প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এসেছিলেন যে বাড়িতে

চলতে ফিরতে

কাজল ঘোষ, চীন থেকে ফিরে | ১৭ অক্টোবর ২০১৭, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ৫:০৬
গাইড ই’র মুখে কথাটি শুনেই অবাক হয়েছি। বাড়িটিতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এসেছিলেন। এটা খুব বেশি আগের কথা নয়। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে। শি জিনপিং চীনের প্রেসিডেন্ট। তিনি কি না অতি সাধারণ একটি বাড়িতে ছিলেন।
ভেবে কেমন জানি লাগছিল। আমার কৌতূহল একটাই। শি জিনপিং কেন এই বাড়িতে। কথা বলে জেনেছি, বাই পিপল হচ্ছে এ অঞ্চলে জনসংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় নৃ-গোষ্ঠী। তাদের সম্মান জানাতেই তিনি এসেছিলেন। ছবিতে দেখেছি তিনি বাড়িটির উঠোনে বসে স্থানীয়দের সঙ্গে আড্ডায় মেতে উঠেছেন। হ্যাঁ সত্যিই আমরা সেই বাড়িটিতেই অবস্থান করছি। যে চেয়ারে তিনি বসেছিলেন আমাদের অনেকেরই সেই চেয়ারটিতে বসে ছবি তোলার জন্য আকুপাকু অবস্থা। এটি একটি অভিজাত বাই পিপলের বাড়ি। আমরা এখানে কিছু সময় কাটাবার সুযোগ পেয়েছি। এটি ত্বালি শহরেই। মুন লেকের পাড়ে। গ্রামটির নাম কুশাং। কুশাং ভিলেজ বলেই সবাই চেনেন। এখানকার বেশিরভাগ বাসিন্দাই বাই জনগোষ্ঠীর। ঘণ্টাখানেকের হাঁটাচলায় অবাক লেগেছে। আমাদের এখানের মহল্লার মতো এলাকাটি। লম্বা সরু পথ চলে গেছে মুন লেকের পাড় পর্যন্ত। যখন আমাদের বাস কুশাং ভিলেজে প্রবেশ করে তখন পর্যন্ত আমরা বুঝতে পারিনি এতবড় লেক সামনেই গর্জন করছে। আর গ্রামটির নীরবতায় বিস্মিত হয়েছি। প্রতিটি বাড়ির দুয়ার বন্ধ। মনে হচ্ছে কোনো লোকজন নেই। কিছুদূর পরে পরে দু’চারজন বয়সী মানুষ বসে গল্প করছে। কারো ৭০ কারো বা ৮০। এরা সকলেই এখন অবসর জীবনে। এক সন্তান নীতির কারণে চীনে জনসংখ্যা কমে যাচ্ছে আর সেই ঢেউ বুঝি এ গ্রামেও পৌঁছেছে। পুরো গ্রামটিই ফাঁকা মনে হয়। আর এই বৃদ্ধদের সবারই সন্তান থাকে শহরে। তারা ব্যস্ত তাদের চাকরি-বাকরি নিয়ে। আর সরকারি ভাতা নিয়ে বুড়ো-বুড়ির দিন কাটছে। বাড়ির ডিজাইন একই। কুশাংকে বলা হয় ত্বালি শহরের আধুনিক একটি গ্রাম। এখানকার সব বাড়ি সাদা রঙের। কারণ, বাই সমপ্রদায় বিশ্বাস সাদা হচ্ছে আভিজাত্যের প্রতীক। দেয়ালে নানান রকমের ডিজাইন রয়েছে। যার প্রতিটিই কোনো না কোনো অর্থবোধক। এখানকার বাড়িগুলো তৈরি পাহাড়, প্রকৃতি মাথায় রেখে। বাড়িগুলো দক্ষিণ-পূর্বমুখো করে তৈরি। বাতাস বা ঝড়ো হাওয়া মাথায় রেখেই এ ব্যবস্থা। এই পাড়ায় অদ্ভূত বিষয় হচ্ছে একটি মুক্ত মঞ্চ আছে। মঞ্চের দু’পাশে দুটো গেট থাকে। বছরের নির্দিষ্ট উৎসব সময়ে এসব মঞ্চে অপেরা প্রদর্শিত হয়। আর একটি গেট দিয়ে শিল্পীরা প্রবেশ করে অন্য গেট দিয়ে প্রস্থান করে। সেই উৎসবে পাড়ার সবাই অংশ নিয়ে থাকে। কুশাং ভিলেজে একটি টেম্পলে প্রবেশের সুযোগ হয়েছে। সেখানে একই ছাদের নিচে তিন মতবাদই চোখে পড়েছে। তাওয়িজম, বুদ্ধিজম, কনফুশিয়াসিজম। পাশাপাশি তিন প্রধানের প্রতিকৃতি একই ছাদের নিচে। বিশেষ দিনগুলোতে তাদের অনুসারীরা প্রার্থনা করতে আসে টেম্পলে। বলা যায়, একেবারেই পরিত্যক্ত অবস্থায় টেম্পলটি। ঝুল পড়ে আছে। পাতায় ছেয়ে যাওয়া উঠোনে বেশ ক’টি আপেল গাছ। আপেল খাওয়ার মানুষের বড্ড অভাব। তাই আমাদের দলের কেউ কেউ আপেল ছুঁয়ে দেখার শখ অবদমন করতে পারেনি।
