গলায় ছুরি বসানোর পর যেভাবে বেঁচে আসেন রোহিঙ্গা যুবক

প্রথম পাতা

মহিউদ্দিন অদুল, উখিয়ার পালংখালী থেকে | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ২:০২
হাফেজ মোহাম্মদ ইউনুচ। বয়স পঁচিশ। বাড়ি মিয়ানমারের রাখাইনে বুথেডংয়ের খিয়াম্বু লামারপাড়া গ্রামে। ১৬ই সেপ্টেম্বর সকালে গরু চরাতে বের হয়েছিলেন ইউনুচের পিতা আলী হোসেন। ছোট্ট নদীর ওপারে ছিল সশস্ত্র বর্মী সেনারা। তারা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে আলী হোসেনকে নিয়ে যান ওপারে।
সঙ্গে একই গ্রামের আবুল কালাম (৪০)। এরপর পাশের কিয়াং চত্বরে নিয়ে দু’জনকেই গলা কেটে হত্যা করে ঝিরির পাশে গর্ত খুঁড়ে লাশ মাটি চাপা দেয়। ঘটনাটি তখনও জানতেন না ইউনুচ। জানতো না গ্রামবাসী। কিছুক্ষণ পর তাদের পাড়ার ইসলামের বাড়িতে আসেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ওচিং। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ওচিং একজন চাক। তাকে সঙ্গে করে মুক্তিপণ দিয়ে পিতাকে ছাড়িয়ে আনার প্রস্তাব নিয়ে যান ইউনুচ। সেনারা তখনই ধরে ফেলে ইউনুচকে। তার উপর চলে অমানুষিক নির্যাতন। এরপর জবাই করতে গলায় ছুরি বসানো হয়। উপুড় করে শোয়ানো ইউনুচ ঘাড় ঘুরিয়ে উপরে দিকে তাকানোর চেষ্টা করেন। তখনই তার মুখে এসে পড়ে প্রচণ্ড লাথি। কিছুটা দূরে ছিটকে পড়েন। ভাগ্যের ফেরে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যান ইউনুচ। এরপরই গ্রাম ছাড়েন। গ্রামবাসীর সঙ্গে গত ২৪শে সেপ্টেম্বর রাতে বাংলাদেশে আসেন। উখিয়ার পুঠিবনিয়া সীমান্ত দিয়ে এদেশে ঢুকেন। তার সঙ্গে কথা হয় উখিয়ার পালংখালীতে। গলায় ছুরির খোঁচার দাগ। চোখে-মুখে বুট জুতার লাথির ক্ষত। রক্তাক্ত সাদা গেঞ্জি। সারা শরীর ক্ষত-বিক্ষত। নড়াচড়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। অন্যরা ছোটাছুটি করলেও এক জায়গায় বসে ছিলেন তিনি।
মৃত্যুর মুখ থেকে ফেরার বর্ণনা দিতে গিয়ে শিহরিত হয়ে উঠছিলেন। কেঁপে কেঁপে উঠছিলেন ভয়ার্ত ইউনুচ। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে মানবজমিনকে বলেন, গত ২৫শে আগস্ট থেকে বিভিন্ন রোহিঙ্গা গ্রামে নির্বিচারে গণহত্যা শুরু হয়। মিয়ানমার সেনা ও বৌদ্ধদের মুসলিম নিধনের খবর পাচ্ছিলাম। পুড়িয়ে দিচ্ছিল ঘরবাড়ি। কিন্তু আমাদের খিয়াম্বু লামাপাড়ার কাছে মগপাড়া ও একটি সেনা ক্যাম্প এবং কিয়াং রয়েছে। তাদের সঙ্গে গ্রামবাসীর সুসম্পর্কও ছিল। আমাদের কোন ক্ষতি করবে না এমন আশ্বাস দিয়ে গ্রাম না ছাড়তে বলে সেনা সদস্যরা। কোথাও না যাওয়ার নির্দেশ দেয়। এতে এক সময় আমরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ি। খাবার-দাবার, বাজার-সওদার অভাবে করুণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
এরই মধ্যে ১৬ই সেপ্টেম্বর সকাল ৯টার দিকে গরু চরাতে বের হন আমার বাবা। সঙ্গে চাচা নবী হোসেন (৬০) এবং স্থানীয় আবুল কালাম (৫০)। পাশের ছোট্ট একটা খালের তীর দিয়ে তারা যাচ্ছিলেন। খালের ওপারে কয়েকজন সেনা সদস্য তাদের দেখেই বন্দুক তাক করে। তাদের দিকে যেতে বলে। তখন বাবা ও আবুল কালাম জিম্মি হয়ে পড়েন। চাচা নবী হোসেন তাদের কথা না শুনে গুরুর আড়ালে আড়ালে পালিয়ে আসেন। কিছু দূরে নিরাপদে এসে দেখেন ঘটনা। তারা দু’জন সামনে এগিয়ে খালের তীরে দাঁড়ান। তখন গলা পানি মাড়িয়ে খাল পার হতে বলে। তারা দু’জন পার হন। কাছে যেতেই দু’জনকে বন্দুক দিয়ে আঘাত করা হয়। দু’জনই পড়ে যান। তাদের নিয়ে যাওয়া হয় পাশে কেয়াংয়ের দিকে। চাচা নবী হোসেন বাড়িতে গিয়ে এসব কথা জানান। প্রত্যক্ষদর্শী গ্রামবাসীও তা জানান। কিন্তু তাদের নেয়ার পর পরই যে কিয়াংয়ের চত্বরে পাহাড়ের ঢালে নিয়ে জবাই করে দেয়া হয়েছে, তা আমরা তখনও জানতে পারিনি। পরদিন এ খবর পেয়েছি অন্য গ্রামের প্রত্যক্ষদর্শীর কাছে। তার আগে ওই রাতেই তিন যুবক গিয়ে তাদের লাশ দেখে আসে। মোবাইলে গলাকাট লাশের ছবি ধারণ করে আনে।
