ধর্ষণমুক্ত সমাজ গড়তে চাই ইভটিজিংমুক্ত সংস্কৃতি

মত-মতান্তর

ফয়সাল খান | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭, শুক্রবার | সর্বশেষ আপডেট: ৫:৫৬
পত্রিকার পাতা বা টেলিভিশন অন করলেই যে খবরগুলো সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে তা খুব সুখকর নয়। হত্যা, ধর্ষণ, ছিনতাই, রাহাজানি আর মারামারির খবর দিয়েই আমদের প্রতিদিনের যাত্রা শুরু করতে হয়। তবে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে আলোচিত খবরের শিরোনাম হচ্ছে ধর্ষণ। যে শব্দটি শুনলেই গা শিউরে উঠে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে নানা লেবাসে অনেক মুখোশধারী ভদ্রলোকেরাও নীরবে এসব অপকর্ম করে যাচ্ছেন। যার বেশিরভাগই সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয় না।
নিজের আত্মসম্মান ও সামাজিক মর্যাদা আর ভিকটিমের নিরাপত্তা ও ভবিষতের কথা চিন্তা করেই এসব ঘটনা ধামা-চাপা দিতে চান ভূক্তভোগীরা। সম্প্রতি চলন্ত বাসে তরুণী ধর্ষণের পর হত্যা, বনানী বা বগুড়ার ঘটনা মিডিয়াতে আলোচানা হওয়ার সুবাদে সারা দেশের মানুষ জেনেছে। প্রতিবাদ হয়েছে। কিন্তু মিডিয়ার আড়ালেও থেকে যাচ্ছে অনেক কিছু। যা সমাজপতিদের হস্তক্ষেপে ধামা-চাপা পড়ে যায়। আগস্ট মাসের শেষ দিকে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় প্রথম শ্রেণির এক শিশু ধর্ষণের ঘটনা মিমাংসা হয়েছে ২০ হাজার টাকায়। যা নিয়ে স্থানীয় কয়েকটি অনলাইন পোর্টাল সংবাদ প্রকাশ করলেও তেমন কোনো চাপে পড়তে হয়নি অপরাধীদের। ঠান্ডা মাথায় কুর্কম করেও ২০ হাজার টাকা দিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে ধর্ষকরা। অন্যদিকে নির্যতিতা শিশুটির মা-বাবা লজ্জায় মানুষের সামনে মুখ দেখাতে পারছেন না।
আর যেসব ঘটনা মিডিয়াতে আসে সেগুলোর ধর্ষকদের ফাঁসির দাবি করেন কেউ কেউ। কেউ বলেন ক্রস ফায়ার দিতে। তবে আমি তাদের দাবিকে অবজ্ঞা করছি বা দ্বিমত পোষন করছিনা। আমিও চাই এদের মতো কুলাঙ্গারদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি হোক। এর পাশাপাশি এদের শাস্তির দাবি নিয়ে যাতে আর করো রাস্তায় নামতে না হয়। কোনো পরিবারের স্বপ্ন যেন আর মুকুলেই ঝরে না পড়ে। সব স্বপ্নগুলো যেন নিজের মতো করে স্বাধীন বাংলাদেশের আকাশে অন্তত উড়তে পারে। এটাই চাওয়া আমাদের। এই জন্য সর্বপ্রথম রাষ্ট্রকেই টিন্তা করতে হবে। প্রথমেই খুঁজতে হবে এর উৎপত্তিস্থল। এর পর তা নির্মূলে রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। উৎস খুঁজে বের করতে না পারলে বার বার রাস্তায় নামতে হবে। চিৎকার করতে হবে। একের পর এক ধর্ষণের খবর মিডিয়ার শিরোনাম হবে। আবার নতুন ধর্ষণের খবর আসবে। এভাবেই আসবে আর যাবে। কিন্তু এসব অপকর্ম বন্ধ হবে না।
এ বিষয়টি নিয়ে বার বার চিন্তা করে আমার সীমিত জ্ঞানে উৎস খোঁজার চেষ্টা করছি। তাই মূল কথা বলার আগে আপনাদের একটু বাংলা নাটক বা সিনেমার কাহিনী স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। যে সিনেমা বা নাটক দেখে আমরা এখনো আবেগ তাড়িত হই। সিনেমার ভালো মন্দ কাহিনীগুলো এখনো দর্শক মনে সাড়া জাগায়। এসব সিনেমা-নাটকের বেশিরভাগেরই মূল বিষয় থাকে প্রেম বা ভালবাসা। আমি দাবি করছি না যে, প্রেম ভালবাসা বন্ধ করে দেন। কিন্তু পদ্ধতিগত দিক দিয়ে পরিবর্তন আনা দরকার।
