চির বসন্তের দেশে, ১৬

নিজের শক্তিতেই ভরসা

চলতে ফিরতে

কাজল ঘোষ, চীন থেকে ফিরে | ২১ অক্টোবর ২০১৭, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ২:৫৫

২০১১-তে শুরু। এখন ২০১৭। ছয় বছরেই তাক লাগিয়ে দিয়েছে। মাত করেছে দুনিয়াকে। অচচঝ ভড়ৎ ঊাবৎুঃযরহম। এটাই তাদের মূল কথা।
প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছে অত্যাধুনিক সুবিধা। যা এই অ্যাপসকে পৃথিবীর সবচেয়ে উদ্ভাবনী অ্যাপস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে অল্পদিনেই। বলছিলাম উইচাটের কথা। দুনিয়াজুড়ে যখন ফেইসবুক, টুইটার, গুগল আর ইনস্টগ্রামের মাতামাতি তখন চীনে ভরসা একটাই। তা হচ্ছে উইচাট। নিজের শক্তিতে ভরসা চীনের নাগরিকদের। তোয়াক্কা নেই দুনিয়ার কোথায় কি হচ্ছে? কান দিচ্ছে না কোনো কিছুতেই। তাইতো বিশাল এই দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী প্রমাণ করেছে তারা এগিয়ে নিতে চায় তাদের উদ্ভাবনী প্রতিভাকে। বলা হয় সব কিছুর চাইনিজ সংস্করণ আছে। তারা তাদের সৃষ্টিশীলতাকে শ্রদ্ধা করে। ভালোবাসে। শুধু ইলেক্টনিক্স সামগ্রী বা ইন্টেলিজেন্ট সার্চ ইঞ্জিন তা-ই নয় চাইনিজ বাজারে দেখেছি আপেল, কমলা, বেগুন, কাঁচামরিচ, আম, টমেটো, বড়ইসহ বেশকিছু খাদ্যদ্রব্যের চাইনিজ প্রজাতি। আর ডিজিটাল সব কিছুই চীনারা নিজস্ব প্রযুক্তিই ব্যবহার করে। প্রথমদিন থেকেই টের পেয়েছি উইচাট কতটা শক্তিশালী। ঢাকা থেকে লাওশিরা বলে দিয়েছে সবাইকে উইচাটের অ্যাকাউন্ট খুলতে। মোবাইলে উইচাটের অ্যাপস ইনস্টল করতে। চীন উইচাট ছাড়া অচল। অবশ্য ঢাকায় থেকেও টের পাচ্ছিলাম চাইনিজদের দেশপ্রেম। কারণ, ভ্রমণ সংক্রান্ত কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলতে চেয়েছি বা কোনো তথ্য জানতে চেয়েছি লাওশিরা সব কিছু আদান-প্রদান করছেন উইচাটে। যাবতীয় কনফারমেশন ম্যাসেজ আসছে উইচাটেই। এ ছাড়া সবাই অন্ধ। চৌদ্দদিন কুনমিং অবস্থানকালে আর কিছু সঙ্গী হোক না হোক উইচাট ছিল আমাদের তথ্য ভা-ার। রাতে ঘুমাতে যাওয়া আর সকালে ঘুম থেকে উঠেই উইচাট। নতুন ঘোষণা কি? আজকের অনুষ্ঠান কি? দিনের ছবি শেয়ার করা। অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি সভা। গাড়ি ছাড়ার সময় সবই দেয়া থাকতো উইচাটে। এমনকি আমাদের গাইড আমরা যেন হারিয়ে না যাই সেজন্য সবাইকে তার উইচাট নাম্বার শেয়ার করতেন। ঘোষণা দিয়ে দিতেন যখনই কোথাও আটকে যাবেন তখন উইচাটে কল করবেন। আমাদের যাদের কাছে উইচাট নাম্বার ছিল না অর্থাৎ পৃথক ফোন নিতে পারিনি তারাও ডায়েরিতে লিখে রাখতাম উইচাট নাম্বার। কারণ, বিপদে পড়লে ভরসা একটাই। উইচাটে নাম্বার কারো সাহায্য নিয়ে রক্ষা পাওয়া যাবে। অন্যদিকে ঢাকায় যার উইচাট নাম্বারে অ্যাকাউন্ট আছে তাকে খুব সহজেই ফ্রি কল করা যেত। মুহূর্তেই আদান-প্রদান করা যত ছবি কিংবা ভিডিও। কিন্তু চীনে অবস্থান আর চীন থেকে ফেরার পর পর্যন্ত যে ধরনের তথ্য পাচ্ছি উইচাট নিয়ে তাতে মাথা খারাপ হওয়ার অবস্থা। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন বিষয় বা প্রযুক্তির সংযোজনে উইচাট হয়ে উঠেছে তাদের চালিকা শক্তি। উইচাটে কি নেই এই প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
