৮ দফা প্রস্তাবনা

বর্মী সেনা কর্মকর্তাদের ওপর ইইউ’র নিষেধাজ্ঞা

প্রথম পাতা

কূটনৈতিক রিপোর্টার | ১৭ অক্টোবর ২০১৭, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ১:৪৬
মিয়ানমার সেনাপ্রধান মিন অংসহ দেশটির জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের ওপর আমন্ত্রণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। সোমবার ব্রাসেলসে ইইউর  পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে এ নিয়ে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবে বলা হয়, মিয়ানমারের সঙ্গে সব ধরনের সামরিক সহযোগিতা পুনর্মূল্যায়ন করছে ইইউ। এ ছাড়াও অভ্যন্তরীণ দমন-নীতিতে ব্যবহার হয় এমন কোনো অস্ত্র মিয়ানমারের কাছে বিক্রি না করার বিষয়েও ইইউ ব্যবস্থা নিয়েছে। এতেও যদি পরিস্থিতির উন্নতি না হয় তাহলে পরবর্তীতে ইউরোপীয় কাউন্সিল বাড়তি পদক্ষেপ নেবে। প্রস্তাবে আরো বলা হয়- যদি ইতিবাচক পরিস্থিতি দেখা যায় তবে তার প্রতি সমর্থন থাকবে ইইউ’র।
ইউরোপের ২৮ রাষ্ট্রের ওই জোটের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফেডেরিকা মঘেরিনি ব্রাসেলস বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। সেখানে জার্মানির অর্থনীতি ও জ্বালানিবিষয়ক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও ভাইস চ্যান্সেলর সিগমার গ্যাব্রিয়েল, বেলজিয়ামের উপ-প্রধানমন্ত্রী দিদিয়ের রেনডার্স, বুলগেরিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী ইকাতেরিনা জাহারিয়েভা, ক্রোয়েশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী মারিজা পেজচিনোভিচ বুরিক, চেক প্রজাতন্ত্রের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী আইভো স্রামেক, ডেনমার্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রী আন্দ্রেস স্যামুয়েলসেন, ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাঁ ইভস দ্রিয়াঁ, এস্তেনিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেভন মাইকসের ছাড়াও স্পেন, ইতালি, সাইপ্রাস, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, লুক্সেমবার্গ, হাঙ্গেরি ও ডাচ পররাষ্ট্রমন্ত্রী, মাল্টার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আয়ারল্যান্ড ও গ্রিসের স্থায়ী প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, মানবাধিকার লঙ্ঘন, নির্বিচারে গুলিবর্ষণ, স্থলমাইনের ব্যবহার, যৌন নির্যাতন ও সহিংসতার ঘটনায় চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে ইইউ’র রেজ্যুলেশনে বলা হয়, মিয়ানমারের এমন পরিস্থিতি মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। এটি অবশ্যই অবিলম্বে থামাতে হবে। রাখাইনে হত্যা, ধর্ষণসহ বর্র্মীবাহিনীর বর্বরতা থেকে প্রাণে বাঁচতে ২৫শে আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত পাঁচ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। ইইউ’র প্রস্তাবে বলা হয়, যখন এত বেশি লোক এক সঙ্গে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে প্রতিবেশি দেশে পালিয়ে যায় তখন বুঝতে হবে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ! সেখানে একটি সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীকে সমূলে উচ্ছেদে কতটা পরিকল্পিত কার্যক্রম চালানো হচ্ছে! ইইউ মনে করে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত শরণার্থীদের নিরাপদ ও মর্যাদার সঙ্গে তাদের নিজ নিজ বসতভিটায় প্রত্যাবাসন। ইইউ’র প্রস্তাবে স্পষ্ট করেই উল্লেখ করা হয়- যেহেতু রাখাইনে মানবিক সহায়তা দেয়া যাচ্ছে না, সেখানে মিডিয়ার কোনো প্রবেশাধিকার নেই তাই সেখানে প্রকৃত প্রয়োজন কী সেটি মূল্যায়ন করা যাচ্ছে না। এজন্য ইইউ মনে করে সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশসহ সব প্রতিবেশীর সঙ্গে মিয়ানমারের জরুরি আলোচনা প্রয়োজন। ইইউ সেই আলোচনাকে উৎসাহিত করছে এবং মিয়ানমারকে তা শুরু করার জন্য আহ্বান জানাচ্ছে। ইইউ’র প্রস্তাবে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার জন্য বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসাও করা হয়। ইইউ প্রস্তাবে আগামী মাসে মিয়ানমারে অনুষ্ঠেয় আসেম পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে রোহিঙ্গা বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনার ওপর জোর দিয়ে বলা হয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন এশিয়ার অন্য দেশগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ রাখবে। এ ছাড়া, আসিয়ান জোটভুক্ত ১০টি দেশের মধ্যে যারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশীদার তাদেরও এ বিষয়ে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য আহ্বান জানানো যাচ্ছে। এদিকে  ব্রাসেলস বৈঠকের বিষয়ে বার্তা সংস্থা বিবিসি বাংলা আগাম একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল। রিপোর্টে দাবি করা হয়- ওই বৈঠকের যৌথ ইশতেহারের খসড়া আগেই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হয়েছে। যাতে দেখা গেছে, রাখাইন সহিংসতা বন্ধে ইইউ মিয়ানমারের শীর্ষ সামরিক অধিনায়কদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার কথা ভাবছে। দেশটির ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞায় ইউরোপের সমর্থন জানানোর চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিবিসি বাংলা দু’টি বিষয় সামনে আনে। প্রথমত. ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা মিয়ানমার সরকারের ওপর কতখানি চাপ প্রয়োগ করতে পারেন? দ্বিতীয়ত. এ চাপে নেপিড’র সরকারের ওপর কতখানি প্রভাব পড়তে পারে? আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ জিয়াউদ্দিন আহমেদ বিবিসিকে বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতিমধ্যেই বিভিন্ন রকম নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে রেখেছে বার্মার ওপর। আগে আরো বেশি নিষেধাজ্ঞা ছিল। এখন তাদের নতুন নিষেধাজ্ঞার চিন্তা করতে হবে জানিয়ে ওই বিশ্লেষক বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নকেই এ ক্ষেত্রে বিশ্ব নেতৃত্ব নিতে হবে। যথেষ্ট না হলেও কিছু ব্যবস্থা তারা নেবে বলে তিনি মনে করেন। মিস্টার আহমেদ বলেন অধিকাংশ রোহিঙ্গাকেই রাখাইন থেকে বের করে দেয়া হয়েছে এবং সেজন্য ওখানে গিয়ে কি ঘটেছে সেটা ইওরোপীয় ইউনিয়নকে দেখতে হবে। তাদের ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিশন যেন সেখানে যেতে পারে। মিয়ানমারের সরকারের ওপর এমন ব্যাপক চাপ দিতে হবে যাতে রোহিঙ্গা নিধন কর্মসূচি তারা বন্ধ করে। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার পরিবেশ মিয়ানমারকেই তৈরি করতে হবে এবং এক্ষেত্রে ইউরোপ ছাড়া বাংলাদেশের এ মুহূর্তে আশার জায়গা নেই বলেও মন্তব্য করেন ওই বিশ্লেষক।
৮ দফা প্রস্তাবনার বিস্তারিত : 
ইউরোপীয় ইউনিয়ন কাউন্সিলের সভায় ৮ দফা প্রস্তাবনার বিষয়ে একমত হয়েছেন নীতি নির্ধারকরা। যার মধ্যে মোটা দাগে যে বিষয়গুলো এসেছে তা হলÑ রাখাইন রাজ্যে মানবিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতি শোচনীয়। সেখানে ধারাবাহিকভাবে গোলাগুলি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, সহিংসতা ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। এর তাৎক্ষণিক অবসান হওয়া জরুরি। রাখাইনে চলমান সহিংসতায় যে পাঁচ লাখের বেশী লোক বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন তারা যেন নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে ফিরতে পারে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। উ™ভূত পরিস্থিতিতে ইইউ মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে রাখাইনে অভিযান বন্ধের অনুরোধ জানিয়েছে। একই সঙ্গে বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা রক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্য না করা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন মেনে চলতে সেনাবাহিনীকে অনুরোধ জানিয়েছে। একই সঙ্গে উত্তেজনা প্রশমনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। আক্রান্ত এলাকায় জাতিসংঘ, আইসিআরসিসহ সব আন্তর্জাতিক বেসরকারির উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে শর্তহীন পূর্ণ প্রবেশাধিকার দিতে হবে। যারা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছে, তাদের নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে ফিরিয়ে আনতে বিশ্বাসযোগ্য ও বাস্তব প্রক্রিয়া চালু করতে হবে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে মানবিক সহায়তা দেয়ার কাজটি রাখাইন পর্যন্ত বিস্তৃত করার প্রয়াস অব্যাহত রাখবে ইইউ। প্রস্তাবনায় স্পষ্ট করেই বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের জুনে মিয়ানমারের বিষয়ে নেয়া কৌশলের ক্ষেত্রে ইইউ এবং এর সদস্য রাষ্ট্রগুলো অটল রয়েছে। দেশটির গণতান্ত্রিক উত্তরণ, শান্তি, জাতীয় সমন্বয় ও আর্থসামাজিক উন্নয়নের বিষয়গুলোর প্রতিও সমর্থন রয়েছে ইইউ’র। সংস্থাটি মনে করে এখন রাখাইনে শান্তি ও উন্নয়নে নিশ্চিতে রাখাইন কমিশনের সুপারিশগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন জরুরি। মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকা-ের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার যে প্রতিশ্রুতি সু চি সরকার দিয়েছে তাকে স্বাগত জানিয়েছে বলা হয় সেখানে শিশুদের ওপর নিষ্ঠুর হামলাসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের মারাত্মক অভিযোগগুলোর বিশদ তদন্ত করা উচিত। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের স্বাধীন আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী মিশনকে মিয়ানমারের পূর্ণ সহযোগিতা করতে হবে। অনুসন্ধানী মিশনকে অবিলম্বে দেশটিতে নিরাপদে ঢুকতে দিতে হবে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল সম্প্রতি অনুসন্ধানী মিশনের ক্ষমতা বাড়ানোর নির্দেশ দেয়ার ঘোষণাকেও স্বাগত জানায় ইইউ। প্রস্তাবনায় মিয়ানমারের কাচিন ও শান রাজ্যের মানুষের মানবিক পরিস্থিতি নিয়েও ইইউ উদ্বিগ্ন জানিয়ে বলা হয়- সেখানেও মানবিক সহায়তা দেয়া প্রয়োজন। ওই সব এলাকায় ত্রাণকর্মীদের অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিতের আহ্বানও জানায় ইইউ।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

