চির বসন্তের দেশে, ১৮

বিশেষ দিনে লাল খাম

চলতে ফিরতে

কাজল ঘোষ, চীন থেকে ফিরে | ২৩ অক্টোবর ২০১৭, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ১০:৫৩
চীনে সবকিছুই চলে নিজস্ব রীতিতে। এটাই চীনের বৈশিষ্ট্য। কারো কোন বিশেষ দিনে ‘হংপাও’ উপহার দেয়া সেখানকার নিয়ম। বাংলায় যাকে বলে লাল খাম। বাংলাদেশে ঈদ-পূজা-পার্বণ কিংবা বিয়ে-জন্মদিনে নানা উপহার দেয়ার প্রচলন রয়েছে। পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করলেও উপহার দেয়ার রীতি রয়েছে।
উপহার দেয়াতেও চীনে রয়েছে ভিন্নতা। তারা হংপাও বা লাল খামেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য। যেকোনো উৎসব-আনন্দে কাউকে উপহার দিতে হলে চীনারা লাল খাম নিয়ে হাজির হন। মূলত চীনা লুনার কালেন্ডারে নববর্ষ পালনকালে ব্যাপকভাবে হংপাও একজন আরেকজনকে বিনিময় করে। এ পদ্ধতিতে যাকে উপহার দেয়া হচ্ছে সে যতক্ষণ খাম না খুলছে ততক্ষণ জানতে পারছে না কত আরএমবি উপহার এসেছে। চীনা ভাষায় ‘ইয়োশি চিয়ান’ অর্থাৎ লাল খামকে ভুতুড়ে অর্থ প্রাপ্তিও মনে করেন অনেকে। কারণ, কত অর্থ আছে এটি তো জানার সুযোগ আগ থেকে নেই। নতুন বছরের শুরুর দিন সকলেই মুখিয়ে থাকেন দিনটির জন্য। বিশেষত ছোটরা। কারণ, বড়রা আশীর্বাদ বা রোগমুক্তিসহ নানা সমস্যায় পড়লে ছোটরা যেন অর্থকষ্টে না থাকে সেজন্য হংপাও দেয়। এটা অনেকটা চীনে বাধ্যতামূলক সংস্কৃতি হয়ে গেছে। মূলত এই হংপাও-এর মাধ্যমে একে অন্যের প্রতি শুভাশিস বা আশীর্বাদ জানায়। নববর্ষে ব্যাপক প্রচলন হলেও জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী, পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করলেও হংপাও পাওয়া যায়। হংপাও নিয়েও রয়েছে নানান তথ্য। যেমন- অবিবাহিত তরুণ-তরুণীরা এই হংপাও দেয়া থেকে বিরত থাকেন। ধরে নেয়া হয় বিবাহিতরা সমাজের বড়দের দলে তাই তারাই হংপাও দেবে। আবার হংপাও কখনও চার-এর অঙ্কে দেয়া যাবে না। তা চল্লিশ বা চারশত আরএমবি যাই হোক। চীনারা বিশ্বাস করে ‘চার’ বা ‘ফোর’-এর শব্দটি খারাপ কোনো ইঙ্গিত করে। ফোর-কে তারা মৃত্যুর সঙ্গে তুলনা করে চাইনিজ শব্দে। ৪০, ৪০০, ৪৪৪ এই অঙ্কগুলো দুর্ভাগ্যের প্রতীক। অন্যদিকে চীনারা এইট বা আটকে শুভ মনে করে। ৮, ৮৮, ৮৮৮ এই অঙ্কগুলো সুভাগ্যের প্রতীক। সকলের প্রত্যাশা থাকে হংপাও-তে প্রাপ্ত অর্থ আট-এর ঘরে গিয়ে যেন শেষ হয় তাহলে তার ভাগ্য শিগগিরই পরিবর্তনমুখী হবে। উন্নতির দিকে এগুবে। একইভাবে ৫২০ অঙ্ককে তারা ভালোবাসার প্রতীক বলে মনে করেন। নববর্ষের উপহার হিসেবে চীনারা এই লাল খামে সাধারণত কখনও কয়েন দেয় না। কাগজি মুদ্রার প্রচলনটাই বেশি। হয়তো উপহার দেয়ার সুবিধার্থেই এটি করা হয়ে থাকে। এমনও দেখা গেছে, চীনা নিউ ইয়ার ইভ থেকে তাদের ল্যানটার্ন ফেস্টিভ্যাল পর্যন্ত ষোলদিন অনেককেই সঙ্গে এই লাল খাম নিয়ে ঘুরতে। কারণ, যেকোনো জুনিয়র বন্ধু, ছোট ভাইবোনের সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে পারে। তখন তাৎক্ষণিক উপহার হিসেবে লাল খাম বা হংপাও দিয়ে দেবে। আর একেক আকৃতি বা একেক নকশা করা ডিজাইনের খামে রেখে দেয়া হয় একেক পরিমাণ অর্থ। এতে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। যিনি উপহার দেবেন তিনি নিশ্চিত থাকেন কোনটিতে ১০০
আরএমবি আছে আর কোনটিতে ১০০০ আরএমবি আছে। আর হংপাও গ্রহণেও রয়েছে কিছু নিয়ম-কানুন। যেমন- হংপাও গ্রহণ করতে হয় দু’হাত পেতে। এক হাতে হংপাও নেয়াটা অনেকটাই অসম্মানের। হংপাও গ্রহণ করার সময় যিনি নিচ্ছেন তার উদ্দেশ্যে শুভকামনা জানাতে হয় প্রফুল্লচিত্তে। আর উপহারের লাল খাম যিনি দিচ্ছেন কখনই তার সামনে খোলা যাবে না। হংপাও খোলার রীতি হচ্ছে একান্তে।
হংপাও নিয়ে নানা মিথ রয়েছে। চিং ডায়নেস্টির সময় বড়রা ছোটদের উপহার দেয়ার জন্য লাল সুতোতে কয়েন বুনতো। এটা ছিল অশুভের হাত থেকে ছোটদের রক্ষাকবচ। মুদ্রণের সূচনা থেকে এটিকে লাল খামে রূপ দেয়া হলো যা এখন পর্যন্ত চলে এসেছে। তবে এখন লাল খাম বা হংপাও প্রচলন হয়েছে ডিজিটাল মাধ্যমেও। বলা হয়ে থাকে, এক গ্রামে ছিল এক দৈত্য। দৈত্যটি গ্রামের শিশুদের ভয় দেখাতো। সকলেই ধারণা করতো রাতে ঘুমন্ত শিশুদের মাথায় হাত রেখে এই দৈত্যটি রোগবালাইয়ের সংক্রমণ ঘটাতো। অনেক সময় এর ফলে শিশুরা মৃত্যুর মুখোমুখি পর্যন্ত হয়েছে। কালক্রমে এক উদ্বিগ্ন দম্পতি দেবতার কাছে শিশুদের