নি র্বা চ নী হা ল চা ল, নারায়ণগঞ্জ ৫

স্বস্তিতে বিএনপি আওয়ামী লীগ টেনশনে

শেষের পাতা

বিল্লাল হোসেন রবিন, নারায়ণগঞ্জ থেকে | ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, রবিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১:১৪
নারায়ণগঞ্জ সদর ও বন্দর উপজেলা নিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন। আগামী নির্বাচনকে ঘিরে ইতিমধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা শুরু হয়ে গেছে। তবে প্রার্থী মনোনয়নে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট স্বস্তিতে থাকলেও অস্বস্তিতে ১৪ দলীয় মহাজোট। জোটের সম্ভাব্য প্রার্থী তিনজনের নাম শোনা গেলেও মহাজোটের প্রার্থী কয়েকজন। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনটি জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আসনটি জাতীয় পার্টির দখলে রয়েছে।
কিন্তু আগামী নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে দলীয় প্রার্থী চান আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। ১৯৯১ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শহর ও বন্দর নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী নাসিম ওসমানকে পরাজিত করে এমপি নির্বাচিত হন বিএনপির আবুল কালাম। ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে আবুল কালাম দ্বিতীয়বারের মতো এমপি নির্বাচিত হন। একই বছর ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত সাবেক আমলা এসএম আকরামের কাছে পরাজিত হন আবুল কালাম। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এসএম আকরামকে পরাজিত করে পুনরায় তৃতীয়বারের মতো এমপি নির্বাচিত হন আবুল কালাম। সে সময় এসএম আকরাম তার এই পরাজয়ের জন্য ওসমান পরিবারকে দায়ী করেন। আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে নারায়ণগঞ্জে হাল ধরেন এসএম আকরাম। কিন্তু সমঝোতার রাজনীতির কারণে ২০০৮ সালের ২৮শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনটি জাতীয় পার্টিতে ছেড়ে দেয়। নির্বাচন করেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য একেএম নাসিম ওসমান। ছিটকে পড়েন এসএম আকরাম। ২০১১ সালের ৩০শে অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে দলের হাইকমান্ড মেয়র প্রার্থী হিসেবে শামীম ওসমানকে সমর্থন দেন। ফলে দলের বেশিরভাগ নেতাকর্মী শামীম ওসমানের পক্ষে মাঠে নামেন। কিন্তু এসএম আকরামের নেতৃত্বে শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেনসহ একটি অংশ অবস্থান নেন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর পক্ষে। নির্বাচনে আইভী বিপুল ভোটে শামীম ওসমানকে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন। আইভীকে বিজয়ী করার পরপর জেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়কের পদ থেকে পদত্যাগ করেন এসএম আকরাম। তবে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে এসএম আকরামকে দলে ফিরিয়ে নেয়ার চেষ্টা চলছে বলে গুঞ্জন রয়েছে।
এদিকে ২০০৮ সালের ২৮শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য একেএম নাসিম ওসমান বিএনপির অ্যাডভোকেট আবুল কালামকে পরাজিত করে সংসদ নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও জাতীয় পার্টিকে আসনটি ছেড়ে দেয়া হয়। নির্বাচনে নাসিম ওসমান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আবারো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। কিন্তু ২০১৪ সালের ৩০শে এপ্রিল ভারতের দেরাদুনে হঠাৎ নাসিম ওসমানের মৃত্যু হলে উপনির্বাচনে জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন পান তার মেজো ভাই ব্যবসায়ী নেতা একেএম সেলিম ওসমান। ২০১৪ সালের ২৬শে জুন অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে সেলিম ওসমান নাগরিক সমাজের প্রার্থী এসএম আকরামকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের চারজন সম্ভাব্য প্রার্থী মাঠে নেমেছেন। তারা হলেন, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ আনোয়ার হোসেন, আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদ সদস্য ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান দিপু, নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহা ও জেলা যুবলীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কাদির। এই চার সম্ভাব্য প্রার্থীর প্রত্যেকেরই আওয়ামী রাজনীতিতে ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে।
নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া প্রসঙ্গে আনোয়ার হোসেন বলেন, ’৬৯ থেকে ২০১৭ দীর্ঘ এই সময়ে আওয়ামীলীগের রাজনীতির সঙ্গেই আছি। দলের কাছে চাওয়া-পাওয়ার বিষয় থাকতেই পারে। দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরাও চায় আমি যেন নির্বাচন করি। কারণ, দীর্ঘদিন এখানে দলীয় এমপি নেই। দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা যদি আমাকে সুযোগ দেন তাহলে নির্বাচন করবো। আর অন্য কেউ পেলেও তার পক্ষে, নৌকার পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবো।
আনিসুর রহমান দিপু বলেন, দীর্ঘ ৪০ বছর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থেকে সুখে-দুঃখে  নেতাকর্মীদের পাশে আছি। এই আসনে দলীয় এমপি না থাকায় দীর্ঘদিন যাবৎ দলের নেতাকর্মীরা বঞ্চিত। এবার শহর-বন্দরের নেতা-কর্মীদের দাবি আগামী নির্বাচনে যেন নৌকার প্রতিনিধি দেয়া হয়। সেই ক্ষেত্রে আমি দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশা করছি।
অ্যাডভোকেট খোকন সাহা বলেন, আগামী নির্বাচনে আমি দলীয় মনোনয়ন চাইব। দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা আমাকে মনোনয়ন দিলে অবশ্যই নির্বাচন করবো। তবে আমাকে না দিয়ে অন্য কাউকে দিলেও আমি তার পক্ষে কাজ করবো।
আব্দুল কাদির বলেন, আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতিমধ্যে আমি কাজ শুরু করেছি। নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। আগামী নির্বাচনে অবশ্যই দলীয় মনোনয়ন চাইবো, দল দিলে নির্বাচন করবো। সেই প্রস্তুতি নিচ্ছি। তবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নৌকার মনোনয়ন যাকে দেবেন, আমরা তার পক্ষে কাজ করবো।
নির্বাচনকে সামনে রেখে এ আসনে থেকে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী তিনজনের নাম শোনা যাচ্ছে। তারা হলেন- নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম, মহানগর বিএনপির সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান ও মহানগর যুবদলের সভাপতি মাকসুদুল আলম খোন্দকার খোরশেদ। গত বছরের ২২শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের দ্বিতীয় নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন সাখাওয়াত। আলোচিত সাতখুন মামলায় বাদী পক্ষের আইনজীবীর ভূমিকা পালন করতে গিয়ে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছেন তিনি। অন্যদিকে আবুল কালাম ক্লিনম্যান রাজনৈতিক হিসেবে পরিচিত হলেও সংসদ সদস্য থাকাকালে তার ছেলে আবুল কাউছার আশার নানা কর্মকাণ্ডে তিনি বিতর্কিত হন। এদিকে শহর-বন্দর ঘিরে এই আসনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল চোখে পড়ার মতো। এই কোন্দল নিরসন না হলে নির্বাচনে এর প্রভাব পড়বে। নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে অ্যাডভোকেট আবুল কালাম বলেন, মনোনয়ন দেয়ার দায়িত্ব দেশনেত্রীর। আমি মিডিয়ার ভাইদের অনুরোধ করবো আজ থেকে আমাকে মনোনয়ন প্রত্যাশীর কাতারে রাখবেন না। যখন সময় হবে আমি আপনাদেরকে বলবো, তার আগে নয়।
অপর মনোনয়ন প্রত্যাশী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, দল মনোনয়ন দিলে নির্বাচন করবো। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন করার পর থেকে কাজ শুরু করেছি। জনগনের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছি। তবে দল যাকে প্রার্থী করবে তার পক্ষে আমরা কাজ করবো। টানা তিনবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর খোরশেদ বলেন, মনোনয়ন চাওয়া কর্মীর অধিকার। তাই তৃণমূল ও রাজপথের সক্রিয় এবং অবহেলিত কর্মীদের প্রতিনিধি হয়ে মনোনয়ন প্রত্যাশা করি। তবে দল থেকে যাকে মনোনয়ন দেবে আমি তার পক্ষেই কাজ করবো।  
