সড়কের দু’পাশে রোহিঙ্গাদের আর্তনাদ

বাংলারজমিন

সরওয়ার আলম শাহীন, উখিয়া থেকে | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, বুধবার
চারদিকে আহাজারি, শেষ সম্বল হারানোদের আর্তনাদ, সড়কের দু’পাশে স্বজন হারানো নারী পুরুষের ভিড়। মিয়ানমার থেকে সীমান্ত পেরিয়ে এদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা এ বস্তি থেকে সে বস্তি খুঁজে ফিরছেন হারানো স্বজনদের। এদের কেউ জানে না আদৌ তাদের হারানো স্বজন বেঁচে আছে কিনা। তবুও তাদের বিশ্বাস মিয়ানমার থেকে তারা সীমান্তের কোনো না কোনো পয়েন্ট দিয়ে এদেশে চলে এসেছে। উখিয়ার কুতুপালং থেকে পালংখালী পর্যন্ত এমন শত শত স্বজনহারা রোহিঙ্গা কাঁদছে। সোমবার বালুখালী টিভি টাওয়ার এলাকায় তেমনই এক স্বজনহারা বৃদ্ধের দেখা মেলে। বৃদ্ধের নাম জমির উদ্দিন। মিয়ানমারের নাইচ্ছাদং এলাকায় তার বাড়ি। তিনি জানান, মিয়ানমারের পাহাড়ি ও জঙ্গল এলাকার ১২ দিন হেঁটে গত ৪ঠা সেপ্টেম্বর উখিয়া উপজেলার সীমান্ত এলাকা আনজিমান পাড়া পয়েন্ট দিয়ে প্রবেশ করেছে। সেই থেকে ৫ সন্তান, ৩ মেয়ে, ছেলের বৌ, নাতি-নাতনিসহ পরিবারের ২০ সদস্যকে খুঁজে ফিরছেন। জমির উদ্দিন জানান, তার ছেলের মধ্যে ইব্রাহিম (৪০), সোলাইমান (৩৮), সালাউদ্দিন (৩৬), ছমি উদ্দিন (৩৫), কবির আহামদ (৩৪), মেয়ে লুৎফুরনেচা, পারুলি, হামিদাসহ নাতি-নাতনিদের এখনো কোনো হদিস মেলেনি। ইতিমধ্যে কুতুপালং, বালুখালী, থাইনখালী, হাকিমপাড়া, তাজনিরমার খোলা, বাঘঘোনা ও জামতলী এলাকায় গড়ে উঠা বস্তিগুলোতে গিয়ে খুঁজে এসেছেন। কিন্তু পাননি। তাই রাস্তার পাশে বসে কাঁদছেন। একটু দূরেই বসেছিলেন মিয়ানমারের খেয়ারীপাড়া থেকে পালিয়ে আসা মরিয়ম, শিশু সন্তান কোলে নিয়ে কাঁদছেন। জানতে চাইলে তিনি জানান, স্বামী ও ছেলে রহিম উল্লাহ (১২) মেয়ে কুলসুম (৮) কোথায় আছে তিনি এখনো জানে না। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাদের গ্রাম আক্রমণ করলে তারা যে যেদিকে পারে পালিয়ে গেছে। আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় গত সপ্তাহে রহমতের বিল সীমান্ত দিয়ে এদেশে পালিয়ে এসেছে। এখন রাস্তার ধারে ৮ মাসের শিশু সন্তান কোলে নিয়ে কাঁদছেন। গত কয়েকদিনে কয়েকটি বস্তিতে স্বজনদের খুঁজে না পেয়ে পাগলপ্রায় মরিয়ম এদিক সেদিক ছুটোছুটি করছে। শুধু জমির উদ্দিন বা মরিয়ম নয়, এরকম শত শত রোহিঙ্গা মিয়ানমারের স্বজনদের খুঁজে না পেয়ে সড়কের দু’পাশে কাঁদছে। এক সপ্তাহ আগে দুই শিশু সন্তান নিয়ে পালিয়ে আসা ফাতেমা বেগম (২৫) জানান, তার স্বামী বাড়ির পাশের জমিতে ধান কাটছিল। এ সময় সেনাবাহিনী ও রাখাইন সম্প্রদায়ের একটি দল তাকে ধরে নিয়ে যায়। কেরোসিনের আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয় তার ঘর। জীবন বাঁচাতে দু’টি সন্তানকে নিয়ে পালিয়ে এসেছে, স্বামীর কি অবস্থা এখনো জানে না ফাতেমা। মংডু পোয়াখালী গ্রামের জমিলা খাতুন (৪৫) জানায়, তারা মিয়ানমার বাহিনীর আক্রমণে দিশেহারা হয়ে সেদেশের সীমান্ত এলাকার খেয়াবনে কিছু না খেয়ে ৭ দিন লুকিয়ে আত্মগোপন করেছিলেন। সেখানকার একজন দালালের মাধ্যমে ৬ দিন আগে উলুবনিয়া সীমান্ত দিয়ে কুতুপালং বস্তিতে এসেছেন। তিনি বলেন, তার পাশের বাড়িটি লুটপাট করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিলে তার বাড়িটিও পুড়ে যায়। স্বামীসহ স্বজনদের খোঁজ মেলেনি এখনো। মংডু পোয়াখালী গ্রামের সব হারিয়ে নিঃস্ব মমতাজ বেগম (৪০) জানান, সেনা সদস্যরা তাদের গ্রামে লুটপাট চালিয়ে মেয়েদের ইজ্জত লুণ্ঠন করছে। ছেলেদের ধরে নিয়ে জবাই করে মারছে। ছোট ছোট ছেলেদের আগুনে নিক্ষেপ করছে। স্বামী হারা সাজু বেগম (২৫) জানায়, পুলিশ তার স্বামী ইউনুছ কে ধরে নিয়ে গেছে। পরে শুনেছি তাকে মেরে লাশ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। বলেন,  শিশু সন্তান ফায়সাল (৫), রাশেদ (৩) ও আনোয়ার (২) এই তিন সন্তানকে নিয়ে কুমিরখালী থেকে অনেক কষ্টে নাফ নদের পারে এসেছি। খেয়ারীপাড়ার আব্দুল হামিদ (২৬) জানান, ঘরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়ার সময় তার চোখের সামনে বয়োবৃদ্ধ পিতা শফিউল্লাহ (৫৫) মারা যায়। উপায়ান্তর না দেখে বাবার লাশ ফেলে মাকে নিয়ে সীমান্ত পার হয়ে কুতুপালং বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছে। এরকম শত শত রোহিঙ্গার আহাজারি উখিয়া টেকনাফ সড়কের দু’পাশজুড়ে। এসব স্বজন হারা রোহিঙ্গাদের বিশ্বাস এখনো তাদের স্বজন বেঁচে আছে কোনো কিনারায়। তাদের দেখা মিলবে অচিরেই।

 
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন