চির বসন্তের দেশে, ১১

কুনমিং-এ ফুলের সমুদ্রে জোয়ার

চলতে ফিরতে

কাজল ঘোষ, চীন থেকে ফিরে | ১৬ অক্টোবর ২০১৭, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:৩৭
ভ্রমণ খোলামনে হওয়া চাই। পিছুটান থাকবেই। কিন্তু তা যদি হয় রুটিনে বদ্ধ; সময়ের আঁচলে বন্দি; তাহলে কিছু দেখা যাবে; কিছু বাদ দিতে হবে। অনেক কিছুই অনুভূতিতে নিয়ে আসতে হবে। দলবেঁধে শিক্ষা সফরে বা ইয়ুথ ক্যাম্পে এ সমস্যা অনেক বেশি। মন চাইলেও কিছু করা যায় না।
সব সময় শৃঙ্খলার মধ্যে আটকে থাকতে হয়। যদিও বাংলাদেশ-চীন ইয়ুথ সামার ক্যাম্প ২০১৭ আমাদের দিয়েছে অনেক কিছুই। কিন্তু কিছু আফসোস তো রয়েই গেল। যেমন ত্বালিতে মুন লেকটা ভালো করে ঘুরে দেখার সুযোগ হয়নি। ন্যাশনালিটি ভিলেজে বেশকিছু জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে আরও বেশিকিছু সময় কাটাবার ইচ্ছে ছিল। তিয়েনসি লেক একদম হাতের কাছে থাকার পরও দেখা হয়নি। ত্বালি যাওয়ার পথে ডাইনোসর ভ্যালিতে নামতে পারিনি। দুই সপ্তাহের একেবারে শেষ প্রান্তে। হঠাৎ মনে হলো শুনেছি এশিয়ার বৃহত্তম ফুলের বাজার কুনমিং-এ। আমাদের শাহবাগ, কাঁটাবন, বেইলি রোডে প্রচুর ফুল কেনাকাটা করেছি। কিন্তু কুনমিং-এ। ২৪শে সেপ্টেম্বর শেষ সন্ধ্যাটা বাছাই করলাম ফুল বাজারের জন্য। খোঁজ নিয়ে জেনেছি ইউনিভার্সিটি টাউন এলাকা থেকে সাবওয়েতে যাওয়া যায় ফুল বাজারে। সাবওয়েকে চীনা ভাষায় বলা হয় তিথি। তিথিওয়ে করে কিভাবে যাওয়া যায়। আমাদের সঙ্গে অভিজ্ঞ টিপু ভাই। তিনি ইন্টারনেট সহায়তা নিয়ে কিছু আগাম তথ্য জেনে নিলেন। কিভাবে যেতে পারি বৃহত্তম ফ্লাওয়ার মার্কেটে। সঙ্গী হিসেবে গাইড পেলাম গোয়েন-কে। সে ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী কুংমিং-এর স্থানীয়। ভরসা পেলাম। আমার সহযাত্রী ছিল টিপু ভাই, আজিম, আসিফ আর জাহাঙ্গীর। ইউনিভার্সিটির ওয়েস্ট গেট দিয়ে ১৫ আরএমবিতে একটি মাইক্রোবাসে আমরা চলে গেলাম সাবওয়ে স্টেশনে। পরিচ্ছন্ন-ঝকঝকে। দিনটি ছিল রোববার। যাত্রী একেবারেই কম। কারণ, রোববার ছুটি থাকে কুনমিং-এ। প্রত্যেকেই ছয় আরএমবি করে টিকিট নিয়ে পাঞ্চ করতেই স্টেশনে প্রবেশ পথ খুলে গেল। প্রতি ১০-১৫ মিনিট পর পরই সাবওয়ে ট্রেন এসে হাজির হয়। আমরা দাঁড়াতেই দরোজা খুলে গেল। যে স্টেশনে আমরা নামবো তার নাম ডোনান (Dounan)। ইউনিভার্সিটি টাউন এলাকা থেকে ছয়টি স্টেশন পরেই এর অবস্থান। একে একে পার হলাম ইকং সাউথ রোড, লিয়ন্ড স্ট্রিট, তোফোং স্ট্রিট, চাংরং স্ট্রিট, সাউথ কোট স্টেশন। ছয় নম্বর স্টেশন তুনান। নেমেই খানিকটা হাঁটা পথ। রোববার বলে ভিড় কম। অল্প কিছু দোকান খোলা আছে। কিন্তু এর বিশালতা সাক্ষী দিচ্ছে এটিই এশিয়ার বৃহত্তম ফ্লাওয়ার মার্কেট। চেংশুই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমে পড়েছিলাম। The captal of flower&_। একেকটি দিন যাচ্ছিল পরতে পরতে টের পাচ্ছিলাম। পথ-ঘাট সবখানেই ফুল অনিবার্য। যেন প্রতিটি দিন সাজিয়ে রাখছে কেউ এসে। ইউনান ইউনিভার্সিটি তো পুরোটাই যেন একটি ফুল বাগান। কুনমিং শহরের ৬০,০০০ বর্গমাইল এলাকাজুড়ে ফুল সাজানো আছে। এটা যে শুধু পথে, সড়ক দ্বীপে বা ফুটপাতে তা নয় রয়েছে ফ্লাওয়ার মল, ফ্লাওয়ার গ্রীন হাউজ, পারফিউম মিউজিয়াম এবং ফোর ডি সিনেমাতেও। তাজা ফুল বিক্রয় করতে ২০০ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে শহরের বিভিন্ন স্থানে। তার সবচেয়ে বড় কেন্দ্র হচ্ছে তুনান। যেখান থেকে শুধু চীনের বিভিন্ন প্রদেশেই নয়- জাপান, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, উত্তর কোরিয়া, সিঙ্গাপুরে প্রতিদিন এই মার্কেট থেকে ফুল যায়। আর প্রতিদিন তরতাজা ফুল আশপাশের দেশসমূহে পাঠাতে বিমানের নিজস্ব ব্যবস্থাপনা রয়েছে। যা ব্যবসা সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একেবারেই শেষ বেলায় ফুল বাজার বন্ধ থাকায় খুব বেশি সুবিধে হয়নি। তাই বলে থেমে থাকার মানুষ আমি নই। ঢাকায় ফিরে কুনমিং অবস্থান করছেন মিশকাত (সাগরেদ আল মিশকাত শরীফ)। যিনি বর্তমানে ইউনান ইউনিভার্সিটিতে পড়ছেন। তাকে অনুরোধ করেছিলাম ফ্লাওয়ার মার্কেট ভিজিট করতে। ইউনান ইউনিভার্সিটির ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী সোফিয়াসহ মিশকাত ফুলমার্কেট ভিজিট করে জানালো নানা অজানা তথ্য। উইচাটের ভিডিও কলে ফুল মার্কেটের ছবিও পাঠিয়ে দিলেন।