দু’জনকে ধরে নেয়ার আধঘণ্টা পর পাশের ইসলামের বাড়ি আসেন স্থানীয় চাক জনপ্রতিনিধি ওচিং। তিনি সেখানে একটা কাজে এসেছিলেন। তখন আমরা তাকে গিয়ে ধরি। বিস্তারিত ঘটনা খুলে বলি। যত টাকা চায়, তত টাকা মুক্তিপণ দিয়ে বাবাকে ছাড়িয়ে আনতে তার সহায়তা চাই। তিনি আমাকে সঙ্গে নিয়ে সেনা সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য রওয়ানা হন। কাছের গ্রাম গোপীতে পৌঁছলে ৫ সেনা সদস্যের সঙ্গে দেখা হয়। তাদের কাছে তিনি খিয়াম্বু লামারপাড়া থেকে কিছুক্ষণ আগে ধরে আনা দু’জনের কথা বলে সন্ধান চান। তখন এক সেনা সদস্য আমাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘তুমিই কী তাদেরকে নিতে এসেছো?’ হ্যাঁ, বলতেই আমার ঘাড়ে উপর্যুপরি বেতের আঘাত করতে থাকে। তারপর ওচিংয়ের সঙ্গে কথা না বাড়িয়ে আমাকে নিয়েই তারা কেয়াং চত্বরের দিকে যাচ্ছিলো। তখনও জানতাম না যে সে দিকেই পাহাড়ের ঢালের কাছে নিয়ে আমার বাবাকে জবাই করে দেয়া হয়েছে। আমাকেও একই উদ্দেশ্যে নেয়া হচ্ছে। কিন্তু কেয়াংয়ের কাছে পৌঁছে চত্বর এলাকায় ঢোকার আগেই এক সেনা কর্মকর্তা সে দিকে না নিতে বলে। তখন ওই পাঁচজন পথ পরিবর্তন করে। কাছের কাঠের তৈরি স্কুল ঘরের দিকে নেয়া হয়। স্কুলের উঠানে নিয়ে উপুড় করে শুইয়ে রাখা হয়। দু’হাতের উপর তুলে দেয়া হয় ভারি জিনিস। সেই উঠানে কাদা মাটি ছিল। তা এড়াতে আমার পিঠের উপর পা দিয়েই আসা-যাওয়া করতে থাকে সেনা সদস্যরা। প্রচণ্ড রোদে এভাবে আমাকে অন্তত সাড়ে তিন ঘণ্টা রাখা হয়।
এরপর এক সেনা সদস্য এসে একটি ছুরি নিয়ে আমার গলায় বসায়। কোপ দেয়ার জন্য প্রস্তুতি হিসেবে প্রথমবার বসাতেই আমি চমকে উঠি। ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে তাকানোর চেষ্টা করি। মাথা তুলতেই আমার মুখে জোরে লাথি মারে। কপালের এক পাশে এক চোখের উপর লাথি পড়ে। কিছুটা দূরে ছিটকে পড়ি। তারপর আর ছুরি চালায় নি। তারপর আমাকে তুলে দাঁড় করানো হয়। কিন্তু আমি মাথা ঘুরে পড়ে যাই। পানি খেতে চাই। আমাকে পানি দেয়া হয়নি। আবার আমাকে দাঁড় করায়। মাথার উপর গুলির বোঝা ও ব্যাগ তুলে দেয়। সে সঙ্গে সৌর প্যানেলের প্লেটও তুলে দেয়া হয়। হাঁটতে না পারলেই পিঠে লাথির পর লাথি। তিন মাইল হাঁটিয়ে আর একটি স্কুলে নেয়া হয়। সেখানে মাথার উপর একটি হেলিকপ্টার চক্কর দিচ্ছিলো। এরপর জিনিসপত্রগুলো নামাতে বলে। কথামতো রাখি। সেখানে অন্তত ৪০ জনের মতো সেনা সদস্য ছিল। সবার বসার জন্য চেয়ার ছিল না। পাশেই একটি মাদরাসা। যে সেনা সদস্যরা গোপী থেকে আমাকে ধরে নিয়ে আসে তাদের একজন পাশের মাদরাসা থেকে একটি চেয়ার এনে দিতে বলে। মাদরাসাটি কাছেই ছিল। আমি তার কথা মতো মাদরাসার দিকে যাই। আড়াল হতেই ভাবি, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে। জবাই করতে গিয়েও হয়তো মালামাল বহনের জন্যই বাঁচিয়ে রেখেছে। এমনিতে তো মরবো। পালিয়ে যাই। বাঁচার চেষ্টা করে মরি। পেছন থেকে গুলি করলেও তো অন্তত বাঁচার চেষ্টাটা করা হবে। তখনই দৌড় দিই। কিন্তু প্রতিক্ষণে মনে হয়েছে এই বুঝি গুলি এসে লাগলো। এই বুঝি পড়ে গেলাম। কিছুক্ষণ দৌড়ানোর পর গ্রামে পৌঁছি পর মনে হলো ‘আমি বোধ হয় বেঁচে গেছি’। এরপরই বাংলাদেশের দিকে পা বাড়াই।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Sirajulislam

