মমতা গাইলেন, একলা চলরে

বউঠানের কক্ষটি আজও রহস্যঘেরা

চলতে ফিরতে

কাজল ঘোষ, কলকাতা থেকে ফিরে | ২৮ আগস্ট ২০১৭, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:২১
আজ যিনি বিশ্বময় বাংলাকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। যিনি একই সঙ্গে দুই টি দেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা। এই বাংলায় যিনি এনেছেন প্রথম নোবেল অর্জনের খ্যাতি। যিনি আমাদের যাপিত জীবনের প্রতিটি প্রসঙ্গে হাজির হন তার সৃষ্টিশীলতা আর মৌলিকত্ব নিয়ে সেই মানুষটির বাড়ি যাওয়া হয়েছিল অনেকটাই কাকতালীয়ভাবে। ২০১৩ সালের আগস্টে কলকাতায় গেলে এক বিকালে কি করা যায় তা নিয়েই ভাবছি। এরমধ্যেই পরিতোষ দা’র ফোন।
কি আর করবে? তোমরা চলে এসো। কোথায় কি জানতে চাইতেই বললো জোড়াসাঁকোয় যাই। ঠাকুরবাড়িটি তোমাদের দেখা হবে। আর আজ কিছু অনুষ্ঠানও হবে। সন্ধ্যাটা তোমাদের ভালোই কাটবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছেলেবেলা বইটি পড়ার পর থেকেই ঠাকুরবাড়ির একটি ছবি আঁকা আছে মনের পটে। এবার সত্যিসত্যি সেখানে যাওয়ার সুযোগ হচ্ছে ভেবেই রোমাঞ্চ অনুভব করছি। আমি আর পুষ্পিতা চটজলদি তৈরি হয়ে বের হলাম। যেতে হবে চিৎপুরে। পথে দাদার সঙ্গে দেখা হবে। আর তারপরই একসঙ্গে বাসে করে যাবো জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির দিকে। বাসে চিৎপুরে নামতেই একটি গলিপথে ঢুকবো এমন সময় তাকিয়ে দেখি সিমেন্টের গেট। রবীন্দ্র সরণি আর বিবেকানন্দ রোডের সংযোগস্থলে এই গলিটি দ্বারকানাথ ঠাকুর লেন। এর প্রবেশ গেটে বড় করে লেখা ‘জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি’। আর নিচের দিকে ছোট করে পিলারে ইংরেজিতে লেখা ‘হাউজ অফ ট্যাগোরস’। বাইরে থেকে দেশ বিদেশের লোকদের নজরে আনতে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দুটি বড় গেটওয়ে নির্মাণ করেছে, যা হোক তর সইছিল না। দাদাকে তাগাদা দিচ্ছিলাম আর কতদূর। যিনি আমাদের মননে-সৃজনে আলো জ্বেলেছেন সেই কবিগুরুর বাড়ি কখন পৌঁছাবো। কিছুদূর গলিপথ হাঁটার পর পেয়ে যাই সেই লাল রঙের দালান। সামনেই সবুজ লন। বিষ্ময় নিয়ে এগুচ্ছি হঠাৎ পাশ দিয়েই দু’তিনটে গাড়ির একটি বহর এসে থামলো। সাদা পোশাকে সশস্ত্র প্রটেকশন। আর পাশ দিয়েই স্যান্ডেল পায়ে সাদা রঙের নীল পাড়ের শাড়িতে চলে যাচ্ছেন মমতা। মানে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ যে বাইশে শ্রাবণ। বিশ্বকবির প্রয়াণ দিন। দূর থেকেই আওয়াজ পাচ্ছিলাম কবির বেদনাবিদূর কিছু গানের। ভেতরে মূল ভবনের সামনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অনেকের বক্তৃতার পর মঞ্চে দাঁড়ালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পত্র-পত্রিকায় অনেক রিপোর্ট পড়েছি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে। কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস করে তিনদশকের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে দুনিয়ায় তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। সাদাসিধে মমতা কথা বলার এক ফাঁকে বললেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানই তার চলার প্রেরণা। তিনি সকল অন্ধকার দূর করে সামনে এগিয়ে নিয়ে চলেন কবির গানে আর সুরে। এরপরই তিনি খালি গলায় গেয়ে ওঠেন, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে’। একসময় অন্যদেরও সুর মেলাতে বললেন। অনুষ্ঠান সাঙ্গ হয়। আমরা এগিয়ে যাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটির নানান অঙ্গনে। পুরো বাড়িটি এখন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায়। এর দেখভাল অনেক আগে থেকেই করছে সরকার। বাড়িটির বিশাল অংশজুড়েই রবীন্দ্র জাদুঘর। বাড়িটির তিনটি অংশের মধ্যে একটি প্রাচীন অংশ, বিচিত্রভবন এবং ভেতর বাড়ি। কবিগুরুর জন্ম কক্ষ অর্থাৎ আঁতুড়ঘর থেকে শুরু করে প্রয়াণ কক্ষ পর্যন্ত। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় একেকটি কক্ষের সামনে। এখানেই দখিনের বরান্দা। এখানে বসেই তিনি লিখতেন। এখানের খাবার ঘর থেকে ভৃত্যরা কিশোর রবির জন্য জলখাবার নিয়ে আসতেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজ লেখায় বাড়িটিকে ‘ভৃত্যরাজক তন্ত্র’ বলেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বাড়িতে জন্মেও বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেখা পেয়েছিলেন দশ বছর বয়সে। চৌদ্দ ভাইবোনের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সবার ছোট। একমাত্র স্কুলে যাওয়া ছাড়া বাইরে বের হওয়া ছিল নিষিদ্ধ। সুতরাং
