যেখানে সীমান্ত তোমার সেখানে বসন্ত আমার

মত-মতান্তর

রফিকুজজামান রুমান | ৩ অক্টোবর ২০১৭, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ৫:২৪
ইংরেজিতে একটি কথা প্রচলিত আছে যার বাংলাটা এরকম- ‘আমরা সবাই ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত বর্ণ আমাদেরকে ভিন্ন না করে, ধর্ম আমাদেরকে বিচ্ছিন্ন না করে, রাজনীতি আমাদেরকে বিভাজিত না করে এবং সম্পদ আমাদেরকে শ্রেণিবদ্ধ না করে।’ বর্ণ, ধর্ম, রাজনীতি আর সম্পদের ব্যবহারে ক্ষমতাকেন্দ্রিক যে বিশ্বব্যবস্থা আমরা গড়ে তুলেছি সেখানে মনুষত্বেরই আজ বড় দুর্দিন। এই পৃথিবীতে এ তো মানুষই যার হাতে সবচেয়ে অসহায় আর একজন মানুষ। ড. র‌্যামেলের একটি গবেষণায় দেখানো হয়েছে, বিগত শতাব্দীতে (১৯০০-১৯৯৯) পৃথিবীতে যত মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগে মারা গেছে, তার চেয়ে ছয়গুণ বেশি মানুষ মারা গেছে রাষ্ট্রের নিপীড়নে (Democide)। রাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবেই নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ধর্ম, বর্ণ কিংবা রাজনীতিকে। রাষ্ট্রের তো হাত-পা নেই। রাষ্ট্র একটি ‘অ্যাবসট্রাক্ট’ বিষয়।
এ হলো শক্তির প্রতীক। ‘সভ্য’ মানুষ এর কাঠামোগত নাম দিয়েছে ‘রাষ্ট্র।’ কিন্তু সেই রাষ্ট্রেই যখন মানুষের হাতে মানুষের নিপীড়ন হয়, তখন আমরা ‘মানুষ’ কি না সেই প্রশ্নই সামনে চলে আসে।
পৃথিবী, মহাকাশ, মহাসাগর জয় করে মানুষ এখন চাঁদে, মঙ্গলগ্রহে বসবাসের আয়োজন করছে। বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে এই পৃথিবীকে কত অবলীলায় মানুষ করায়ত্ব করে ফেলেছে। নাম দিয়েছে ‘বিশ্বগ্রাম!’ অথচ সেই পৃথিবীতে কিছু মানুষের কোনো দেশ নেই। রাষ্ট্র নেই। ভূখণ্ড নেই! মানুষের জন্য এর চেয়ে অপমানের, দুঃখের, পরাজয়ের আর কী থাকতে পারে যে, তারই মতো আর একজন মানুষ এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য কোনো ভূখণ্ড পায় না! আমরা কি তবে এখনো মানুষ হইনি? এই পৃথিবী কি তবে মানুষের পৃথিবী নয়?
স্বদেশ মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের দিকে তাকালে মানবিকতার এই নিষ্ঠুর পরাজয়ের প্রতিচ্ছবিই কেবল চোখে পড়ে। এই আধুনিক সভ্য সময়ে এমন দৃশ্যও কি কল্পনা করা যায়! মধ্য সেপ্টেম্বরে গিয়েছিলাম কক্সবাজরের উখিয়ায়। সেখানকার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র ঘুরে ঘুরে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর নির্মমতার যে বয়ান শুনেছি তা অবিশ্বাস্য! এতদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে রোহিঙ্গা নির্যাতনের নানা খবর ও ছবি দেখেছি। কিন্তু বিশ্বাসের মাপকাঠিতে ফেসবুক তো কখনোই পুরোপুরি মনোত্তীর্ণ নয়। ফেসবুকের প্রায় সবকিছুকেই প্রথমে ‘অর্ধসত্য’ বলে আমি ধরে নিই। ফেসবুক যত না প্রকৃত ‘বাস্তব’, তার চেয়েও অনেক বেশি ‘তৈরি করা বাস্তব’। এবং গণমাধ্যমও। এমন কি মূলধারার গণমাধ্যমকেও সবসময় পুরোপুরি বিশ্বাস না করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ফলে রোহিঙ্গা নির্যাতনের কাহিনীগুলো পুরোপুরি বিশ্বাস করা প্রশ্নহীন ছিল না। কিন্তু নিজে বিভিন্ন ক্যাম্পে ঘুরে ঘুরে রোহিঙ্গা মানুষজনের সঙ্গে কথা বলে মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলে নির্যাতনের যে ভয়াবহ বর্ণনা শুনেছি, তা বিশ্বাস করা কঠিন হলেও চরম বাস্তব। তিন বছরের ছেলেটির নাম ইসমাইল। উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পের কোথাও জায়গা হয়নি ওর। রাস্তার ধারে ত্রাণের জন্য অপেক্ষারত নানুর কোলে ক্লান্তি আর ক্ষুধায় ঘুমিয়েই পড়েছে নাফ নদ পাড়ি দিয়ে আসা শিশুটি। নানুর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ইসমাইলের বাবাকে মিয়ানমারের বর্মিরা মেরে ফেলেছে। জানতে চাইলাম কীভাবে মারলো। ইসমাইলের নানু বললেন, বর্মিরা প্রথমে হাত কাটে। পরে পা কাটে। শেষে গুলি করে মেরে ফেলে। জিজ্ঞেস করলাম, ওর মা কোথায়। মা নিখোঁজ। বুঝতে কষ্ট হলো না, এই মাকে মিয়ানমারের কোনো আর্মি হয়তো ভোগের সামগ্রী বানিয়ে নাফ নদেই ফেলে দিয়েছে উচ্ছিষ্ট দ্রব্যের মতো করে। ইসমাইল ঘুমিয়ে ছিল বলে ওর চোখের ভাষা পড়তে পারিনি। শিশুরা ঘুমের মধ্যে কী ধরনের স্বপ্ন দেখে জানি না। হয়তো সুন্দর একটি পৃথিবীতে হাসি আর আনন্দে ভরা নানা রঙের স্বপ্নে বিভোর ছিল ইসমাইল। কিন্তু ঘুম ভেঙে গেলেই মা-বাবাহীন কী নিষ্ঠুর এক পৃথিবী কী ভয়ানক এক অসহায়ত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে তার সামনে! সেই পৃথিবীতে ইসমাইলের কোনো ভবিষ্যৎ আছে কি না জানি না। কিন্তু এমন আরো অসংখ্য ইসমাইলের এমন পরিণতির বিনিময়ে রাশিয়া, চীন আর ভারতের ভবিষ্যৎ নির্মিত হচ্ছে মিয়ানমার উপকূলে। সে ভবিষ্যৎ শুধুই পুঁজি আর মুনাফার। সেখানে মানবিকতাবোধ ঘুমিয়ে থাকে ইসমাইলের এই ঘুমের চেয়েও গভীর ঘুমে। এরকম মিয়ানমারে উৎপন্ন আরো অসংখ্য টুকরো টুকরো ঘটনার বর্ণনায় ভারি হয়ে উঠছে কক্সবাজারের জনপদ। কক্সবাজার পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সমুদ্র্র সৈকতের নাম-ই শুধু নয়; সেটি আজ পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা নিষ্ঠুর অমানবিক ঘটনারও সাক্ষীস্থল। রোহিঙ্গা নারীরা বেশি বেশি সন্তান নেয়। জানা গেল, বারবার গর্ভবতী হলে মিয়ানমার আর্মিদের ধর্ষণের হাত থেকে কিছুটা রক্ষা পাওয়া যায়। গর্ভবতী নারীরা ধর্ষণের জন্য আর্মিদের ফার্স্ট চয়েস নয়! এ কেমন পৃথিবী ওহে জাতিসংঘ, চীন, রাশিয়া? ভূ-রাজনীতি আর অর্থনীতির স্বার্থ তোমাদের অন্ধত্বকে কোন পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে?  
নাফ নদের ওপারে মানবিকতার নির্লজ্জ পরাজয়ে জনপদ ভারি হয়ে উঠছে যখন, ঠিক এপারেই তখন রচিত হচ্ছে ভালোবাসা আর মানবিকতার অমর কাব্য। লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে ছোট্ট বাংলাদেশ মানবিকতার যে মহান জয়গানে মুখরিত হয়ে উঠেছে, তা বিশ্বে বিরল। এ তুলনাহীন। হে মিয়ানমারের জান্তা সরকার, হে সুচি, নদীর এ পারের এ দৃশ্য দেখে নাও। সুচির কাছে বড় জানতে ইচ্ছে করে, ‘শান্তি’ শব্দটি শুনলে সে কি বিব্রত হয় না! নোবেল পুরস্কারের সনদটি কি তার ঘরের দেয়ালে এখনো টানানো আছে? সেটি চোখে পড়লে লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে যায় না? জেনে রাখো, এদেশের প্রতিটি মানুষ কোনো রকমের কোনো পুরস্কারের মোহ ছাড়াই তোমাদের বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের যেভাবে সাহায্য করে যাচ্ছে, কোনো ‘নোবেল’ দিয়েই তা পরিমাপ করা যাবে না।  
রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ সত্যিই অনন্য নজির স্থাপন করেছে। যে যার মতো করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। এমনকি কিছুটা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করা গেল, মসজিদের বাইরের কোনো ‘কর্মকাণ্ডের’ সঙ্গে সম্পর্ক না থাকা তাবলীগ জামাতের লোকেরা পর্যন্ত দল বেঁধে রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ নিয়ে গেছে। জাতি, ধর্ম, শহর, গ্রাম সব এক হয়ে গেছে। বাংলাদেশের গণমাধ্যমও অসাধারণ মানবিক দায়িত্ব পালন করে চলেছে। এই বাংলাদেশই চিরকালের বাংলাদেশ।
কুমার বিশ্বজিতের একটি জনপ্রিয় গান আছে। ‘যেখানে সীমান্ত তোমার, সেখানে বসন্ত আমার।’ এই গানটির কথাই আজ কেবল মনে পড়ছে। নাফ নদীর ওপারে কিংবা বাংলাদেশ-মিয়ানমারের স্থল-সীমান্তের ওপারে চলছে স্বৈরাচারী মিয়ানমার সরকারের ধ্বংসযজ্ঞ। কিন্তু সীমান্ত পেরোলেই বাংলাদেশের জনপদে সুবাস ছড়াচ্ছে মানবিকতার কী নির্মল বসন্ত! তোমাদের সীমান্ত অমানবিকতায় রক্তাক্ত, আমাদের জনপদে মানবিকতার বসন্ত!