২০১৭-০৯-২৭ ১৩:৪০:১০

আর কত চাও শহীদ আল্লাহ! আর কত ক্রন্দন সূচি ও একদিন মৃত্যুর সাদ গ্রহন করবে, তবে কিরকম তার সাদ হবে ভাবতে পারছি না

md shahahan seraj

২০১৭-০৯-২৬ ১৯:১৭:৫২

রাখে আল্লাহ মারে কে

nur alam

২০১৭-০৯-২৬ ১৭:৩৮:৪৫

সত্যই জাহেলিয়াতের ওৎবা শায়বা, আবু লাহাবকে হার মানিয়েছে সুচি । মায়ান মারের সামরিক জান্তা ও সুচির বিচার চাই , আন্তর্জাতিক আদালতে ।

আপনার মতামত দিন

দুর্ঘটনার কবল থেকে ট্রেনটি রক্ষা করলো দুই শিশু

ঢাকায় তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী

বৃদ্ধা মিলু গোমেজ হত্যায় কেয়ারটেকার গ্রেপ্তার

ষোড়শ সংশোধনীর রিভিউ শুনানিতে আন্তর্জাতিক আইনজীবী নিয়োগের আবেদন

শোকের উপর শোক, অসুস্থ হয়ে পড়লেন নওফেল

বিএনপি প্রার্থীকে প্রচারণায় বাধা দেয়ার অভিযোগ

‘নির্বাচনে না আসলে বিএনপির অস্তিত্ব বিপন্ন হবে’

নিখোঁজ প্রকৌশলীর মরদেহ উদ্ধার

ওয়ালটনে প্রতিষ্ঠাতা নজরুল ইসলাম মারা গেছেন

মহিউদ্দিন চৌধুরীর কুলখানিতে পদদলিত হয়ে ১১ জনের মৃত্যু

‘বিএনপি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেনা’

লেবাননে বৃটিশ কূটনীতিককে শ্বাসরোধ করে হত্যা

বিমানে দেখা এরশাদ-ফখরুলের

ছিনতাইকারীর টানাটানিতে মায়ের কোল থেকে পড়ে শিশুর মৃত্যু

‘উন্নয়ন কথামালায়, মানুষ কষ্টে আছে’

সারা দেশে বিএনপির প্রতিবাদ কর্মসূচি আগামীকাল