রাখাইনে গণহত্যা জনপ্রতিক্রিয়া

এক্সক্লুসিভ

| ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:৪৯
মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বর গণহত্যা চালাচ্ছে রাষ্ট্রীয় বাহিনী। তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হচ্ছে। জীবন বাঁচাতে স্রোতের মতো রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ প্রবেশ করছে বাংলাদেশে। মিয়ানমার বাহিনীর হামলায় তাদের কেউ আহত, কেউ পঙ্গু। প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা নতুন করে কক্সবাজারে আশ্রয় নিয়েছে। খাদ্য, পানি আর চিকিৎসার জন্য সেখানে চলছে বিপন্ন রোহিঙ্গাদের হাহাকার।
এমন পরিস্থিতিতে রাজধানীতে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েছিল মানবজমিন। নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এ ইস্যুতে তাদের ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন যা পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতার শিক্ষক বুরহান উদ্দিন ফয়সাল বলেন, ‘মগের মুল্লুক’ যে কথাটি এতদিন ধরে শুনে আসছিলাম তার সার্থক রূপ মিয়ানমারের বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা। রোহিঙ্গারা আরাকান বা রাখাইনের বহু বছরের পুরনো জনগোষ্ঠী। ১০৪৪ সালে কট্টর বৌদ্ধ বর্মী রাজা ‘আনাওহতা’ মগদের বার্মার অন্য অঞ্চল থেকে এনে রোহিঙ্গাদের আবাসভূমিতে বৌদ্ধ বসতি স্থাপন করায়। ১৭৮৪ সালে তৎকালীন বর্মী রাজা আরাকান দখলের পর থেকে এ জনগোষ্ঠী মানুষের দীর্ঘ বিড়ম্বনা শুরু হয়। এর একমাত্র কারণ তারা মুসলিম। তিনি কয়েকটি প্রশ্ন রেখে বলেন,  সুদান বা পূর্ব তিমুরে জাতিসংঘ যা করেছে মিয়ানমারে সে ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেয় না কেন? রোহিঙ্গাদের রক্ত তাহলে সাদা না হলুদ? তারা কি মায়ের পেট থেকে আসেনি? কেন তাহলে জাতিসংঘ সন্ত্রাসী রাষ্ট্র মিয়ানমারে শান্তিরক্ষী পাঠায় না? ওআইসি বা ক্ষমতাধর দেশগুলো কেন মিয়ানমারকে বয়কট করে না?  তুরস্ক বা মালয়েশিয়া এমনকি মালদ্বীপ বিক্ষিপ্তভাবে যা করছে তা যদি সংঘবদ্ধভাবে করতে পারতো তাহলে ভালো হতো। সেদিনের অপেক্ষায়  যেদিন ওআইসি নেতারা একসুরে রাখাইনে নির্যাতনের বিপক্ষে কথা বলবেন। জাতিসংঘের ভূমিকা হবে ন্যায়ভিত্তিক।
আইনজীবী সাকিল আহমাদ বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের ইতিহাস অনেক পুরনো। তবে বর্তমান সময়ে তা অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। বাংলাদেশ তাদেরকে মানবিক দিক থেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে আশ্রয় দিয়েছে। তবে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে বিশ্ব সম্প্রদায়কে কয়েকটি বিষয় বাস্তবায়নে মিয়ানমারকে চাপ প্রয়োগ করতে হবে। সেগুলো হলো: রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে নাগরিকত্ব দেয়া। সম্প্রতি তাদের বাড়িঘর পোড়ানো এবং অন্যান্য যেসব ক্ষতি হয়েছে তা তদন্ত করে সঠিক নিরুপণের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দেয়া। আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের মাধ্যমে তদন্তে প্রমাণসাপেক্ষ এই গণহত্যা ও নির্যাতনে দায়ীদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। সংবাদপত্রের এজেন্ট মো. শফিক বলেন, রোহিঙ্গারা আমাদের ওপরে বিশাল বোঝা।  তারপরেও মানবিক কারণে সরকার আশ্রয় দিয়েছে। সৌদি আরব এই গণহত্যার বিপক্ষে এখন পর্যন্ত টুঁ-শব্দও করেনি। অথচ মিয়ানমারের মিত্র চীন ও ভারতও শেষ পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে, মিয়ানমারে গণহত্যা চলছে। আমাদের গরিব দেশ নিজেরাই ভালো করে চলতে পারি না সেখানে তাদের বোঝা কি করে  নেবো। এত রোহিঙ্গা নিয়ে আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ বা কিভাবে চলবে বলতে পারছি না।
মানবাধিকার কর্মী কামরুল হাসান বলেন, রোহিঙ্গাদের সমস্যা সম্পর্কে তো কম বেশি সবাই অবগত। আমি তাদের সমস্যা সমাধানে কয়েকটি করণীয় বলবো। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব দিতে হবে। জাতিসংঘের নিয়ন্ত্রণে রোহিঙ্গাদের জন্য ‘সেইফ জোন’ মিয়ানমারের ভেতরেই নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য শান্তিরক্ষা মিশন মোতায়েন করতে হবে। মিয়ানমারের দাবি অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের মধ্যে কেউ যদি সন্ত্রাস, সহিংসতার সঙ্গে জড়িত থাকে তাহলে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। রোহিঙ্গাদের হত্যা, অগ্নিসংযোগ এবং উচ্ছেদের সঙ্গে জড়িত মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও বেসামরিক ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে আশ্রয় নেয়া সব রোহিঙ্গার অধিকার (খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থান) নিশ্চিত করতে হবে।
চা দোকানি মো. নুর আলম রানা বলেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ে আমাদের ছোট দেশের অনেক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশ এমনি নানা সমস্যায় জর্জরিত। বাংলাদেশ একদিক থেকে রোহিঙ্গাদের না নিয়ে পারছে না। অন্যদিকে তাদের আশ্রয় দিলে নানা ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। জাতিসংঘ ঠিকভাবে পদক্ষেপ নিলে     পৃষ্ঠা ৫ কলাম ১
 রোহিঙ্গাদের এমন ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ে পড়তে হতো না। আমাদের উচিত আলোচনা করে রোহিঙ্গাদের কিভাবে রাখাইনে ফেরত পাঠানো যায় এবং তাদের ভূমিতে বসবাসযোগ্যের ব্যবস্থা করে দেয়া যায়।