ঢাকা ওয়াসাকে ১৩টি খাল উদ্ধারের নির্দেশ

এসডিজি অর্জন করতে হলে প্রতিবছর ৩০ শতাংশ নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ বাড়াতে হবে

‘অনুপ্রবেশকারীদের ৫০০০ পাওয়ারের বাতি জ্বালিয়েও খুঁজে পাওয়া যাবে না’

‘ক্ষমতা থাকলে সরকারকে টেনে-হিচড়ে নামান’

আগামীকাল আদালতে যাবেন খালেদা জিয়া

‘সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন নেই’

‘তদন্তের স্বার্থেই তনুর পরিবারকে ডাকা হয়েছে’

জিম্বাবুয়ের নতুন প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন ‘কুমির মানুষ’

আশ্রয়শিবিরে সংক্রমণযুক্ত পানির বিষয়ে ইউনিসেফের সতর্কতা

চীন, উত্তর কোরিয়ার ১৩ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ

রোহিঙ্গা সঙ্কট: উচ্চ আশা নিয়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার বৈঠক শুরু

ঘোড়ামারা আজিজসহ ছয় জনের মৃত্যুদণ্ড

নিবিড় পর্যবেক্ষণে মহিউদ্দিন চৌধুরী

আফ্রিকার স্বৈরাচারদের মেরুদণ্ডে শিহরণ

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের প্রস্তাব, যা বললেন মুখপাত্র...

দুদকের মামলা থেকে অব্যাহতি পেলেন মেয়র সাক্কু