কফি হাউজটা আজও আছে

চলতে ফিরতে

কাজল ঘোষ, কলকাতা থেকে ফিরে | ২৩ আগস্ট ২০১৭, বুধবার
কলকাতা যাই আর না যাই কিন্তু কফি হাউজের একটি ছবি আঁকা আছে মনের ভেতরে। আর তা হয়েছে কৈশোর-তারুণ্যে মান্না দে’র কফি হাউজ গানটি শোনার ফলে। আর আমাদের শিক্ষাজীবনের যত বিদায় অনুষ্ঠান, পুনর্মিলনী এমনকি বনভোজন বা কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দল বেঁধে হেরে গলায় এই গানটি গেয়ে ওঠতাম। কলকাতায় যতবার গিয়েছি ততবারই কোনো এক অদৃশ্য কারণে মন ছুটেছে কফি হাউজের দিকে। প্রথম দেখার কফি হাউজের কথা খুব একটা মনে না থাকলেও তবে প্রাণ জুড়াতে এক পেয়ালা কফিতে চুমুক দিয়েছিলাম এটা সত্য। এর পরের বার ২০১৩ সালে যখন গেছি তখন অনেকটা সময় নিয়ে কফি হাউজকে পরখ করেছিলাম।
সেবার এখানকার বিখ্যাত অনিয়ন পাকোরা, চিকেন পাকোরা আর মাটন অমলেটে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেছি। এরপর দেশে ফিরলেও মাটন অমলেট আর পাকোরার স্বাদ জিভে লেগেছিল অনেকদিন। এই দুই দফায় কফি হাইসের আড্ডায় চোখে পরে নবীন-প্রবীণের মেলা কফি হাউজ ঘিরে। দোতলায় ওঠতেই সিগারেটের ধোঁয়ার অন্ধকার পার হয়ে চোখে পড়বে কফি হাউজ। দেয়ালের নানা প্রান্তে টানা রয়েছে বিখ্যাত সব শিল্পীদের চিত্রকর্ম। আর সারি সারি গোলটেবিল সাজানো। ওপরের দিকে রয়েছে থিয়েটার বা গ্যালারির মতো। সেখানেও টেবিল সাজানো। কখনও কখনও এমন হয় এইসব টেবিল ভর্তি হয়ে আড্ডাবাজারা দাঁড়িয়ে থাকেন কখন খালি হবে টেবিল। যদিও খানিকটা হোঁচট খেয়েছিলাম যখন শুনেছি মান্না দে নিজেই কখনও যাননি কফি হাউজে। যে গান এতটাই ব্যাকুল করেছে কফি হাইজের জন্য, সেই গানের গায়ক নিজেই আসেননি এই কফি হাউজে। এটা মেনে নিতে বেশ অনেকটা কষ্ট হয়েছিল। যা হোক কফি হাইজের আড্ডা সত্যিই অন্যরকম। বিশেষত শিল্প-সহিত্য চর্চার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের এমন অফুরান আড্ডার তুলনা হয় না। আর কফি হাউজের আড্ডায় কখনও বাধা দেন না কর্তৃপক্ষ। অফুরান আড্ডা চলছে তো চলছেই। কফি হাউজের ওয়েটারদের একটি বিশেষত্ব আছে। তা হলো- সকলেই অভিজাত, রাজকীয় পাগড়ি আর সাদা সেরোয়ানিতে পুরোদস্তুর বাবু সেজে কফির পেয়ালা নিয়ে হাজির হন।
ইতিহাসের পাতায় রয়েছে এই কফি হাউজ নিয়ে নানান তথ্য। কলেজ স্ট্রিটের প্রান্তে অবস্থিত খ্যাতনামা প্রেসিডেন্স কলেজ। যা বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর ঘটেছে। তাছাড়াও সেখানকার লম্বা এলাকা জুড়ে পুরাতন ও নতুন বইয়ের বাহার দোকান নিয়ে বসে কারবারিরা যা কাছে টানে। বিখ্যাত সব প্রকাশনার দোকান রয়েছে এই এলাকাতেই। আনন্দ, দেজ, মিত্র ও ঘোষ এমন নানান পাবলিশার্স অবস্থিত এ এলাকাতেই। সব ছাপিয়ে এখানকার পাতিরামের লিটলম্যাগের স্টলটি আমাকে অভিভূত করেছে। কলেজ স্ট্রিটের মোড়ে এই ছোট্ট স্টলটিতে পুরো ভারতজুড়ে যত লিটল ম্যাগ বের হয় তার অন্তত একটি করে হলেও কপি থাকে। দুই বঙ্গের ছোট কাগজের উৎসাহী পাঠকরাও ছুটে যান তাদের পছন্দের কাগজের খোঁজে পাতিরামের স্টলে। এই কফি হাউজেই  আডি্ডা দিতেন কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়। দুনিয়ার তাবৎ বিষয় ওঠে আসতো সত্যজিৎ রায়ের টেবিল আড্ডায়। খ্যাতনামা অভিনেতা রুদ্রপ্রসাদও আড্ডা দিতেন এই কফি হাউজেই। অপর কিংবদন্তি অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এক্ষণ পত্রিকা সম্পাদনা করতেন এই কফি হাউজে বসেই।
উইকিপিডিয়ার দেয়া তথ্যে জানা যায়, উত্তর কলকাতার বইপাড়া কলেজ স্ট্রিট চত্বরে এটি অবস্থিত। কফি হাউজের নাম প্রথম দিকে ছিল না। এটি ছিল বিরাটাকৃতির হল। যেখানে মানুষের জমায়েত হতো। ১৮৭৮ সালের এপ্রিলে তৎকালীন বৃটিশ রানী ভিক্টোরিয়ার স্বামী অ্যালবার্টের নামকরণে এটির নামকরণ করা হয় অ্যালবার্ট হল। এরপর ১৪০ বছর কেটে গেছে। ১৯৫৭ সালে এটি কফি হাউজে রূপ লাভ করে। এটি ইন্ডিয়ান কফি হাউজ বা কফি হাউজ নামে পরিচিতি লাভ করে। একসময় কফিহাউজ ইন্ডিয়ান কফি বোর্ডের আওতা  থেকে বেরিয়ে এসে শ্রমিক সমবায়ের আওতায় আসে। বাঙালির প্রাণের এ আড্ডাস্থলটি উপমহাদেশে বৃটিশবিরোধী নানা আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে।
কলকাতায় দুটি কফি হাউজ রয়েছে। একটি কলকাতার সেন্ট্রাল এভিনিউ অন্যটি কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউজ। এই দুটি কফি হাউজেরই রয়েছে পুরনো ইতিহাস। ইন্ডিয়ান কফি বোর্ডের উদ্যোগে বাঙালি কফিসেবীদের জন্য সেন্ট্রাল এভিনিউর কফি হাউজ খোলা হয় ১৯৪১-৪২ সাল নাগাদ। এর কিছুদিন পর চালু হয় কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউজটি। দুই কফি হাউজই ছিল এককালের বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের প্রধান আড্ডাস্থল। নিকটতম বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ছাত্রছাত্রীদের ভিড় করা ছাড়াও নামিদামি বুদ্ধিজীবী লেখক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, গায়ক, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও বিদেশি পর্যটকদের আড্ডা  দেয়ার অবারিত জায়গা হিসাবে কফি হাউজ খ্যাত। বিশ্বের সবচেয়ে বড় পুরনো বইয়ের বাজার ও নতুন বইয়ের ক্রেতারা এখানেই ভিড় জমান।
মান্না দে’র সেই গানের মতোই বলতে হয়, একই সেবাদানে আজ এসেছে নতুন পুড়ি, শুধু সেই সেদিনের মালি নেই। সেই টেবিলটা আজও আছে, সেই একই কাপে হয়তো কফি এখনও আসছে। শুধু সেই আড্ডাবাজরা বদলেছে। কফি হাউজের আড্ডার রেশ থেকে যাবে অনেকদিন অবধি।