শিক্ষার্থী নাভা তাসনুভা বলেন, আমি যদি দেশের অবস্থা বিবেচনা করে বলি তাহলে মানবতার আগে আসে রোহিঙ্গাদের ভরণ পোষণের ব্যাপারটা। সহজ কথায় বললে, নিজেদের লোকদের খাবার নেই তার উপরে ওরা একটি বোঝা। তবে মানবিক দিক দেখলে তাদের আশ্রয় দেয়া যৌক্তিক।
বেসরকারি চাকরিজীবী মো. মহিবুল্লাহ বলেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় প্রদান করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। রোহিঙ্গা ইস্যু এখন বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু বাংলাদেশের পক্ষে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে জাতিসংঘ ও বিশ্বের অন্যান্য সকল দেশ ও সংগঠনকে এগিয়ে আসতে হবে।
ফল বিক্রেতা মোহাম্মদ আলী বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রতি মিয়ানমারের সৈন্যরা নির্যাতন ও গণহত্যা চালিয়ে দেশছাড়া করছে তা অমানবিক। আমাদের সরকার তাদেরকে জায়গা দিয়েছে মানবিক ও মুসলিম, ভাইবোন হিসেবে। এই রোহিঙ্গা মুসলিমদের নাগরিকত্ব দিয়ে ফিরিয়ে নেয়া হোক।
রিকশাচালক মো. নূরু মিয়া বলেন, ‘মরার ভয় তো আর বর্ডার বোঝে না। আমি অশিক্ষিত মানুষ, বেশি কিছু বুঝি না। তবে জান বাঁচাইতে পলাইয়্যা আসা মানুষগুলারে কয়ডাদিন আমগোর দেশে থাকতে দিলে কি আর এমন ক্ষতি হইবো?’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইমন হোসাইন বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা তো আমাদের দেশে আগে থেকেই আছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেটি প্রকট আকার ধারণ করেছে। রোহিঙ্গাদের ওপর যে অমানুষিক নির্যাতন চলছে তা আসলে মেনে নেয়া যায় না। বিষয়টি সমাধানে বিশ্বনেতাদের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। কিন্তু সবাই কেন জানি চুপ, কেউ কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। রোহিঙ্গাদের নিয়ে আমাদের দেশ সত্যিকার অর্থেই অনেক চাপের মধ্যে আছে। মানবিকতার স্বার্থে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া উচিত। তবে, নিজেদের দেশের বাস্তবতাও মাথায় রাখা প্রয়োজন। বাংলাদেশ এমনিতেই একটি জনবহুল দেশ। আয়তনের তুলনায় আমাদের জনসংখ্যাও বেশি। তার উপর আমাদের জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। অন্য একটি জনগোষ্ঠীকে নতুন করে এখানে স্থায়ীভাবে বাস করতে দেয়ার সুযোগ আমাদের নেই। সাময়িক সময়ের জন্য তাদের আশ্রয় দিয়ে, এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়াটাই শ্রেয় হবে।
একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা শিপন আহমেদ বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সরকার ও সে দেশের সেনাবাহিনী যে নির্যাতন করছে তা অমানবিক ও মানবতাবিবর্জিত। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তো বরাবরই উগ্র আচরণ করে আসছে। এর আগেও তারা  রোহিঙ্গাদের বিভিন্নভাবে নির্যাতন করে আমাদের দেশে পাঠাতে তৎপর ছিল। এখন সরকারের উচিত রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে দ্রুত একটি সিদ্ধান্তে আসা।   রোহিঙ্গা ইস্যুতে জানতে চাওয়া হলে ব্যাংক কর্মকর্তা রাজিবুল ইসলাম বলেন, মিয়ানমার যা করছে রোহিঙ্গা ইস্যুতে তা গণহত্যার শামিল। আন্তর্জাতিক সকল আইনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে মিয়ানমার তাদের রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর ওপর অমানবিক নির্যাতন চালাচ্ছে। এতো ছোট একটি দেশ, কিন্তু তাদের সাহস দেখে অবাক হই। সম্ভবত চীনই তাদের শক্তির প্রধান উৎস। আর সম্প্রতি ভারতও পরোক্ষভাবে মিয়ানমারের এ কর্মকাণ্ডকে সমর্থন জানাচ্ছে। এর ফলে মিয়ানমার আরো আগ্রাসী হতে পারে। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের পেছনে শুধুমাত্র ধর্মীয় ব্যাপারই নয়, আরো অনেক বিষয় থাকতে পারে। বিশেষ করে ভূ-রাজনৈতিক ব্যাপারটিও এখানে মুখ্য কারণ হতে পারে।   
তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থী সৌরভ হাসান বলেন, তারা কি সাধারণ মানুষের ওপর এই নির্যাতন করে ঠিক করছে? তারাও তো মানুষ। তাদের নিজেদের উপর যদি কেউ এমন নির্যাতন করতো, তাহলে তাদের কেমন লাগতো। যদি তাদের নিজেদের মানুষের হাত-পা কেটে, গুলি করে হত্যা করা হতো তাহলে কেমন লাগতো তাদের? তাদের এই সব অমানবিক নির্যাতন কোনোভাবেই কেউ সমর্থন করবে না।
বিক্রম কর্মী মিমি বিশ্বাস বলেন, যেভাবে মিয়ানমারে শিশু-নারীসহ সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন করা হচ্ছে তা মোটেও  মেনে নেয়া যাচ্ছে না। আমাদের সরকার তাদের এই দেশে স্থান দিয়ে খুব ভালো একটা কাজ করেছে। কিন্তু সুচি সরকার কাজগুলো মোটেও ঠিক করছে না। মিয়ানমার সরকার বলছে, এই রোহিঙ্গারা নাকি  মিয়ানমারের নাগরিকই না। তাহলে এই রোহিঙ্গা মানুষগুলো কোথায় যাবে? বাংলাদেশে আগে থেকেই অনেক সমস্যা রয়েছে। স্থায়ীভাবে রোহিঙ্গাদের জায়গা দেয়া কোনোভাবেই সম্ভব না।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাইয়ান বসুনিয়া বলেন, এমনিতেই আমাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা তার উপর আবার এত মানুষের বাড়তি চাপ। মানবিক কারণে তাদের ক্ষণিকের আশ্রয় দিলেও স্থায়ী বসতি গড়ার সুযোগ দেয়া যাবে না।
প্রতিক্রিয়া নিয়েছেন হাফিজ মুহাম্মদ, এসএম ফয়সাল হাসান, পিয়াস সরকার ও সুদীপ অধিকারী

