শিশুদের ফাস্টফুড থেকে দূরে রাখুন

শরীর ও মন

ফয়সাল হাসান | ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭, সোমবার
ফাস্টফুডের প্রতি ঝুঁকছে শিশুরা। আর এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ছোট্ট সোনামণিদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি। অস্বাভাবিক মোটা হয়ে যাচ্ছে অনেক শিশু। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে তাদের শারীরিক গঠন। নিয়মিত এসব খাবার খেলে স্থুলতার পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি সমস্যা, ডায়াবেটিস, মস্তিষ্কের সমস্যা, হার্টের সমস্যাসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে শিশুদের। এমনই তথ্য উঠে এসেছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গবেষণা থেকে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের থোরাস্ক জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, সপ্তাহে অন্তত তিন থেকে চারবার ফাস্টফুড খায় এমন শিশুদের মধ্যে স্থুলতা, বিভিন্ন চর্মরোগ, একজিমা ও অ্যাজমা এবং নাক-কানের সংক্রমণ হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
এ গবেষণাটি পরিচালনা করা হয় বিশ্বের ৩১টি দেশের ছয় থেকে সাত বছর বয়সী এক লাখ ৮১ হাজার শিশু এবং ১৪ থেকে ১৬ বছর বয়সী ৫১টি দেশের কিশোর-কিশোরীদের ওপর। গবেষণায় দেখা যায়, ফাস্টফুডে অভ্যস্ত শিশু-কিশোরদের মধ্যে বিভিন্ন অসংক্রমিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় ৩৯ শতাংশ বেশি।
আমাদের দেশে, বিশেষ করে ঢাকা শহরের প্রতিটি স্কুল-কলেজের আশেপাশেই রয়েছে অসংখ্য ফাস্টফুডের দোকান। ফলে এসব মুখরোচক খাবারের প্রতি সহজেই আকৃষ্ট হচ্ছে শিশুরা। কিন্তু এসব ফাস্টফুড খাবারের মোড়কে উল্লেখ করা থাকেনা ক্যালরির পরিমাণ। তাই না বুঝেই অতিরিক্ত ক্যালরি সমৃদ্ধ এসব খাবার গ্রহণের ফলে শিশুদের মধ্যে স্থুলতা বা অল্প বয়সে মুটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে শিশুদের মধ্যে স্থুলতা নিয়ে জরিপ করে আন্তর্জাতিক উদারাময় গবেষণা কেন্দ্র (আইসিডিডিআরবি)। ‘শিশু-কিশোরদের মধ্যে স্থুলতার প্রকোপ এবং শারীরিক সক্রিয়তার ধরন’ শীর্ষক এ জরিপে দেখা যায়, দেশের শহরাঞ্চলের ১৪ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজন ও স্থুলতায় ভুগছে। আর ঢাকায় এ সংখ্যা ২১ শতাংশ। এ গবেষণায় দেশের ৭টি সিটি করপোরেশনের ৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী ৪ হাজার ১০০ শিশুর ওপর জরিপ চালানো হয়। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, জরিপে অংশ নেয়া ৯৮ শতাংশ শিশু সপ্তাহে কমপক্ষে চারবার শর্করা সমৃদ্ধ খাবার ভাত বা রুটি খেয়েছে। কিন্তু প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ ও আয়োডিন যে পরিমাণে খাওয়া দরকার, তা খাচ্ছে না। এ জরিপে আরো উঠে আসে, শিশুদের মধ্যে কমপক্ষে ৫০ ভাগ ডুবো তেলে ভাজা সিঙ্গারা, সমুচা, চপ ইত্যাদি খাবার খেয়ে থাকে। আর কমপক্ষে ২০ ভাগ শিশু খেয়েছে পিৎজা, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, বার্গার, চিকেন ফ্রাই ইত্যাদি। এসব খাবারই শিশুদের স্থুলতা বা মুটিয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ বলে উল্লেখ করা হয় এ গবেষণায়।
এ বিষয়ে বারডেম জেনারেল হাসপাতালের খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান পুষ্টিবিদ শামসুন্নাহার নাহিদ মহুয়া মানবজমিন’কে বলেন, জাঙ্কফুড বা ফাস্টফুড শিশু স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। জাঙ্কফুড বলতে সাধারণত সিঙ্গারা, সমুচা, চপ ইত্যাদিকে বোঝানো হয়। এসব খাবার মূলত ডুবো তেলে ভাজা হয়। আর বেশিরভাগ দোকানেই একই তেল বারবার ব্যবহার করতে দেখা যায়। অতিরিক্ত জাল দেয়ার ফলে এ তেল একসময় বিষাক্ত হয়ে পড়ে। আর তখন ওই তেলে ভাজা খাবার খেলে সেখান থেকে তৈরি হয় ট্রান্সফ্যাট। আর এ ট্রান্সফ্যাট থেকেই শিশুদের মধ্যে স্থুলতা বা ওজন বৃদ্ধির ব্যাপারটি আসে। অন্যদিকে রয়েছে পিৎজা, বার্গার, স্যান্ডউইচ ইত্যাদি প্রসেসড (প্রক্রিয়াজাত) খাবার। এসব খাবার থেকে যে পরিমাণ ক্যালরি শিশুদের শরীরে জমা হয়, সে পরিমাণ ক্যালরি বার্ন করার মতো পরিশ্রম করার সুযোগ তাদের থাকেনা। ফলে তাদের রক্তে বা লিভারে জমা হয় অতিরিক্ত চর্বি। তবে হোমমেড (বাসায় তৈরিকৃত) খাবারে শিশুদেরকে অভ্যস্ত করা গেলে সেটি একটি সমাধান হতে পারে বলে জানান এ পুষ্টিবিদ। তিনি আরো বলেন, ফাস্টফুড থেকে শিশুদের স্থুলতা বা ওজনবৃদ্ধির বিষয়টি শুধুমাত্র শারীরিক সমস্যাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনা। একপর্যায়ে এটি ভুক্তভোগীর মানসিক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একটি শিশু যখন তার শারীরিক গঠনের কারণে নিজেকে সমাজ থেকে আড়াল করার চেষ্টা করে, তখন তার মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হয়। এ হতাশা থেকে তৈরি হয় ইনসমনিয়া। আর ইনসমনিয়ার ফলে যখন রাতের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, তখন সমস্যা আরো প্রকট হয়। এরকম পরিস্থিতিতে শিশু-কিশোররা মাদকাসক্ত পর্যন্ত হতে পারে।
রাজধানীর ধানমন্ডি টিউটোরিয়াল নামক স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক নিলুফার ইয়াসমিন বলেন, সকালে যখন বাচ্চাকে স্কুলে নিয়ে আসি, ঘুম থেকে উঠে সে কিছুই খেতে চায়না। বেশিরভাগ সময় বাসা থেকে নুডলস বা নাগেট বানিয়ে নিয়ে আসি। তবে স্কুল ছুটির পরে বাচ্চা প্রায়ই জেদ ধরে রেস্টুরেন্টে খাওয়ার। একরকম বাধ্য হয়েই তখন ফাস্টফুড কিনে দিতে হয়।
সম্প্রতি কানাডা সরকার সেখানকার স্কুলগুলোতে ফাস্টফুড নিষিদ্ধ করেছে। সিটিভি নিউজে প্রকাশিত ‘ব্যান অন জাঙ্কফুড’ শিরোনামে কানাডিয়ান গবেষকদের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অতিমাত্রায় ফাস্টফুড খেলে শিশুদের মধ্যে চঞ্চলতা ও আচরণগত সমস্যা দেখা দেয়। আর এসব শিশুদের হতাশায় ভোগার মাত্রা অন্যদের তুলনায় ৫১ শতাংশ বেশি। এসব খাবার মস্তিষ্কের জন্যও ক্ষতিকর। যা শিশুদের পড়াশুনায়ও ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফাস্টফুড কালচার থেকে শিশুদেরকে বের করে আনতে আরো সচেতন হতে হবে অভিভাবকদের। অতিমাত্রায় ফাস্টফুড আর প্রযুক্তি নির্ভর না হয়ে, শিশুরা যেন সুস্থ শরীর ও মন নিয়ে সামাজিক হয়ে বেড়ে উঠতে পারে সেদিকেই নজর দিতে হবে। শিশুদের খাদ্যাভাসে আনতে হবে পরিবর্তন। কৃত্রিম খাবারকে না বলে, ঝুঁকতে হবে পুষ্টিকর খাবারের দিকে।