 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

নবীনগরে আওয়ামী লীগ নেত্রী খুন

রোহিঙ্গাদের সঙ্গে দেখা হবে পোপের

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনে বিশ্বজনমত গঠিত হয়েছে

৬৯ মাসে তদন্ত প্রতিবেদন পেছালো ৫২ বার

মসনদে বসছেন ‘কুমির মানব’

রোহিঙ্গাদের ফেরাতে সমঝোতার কাছাকাছি বাংলাদেশ-মিয়ানমার

তনুর পরিবারের সদস্যদের ঢাকায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ

স্বপ্ন দেখাচ্ছে সৌর বিদ্যুৎ

আসন ধরে রাখতে চায় আওয়ামী লীগ, ফিরে পেতে মরিয়া বিএনপি

মেয়র পদে ১৩ জনের মনোনয়নপত্র জমা

জিদান খুনের রোমহর্ষক বর্ণনা আবু বকরের

অসহনীয় শব্দ দূষণে বেহাল নগরবাসী

সব স্কুলে ছাত্রলীগের কমিটি দেয়ার নির্দেশ

একতরফা নির্বাচন কোন নির্বাচনী প্রক্রিয়া নয়

‘অনুমোদনহীন বারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা’

কি পেলাম কি পেলাম না সেই হিসাব মেলাতে আসিনি: প্রধানমন্ত্রী