকালীন সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্ক তার উত্তরসূরি নেলসন ম্যান্ডেলার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করার পরও সমাজ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে একতাবদ্ধ রাখতে সহযোগিতা করেছিলেন।  
অস্ট্রেলিয়ার সিডনিভিত্তিক লোয়ি ইন্সটিটিউটের বিশ্লেষক আরন কনেলি বলেন, ‘মিয়ানমারে ডি ক্লার্ক-ম্যান্ডেলার মতো অংশীদারিত্ব নেই।’ নিজের পূর্বসূরি প্রেসিডেন্টকে দৃশ্যপট থেকে একদমই সরিয়ে দিয়েছেন অং সান সুচি। অথচ, তিনি ছিলেন একজন সংস্কারবাদী জেনারেল। আরন কনেলি বলেন, পূর্বসূরি নেতার সঙ্গে সহযোগিতা দূরে থাক, সুচির মধ্যে অনেকটা ট্রাম্প-ধাঁচের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আছে। সুচি অনেক প্রতিষ্ঠানকে নিয়েই এমন সন্দেহ পোষণ করতেন যে, তাদের আনুগত্য বোধ হয় তার প্রতি নয়, বরং সাবেক প্রেসিডেন্টের প্রতি।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, তিনি মিয়ানমার পিস সেন্টারের অনেক কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছেন। অথচ, এই প্রতিষ্ঠানটিই দেশের বহু জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনায় নেতৃত্ব দিয়েছিল। ফলে বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে হওয়া অস্ত্রবিরতি ভেঙে পড়ে এবং ফের শুরু হয় লড়াই। সুচির ঘনিষ্ঠ অল্প ক’জনই আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানকে এড়িয়ে কার্যত দেশ পরিচালনা করছেন।
একটি বিদ্যালয়ের কাহিনী
এই গ্রীষ্মে হঠাৎ একদিন ইয়াঙ্গুনের একটি ইসলামী বিদ্যালয় চত্বরের শিক্ষার্থীরা তাদের ফটকের বাইরে চিৎকার শুনতে পায়। কয়েক ডজন বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী এই ভবন চুরমার করে দেয়ার হুমকি দিচ্ছিলো। আগের দিনই তারা স্থানীয় কর্মকর্তাদের কাছে দাবি জানায় এই বিদ্যালয় বন্ধ করতে হবে। গুজব ছড়িয়ে পড়ে এসব বিদ্যালয় গোপনে মসজিদ হিসেবে কাজ চালায়। ওই জাতীয়তাবাদীদের বক্তব্য, সরকার যদি তাদের দাবি না মানে, তাহলে তারা বিদ্যালয় ভবন ধ্বংস করে দেবে।
পরের দিনই তারা জড়ো হয় ওই বিদ্যালয়ের বাইরে। দেখে মনে হচ্ছে এখনই তারা হুমকি বাস্তবায়ন করে ছাড়বে। পুলিশও এসে যায় ততক্ষণে, কিন্তু বিক্ষোভকারীদের থামানোর কোনো লক্ষণ তাদের মধ্যে ছিল না। শিক্ষার্থীদের দ্রুতই স্কুল ভবন থেকে বের করে নেয়া হয়। কিন্তু ভবন ধ্বংস করার বদলে বিক্ষোভকারীরা বিদ্যালয়ের মূল ফটক বন্ধ করে দেয়। তখন থেকেই এটি বন্ধ আছে। মুসলিমদের আশঙ্কা সেখানে ফিরে গেলে সহিংসতা সৃষ্টি হবে।
ইউ ওয়াই ফো অং স্থানীয় আইনপ্রণেতা। তিনি যুক্তি দেখান, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা ছিল সেদিন হস্তক্ষেপ করলে পরিস্থিতি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারতো। কারণ, তার নির্বাচনী এলাকায় ধর্মীয় উত্তেজনা বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে। দেশজুড়েই এই ধরনের পরিস্থিতি বিরাজমান। ফো অং যেন সেটাই প্রকারান্তরে স্বীকার করে নিলেন। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিপুল প্রভাব বৌদ্ধ চরমপন্থিদের। অনেক সময় তারা রাষ্ট্রকে নিজেদের দাবির মুখে পদানত করে।
২০১২ সাল থেকেই চরমপন্থিদের এই প্রভাব বাড়তে থাকে। তখন গণমাধ্যম ও বাক-স্বাধীনতার ওপর অনেক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়। তখন সৃষ্টি হওয়া শূন্যতা দখল করে চরমপন্থিরা। তাদের জাতীয়তাবাদ ও ঐতিহ্যবাদের বার্তা প্রবল পরিবর্তনের মুখে দিশাহারা সমাজে বেশ ভালোভাবে গৃহীত হয়।