এশিয়ার বৃহত্তম ফ্লাওয়ার মার্কেট তুনান ফ্লাওয়ার মার্কেট কুনমিং-এর কেন্দ্রস্থল থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই মার্কেটকে স্থানীয়রা heart of flower supply বলে থাকে। অনেকেই আবার flowers sea বা ফুলের সমুদ্র বলেও অভিহিত করেন। বাস্তবতাও তাই। প্রতিদিন গড়ে এই ফুলবাজারে ২.৫ মিলিয়ন আরএমবি-র ফুল বিক্রয় হয়ে থাকে। ৪ বর্গমাইল এলাকাজুড়ে তিনতলা এই মার্কেটের রয়েছে ৮টি গেট। দিনে দুইবার ফুলের মার্কেট বসে। সকালে মূলত খুচরা আর রাতে পাইকারি। সকালে ৯টায় শুরু হয়ে চলে বিকাল ৫টা। আর রাত সাড়ে ৮টা শুরু হয়ে চলে মধ্যরাত পর্যন্ত। মার্কেট এলাকায় রপ্তানিযোগ্য ফুল প্যাকেট করা হয়। কয়েক শত ফ্রিজিং পিকআপ ভ্যান ফুল নিয়ে ছুটে গন্তব্যের উদ্দেশে। আর শুধু ফুল নয় এখানে পাতাবাহার, ক্যাকটাস, ফুলের গাছ, ফুলদানি, ফুল চাষের নানান সামগ্রীও বিক্রয় হয়ে থাকে। মার্কেটের নিচতলায় শুধু ফুল বিক্রয় হয়। দুই থেকে তিন হাজার রকমের ফুল মার্কেটে প্রতিদিন আসে। ইউনান প্রদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে চাষিরা এখানে ফুল নিয়ে আসে। বিক্রেতাদের বেশির ভাগই নারী। এদের বেশির ভাগই নিজেদের বাগানে চাষ করা ফুল নিয়ে বিক্রয় করতে আসে। অনেকেই দেখা গেছে সন্তান কোলে নিয়ে ফুল বিকিকিনি করতে। লিলি (Lily) রোজ (Rose), ফরগট মিন নট (Forgot me not), কারনেশন (Carnation), বাটারফ্লাই অর্কিড (Butterfly orchid), জারবেড়া (Gerbera), মথ অর্কিড (সড়ঃয ড়ৎপযরফ), আফ্রিকান ডাইসিস (African daisies), অপেন আর্ডিং (ড়ঢ়বহ যড়ৎফরহম), গ্ল্যাডিওলাস (Gladio0lus), চাইনিজ রোজ (ঈযরহবংব জড়ংব), ক্রিসেনথিমাম (Chrysanthemum), আফ্রিকান ক্রিসেনথিমাম (African Chrysanthemum), অন্থরিয়াম (Onthurium)। নাম লিখে শেষ করা যাবে না। তবে মজার বিষয় হচ্ছে গোলাপের রয়েছে নানান ধরন। দশ থেকে পনের ধরনের গোলাপ বাজারে আসে প্রতিদিন। এর মধ্যে চীনের রয়েছে নিজস্ব ধরনের গোলাপ। আর গোলাপের মধ্যেও হাইব্রিড রয়েছে। বলা হয়ে থাকে কুনমিং-এ সবচেয়ে বেশি গোলাপ চাষ হয়। আর গোলাপ দিয়েই তৈরি হয় কুনমিং-এর জনপ্রিয় খাবার মুন কেক। যা মিড অটম ফ্যাটিবলে সবাইকে উপহার হিসেবে দেয়া হয়।
ব্যবসায়ী লিওকং জানান, এপ্রিল হচ্ছে বসন্ত। আর সেই সময় সবচেয়ে বেশি ফুলের আমদানি হয়। উৎসবগুলোতে ফুলের চাহিদা বেশি থাকে। ফেব্রুয়ারিতে ভ্যালেন্টাইনস ডে, চীনের নিজস্ব রীতিতে পালিত লাভারস ডেতে (২০শে আগস্ট) চাহিদা তুঙ্গে। সে সময় ফুলের দামও চড়া থাকে। সাধারণ দামের চেয়ে দ্বিগুণ দামে এ সময় ফুল বিক্রয় হয়ে থাকে। যেমন সাধারণ গোলাপ ২০টির একেকটি প্যাকেট সর্বনিম্ন ১৫ আরএমবিতে বিক্রয় হচ্ছে। অন্যদিকে হাইব্রিড গোলাপ ১৫টির প্যাকেট ২০ আরএমবি। এটিই উৎসবের সময় দ্বিগুণ হয়ে যাবে। ছোট ছোট বিক্রেতারা গড়ে প্রতিদিন দশ হাজার আরএমবির ফুল কেনাবেচা করে থাকে। আর প্রতিদিন ৩ মিলিয়ন ফুল বিক্রয় হয়। মজার বিষয় হচ্ছে ফ্লাওয়ার মার্কেটে রয়েছে ফুলের তৈরি খাবার দোকানও। চীনে ফুল আর নানান ক্যাকটাস, পাতাবাহারে বাড়িঘর সাজানোর রয়েছে ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্যই ফুলের ব্যবসাকে স্থানীয়ভাবে প্রসারে সহযোগিতা করে থাকে। তাছাড়া চিরবসন্তের দেশ কুনমিং ভাগ্যবান প্রকৃতির জন্য। মিষ্টি আবহাওয়া ফুল চাষের জন্য উপযুক্ত। চীনের কিশোর-যুবা-বয়সী সকলেরই একটি মাসিক বরাদ্দ থাকে ফুলগাছ ক্রয়ের। সব চাহিদা মাথায় রেখে কুনমিং-এ ফুলের ব্যবসার কেবলই প্রসার ঘটছে। ১৯৯৯ সালে তুনান মার্কেট চালু হলে তা ২০১৭-তে এসে এশিয়ার বৃহত্তম ফুলের মার্কেট। আর ক্রমবর্ধমান ফুল চাষ বৃদ্ধিও নেপথ্যে ভূমিকা রাখছে। ১৯৯৪ সালে যেখানে ইউনানে ১৩৩ হেক্টর জমিতে ফুল চাষ হতো তা ২০১৩-তে এসে দাঁড়িয়েছে ৬৭,৪০০ হেক্টরে। ধীরে ধীরে তুনানের বাইরে কুনমিং শহরেই আরও বেশকিছু ফুলের মার্কেট গড়ে উঠেছে। এদের মধ্যে অন্যতম হোয়াইট ড্রাগন ফ্লাওয়ার মার্কেট, ওয়েস্টার্ন পেন্টস ফ্লাওয়ার মার্কেট, চাইওয়ান ফ্লাওয়ার মার্কেট, তাগুয়ান ফ্লাওয়ার মার্কেট, গোল্ডেন ট্রি ভিলেজ ফ্লাওয়ার মার্কেট, চিনশিং ফ্লাওয়ার মার্কেট।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