এসব নাটক বা সিনেমায় একটি ছেলে একটি মেয়েকে ভাল লাগা বা ভালবাসার কথা প্রকাশের জন্য ইভটিজিংয়ের দৃশ্য দেখাতে হবে কেন? ছেলেটি প্রতিদিন একটি সুন্দরী মেয়ের চলার পথ রোধ করে ডির্স্টাব করতে করতে এক সময় মেয়ে রাজি হয়ে যায়। আর এই বিষয়টি কোনো নাটক বা সিনেমায় খারাপভাবে উপস্থাপন করা হয়না। করাণ এই ছেলেটি তো সিনেমার নায়ক। নায়ক খারাপ হলে সিনেমার উদ্দেশ্যই ভেস্তে যাবে। কিন্তু এই নায়ককে অনুকরণ করতে গিয়ে কত লম্পটের জন্ম হয়েছে তার হিসাব হয়তো করো কাছেই নেই। সিনেমার নায়ক নায়িকাদের সব কাজই সমাজের বেশিরভাগ মানুষ ভাল চোখে দেখেন। কেননা সমাজের সবচেয়ে ভাল মানুষের রূপ দিয়েই এসব চরিত্র অংকন করা হয়। তাহলে প্রশ্ন আসে ইভটিজিং কি ভাল কাজ? যদি ভাল না হবে তাহলে কেন এত হাইলাইটস করে বার বার দেখানো হচ্ছে? আমাদের জাতিসত্ত্বা বাঁচাতে হলে এসব প্রশ্নের উত্তর বের করতে হবে। কেননা প্রতিটি দেশের সংস্কৃতি ধরে রাখতে হলে নাটক সিনেমারও দরকার আছে।
বাংলাদেশের ধর্ষণের কারণ নিয়ে গত ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ বিবিসি বাংলয় প্রকাশিত রোকেয়া লিটার একটি প্রতিবেদনের অংশ বিশেষে একটু চোখ বুলিয়ে আসি। তাহলে বিষয়টি আরো পরিস্কার হবে। ‘বাংলাদেশ ও ভারতের সিনেমাগুলোতে দেখা যায়, নায়িকা যখন নায়ককে পাত্তা দেয় না, তখন একজন নায়ক তার একপাল বন্ধু নিয়ে নায়িকার পেছনে ছুটছে, বিরক্ত করছে, নায়িকাকে ধাক্কা দিচ্ছে, তার শরীরে হাত দিচ্ছে, নাচ-গান করছে, নায়িকা একা বিরক্ত হচ্ছে বটে, কিন্তু দর্শক সারিতে বসে থাকা মানুষগুলো তা দেখে মজা পাচ্ছে, শিস দিচ্ছে, হাতে তালি দিচ্ছে। কারণ, কিছুক্ষণ পরেই দেখা যাবে যে ওই উত্যক্তকারীই আসলে সিনেমার নায়ক। সিনেমায় কেউ খুন করলে বা চুরি করলে, তার শাস্তি হওয়া দেখায় ঠিকই, কিন্তু নায়ক যে নায়িকাকে উত্যক্ত করলো, তার কোনো শাস্তি নেই, কারণ সে তো নায়ক! সেন্সর বোর্ডও নায়িকাকে এভাবে রাস্তা-ঘাটে বিরক্ত করার দৃশ্যগুলো খারাপ চোখে দেখে না। সিনেমা শেখায়, দলবল নিয়ে নাচগান করে নায়িকাকে বিরক্ত করেই প্রেম করতে হয়। সিনেমার নায়ক যেহেতু দর্শকের কাছে রোল মডেল, আর প্রতিটি মানুষই তার নিজের জীবনের নায়ক হয়ে উঠতে চায়। সিনেমার নায়করা যদি এভাবে নায়িকাকে উত্যক্ত করে প্রেম আদায় করে, তবে বাস্তবের নায়করা কেন তাদের অনুসরণ করবে না? অন্যদিকে সিনেমার নায়িকারা উত্যক্তকারীর প্রেমে পড়ে ঠিকই, কিন্তু বাস্তব জীবনের নায়িকারা হয়ে ওঠে একেকজন তনু, রিশা, নার্গিস অথবা ভারতের নির্ভয়া।
আমার মনে হয় সিনেমায় এসব গানের দৃশ্য দেখতে দেখতেই ইভ টিজিং বা রাস্তা-ঘাটে মেয়েদের উত্যক্ত করা যে একটা অপরাধ, সেই বোধটাই আর জন্ম নিচ্ছে না বিপথগামী তরুণদের মনে। এখন প্রশ্ন হল ধর্ষণ বা ইভটিজিংয়ের উৎস চিহ্নিত করে তা রোধ করার উপায় খুজেঁ বের না করে ধর্ষকদের শাস্তির দাবি করে আর জেল জরিমানা দিয়ে এই অপরাধ রোধ কার যাবে কি না? একটি জাতির মেরুদন্ড যদি হয় শিক্ষা, আর সেই শিক্ষার বেশিরভাগই আসে সংস্কৃতি থেকে। সেই সংস্কিৃতিই যখন ধর্ষণ আর ইভটিজিং শিক্ষা দেয়, তখন জাতি হিসাবে আমরা এর চেয়ে ভাল আর কি প্রত্যাশা করতে পারি?
সিনেমার স্টরিগুলো গতানুগতিক এই ধারার চেয়ে বেশি ব্যতিক্রম হয় না। আমি বলছি না এই সংস্কৃতি বাদ দিয়ে দিতে হবে। তবে দাবি করছি এমন ইভটিজিং সমৃদ্ধ গল্প বাদ দিলে সংস্কৃতি থেকে আমরা ভাল কিছু শিখতে পারব। সুন্দর একটি দেশ গড়তে পারব। যে সংস্কৃতি ধর্ষণের শিক্ষা দেবে না। এমন একটি সংস্কৃতি বা বিনোদন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পরিচালক প্রযোজকদের এগিয়ে আসা উচিৎ। যারা সিনেমা নাটকের অনুমোদন দিচ্ছেন তাদেরও বিষয়গুলো নজরে আনা প্রয়োজন। পরিশেষে বলতেই পারি ইভটিজিং মুক্ত সংস্কৃতি একটি ধর্ষণমুক্ত সমাজ গড়তে পারে।