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বর্তমানে জাতীয় পার্টির একক প্রার্থী সংসদ সদস্য একেএম সেলিম ওসমান। তিনি মূলত ব্যবসায়ী। নিট গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সভাপতি। নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর জাতীয় পার্টির এক নম্বর সদস্য। তবে এখানে জাতীয় পার্টির এমপি হলেও দলের সাংগঠনিক ভিত অনেক দুর্বল। ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির কারণে সাংগঠনিকভাবে তেমন একটা এগুতে পারেনি এখানকার জাতীয় পার্টি। ফলে ভোটের হিসাবে আওয়ামীলীগ-বিএনপি থেকে তারা অনেক পিছিয়ে। তাছাড়া ২০১৬ সালের ১৩ই মে বন্দরের কলাগাছিয়ার কল্যানদীতে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে পিয়ার সাত্তার উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তিকে প্রকাশ্য জনসম্মুখে কান ধরিয়ে উঠবস করিয়ে সারা দেশে আলোচনায় উঠে আসেন সেলিম ওসমান। একপর্যায়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশে তদন্তের পর সেলিম ওসমানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলাটি বিচারাধীন। এ ঘটনায় তার ইমেজে ভাটা পড়ে। যদিও সেলিম ওসমান বিভিন্ন ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুদান দিয়ে নিজের ইমেজ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন। মজার বিষয় হলো জাতীয় পার্টি মহাজোটের অংশ হলেও খোদ আওয়ামী লীগ এখানে জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। সেলিম ওসমান বলেন, আগামী নির্বাচন করবো কি করবো না তার সিদ্ধান্ত নেবো ২০১৮ সালের ৩০শে জুন। তবে আমার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে এলাকার উন্নয়নকাজ অব্যাহত আছে, থাকবে। এই উন্নয়নকাজ দিয়ে যদি জনগণকে সনু্তষ্ট করতে পারি, জনগণের যদি ডিমান্ড থাকে তাহলে আমি চিন্তা করে দেখবো, নির্বাচন করবো কি করবো না। তিনি বলেন, আমি মিডিয়াতে বলেছি নারায়ণগঞ্জ যেহেতু আওয়ামী লীগের জন্মস্থান সেহেতু নারায়ণগঞ্জের সবকটি আসনে নৌকার প্রার্থী দেয়া হোক।
সিপিবি নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি হাফিজুল ইসলাম বলেন, সিপিবি’র সঙ্গে বাসদের একটি জোট রয়েছে। তাই নির্বাচনে তারা ঐক্যবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন। সে হিসেবে নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনের মধ্যে ৩টিতে সিপিবি এবং বাকি ২টিতে বাসদ প্রার্থী দেবে। সেক্ষেত্রে সিপিবি নারায়ণগঞ্জ-৫ থেকে অ্যাডভোকেট মন্টু ঘোষকে, নারায়ণগঞ্জ-২ আসন থেকে হাফিজুল ইসলামকে এবং নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে অ্যাডভোকেট জিয়া হায়দার ডিপথিকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। আর বাকি দুটি আসনে বাসদ তাদের প্রার্থী ঠিক করবে।
 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

ট্রাম্পের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা হিমঘরে পাঠালেন আরো এক বিচারক

পেপ্যালের জুম সেবার উদ্বোধন

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে দায়ী করলো যুক্তরাষ্ট্র

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সভাপতি মজনু গ্রেপ্তার

ঢাবির ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা কাল

কুয়েতে এসি বিস্ফোরণে নিহত পাঁচজনের মরদেহ দেশে,বিকালে দাফন

আমাদের অনেক এমপি অত্যাচারী, অসৎ : অর্থমন্ত্রী

মিয়ানমার থেকে শূন্য হাতে ফিরলেন জাতিসংঘ কর্মকর্তা

‘এ নিয়ে আমার কোনো আফসোস নেই’

সোমালিয়ায় হামলায় নিহত ৩ শতাধিক, বৈশ্বিক সংহতি কোথায়?

মেসির সেঞ্চুরি, বার্সেলোনার জয়

ম্যানইউ’র জয়ের ধারা অব্যাহত

ইভিএম চায় আওয়ামী লীগ সীমানায় অনীহা

আরো একটি পরাজয়

আরো অর্থায়ন না হলে রোহিঙ্গা শিশুদের সহায়তায় বিপর্যয়

চীন-রাশিয়া পাশে আছে