ইউ সো মিন্ট অং একজন রাজনীতি বিজ্ঞানী। তার ভাষ্য, সরকারি কর্মকর্তারা জানতেন বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ ঠেকানোর মূল্য হবে খুবই চড়া। খোদ রাষ্ট্রই নিজের অনেক কর্তৃত্ব ধার করেছে বৌদ্ধ ধর্ম থেকে। ফলে সরকার হয়তো ছোটখাটো গোষ্ঠীকে থামিয়ে দিতে পারে, কিন্তু খোদ ধর্মবাদকে আঘাত করতে পারবে না। মিন্ট অং বলেন, বিকল্প হিসেবে ‘নেতিবাচক নিয়ন্ত্রণ চর্চা’ নামে এক পরীক্ষা চালাতে থাকে সরকার। অর্থাৎ, যতক্ষণ পর্যন্ত এই জাতীয়তাবাদীরা সংখ্যালঘু ও মানবাধিকারকর্মীদের ওপর চড়াও হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্র চুপ থাকবে। কিন্তু রাষ্ট্রের দিকে ধেয়ে আসলে সহ্য করা হবে না।
মিয়ানমার ইসলামিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ইউ জ উইন লাট বলেন, ‘যখনই সরকার কোনো সংকটে পড়ে, তখনই তারা ধর্মীয় ইস্যুকে ব্যবহার করে। আমরা (মুসলিমরা) আসলে এখানে বলির পাঁঠা।’ চরমপন্থিরা ক্রমবর্ধমান বিচারহীনতা ভোগ করছে। প্রায়ই টার্গেট করছে মুসলিম ও তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে। জ উইন লাট বলেন, ‘রাষ্ট্রই তার নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে পারছে না।’
বন্ধুত্ববাদকে মনে করা হয় বিপজ্জনক
২০১৫ সালে এশিয়ার ১৩টি দেশে চালানো এশিয়ান ব্যারোমিটার জরিপ থেকে মিয়ানমারের দুইটি আশ্চর্য্যজনক ফলাফল উঠে এসেছে। দেশটির নাগরিকরা এশিয়ার মধ্যে গণতন্ত্রের অন্যতম বড় সমর্থক। কিন্তু যেই উদারনৈতিক রাজনৈতিক মূল্যবোধ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেয়, তার প্রতি সবচেয়ে কম সমর্থন রয়েছে যেসব দেশের, তাদেরও অন্যতম মিয়ানমার।  
৮০ শতাংশেরও বেশি বার্মিজ উত্তরদাতা মত দিয়েছেন, আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের মতামত আমলে নেয়া উচিত। তারা এ-ও বলছেন, নাগরিকত্ব ধর্মের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। নির্বাহী বিভাগের ওপর কোনো ধরনের জবাবদিহিতার ধারণা নাকচ করে দিয়েছেন প্রায় দুই তৃতীয়াংশ নাগরিক। সামাজিক নিয়ন্ত্রণকে প্রয়োজন মনে করেন তারা। বহুত্ববাদকে মনে করেন বিপজ্জনক। কিছু নাগরিক অপর নাগরিকদের বিশ্বাস করেন না।
জরিপের প্রতিবেদনে দুই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী লিখেন, ‘সামাজিক আস্থা যেসব গণতন্ত্রে নিম্নগামী, তারা সংঘাতের ঝুঁকিতে থাকে। সমাজ থাকে ভেঙে টুকরো টুকরো হওয়ার ঝুঁকিতে।’
ইতিহাসবিদ থান্ট মিন্ট-ইউ আরো বলেন, ‘মিয়ানমার কখনই উদারনৈতিক সমাজ ছিল না।’ তিনি আরো যোগ করেন, দশকের পর দশক ধরে সামরিক শাসন, গৃহযুদ্ধ ও দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্নতা দেশটিতে অনুদার দৃষ্টিভঙ্গিকে আরো গাঢ় করেছে।
এশিয়ান ব্যারোমিটার জরিপে উঠে আসে, মিয়ানমারের প্রতি ১০ নাগরিকের মধ্যে ৭ জনই বলেছেন, শিক্ষার্থীদের উচিত শিক্ষককে কোনো প্রশ্ন না করা। অর্থাৎ, তাদের মধ্যে কর্তৃত্ববাদী মূল্যবোধ এখনো প্রবলভাবে উপস্থিত।
আইনজীবী নিও নিও থিন বলছিলেন, ‘মানুষ মনে করে অং সান সুচি খোদার মতো। তিনি যা চান সেটাই করতে পারেন। আমাদের শিক্ষাই দেয়া হয় যে, নেতাকে অনুসরণ করাই হলো ধর্ম।’
দেশটিতে বিদ্যমান মেরুকরণ এমনকি একসময়কার ঘৃণিত জেনারেলদের শক্তিশালী করেছে। জ্যেষ্ঠ জেনারেল ও সামরিক বাহিনী প্রধান মিন অং হ্লাইং-এর একটি সক্রিয় ফেসবুক পেজ রয়েছে। ১৩ লাখ অনুসারী তার বন্দনায় ভর্তি করে ফেলেছে ওই পেইজ।
সমালোচনা করলে দণ্ড
