একটি তাঁবুর জন্য ৩ দিন অপেক্ষা

শেষের পাতা

মহিউদ্দিন অদুল, উখিয়ার পালংখালী থেকে | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ১:১৬
প্রখর রোদ্দুর। এরই মধ্যে ক্ষণিকের ছায়া নিয়ে হাজির একখণ্ড মেঘ। তারপর একপশলা বৃষ্টি। ঘন বর্ষণ মুহূর্তেই ভিজিয়ে দিলো তাদের। একেবারে কাকভেজা। আনোয়ারার কোলে নাম না রাখা ৬ মাসের কন্যা। আছুমার কোলে দেড় বছরের ফোরকান। ছাবেকুন্নাহারের কোলে দু’বছরের কন্যা মরজান। অপর ছাবুর দু’বছরের কন্যা হারেছাসহ ৫ পরিবারের ২০ শিশু ভিজলো। একই সঙ্গে ভিজলো তাদের ঘনিষ্ঠ পাঁচ পরিবারের ৩৩ জন।
সবার হাত খালি। সন্তানের মাথার উপর ধরার মতো কোনো অবলম্বন নেই। পিচ রাস্তা ঘেঁষে খোলা প্রান্তর। ঘর বাড়ি কিছুটা দূরে। দৌড়ে ছাউনির নিচে যাওয়ার কোনো আশ্রয়ও কাছে নেই। ফলে নিয়তিকে মেনে নেয় তারা। জড়োসড়ো হয়ে ভিজছিল সবাই। শিশুদের গায়ে কাঁপুনি ধরে। গতকাল সকাল ১০টায় এ দৃশ্য চোখে পড়ে উখিয়ার পালংখালী বাজারের কিছুটা উত্তরে।
কাছে যেতেই চেনা গেল তাদের। আগের দু’দিনও ঠিক সেখানেই তাদেরকে বৃষ্টিতে ভিজতে ও রোদে পুড়তে দেখা গিয়েছিল। তিন দিন ধরে এখানে কেন জানতে চাইলে আছুমা বেগম বললেন, এক লোক দয়া করে আমাদের কিছু দিনের জন্য জায়গা দিয়েছেন। কিন্তু মাথার উপর পাতার মতো কিছুই নেই। পলিথিন কেনার টাকা নেই। ওই লোকের আঙ্গিনায় খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাই। আর দিনে একটি তাঁবুর জন্য রাস্তায় এসে বসছি। গাড়ি থেকে কিছু কাপড় ও খাবার দিলেও এখন পর্যন্ত একটি তেরপাল বা তাঁবু পাইনি। তাই প্রতীক্ষায় আছি।
তাদের বাড়ি মিয়ানমারের রাখাইনের মংডুর চিনগিরি পাড়ায়। গত ২৫শে আগস্ট মিয়ানমার সেনা, পুলিশ ও বৌদ্ধ রাখাইনরা তাদের পাড়ায় হানা দেয়। এলোপাতাড়ি গোলাগুলি ও কোপানো শুরু করে। তাতে ওই পাড়ার বাহাদুর (৫০), ইউসুফ (২০), নুর বক্ত (১৫) এবং আবুল কাশেমসহ (২০) কয়েকজন মারা গেছে বলেও জানান তারা। তাই প্রাণ বাঁচিয়ে সন্তানদের নিয়েই বেরিয়ে পড়েন। ভোগান্তির দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে গত শুক্রবার নাফ নদ পার হন। ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের কোলে-কাঁধে করে পালংখালীর আঞ্জুমানপাড়া সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেন। এক বংশের পাঁচ পরিবার নিজেদের সঙ্গ ছাড়েনি। যেখানে যাচ্ছে এক সঙ্গেই অবস্থান করছে।
এর মধ্যে আছুমা ও ইলিয়াছ দম্পতির ৫ সন্তান। নূর ফাতেমা (১০), ইয়াছিন আরা (৫), মিনারা বেগম (৪), ছমিরা বেগম (৩) ও ফোরকান (২)। সবার বয়স কাছাকাছি। তিনজনই কোলের শিশু। বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকে গত ১৮ দিন ধরেই তারা পথে পথে। এভাবেই বৃষ্টিতে ভিজছে। রোদে পুড়ছে ছোট্ট শিশুরা। মাথার উপর ছায়া জুটেনি অর্ধমাসেও। এতে সন্তানদের সবাই কম-বেশি জ্বর, ডায়েরিয়ায় ভুগছে। অথচ তাদের ছিল স্বচ্ছল সংসার। গোয়ালে ১১টি গরু। ২টি মহিষ। ৮৪০ কেজি চাল। আর দেড় মাস পরেই ৬ কানি জমির ধান তোলার কথা ছিল। নৃশংসতার ঝড়  মুহূর্তেই তাদের সংসার তছনছ করে দিলো। পথে বসালো।