 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

মুক্তিযোদ্ধাকে হারিয়ে দুইয়ে শেখ জামাল

সারা দেশে বিএনপির প্রতিবাদ কর্মসূচি ১৮ ডিসেম্বর

যেভাবে অপহরণকারীদের হাত থেকে মুক্ত হলেন সিলেটের ব্যবসায়ী মুন্না

মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুতে প্রেসিডেন্টের শোক

সানি লিওন শাড়ি না পরলে গণ আত্মহত্যার হুমকি!

রাজধানীতে লাগেজে মস্তকবিহীন লাশ উদ্ধার

‘সাধারণ মানুষের রাজনীতি করতেন মহিউদ্দিন চৌধুরী’

মন্ত্রিত্বের প্রস্তাবেও না বলেছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী

সারাদেশে আবহাওয়া শুষ্ক থাকবে

বিজয় দিবস অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন ৩০ জন ভারতীয়

প্রেমিকের সঙ্গে দেখে ফেলায়...

কুমিল্লায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩

ঢাবি গার্হস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত

মহান বিজয় দিবসে যেসব রাস্তা পরিহার করতে হবে

মহিউদ্দিনের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকারের শোক

বাবার কবরের পাশেই শায়িত মহিউদ্দিন চৌধুরী