২০১৩ সালে গণতন্ত্রে রূপান্তরকালে কর্তৃপক্ষ একটি আইন পাস করে। এই আইন মোতাবেক, সরকারের সমালোচনা করলে সাংবাদিকরা জরিমানা, এমনকি কারাদণ্ডও পেতে পারেন। দেখে মনে হচ্ছিল, পুরনো স্বৈরতন্ত্রের শেষ চিহ্ন হয়ে থাকবে এসব। ওই সরকার ৭বার আইনটি প্রয়োগ করে। এর মধ্যে ৫বার অভিযুক্ত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠিত হয়।
উদ্বিগ্ন হলেও তখন মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো ভেবেছিল পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্র এলে হয়তো এসবের অবসান ঘটাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অং সান সুচির সরকার মোট ৮৯ বার এই আইন প্রয়োগ করেছে। মিয়ানমার জার্নালিস্ট ইন্সটিটিউট বলছে, এর মধ্যে ১৩ সাংবাদিক শাস্তির মুখে পড়েছেন। ২০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠিত হতে যাচ্ছে। ১০ জনের বিরুদ্ধে অং সান সুচির মানহানির অভিযোগ করা হয়েছে।
জার্নালিস্ট ইন্সটিটিউটের শিক্ষক ইউ সেইন উইন বলেন, ‘আমরা কম্বোডিয়া হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছি। কিংবা আরো খারাপ কিছুতে পরিণত হতে পারি।’ সম্প্রতি, কম্বোডিয়া বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম বন্ধ করে দিয়েছে। কর্তৃত্ববাদের পথে ধাবিত হয়েছে।
ইউ সেন উইনের মতে, সবচেয়ে বড় হুমকি এই বিচার বা সাজা নয়, বরং সেলফ-সেন্সরশিপ। সাংবাদিকদের সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘তারা অনেকটা বাঁশের মতো, যেন বাতাসের ভারে নুইয়ে পড়ছে।’ অনেক সাংবাদিক তাকে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চালানো নৃশংসতা তারা চেপে গেছেন, বরং রোহিঙ্গা জঙ্গিদের ব্যাপারে সংবাদ বেশি প্রকাশ করেছেন। কারণ, তাদের মনে হয়েছে, সেটা করাই হবে রাষ্ট্রের স্বার্থের পক্ষে।
এমন আরো কালাকানুন এখনো রয়েছে। যেমন, ৫০৫ (বি) ধারা মোতাবেক, ‘জনশান্তি’র প্রতি হুমকি যেকোনো ধরনের বক্তব্য বা সমাবেশ করা ফৌজদারি অপরাধ। মূলত, মানবাধিকার কর্মী ও ছাত্রনেতাদের আটক করতেই এই আইন প্রয়োগ হয়েছে বেশি।
‘ভেবেছিলাম গণতন্ত্র আকাশ থেকে পড়বে’
ইউ থেট সোয়ে উইন একজন আদর্শবাদী বোহেমিয়ান অ্যাক্টিভিস্ট। ৩১ বছর বয়সী এই ব্যক্তি এক সময় ছিলেন এমন ধরনের লোকদের অন্তর্ভুক্ত যাদের ভাবা হতো নতুন মিয়ানমারের প্রতিভূ। কিন্তু এখন তিনি চিন্তিত যে, খোদ তার দেশের নাগরিকরাই রাষ্ট্রের চেয়ে আরো ভয়াবহ হুমকি হিসেবে দাঁড়িয়েছে। তার ভাষ্য, ‘আমরা ভেবেছিলাম গণতন্ত্র আকাশ থেকে পড়বে। আমরা আসলে জানতাম না যে, এটা একটা প্রক্রিয়া, যেখানে সব মানুষকে অন্তর্গত করতে হবে।’
সেন্টার ফর ইউথ অ্যান্ড সোস্যাল হারমনি নামে একটি সংগঠনের নেতা তিনি। মিয়ানমারে এখনো গুটিকয়েক যেসব গোষ্ঠী ধর্মীয় সহিষ্ণুতার কথা প্রচার করে তাদের মধ্যে এটি একটি। এই সংগঠনের কার্যালয়ে ভাঙচুর চালিয়েছে বৌদ্ধ চরমপন্থিরা। তার বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের সমর্থনদানের অভিযোগ উঠানো হয়েছে। এমনও গুজব চালানো হয় যে, তিনি তার স্ত্রীর সঙ্গে মিলে যে স্পা চালান, তা আসলে চালায় মুসলিমরা। অল্প ক’দিনেই ব্যবসা লাটে উঠে। হুমকি দিয়ে বহু ফোন করা হয় তাকে। এক পর্যায়ে তিনি নিজের পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে রক্ষী ভাড়া করেন।
সোয়ে উইন বলেন, ‘আমি চাই না আমার সন্তানরা এমন সমাজে বড় হোক যেটি বিভক্ত ও বিদ্বেষ ছড়ায়।’ কিন্তু আশার আলো কমই দেখছেন তিনি। ‘আমরা দুই ধাপ সামনে যাই তো তিন ধাপ পেছনে পড়ি,’ বলছিলেন তিনি।
(নিউ ইয়র্ক টাইমসে ম্যাক্স ফিশারের লেখা ‘মিয়ানমার, ওয়ান্স আ হোপ ফর ডেমোক্রেসি, ইজ নাউ অ্যা স্টাডি ইন হাউ ইট ফেইলস’ শীর্ষক বিশ্লেষণীর অনুবাদ। অনুবাদ করেছেন মাহমুদ ফেরদৌস।)

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

ঢাকা ওয়াসাকে ১৩টি খাল উদ্ধারের নির্দেশ

এসডিজি অর্জন করতে হলে প্রতিবছর ৩০ শতাংশ নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ বাড়াতে হবে

‘অনুপ্রবেশকারীদের ৫০০০ পাওয়ারের বাতি জ্বালিয়েও খুঁজে পাওয়া যাবে না’

‘ক্ষমতা থাকলে সরকারকে টেনে-হিচড়ে নামান’

আগামীকাল আদালতে যাবেন খালেদা জিয়া

‘সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন নেই’

‘তদন্তের স্বার্থেই তনুর পরিবারকে ডাকা হয়েছে’

জিম্বাবুয়ের নতুন প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন ‘কুমির মানুষ’

আশ্রয়শিবিরে সংক্রমণযুক্ত পানির বিষয়ে ইউনিসেফের সতর্কতা

চীন, উত্তর কোরিয়ার ১৩ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ

রোহিঙ্গা সঙ্কট: উচ্চ আশা নিয়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার বৈঠক শুরু

ঘোড়ামারা আজিজসহ ছয় জনের মৃত্যুদণ্ড

নিবিড় পর্যবেক্ষণে মহিউদ্দিন চৌধুরী

আফ্রিকার স্বৈরাচারদের মেরুদণ্ডে শিহরণ

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের প্রস্তাব, যা বললেন মুখপাত্র...

দুদকের মামলা থেকে অব্যাহতি পেলেন মেয়র সাক্কু