উইচাটের শুরু অল্পদিন। কিন্তু বছর যাচ্ছে আর নতুন নতুন বিষয় যুক্ত হচ্ছে এতে। পুরো চীন যেন এখন উইচাটে। ব্যাংকিং থেকে শুরু করে ই-কমার্স, স্বাস্থ্যসেবা, পড়াশুনা, শপিং, গাড়িভাড়া, যাবতীয় যোগাযোগ তথ্য আদান-প্রদান সবই হচ্ছে উইচাটে। উইচাটের সুবিধা অনেক। বিস্তারিত এক লেখায় বলে শেষ করা যাবে না। তবে আমাদের দেশে ফেইসবুক যেভাবে মহামারির মতো অন্দরমহলে প্রবেশ করেছে। চীনে উইচাটও তাই। বরং চীন উইচাটকে ধীরে ধীরে নিয়ে যাচ্ছে তাদের চলার আলোকবর্তিকার জায়গায়। উইচাট নেইতো চীনে আপনি অচল। বাংলাদেশের বেশ ক’জন ছাত্র বর্তমানে পড়াশুনা করছে ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাদেরই একজন মিশকাত শরীফ। এক মাস হলো ইউনানে আছে। সে জানায় তাদের ডরমেটরিতে প্রতিটি ফ্লোরে রয়েছে ১৪টি ওয়াশিং মেশিন। সাতটি-সাতটি করে দু’পাশে এই ১৪টি ওয়াশিং মেশিনে কাপড় ধোয়ার ব্যবস্থা। কিন্তু এর টাকা পরিশোধ করতে হবে কোম্পানিকে উইচাটের মাধ্যমে। থ্রি আরএমবি করে পরিশোধ করলেই হলো। তারপর মেশিনে একবার যতগুলো কাপড় দেয়া সম্ভব তা দিয়ে আপনি চলে আসুন রুমে। কাপড় ধোয়া আর শুকানোর পর উইচাট আপনার মোবাইল ম্যাসেজ পাঠাবেÑ কাপড় প্রস্তুত। সাইকেলের গল্পতো আপনাদের বলাই হয়েছে। বারকোড স্ক্যান করে যে কোনো স্থান থেকে আপনি সাইকেল নিয়ে চলে যেতে পারেন শহরের যে কোনো স্থানে। পুরো চীনে প্রায় ১ কোটি সাইকেল এভাবেই চলছে উইচাটের মাধ্যমে। উইচাটে আপনি যে কোনো স্থান থেকে ক্যাশ ট্রান্সফার করতে পারেন। এটা ১ আরএমবি থেকে একলাখ আরএমটি পর্যন্ত। আমাদের সহযাত্রী টিমমেট টিপু ভাই আরএমবি সঙ্কটে পড়লে ইউনানের বাইরে অন্য এক প্রদেশে বাসরত এক বন্ধুর কাছ থেকে উইচাটের মাধ্যমে আরএমবি আনে। যা করতে ডলার ভাঙানোর চেয়ে অনেক বেশি সহজ ও স্বচ্ছন্দ। আমরা সাধারণত ফেসবুককে ব্যবহার করি সোশ্যাল মিডিয়া হিসেবে। কিন্তু ইউচাট সোশ্যাল মিডিয়ার চেয়েও অনেক বেশি ক্ষেত্রে ব্যবহার করে চীনারা। সোশ্যাল মিডিয়ার বাইরে ভয়েস ম্যাসেজ, ম্যাসেজ, ভিডিও কল, গ্রুপ চ্যাট, ছবি-ভিডিও শেয়ার, মোমেন্ট বা স্মরণীয় মুহূর্ত শেয়ার করা যায়। চমকপ্রদ বিষয় হচ্ছে লোকেশান সেট করা যায় উইচাটে। আপনি কোথায় আছেন তা লোকেশন সেট করে দিলে আপনার বন্ধু সহজেই আপনাকে খুঁজে বের করতে পারবে। সোশ্যাল মিডিয়ার বাইরে উইচাট ব্যাংক কার্ডের ভূমিকায় ব্যবহৃত হচ্ছে চীনে। আপনি সব ধরনের টিকিট তা ট্রেন, বাস, বিমান যাই হোক তার টিকিট কাটতে পারবেন এর মাধ্যমে। সব ধরনের বিল পরিশোধ করবেন তাও উইচাটের মাধ্যমে। সিনেমা দেখবেন তা থ্রিডি বা ফোর ডি যাই হোক না কেন সবই কাটতে পারবেন উইচাটে। আপনি ডাক্তার দেখাতে চান তাও সম্ভব উইচাটেই। আপনি আপনার রোগ বুঝে সেই ডাক্তারের সিরিয়াল নিন। আপনার সমস্যা ও পরবর্তী পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট পাঠিয়ে দিন। সিরিয়াল পেয়ে যাবেন। ডাক্তার আগ থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখবে আপনার জন্য।