লেখক: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও কলাম লেখক
ই-মেইল: rafique.ruman@gmail.com

 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Amanullah Noman

২০১৭-১০-০৩ ২২:৪০:০৩

রোমান ভাই লেখাটা সুন্দর হয়েছে। গানের কলির সাথে একেবারেই মিলে গেছে।

Nurul

২০১৭-১০-০২ ১৩:৩০:০৯

লেখাটির জন্য আপনাকে ধন্যবাদ

আপনার মতামত দিন

মুক্তিযোদ্ধাকে হারিয়ে দুইয়ে শেখ জামাল

সারা দেশে বিএনপির প্রতিবাদ কর্মসূচি ১৮ ডিসেম্বর

যেভাবে অপহরণকারীদের হাত থেকে মুক্ত হলেন সিলেটের ব্যবসায়ী মুন্না

মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুতে প্রেসিডেন্টের শোক

সানি লিওন শাড়ি না পরলে গণ আত্মহত্যার হুমকি!

রাজধানীতে লাগেজে মস্তকবিহীন লাশ উদ্ধার

‘সাধারণ মানুষের রাজনীতি করতেন মহিউদ্দিন চৌধুরী’

মন্ত্রিত্বের প্রস্তাবেও না বলেছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী

সারাদেশে আবহাওয়া শুষ্ক থাকবে

বিজয় দিবস অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন ৩০ জন ভারতীয়

প্রেমিকের সঙ্গে দেখে ফেলায়...

কুমিল্লায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩

ঢাবি গার্হস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত

মহান বিজয় দিবসে যেসব রাস্তা পরিহার করতে হবে

মহিউদ্দিনের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকারের শোক

বাবার কবরের পাশেই শায়িত মহিউদ্দিন চৌধুরী