 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

শীর্ষ সন্ত্রাসী সাদ্দাম হোসেন গ্রেপ্তার

‘আশ্রয়শিবিরে ৫০০ রোহিঙ্গা নারীর যৌন ব্যবসা’

এম কে আনোয়ারের দাফন আগামীকাল

‘আন্দোলনের দাবিগুলো নিয়ে ক্যাবিনেটে সুপারিশ করা হয়েছে’

জঙ্গি অভিযান শেষ, আটক হয়নি কেউই

খালেদা জিয়া কক্সবাজার যাচ্ছেন রোববার

রোনালদোই সেরাা

সেরা একাদশে যারা

রোহিঙ্গা ইস্যু- ফের  আসছেন চীনের বিশেষ দূত

রোহিঙ্গাদের জন্য ৩০০০ কোটি টাকার প্রতিশ্রুতি

রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমার ও বাংলাদেশকে একই সাথে খুশি করা ভারতের জন্য কি কূটনীতির পরীক্ষা?

সুষমার সতর্ক কূটনীতি

সেসিপ প্রকল্পে ১৩২ কোটি টাকা লোপাট

রোহিঙ্গাদের পাশে রানী রানিয়া

‘সব বিষয় ইমানদারির সঙ্গে মিটিয়ে ফেলবো’

‘সবুজ বিপ্লবের’ পথে পোশাক শিল্প