২০১৮ সালে প্রবল ভুমিকম্পের আশঙ্কা!

কেয়া চৌধুরী এমপি’র উপর হামলার ঘটনায় মামলা

বাংলাদেশের রাজনীতি, বিকাশমান মধ্যবিত্ত এবং কয়েকটি প্রশ্ন

ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতাতে আহত ডিবি পুলিশ

প্রতিবেশীদের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকা জরুরীঃ বাংলাদেশকে মিয়ানমার

তারেক রহমানের জন্মদিন পালন করবে বিএনপি

রোহিঙ্গা শিবিরে যেতে চান প্রণব মূখার্জি

তালাকপ্রাপ্ত নারীকে অপহরণের পর গণধর্ষণ

আরো ১০ দিন বন্ধ থাকবে লেকহেড স্কুল

জাতিসংঘকে দিয়ে রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধান হবে নাঃ চীন

ম্যনইউয়ের টানা ৩৮

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সংলাপে সহায়তা করতে আগ্রহী চীন

জল্পনার অবসান ঘটালেন জ্যোতি

চীনের বেইজিংয়ে অগ্নিকাণ্ড, নিহত ১৯ আহত ৮

সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত এমপি গোলাম মোস্তফা আহমেদ

বিশ্ব সুন্দরীর মুকুট মানসী চিল্লার-এর