তার শ্বশুর বদি আলমের (৫০) পরিবারে সম্পদ ছিল ঢের বেশি। নিঃস্ব হাতে তাদেরও করুণ পরিণতি বরণ করতে হয়েছে। তা ঘোচেনি এখন পর্যন্ত। মাথার উপর জুটেনি একটি তাঁবু। তাই তারাও একই সঙ্গে ছোট্ট শিশুদের নিয়ে রাস্তায় প্রহর গুণছে। যদি কেউ একটি তেরপাল বা তাঁবু ছুড়ে মারে! তার স্ত্রী আলেমা খাতুনের (৪৫) সঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজছিল মেয়ে নূর নাহার বেগম (১৭), হাসিনা (১৬), আনাছ (১৫), নূর হোসেন (১০) এবং মোহাম্মদ নূর (৭)।
বদি আলমের ছেলে জোবায়ের ও স্ত্রী ছাবেকুন্নাহারের কোলে দেড় বছরের অবুঝ শিশুটি মারজানকে ঢেকে দেয়ার মতো কাপড় নেই। তাই কয়েক ফোটা বৃষ্টি তার চোখে-মুখে পড়তেই ঘুম ভেঙ্গে গেল। চিৎকার করে কেঁদে উঠলো। মা বৃষ্টির মধ্যেই দোল দিচ্ছিলেন। কিন্তু থামছিল না কান্না। কেঁদেই যাচ্ছিল। বৃষ্টির শব্দে তার সেই শব্দ হারিয়ে যাচ্ছিল।
বৃষ্টিতে হারেছাকে (২) বুকের কাপড়ের নিচে লুকাচ্ছিলেন মা ছাবেকুন্নাহার। স্বামী নুরুল হক ও ছাবেকুন্নাহারের অপর ছেলেও মায়ের গা ঘেঁষে আত্মরক্ষার চেষ্টায় ছিলেন। কিন্তু তাতে রক্ষা মিলছিল না। হাত দিয়ে মাথা চুইয়ে বার বার পানি ঝরাচ্ছিলেন বাবা।
ছাবেকুন্নাহারের পিতা ছৈয়দ হোছন (৪০) ও মা রশিদার (৩৫) পরিবারের বাকি ৬ ছেলে-মেয়েও শিশু। সবার বয়স তিন থেকে পনেরোর মধ্যে। তারা হলো ইদ্রিস, ইলিয়াছ, ইউসুফ, রিয়াজ, আশেকা ও রাশেদা।
বদি আলমের অপর ছেলে হাশিম ও তার স্ত্রী আনোয়ার জাহান বড় ছিলেন বেশি বিব্রতকর অবস্থায়। জ্বরে আক্রান্ত রোশমিন আরাকে (৪) রক্ষা করবেন না দু’বছরের অপর শিশু রোহরাকে বাঁচাবেন সেই দ্বন্দ্বে ছিলেন। তারা মায়ের কোল ঘেঁষতেই ওই দিকে ৬ মাসের কন্যা ঘুম ভেঙে কান্না জুড়ে দিলো। এক করুণ দিশেহারা পরিস্থিতিতে মা শুধু একটি তাঁবুর অভাবে কাউকে বাঁচাতে পারলেন না।
এমন পরিস্থিতি শুধু তাদের নয়। কুতুপালং রাস্তার মাথায় ছমিদাকেও সন্তানদের নিয়ে রোদে পুড়তে দেখা গেছে। বালুখালীতে রাস্তার মাথায় ভিজছিলেন লায়লা ও ছমিনার ১৩ শিশু সন্তান। মিয়ানমার থেকে প্রাণ নিয়ে এদেশে আশ্রয় নেয়া বহু অসহায় পিতা-মাতাকে এমন করুণ অবস্থায় দেখা গেছে। গত সোমবার রাতে উখিয়া থেকে পালংখালী যাওয়ার পথে রাস্তার পাশে, জঙ্গলে, পাহাড়ে খোলা আকাশের নিচে তাদের মতো অনেক পরিবারকে শুয়ে-বসে থাকতে দেখা গেছে। দিনেও বিভিন্ন এলাকায় শত শত পবিবারকে একটি তাঁবুর অভাবে খোলা আকাশের নিচে থাকতে বাধ্য হয়েছে। এখন কিছু কিছু খাবার জুটলেও জুটছে মাথার উপর ছায়া। অনেকে লবণ মাঠে ব্যবহার করা পুরোনো পলিথিন কিনে তাঁবু টানাচ্ছে। তাও জুটেনি শত শত রোহিঙ্গা শরণার্থী পরিবারের। তারা এমন করুণ পরিস্থিতিতে এভাবে একটি তাঁবুর জন্য রাস্তার ধারে খোলা আকাশের নিচে প্রতীক্ষায় সময় পার করছেন। এখন ক্ষুধা-তৃষ্ণা কিছুটা জুটলেও অনেকের মাথার উপর এখনো ছায়া নেই। তারা তাঁবুর প্রতীক্ষায় সময় পার করছেন।
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন