কিশোর রফিকের ঢেউয়ের সঙ্গে যুদ্ধ

এক্সক্লুসিভ

মহিউদ্দিন অদুল, কুড়িগ্রাম থেকে ফিরে | ২৮ আগস্ট ২০১৭, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ১:১৬
 চারদিকে মানুষের আহাজারি। বাঁচার জন্য বিলাপ। বন্যায় তাড়া খাওয়া মানুষের কান্নাকাটি। বিভীষিকাময় ভয়ার্ত চিৎকার-চেঁচামেচিতে মধ্যরাতের ঘুম ভাঙে কিশোর রফিকুল ইসলামের। বিপদের ঘনঘটা আঁচ করতে পারলেও সাহস হারায়নি। মা, বাবা, দাদী, ভাইকে জাগিয়ে বেরিয়ে পড়ে। প্রাণ হাতে নিয়ে দৌড় সবার।
কিন্তু খাল পারাপারের বেড়িবাঁধে পা দিতেই তা তুলার মতো ভেসে যায়। সঙ্গে সঙ্গে ডাল ধরতেই স্রোতে উপড়ে যায় গাছটিও। শুরু হয় ঘনকালো অন্ধকারে বন্যার প্রবল স্রোতে তাদের বাঁচার সংগ্রাম। এই প্রাণপণ বাঁচার সংগ্রামে মা রূপবান (৩৫) ও দাদী ছেরবানকে (৮০) বাঁচাতে পারলেও চাচী ফাতেমা বেগমকে (৪০) বাঁচাতে পারলো না রফিক।
গত ১২ই আগস্ট দিবাগত রাতে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের কালুয়া গ্রামের খালের বেড়িবাঁধ বিলীন হয়ে এমন ভয়াবহ বিপদের মুখে পড়েছিলেন তারা। সেই ভয়ানক স্মৃতি এখনো দুঃস্বপ্নের মতো তাড়ায় কালিয়া গ্রামের এই পরিবারকে। এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন সেই রক্তাক্ত ক্ষত। স্বজনহারার শূন্যতা। ‘বাবা, আমাকে বাঁচাও’ চাচীর এমন চিৎকার প্রায় কানে বাজে রফিকের। চমকে উঠেন ঘুম থেকে। কিন্তু ছোট্ট চাচাতো ভাইদের মায়ের শূন্যতা বুঝার বয়সও হয়নি।
গত বুধবার বন্যায় দাদী ও মাকে যে কিশোর বাঁচিয়েছে তার বাড়ি কোথায় জানতে চাইতেই গ্রামবাসীরা দেখিয়ে দিলো। ভয়াবহ বন্যায় বাঁচার এমন গল্পে বাড়িটি পরিচিত হয়ে উঠলেও সেখানে সবার চোখে-মুখে একরাশ শূন্যতা। নিজেরা বাঁচলেও ফাতেমার মৃত্যু সবাইকে বোবা কান্নায় আচ্ছন্ন রেখেছে। বন্যায় তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আশপাশের কিছু বাড়িঘর তো একেবারে চিড়ে চ্যাপ্টা। খালের উপর যেন বসিয়ে দেয়া হয়েছে কালিয়া কমিউনিটি ক্লিনিক ভবনটি।
রফিক, রূপবান ও ফাতেমার কাছে জানতে চাইতেই রফিক জানালেন মৃত্যুর মুখ থেকে তাদের ফেরার গল্প, ‘মানুষের আহাজারিতে ঘুম ভাঙে। চিৎকার শুনেই বুঝে যায় বন্যা তেড়ে আসছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘরে হাঁটু পানি। মা, দাদী, বাবা আজাদ আলী (৪০) এবং ছোট ভাই বিপুলসহ (১২) সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি। কিন্তু এগুনো খুব কষ্টের। আমি মা ও দাদীকে ধরি। বাবা ছোট ভাইকে। কষ্টে কোনো মতে বাড়ির পাশের খালের বাঁধে পৌঁছি। বাঁধটি খাল পারাপারের  
 স্থানীয় সড়কও। উদ্দেশ্য তা ধরে গড়ের বাজারে গিয়ে উঠা। কিছুটা এগিয়ে বাঁধে পা দিতেই তাতে আঘাত হানে খাড়া হয়ে আসা প্রবল স্রোত। এর আগে আরো একটি বড় বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় পানি ওই বাঁধে প্রচণ্ড বেগে আঘাত হানে। তাতে পা দেয়ার পর মুহূর্তেই বাঁধটি একেবারে বিলীন হয়ে যায়। তারা অনুভব করে হঠাৎই পায়ের নিচের মাটি সরে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে এক হাতে মা ও অন্যহাতে দাদীকে ধরে রেখে দু’হাতে বুক দিয়ে রফিক আঁকড়ে ধরে একটি ইউক্লিপটাস গাছ। তারপর আরো একটা স্রোত ও ঢেউয়ে সেই গাছটাও উপড়ে যায়। সইতে হয় সে আঘাত। তবে পানি থাকায় তা মারাত্মক হয়নি। এ অবস্থায়ও মা এবং দাদীকে দু’হাতে ধরে রাখি। সে পরিস্থিতিতে তিনজনের চেষ্টায় কিছুটা তীরের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু স্রোত ও ঢেউ আমাদেরকে খালের মাঝে নিয়ে যায়। এরপর আগের মতো করে একটি শিমুল গাছ ধরি। এরই মধ্যে গাছের ডাল ও পাতা শরীরে লেগে আঘাতের পর আঘাত করছিলো। তখন ছোট ভাইকে ডাক দিই। সে সাড়া দেয়। বলে একটি গাছ ধরে আছে। সে ডাক শুনে বাবা অন্ধকারে সে দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে। স্রোতের টান ও ঢেউয়ের আঘাতের মধ্যে মাকে বলি পায়ের নিচে মাটি আছে কিনা দেখো। মা বলে মাটি নাই। অথৈ পানি। এরই মধ্যে আগের বাঁধ ভেঙে ভেসে আসা চাচী ফাতেমা আমাদের আওয়াজ শুনে। তিনি চিৎকার দিয়ে বলেন, ‘বাবা, আমাকে বাঁচাও। আমাকে বাঁচাও।’ মুহূর্তেই তাকে উদ্ধারের কথা মাথায় আসে। তখনই মনে হয় মা বা দাদীর যে কোনো একজনকে ছেড়ে দিলেই স্রোত ভাসিয়ে নেবে। নিজেকে সংবরণ করে চাচীকে চিৎকার করে বলি ‘বউ (চাচী) গাছ ধরো, গাছ ধরো।’ তখনও আমরা শিমুল গাছটি ধরে ছিলাম। আঘাতের পর আঘাত ও গাছের চিপায় ঘষা লেগে দাদীর হাতের চামড়া খসে গেছে। থেঁতলে গেছে বাহু। তখন ভাবি এমন কষ্টে আর থাকা যাবে না। দু’জনকে এক সঙ্গে আর আঁকড়েও রাখা যাবে না। কিন্তু পড়ি উভয় সংকটে। মাকে না দাদীকে আগে বাঁচাবো। তখনই ভাবি মা সাঁতার দিলে হয়তো তীর ধরতে পারবে। আর দাদীকে ছেড়ে দিলে ডুবে যাবে। এ অবস্থায় মাকে সাঁতার দিতে বলি এবং আমি দাদীকে নিয়ে আসবো বলে জানাই। যেই কথা সেই কাজ। মাকে ছেড়ে দিয়ে দাদীকে নিয়ে আমি সাঁতার দিই। কিন্তু তীরে উঠা আর হয় না। স্রোত ভাসিয়ে নেয় এক কিলোমিটার দূরে চুতুর্ভূজ এলাকায়। ভাসমান ময়লা-আবর্জনার সঙ্গে ভেসে থাকাটা সে সময় দুর্বিষহ ছিল। পায়ের নিচে মাটি পাওয়ার পর দেখি মাও বেঁচে আছেন। দাদীর হাতে ব্যাপক জখম। পরে বাবা এবং ভাইকেও ফিরে পাই। কিন্তু চাচীকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। অবশেষে ঘটনার নবম দিন গত ২১শে আগস্ট শিমুলগাছ ধরা অবস্থায় চাচীর লাশ পাওয়া যায়। সেই বাঁধ থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে মেখলী এলাকায়। শাড়িও জড়িয়ে ছিল গাছের ডালে।’
বড়বাড়ী শহীদ আবুল কাশেম উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া কিশোর রফিকের আফসোস, বাঁচার জন্য চাচীকে যে গাছের ডাল ধরতে বলেছিলাম। তাই তার জন্য কাল হলো কিনা। বিপদের শেষ মুহূর্তে হাতে ধরা ডাল আর ছাড়তে পারেনি কিনা। তাতে ডালের সঙ্গে নিজেও ডুবে মরেছে কিনা। এমন নানা ভাবনা কুরে কুরে খাচ্ছে তাকে। ফাতেমা ছাড়াও ওই গ্রামের শিশুসহ আরো কয়েকজন মারা গেছে বন্যার করাল স্রোতের বলি হয়ে। কেবল কুড়িগ্রাম জেলায়ই নিহত হয়েছে ২৩ হতভাগা নারী-পুরুষ ও শিশু।
বৃদ্ধা ছেরবান হাতের চমড়া খসে যাওয়া গভীর ক্ষত দেখিয়ে বলেন, হয়তো আল্লাহ হায়াত রাখছিল তাই বেঁচে আছি। নইলে এত কষ্ট-যন্ত্রণায় বেঁচে থাকা দায় ছিল। কিন্তু আমার ছেলের বউকে তো হারিয়েছি।
 
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

selina

২০১৭-০৮-২৭ ২০:৩৮:৫৮

Tragedy ,Allah save us from Your penalty .

আপনার মতামত দিন