ভৃত্য পরিবেষ্টিত জীবনই ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছেলেবেলায় নিয়তি। একে একে বাড়িটি ঘুরে দেখছিলাম আর নানা প্রসঙ্গ আওড়াচ্ছিলাম। ভেতরবাড়ির বউঠানের কক্ষটি আজও বন্ধ। যে কক্ষে বিষ খাওয়ার দু’দিন পর মৃত্যু হয়েছিল রবিঠাকুরের নতুন বউঠান কাদম্বরী দেবীর। নানা বিতর্ক এই মৃত্যু ঘিরে। এটি মৃত্যু না আত্মহত্যা তা নিয়ে খোদ ঠাকুরবাড়ির প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকার আজও সমাধান হয়নি। ১৮৮৪ সালের ১৯শে এপ্রিল কাদম্বরী দেবী আফিম খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। এর দু’দিন পর ২১শে এপ্রিল মাত্র ২৫ বছর বয়সে তিনি মারা যান। বলা হয়ে থাকে এই বউঠানের মৃত্যু ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যন্ত্রণার। মাত্র তেইশ বছরে মৃণালিনী দেবীকে বিয়ের চার মাসের মাথায় বউঠানের মৃত্যু রবীন্দ্রনাথের জীবনকে বিষাদময় করে তুলেছিল। তা তার সে সময়ের লেখা অসংখ্য কবিতা ও গানে আমরা জানতে পারি। বউঠানের সেই কক্ষটি বছর দুয়েক আগে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নেতৃত্বে পরিদর্শনের জন্য খোলা হলেও তা আবার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
যেভাবে জোড়াসাঁকোয় ঠাকুরবাড়ি
৬ বি দ্বারকানাথ টেগোর লেন মূলত পরিচিত ছিল মেছো কলোনি বলে। এখানে অবস্থিত জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়িটি ছিল একটি দেবোত্তর সম্পত্তি। জমিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঠাকুরদাদা দ্বারকানাথের ঠাকুরদাদা নীলমণি ঠাকুর গৃহদেবতা লক্ষ্মীজনার্দন জিউয়ের নামে  দেবোত্তর সম্পত্তি হিসাবে লাভ করেছিলেন বিশিষ্ট ধনী বৈষ্ণবচরণ শেঠের কাছ থেকে। তবে ব্যবসা করে স্বচ্ছলতা লাভের পর দ্বারকানাথ ঠাকুরই প্রথম ঠাকুরবাড়ির পত্তন করেন। তৈরি হয় মহর্ষিভবন। এরপর আরও স্থাপনা নির্মিত হয়। অষ্টাদশ শতকের শেষ ভাগ থেকে ঠাকুর পরিবারের বাসস্থান ছিল এখানে। এ বাড়িতেই ১৮৬১ সালের ৭ই মে, বাংলা ১২৬৮ সালের ২৫শে বৈশাখ জন্মেছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ঊনবিংশ শতাব্দীর বাঙালির সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে এই বাড়ির বাসিন্দারা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছিলেন। তার মধ্যে সবার আগে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সে সময় দুনিয়ার খ্যাতনামা অসংখ্য বিখ্যাত ব্যক্তি এসেছিলেন এই বাড়িতে। ১৯৬২ সালের ৮ই মে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষে এই রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু।
জোড়াসাঁকোর ভেতর-বাহির
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁতুড়ঘর থেকে শুরু করে যে ঘরে তিনি  শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন তা সবই এখন স্মৃতিকক্ষ। পুরো বাড়িটিকে করা হয়েছে রবীন্দ্র মিউজিয়াম। বাড়িটি আয়তাকার। বাড়ির ৪টি ভবনের ১৮টি গ্যালারিজুড়ে রয়েছে সংগ্রহশালা। মহর্ষিভবনের দোতলায় হাতের বাম দিকের ঘরটি রবীন্দ্রনাথের খাবার কক্ষ। এরপর কবিপত্নী মৃণালিনী দেবীর হেঁসেল। পাশে সংগীত কক্ষ, এরপর মহাপ্রয়াণ কক্ষ। যে কক্ষে ১৯৪১ সালের ৩০শে জুলাই কবিগুরু শেষ কবিতা, ‘তোমার সৃষ্টির পথ’-এর নির্দেশনা দিয়েছিলেন। এর সাতদিন পর তিনি পাড়ি জমান না  ফেরার দেশে। এই ভবনেই রয়েছে দু’টি আর্ট গ্যালারি। একটি প্রাচ্য আর অন্যটি পাশ্চাত্য ধারার। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যামিনী রায়, নন্দলাল বসুসহ আরো অনেক নামিদামি শিল্পীর আঁকা ছবি আছে এখানে। রয়েছে নোবেল পুরস্কারের ছবি সংবলিত একটি গ্যালারি। নাইটহুড বর্জনের কারণ বর্ণনা করে ইংরেজ সরকারকে লেখা চিঠির কপিও আছে এখানে।
মূল ভবনের পাশের ভবনটির নাম বিচিত্রা। দোতলায় ভিক্টোরিয়া হল। এখানে আছে শিলাইদহ কুঠিবাড়ির কিছু ছবি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে বোটে ঘুরে বেড়াতেন পদ্মায় সেই বোটের একটি প্রতিকৃতি আছে, যা বাংলাদেশ সরকারের দেয়া উপহার হিসাবে সংরক্ষিত আছে। নিচে আয়তাকার উঠোনের একদিকে স্থায়ী মঞ্চ আর অন্যদিকে দুর্গা পূজার স্থান। ঠাকুর পরিবার ব্রাহ্ম ধর্ম গ্রহণ করলে পূজা বন্ধ হয়ে যায়। পরে সেখানেই হত ব্রাহ্ম সমাজের সভা। মূল বাড়ির বাইরের দিকের একটি ভবনে সংরক্ষিত আছে রবীন্দ্রনাথের ব্যবহৃত একটি গাড়ি।