মার্ক জাকারবার্গ ফেসবুক শুরু করেছিলেন ২০০৩ সালে। শুরুতে এর নাম ছিল ফেসম্যাস। আর প্রধান কার্যক্ষেত্র ছিল হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস। বর্তমানে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ প্রতিমুহূর্তে ফেসবুক নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। এটাকে ডিজিটাল জাতিসংঘ বললে ভুল হবে না। কিন্তু এই ফেসবুক এখনো প্রবেশ করতে পারেনি চীনে। ফেসবুকের সিইও মার্ক জাকারবার্গের সহধর্মিণী চীনের। জাকারবার্গ শিখছেন চীনের ভাষাও। চীন সফর করেছেন বেশ ক’বার। দেখা করেছেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর সঙ্গে। কিছুতেই মন গলেনি চীনা কর্তৃপক্ষের। অনুমতি মিলেনি। চীনের বাইরে যারা বিদেশি তারা ভিপিএন বা সুপার ভিপিএন-এর মাধ্যমে ফেসবুক দেখার সুযোগ পান। তবে নেটওয়ার্ক খুবই দুর্বল। চীনারা বিশ্বাস করে তাদের নিজস্বতায়। তাই অন্য কোনো মাধ্যম তাদের বাছাই করতে হবে এমন কোনো বিষয় নেই। দেড়শ’ কোটি মানুষের এই দেশ এক সময় নিজস্ব গ-িতেই আটকে ছিল। বেড়ে ওঠছিল কেবলই তাদের সংস্কৃতি নিয়ে। তাদের শিক্ষা নিয়ে। কিন্তু এখন বদলাচ্ছে। চীনেও আসছে বিদেশি বিনিয়োগ। তবে সবই চীনের নিজস্ব আদলে। কাজেই দুনিয়া যখন ফেসবুক, গুগল, জি-মেইল, ইনস্টাগ্রাম আর টুইটার ছাড়া অচল। চীন তখন তার নিজেদের সার্চ ইঞ্জিন নিয়ে মশগুল। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি উইচাট ব্যবহার অনেক বেশি সহজ। উইচাট দিয়ে সবই করা যায় মুহূর্তেই। আমাদের সঙ্গে যে সব গাইডরা থাকত যে কোনো তথ্য জানতে চাইলে শরণাপন্ন হতো উইচাটের। এ যেন আলাদীনের চেরাগের মতোই। ঘষা দিলেই প্রদীপ থেকে এক দৈত্য এসে সব মুশকিল আসান করে দেয়। চীনে উইচাটের বাইরে-আরো দুইটি সোশ্যাল সাইটের নাম শোনা যায় একটি বাইদু আর অন্যটি ওয়েইবো। ওয়েইবো হচ্ছে টুইটারের মতো মাইক্রোব্লগিং সাইট আর বাইদো হচ্ছে জনপ্রিয় আলোচনা ও বিতর্কের ফোরাম। তবে সব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ে রক্ষণশীল অবস্থায় চীন সরকার। এসব যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত তথ্য কঠোরভাবে নজরদারি করে সরকারি কমিশন। আর দেশের জাতীয় নিরাপত্তা, রাজনীতিসহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা-সমালোচনাকে করা হয় কঠোর নজরদারি। দেশের বাইরে থেকেও এসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো ধরনের তথ্য আদান-প্রদান করা সম্ভব নয়। কারণ ইন্টেলিজেন্ট সার্চ অপটিমাইজেশন দিয়ে এসব তথ্য নজরদারি করে সরকার। সবার আগে দেশের স্বার্থ এই বিবেচনাতেই এই নজরদারি। ২০১০ সালে কোয়াংচুতে একটি রিসার্স প্রজেক্ট হিসেবে চালু হয় উইচাট। এর মূল ভার্সন ছিল ‘উইচিন’। যার যৌথ আবিষ্কারক সিয়াওলং ছাং ও মা হুইয়েতাং। অফিসিয়ালি ইউচাটের যাত্রা ২০১১ সালে। মাত্র ছয়বছরে উইচাট পৌঁছে গেছে সারা পৃথিবীর শীর্ষ সোশ্যাল মিডিয়ার একটিতে। যাত্রার প্রথম বছর ১০০ মিলিয়ন মানুষ যুক্ত হয়-এর সঙ্গে। বর্তমানে প্রতি মাসে গড়ে ৮৮৯ মিলিয়ন মানুষ উইচাটে যুক্ত থাকে যার মধ্যে ৯০ ভাগই চীনা নাগরিক। ফেসবুক বা হোয়াটস অ্যাপের তুলনায় এটি ব্যবহারকারীর দিকে পিছিয়ে থাকলেও খুব দ্রুতই গতিশীল উইচাট। প্রতিনিয়ত এতে নতুন নতুন অ্যাপস বা অপশন যুক্ত হওয়ায় এতে অনেক বেশি ব্যবহারকারী সংযুক্ত হচ্ছে।