 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

ইয়াছিন আরাফাত

২০১৭-০৯-১২ ১৮:৩২:৪৮

#বুরহান_উদ্দিন_ফয়সাল ভাইয়া সুন্দর একটা কথা বলেছেন। আসলে কি রোহিঙ্গাদের রক্ত সাদা বা হলুদ.? ও আই সি বা জাতিসংঘ কেন কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না.? সু চি কিভাবে শান্তিতে নোভেল পায়.? ওর এই পদক কেড়ে নেয়া উচিত.!!!

সাইফুল

২০১৭-০৯-১২ ১১:৩১:৫১

স্থায়ী সমাধান হওয়া উচিৎ

আপনার মতামত দিন

নবীনগরে আওয়ামী লীগ নেত্রী খুন

রোহিঙ্গাদের সঙ্গে দেখা হবে পোপের

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনে বিশ্বজনমত গঠিত হয়েছে

৬৯ মাসে তদন্ত প্রতিবেদন পেছালো ৫২ বার

মসনদে বসছেন ‘কুমির মানব’

রোহিঙ্গাদের ফেরাতে সমঝোতার কাছাকাছি বাংলাদেশ-মিয়ানমার

তনুর পরিবারের সদস্যদের ঢাকায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ

স্বপ্ন দেখাচ্ছে সৌর বিদ্যুৎ

আসন ধরে রাখতে চায় আওয়ামী লীগ, ফিরে পেতে মরিয়া বিএনপি

মেয়র পদে ১৩ জনের মনোনয়নপত্র জমা

জিদান খুনের রোমহর্ষক বর্ণনা আবু বকরের

অসহনীয় শব্দ দূষণে বেহাল নগরবাসী

সব স্কুলে ছাত্রলীগের কমিটি দেয়ার নির্দেশ

একতরফা নির্বাচন কোন নির্বাচনী প্রক্রিয়া নয়

‘অনুমোদনহীন বারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা’

কি পেলাম কি পেলাম না সেই হিসাব মেলাতে আসিনি: প্রধানমন্ত্রী