রক্ষায় প্রার্থনা করে। তাদের প্রার্থনায় তুষ্ট হয়ে দেবতা নবজাতক শিশুদের রক্ষায় ৮টি পরীকে পৃথিবীতে পাঠায়। দুষ্ট দৈত্যকে দমন করতে পরীগুলো ৮টি কয়েনের রূপ ধারণ করে শিশুদের মাথার কাছে থাকতো। যখন দৈত্য শিশুদের ক্ষতি করতে মাথা ছুঁতে যেতো নিচে থাকা কয়েন থেকে উজ্জ্বল আলোক রশ্মি বের হতো। এই রশ্মি দেখে দৈত্যটি ভয়ে পালিয়ে যেত। পরে ধীরে ধীরে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে শিশুদের মঙ্গল কামনায় লাল খামে কয়েনের কথা ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমদিকে শিশুদের লাল খাম দেয়া হতো স্প্রিং ফেস্টিভ্যালে। সময় বদলের সঙ্গে সঙ্গে এই খাম সবাইকে দেয়ার রীতি প্রচলিত হয়। আর শুধু স্প্রিং ফেস্টিভ্যাল নয় এর বাইরে নববর্ষেই ব্যাপকহারে হংপাও দেয়ার প্রচলন ঘটে। অন্য আরেক প্রচলিত মিথ থেকে জানা যায়, নিয়েন নামে এক দৈত্য বছরের শেষদিকে গ্রামবাসীদের আতঙ্কিত করে তুলতো। ভয় দেখাতো। দৈত্যটির তিনটি দুর্বলতা ছিল। এগুলো হচ্ছে দৈত্যটি শব্দকে ভয় পেতো, সূর্যের আলোকে ভয় পেতো এবং লাল রঙকে ভয় পেতো। গ্রামবাসী দৈত্যের এই দুর্বল দিকগুলো জানতে পেরে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। তারা এই দৈত্যের উৎপাত থেকে বাঁচতে গ্রামের প্রবেশমুখে বড় রকমের দুর্গে আগুন জ্বালিয়ে রাখতো। আর প্রতিটি ঘরের দরোজা লাল রঙে রাঙিয়ে দিতো। নিয়েন দৈত্য এগুলো দেখে মাথা লুকিয়ে ভয়ে পালিয়ে যেত এবং এভাবেই লাল রঙ চীনাদের নববর্ষে উপহারের সঙ্গে যুক্ত হয়। শয়তানের হাত থেকে রক্ষা আর অন্যদিকে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবেই এই লাল খাম দেয়ার প্রচলন।
উইচাটেও হংপাও
চীনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম উইচাট পিছিয়ে নেই এক্ষেত্রেও। চীনা ভাষায় উইচাটকে বলে ‘ওয়েইশিন’। উইচাট বা ওয়েইশিন আত্মীকরণ করেছে হংপাওকেও। আর তা এত দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে তাও একটি বিস্ময়। ২০১৪ সালে উইচাট নববর্ষ সামনে রেখে হংপাও চালু করে। এ পদ্ধতিতে যে কেউ একটি লাল খাম মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে পাঠাতে পারে উপহার হিসেবে। আর ম্যাসেজ পৌঁছালেও যতক্ষণ পর্যন্ত রিসিভার রিসিভ বাটন না চাপবে ততক্ষণ জানা যাবে না কত আরএমবি আছে হংপাওতে। আরো মজার বিষয় হচ্ছে যদি উপহার গ্রহীতা মনে করে দাতা অনেক বেশি উপহার পাঠিয়েছে তিনি তা নিতে চান না পরবর্তী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে এই অর্থ ফেরত পাঠানো যাবে উপহারদাতাকে। উপহারদাতাও একইভাবে রিসিভ বাটন চাপলে আবার সেই অর্থ তার একাউন্টে ফিরে পাবে। এটি আরো জনপ্রিয় হয় ২০১৪ সালে চীনের সবচেয়ে জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেল সিসিটিভিতে নিউ ইয়ার গালা অনুষ্ঠানে দর্শকদের লাল খামে পুরস্কৃত করার চল শুরু করলে। ২০১৬-তে উইচাটে ৩২ বিলিয়ন ভার্চুয়াল ইনভেলাপ পাঠায় গ্রাহকদের। হংপাওয়ের এই জনপ্রিয়তায় উইচাট ও আলী বাবা কর্তৃপক্ষের মধ্যে নিয়ে আয়োজিত গালা প্রতিযোগিতার জন্ম দেয়। পরবর্তীতে আলী বাবা গ্রুপও হংপাও তাদের অনলাইন শপে যুক্ত করে। ২০১৭-তে এসে ডিজিটাল মাধ্যমে হংপাও পাঠানোর ক্ষেত্রেও বিপ্লব ঘটে। প্রায় একশ’ বিলিয়ন হংপাও চলতি বছরের নববর্ষে বিনিময় হয় চীন জুড়ে।
সৌভাগ্যের প্রতীক লাল
লাল রং চীনের সংস্কৃতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নববর্ষসহ চীনের উৎসবগুলোতে লাল রঙের আধিক্য লক্ষণীয়। লাল রক্তের রং যা জীবনের কথা বলে। যা খ্যাতি এবং সমৃদ্ধির প্রতীক বুঝায়। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় চীনারা লাল রঙকে তাদের সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে মেনে নিয়েছে। কারণ, লাল একাধারে আগুন, সূর্যের আলো, উজ্জ্বলতা এবং জীবনী শক্তির প্রকাশ করে। উপরে বর্ণিত কারণগুলোর জন্য ঘরের সাজসজ্জা থেকে শুরু করে পোশাক পরিচ্ছদ এমনকি নববর্ষের বিশেষ মুহূর্ত রাঙিয়ে তুলতে উপহার দেয়া হয় লাল খামে। চাইনিজ নববর্ষে তাদের ঘরগুলো সাজানো হয় মোমের লাল আলোতে। যেন দুর্ভাগ্য দূর হয়ে যায় আর অশুভ না আসতে পারে। নববর্ষের রাতে চীনারা পরস্পরকে শুভ কামনা জানাতে লাল কাগজে সোনালী রঙে নাম লিখে ঝুলিয়ে রাখে নিজেদের দরোজায়।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