কাল পড়–ন: ক্যাশ লেস ইকোনমি যুগে চীন

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

২০১৮ সালে প্রবল ভুমিকম্পের আশঙ্কা!

কেয়া চৌধুরী এমপি’র উপর হামলার ঘটনায় মামলা

বাংলাদেশের রাজনীতি, বিকাশমান মধ্যবিত্ত এবং কয়েকটি প্রশ্ন

ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতাতে আহত ডিবি পুলিশ

প্রতিবেশীদের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকা জরুরীঃ বাংলাদেশকে মিয়ানমার

তারেক রহমানের জন্মদিন পালন করবে বিএনপি

রোহিঙ্গা শিবিরে যেতে চান প্রণব মূখার্জি

তালাকপ্রাপ্ত নারীকে অপহরণের পর গণধর্ষণ

আরো ১০ দিন বন্ধ থাকবে লেকহেড স্কুল

জাতিসংঘকে দিয়ে রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধান হবে নাঃ চীন

ম্যনইউয়ের টানা ৩৮

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সংলাপে সহায়তা করতে আগ্রহী চীন

জল্পনার অবসান ঘটালেন জ্যোতি

চীনের বেইজিংয়ে অগ্নিকাণ্ড, নিহত ১৯ আহত ৮

সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত এমপি গোলাম মোস্তফা আহমেদ

বিশ্ব সুন্দরীর মুকুট মানসী চিল্লার-এর