সেই বাড়িটি এখন জাদুঘর
চীনের প্রেসিডেন্ট যে বাড়িটিতে ছিলেন এটি ইউনানের বড় এথনিক জনগোষ্ঠী বাই পিপলদের বাড়ি। এটি একটি ট্রাডিশনাল বাই হাউজ। বাড়িটির মালিক লি। বর্তমানে বাড়িটি একটি দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। দু’তলা এই বাড়ির নিচতলাতেই একটি কক্ষ জাদুঘর বানানো হয়েছে। প্রেসিডেন্ট শি জিংপিং যে টেবিল চেয়ারে বসেছিলেন তা স্থান পেয়েছে কক্ষটিতে। আর মহামান্য অতিথির বেশকিছু পরিদর্শনকালীন ছবি। মালিক লি আমাদের বাড়িটি সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য দিলেন। বর্তমানে বাড়ির দু’তলায় তার পরিবার নিয়ে বাস করেন। বাড়িটির সামনে একটি সাদা দেয়াল রয়েছে। যা বাই পিপলদের ট্রাডিশন। এটি প্রতিরক্ষা দেয়াল হিসেবে তারা স্থাপন করে। বাই পিপলদের বাড়ির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে- দেয়াল থাকবে সাদা। কারণ এরা সাদাকে পবিত্র, উজ্জ্বল রঙ মনে করে। তাদের পোশাকেও দেখা যায় একইরকম মিল।
বাই নৃ-গোষ্ঠীর আচার-ঐতিহ্য
আজ থেকে ২২শ’ বছর আগে বাই সম্প্রদায়ের সূচনা। প্রাচীন চি সম্প্রদায়ের মধ্য থেকেই এই বাই জাতিগোষ্ঠীর সূচনা। একসময় চি জাতিগোষ্ঠীর বাস হাংশুই নদীর তীরে। সেখান থেকে কালক্রমে হান এবং চিন ডায়নেস্টির সময় এরা দলবলে চলে আসে পশ্চিমাঞ্চলের ল্যানচাং নদীর পাড়। ইউনান প্রদেশে তারা চিয়াং জনগোষ্ঠী হিসেবে প্রথমদিকে পরিচিত হলেও ধীরে ধীরে তারা বাই সম্প্রদায় হিসেবে প্রকাশিত হয়। ইউনানের ত্বালি, কুনমিং-এ বর্তমানে প্রায় দুই লাখ বাই সম্প্রদায়ের বাস। ত্বালি কিংডম সময়কালে বাই’রা নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে ব্যাপকভাবে বিকশিত হয়। বাই’রা তাদের পোশাকে উজ্জ্বলতাকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। এরা ক্যামেলিয়া ফুলকে সৌন্দর্যের প্রতীক মনে করে। আর এ কারণে তাদের পোশাক তৈরির সময় ক্যামেলিয়া ফুলের রঙকেই বাছাই করে থাকে। বাই জনগোষ্ঠীর সাদা রঙকে প্রাধান্য দেয়ার অন্যতম কারণ তারা মনে করে এই রঙ সামাজিক প্রতিপত্তির প্রতীক। ছেলেরা সাধারণত ওপরে সাদা রঙের ফতুয়ার মতো আর একই রঙের প্যান্ট পরে থাকে। মেয়েরা রঙিন পোশাক পড়লেও তাতে সাদার প্রাধান্য থাকে। বিবাহিত বা অবিবাহিত বিবেচনা করেও বাই মেয়েদের পোশাক ও সাজসজ্জায় পার্থক্য দেখা যায়। এরা মূলত গরু ও শূকরের মাংস বেশি খায়। আর তাদের খাদ্য তালিকায় নানান রকমের আচার থাকে। তবে নদী এলাকায় তাদের বসতি বলে মাছও নানাভাবে তাদের খাদ্য তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। বাই সম্প্রদায়ের মানুষেরা দিনে দুইবার চা পান করে। কিন্তু এটা বিশেষ ধরনের চা। চীনা ভাষায় এই চা’কে বলা হয় সানতাও আর ইংরেজিতে বলে থ্রি কোর্স টি। তিন দফায় এই চা পরিবেশিত হয়ে থাকে। প্রথমে তিতকুটে, তারপর মিষ্টি এবং সবশেষে গ্রিন চায়ের ফ্লেভারে চা।