২০১৮ সালে প্রবল ভুমিকম্পের আশঙ্কা!

কেয়া চৌধুরী এমপি’র উপর হামলার ঘটনায় মামলা

বাংলাদেশের রাজনীতি, বিকাশমান মধ্যবিত্ত এবং কয়েকটি প্রশ্ন

ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতাতে আহত ডিবি পুলিশ

প্রতিবেশীদের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকা জরুরীঃ বাংলাদেশকে মিয়ানমার

তারেক রহমানের জন্মদিন পালন করবে বিএনপি

রোহিঙ্গা শিবিরে যেতে চান প্রণব মূখার্জি

তালাকপ্রাপ্ত নারীকে অপহরণের পর গণধর্ষণ

আরো ১০ দিন বন্ধ থাকবে লেকহেড স্কুল

জাতিসংঘকে দিয়ে রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধান হবে নাঃ চীন

ম্যনইউয়ের টানা ৩৮

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সংলাপে সহায়তা করতে আগ্রহী চীন

জল্পনার অবসান ঘটালেন জ্যোতি

চীনের বেইজিংয়ে অগ্নিকাণ্ড, নিহত ১৯ আহত ৮

সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত এমপি গোলাম মোস্তফা আহমেদ

বিশ্ব সুন্দরীর মুকুট মানসী চিল্লার-এর