 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

নবীনগরে আওয়ামী লীগ নেত্রী খুন

রোহিঙ্গাদের সঙ্গে দেখা হবে পোপের

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনে বিশ্বজনমত গঠিত হয়েছে

৬৯ মাসে তদন্ত প্রতিবেদন পেছালো ৫২ বার

মসনদে বসছেন ‘কুমির মানব’

রোহিঙ্গাদের ফেরাতে সমঝোতার কাছাকাছি বাংলাদেশ-মিয়ানমার

তনুর পরিবারের সদস্যদের ঢাকায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ

স্বপ্ন দেখাচ্ছে সৌর বিদ্যুৎ

আসন ধরে রাখতে চায় আওয়ামী লীগ, ফিরে পেতে মরিয়া বিএনপি

মেয়র পদে ১৩ জনের মনোনয়নপত্র জমা

জিদান খুনের রোমহর্ষক বর্ণনা আবু বকরের

অসহনীয় শব্দ দূষণে বেহাল নগরবাসী

সব স্কুলে ছাত্রলীগের কমিটি দেয়ার নির্দেশ

একতরফা নির্বাচন কোন নির্বাচনী প্রক্রিয়া নয়

‘অনুমোদনহীন বারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা’

কি পেলাম কি পেলাম না সেই হিসাব মেলাতে আসিনি: প্রধানমন্ত্রী