এদের অতিথিপরায়নতা সমাদৃত। বাড়িতে কোনো অতিথি এলে পানীয় সহকারে বরণ করে নেয়া হয়। আর বাই জনগোষ্ঠীর বাড়ি নির্মাণে রয়েছে নিজস্ব ধরণ। আমরা যখন ত্বালি শহরে প্রবেশ করি তখনই তা টের পাই। বিকালের রোদে ত্বালি শহরের বিভিন্নস্থান চিকচিক করছিল। কারণ বাই জনগোষ্ঠীর সব বাড়ির দেয়াল সাদা রঙের। আর ওপরের দিকে রয়েছে নীলরঙের নানা নকশা। বাইদের বাড়ি সাধারণত ‘ইউ’ আকৃতির হয়ে থাকে। ভেতরে উঠান থাকে। আর সামনের দিকে একটি দেয়াল থাকবে যেখানে আলোর প্রতিবিম্ব পড়বে বাড়ির ভেতরে। বাড়ির মূল অংশ ইট এবং কাঠে তৈরি হলেও দেয়ালটি তৈরি করে সাধারণত মার্বেল দিয়ে। ত্বালির চাংশান পাহাড়েই রয়েছে অনেক মার্বেল। যা ত্বালি শি বা ত্বালি স্টোন নামে খ্যাত। এই ত্বালি স্টোন দিয়ে তৈরি হয় বাড়ির সামনের স্ক্রিন। আর ঝড় বা বৃষ্টির কথা মাথায় রেখে বাড়িগুলো সবই দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে তৈরি। আর দুষ্ট ড্রাগন বা শয়তানের হাত থেকে বাঁচতে তারা নীল রঙের নানান নকশা কাটে বাড়ির ওপরের দিকে। যেন রাতে চাঁদের আলোতেও এরা ভয় পায়। বাই এথনিক পিপল (বাই নৃ-গোষ্ঠী) ত্বালি শহরের সবচেয়ে বড় নৃ-গোষ্ঠী। তারা নিজেদের বাইজি (ইধরুর-যিরঃব ঞৎরনব) মনে করে।
সিচো ভিলেজে এক ঘণ্টা
চাইনিজ ভাষায় সিচো অর্থ হচ্ছে হ্যাপি। আর সিচো ভিলেজকে ইংরেজিতে বলা হয় হ্যাপি ল্যান্ড। ২০শে সেপ্টেম্বর থ্রি প্যাগোডা দেখে নান ইয়ং লি চিয়াও এলাকায় একটি মুসলিম রেস্টুরেন্টে আমরা লাঞ্চ শেষ করতেই গাইড ‘ই’ আমাদের জানায় এবার আমাদের যাত্রা হ্যাপি ল্যান্ডে। কথাটি শুনে ভেতরে ভেতরে হ্যাপি হয়ে গেলাম। আমাদের আধঘণ্টা দূরত্বে একটি বাই অভিজাত পরিবারের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো। প্রথা অনুযায়ী সেখানকার গাইড চিংহুয়া (এড়ষফবহ ঋষড়বিৎ) আমাদের পুরো বাড়িটি ঘুরিয়ে দেখায়। বাড়িটির বিশতম বংশধর এখন বাস করে। বাড়ির গেট তিনটি লেয়ারে তৈরি। বাড়ির ভেতরে তিন তলা একটি ভবন। গেটটি তিনটি লেয়ারে তৈরি কারণ, বৃষ্টি যেন একেক ধাপে নিচে নেমে আসে। আর বাই গোষ্ঠী বৃষ্টির পানি নষ্ট হতে দেয় না। তারা এই পানিকে পবিত্র মনে করে বলে সংরক্ষণ করে থাকে। এই তিন লেয়ারের গেটটিতে তা সংরক্ষণের ব্যবস্থাও আছে আর বাড়ির ওপরের অংশে চার স্তরের নকশা করা। একেবারে ওপরে ব্লু ফিনিক্স তারপরের স্তরে নারী ড্রাগন, তৃতীয় ধাপে খরগোশ। চতুর্থ ধাপে আবারো ফুল পাখির ছবি। প্রথম ধাপ হচ্ছে বিপদ থেকে রক্ষা, দ্বিতীয় ধাপে নারী ড্রাগন, কারণ বাড়ির মালিক হচ্ছেন নারী। তৃতীয় ধাপে খরগোশ। যা সন্তান সন্ততির লক্ষণ। অর্থাৎ এই বাড়িতে অনেক ছেলে মেয়ে আছে তার চিহ্ন। বাড়িটি চাংশান পর্বতমালা মাথায় রেখে দক্ষিণ-পূর্ব মুখো করা। বাড়িটির গেটে লেখা ‘হ লু’। অর্থাৎ বাড়িটির নাম বাড়ির দেয়ালে বইয়ের ছবি আঁকা। এর অর্থ হচ্ছে এই বাড়ির ছেলে-মেয়েরা শিক্ষিত। গেটে ভাগ্যলক্ষ্মীর প্রতিকৃতিও আঁকা আছে। যাতে হাত দিলে আপনার ভাগ্য নিয়ে নিতে পারে (ভাগ্যলক্ষ্মী)। বাই জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য হচ্ছে তারা বাড়ির দেয়ালে তাদের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করে। সবাই যেন বুঝতে পারে কে কি? আমরা যেই বাড়িটি দেখি তার বয়স হবে একশ’ বছরের বেশি। কিন্তু মনে হচ্ছিল যেন সম্পূর্ণ নতুন। যা হোক একসময় আমাদের বরাদ্দকৃত সময় শেষ হয়ে আসে। আমাদের এ বাড়িতেই পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় ঐতিহ্যবাহী টাইডাই বা বাটিকে তৈরি পোশাকের সঙ্গে। এটাও এই এলাকার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। আমরা নিজেরাও এতে অংশ নেই। আর সবশেষ নিজ হাতে রাইচ কেক তৈরি ও আচার সহযোগে খেয়ে উদরপূর্তি করি।

কাল পড়ুন: চা নিয়ে যৎকিঞ্চিত

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

২০১৮ সালে প্রবল ভুমিকম্পের আশঙ্কা!

কেয়া চৌধুরী এমপি’র উপর হামলার ঘটনায় মামলা

বাংলাদেশের রাজনীতি, বিকাশমান মধ্যবিত্ত এবং কয়েকটি প্রশ্ন

ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতাতে আহত ডিবি পুলিশ

প্রতিবেশীদের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকা জরুরীঃ বাংলাদেশকে মিয়ানমার

তারেক রহমানের জন্মদিন পালন করবে বিএনপি

রোহিঙ্গা শিবিরে যেতে চান প্রণব মূখার্জি

তালাকপ্রাপ্ত নারীকে অপহরণের পর গণধর্ষণ

আরো ১০ দিন বন্ধ থাকবে লেকহেড স্কুল

জাতিসংঘকে দিয়ে রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধান হবে নাঃ চীন

ম্যনইউয়ের টানা ৩৮

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সংলাপে সহায়তা করতে আগ্রহী চীন

জল্পনার অবসান ঘটালেন জ্যোতি

চীনের বেইজিংয়ে অগ্নিকাণ্ড, নিহত ১৯ আহত ৮

সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত এমপি গোলাম মোস্তফা আহমেদ

বিশ্ব সুন্দরীর মুকুট মানসী চিল্লার-এর